ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার গেরুয়াকরণ, দীননাথের অঙ্গুলিহেলন

 

কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার কয়েক দিনের মধ্যেই সংঘ পরিবারের বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজন শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার নিয়ে বিবৃতি দিতে শুরু করলেন। যদিও শিক্ষা ক্ষেত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি ব্যক্তি ও সংস্থাগুলো শিক্ষায় ‘সনাতনী’ ধ্যান-ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারে একমত হলেও কিভাবে তা করা হবে তা নিয়ে তাদের মধ্যে ঐক‌্যমত নেই। ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার গেরুয়াকরণে মোদি সরকারের ভূমিকা কী লক্ষ্য করুন পর পর ঘটনাগুলিতে।

মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী স্মৃতি ইরানি নিজেও পূর্ববর্তী সরকারের চালু করা কাঠামো বহাল রাখা হবে কি না সে ব্যাপারে বিবৃতি দিয়েছেন। তার একটি বিবৃতিও স্কুলের অবকাঠামো উন্নতি বা সার্বজনীন শিক্ষা নিশ্চিত করা সংক্রান্ত নয়, বরং সেগুলোর সবই বেদ, উপনিষদ এবং অন্যান্য প্রাচীন হিন্দু পুস্তক শ্রেণি কক্ষে প্রবর্তন বিষয়ক। মনে করা হচ্ছে, তিনি আমলাদের প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতি ও উত্তরাধিকারের স্মৃতি সংরক্ষণে সহায়ক হবে এমন শিক্ষা সামগ্রী উদ্ভাবন করতে বলেছেন।

ন্যাশনাল কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্ক (এন সি এফ) আমূল পরিবর্তনে সরকারি পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে যে গুঞ্জন রয়েছে সেই সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে গত জুলাইয়ে রাজ্যসভায় স্মৃতি ইরানি ‘এন সি এফ ২০০৫’ সমর্থন করে বলেন যে, সেটা স্পর্শ করা হবে না। এর কয়েক দিন পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং ইঙ্গিত দেন, পাঠ্যপুস্তকের সংশোধনের পরিকল্পনা রয়েছে: ‘তরুণরা যাতে আমাদের মূল্যবোধ জানতে পারে সেজন্য পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তুতে পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।’ তিনি রাজ্যসভায় দেশে অপরাধ বৃদ্ধি-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় আরও বলেন, ‘মানসিকতায় পরিবর্তন’ আনার জন্য জনগণের মধ্যে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত করার দরকার রয়েছে।

স্মৃতি ইরানি আরেকটি বিবৃতিতে এটাও বললেন, ভারতের শিক্ষানীতি সংশোধনের লক্ষ্যে দেশভিত্তিক ও অঞ্চলভিত্তিক বিতর্কের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। তিনি হায়দরাবাদে ‘রিস্ট্রাকচারিং অব আওয়ার এডুকেশন সিস্টেম উইথ ভারতীয় পারসপেকটিভ অব ভেলুস’ শীর্ষক এক সিম্পোজিয়ামে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেন, ‘ভারতের নতুন আকাঙ্ক্ষা এবং ২০১৪ সালের সম্ভাবনার আলোকে এমন একটি শিক্ষানীতির প্রয়োজন যা আরও শক্তিশালী, আরও উদ্দীপ্ত ও আরও মানবিক করে জাতিকে নতুনভাবে বিকশিত করে তুলবে।’ একই অনুষ্ঠানে তিনি ঘোষণা করেন, সব সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন (সি বি এস ই) স্কুল, কেন্দ্রীয় ও নবোদয় বিদ্যালয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি ‘মাতৃভাষা দিবস’ উদযাপিত হবে। তিনি উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও এতে অংশ নেওয়ার ‘পরামর্শ’ দেন।

নতুন প্রশাসনের তরফে ‘পরামর্শের’ ওজন কতটুকু তা শিক্ষক দিবসে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ এবং দেশজুড়ে ছাত্রদের সাথে মতবিনিময়ের ঘটনায় পরিষ্কার হয়ে যায়। স্মৃতি ইরানি যদিও মিডিয়াকে বলতে থাকেন, ছাত্রদের ওই ভাষণ শোনা বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু তবুও দিল্লির স্কুল এডুকেশন অ্যান্ড লিটারেসি বিভাগের সচিব সব জেলা শিক্ষা অফিসারকে এই মর্মে দিয়ে চিঠি দেন যে স্কুলগুলো ‘চাইলে’ বেলা ২.৩০ থেকে ৪.৪৫ পর্যন্ত শিশুদের সমবেত হওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে, যাতে তারা ‘চাইলে’ টেলিভিশনে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ সরাসরি দেখতে পায়। এর পরপরই আরও কয়েকটি চিঠিতে ‘৫ সেপ্টেম্বর ২০১৪-এ শতভাগ অংশগ্রহণ নিশ্চিত’ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। কতগুলো স্কুল এসব নির্দেশ অনুসরণ করল এবং কতসংখ্যক ছাত্র ভাষণের সময় উপস্থিত ছিল তা মন্ত্রণালয়ে জানানোর নির্দেশ জারি করা হয়। সি বি এস ই তার অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছাত্রদের জন্য সরাসরি দেখার ব্যবস্থা করতে এবং এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়। ভাবুন তাহলে!

বামপন্থীরা একে ‘নজিরবিহীন’ অভিহিত করে অবিলম্বে প্রত্যাহার করার দাবি জানায়। ‘স্পষ্টতই সব আদর্শের সাথে পরিচিত হওয়ার মাধ্যমে নিজের জীবন সম্পর্কে জানা পথ গ্রহণ করার ব্যবস্থা করার বদলে আর এস এস-বি জে পি (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ-ভারতীয় জনতা পার্টি) এই উপলক্ষকে তরুণদের মগজ ধোলাই করার কাজে ব্যবহার করতে চায়’ বলে সি পি আই (এম)-র পলিট ব্যুরোর এক বিবৃতিতে বলা হয়।

এদিকে শিক্ষা বাঁচাও আন্দোলন সমিতির আহ্বায়ক দীননাথ বাত্রা, প্রখ্যাত ভারততত্ত্ববিদ ওয়েন্ডি ডনিগারের ‘দি হিন্দু : অ্যান আলটারনেটিভ হিস্টরি’ বইটি বাতিল করার মাধ্যমে রাতারাতি খ্যাতি অর্জনকারী, স্কুল পাঠ্যপুস্তকের সংস্কার সম্পূর্ণ করার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তিনি এন সি এফ ২০০৫ প্রশ্নে এইচ আর ডি মন্ত্রীর সাথে ভিন্ন মত প্রকাশ করেন এই কারণে যে, এটা নাকি ‘অন্যদের মতাদর্শ’ ভিত্তিক।

ফ্রন্টলাইন পত্রিকায় দিব্য ত্রিবেদী এক নিবন্ধে লিখছেন, সম্প্রতি গুজরাটে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের সহায়ক গ্রন্থগুলোর প্রবর্তন কোনো ইঙ্গিতবাহী হলে মনে করতে হবে কেন্দ্রীয় সরকার যা-ই বলুক না কেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে গেরুয়াকরণ হলো প্রকৃত ও আসন্ন হুমকি। একটার পর একটা বইতে ‘অন্যদের মতাদর্শকে’ অবৈধ হিসেবে মুদ্রিত হয়েছে: লক্ষ্যহীন, ঔদ্ধত্য ও একগুঁয়ে তরুণ প্রজন্ম সৃষ্টির জন্য মার্কস ও ম্যাকলেকে দায়ী করা হয়েছে। ‘নিগ্রো’ পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়েছে মারাত্মক ধরনের অপরাধীর ক্ষেত্রে, গরু পূজাকে চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রশংসা করা হয়েছে।

আর এস এস নিয়ন্ত্রিত ‘ভারতীয় শিক্ষানীতি আয়োজক’ নামে একটি সংগঠন ভারতীয় শিক্ষাকে ‘ভারতকেন্দ্রিক’ করার পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করেছে। তবে সংগঠনটির প্রধান ব্যক্তি আর এস এস-সংশ্লিষ্ট দীননাথ বাত্রা এই সংস্থাকে আর এস এস প্রতিষ্ঠিত বলে মানতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটা কোঠারি কমিশনের মতো স্বাধীন সংস্থা এবং অ-আর এস এস লোকজনকে নিয়ে গঠিত।’ সরকারি সংস্থার আদলেই গঠিত হয়েছে ‘আয়োজক’, তবে সময়ই বলে দেবে মোদি সরকার এর ওপর কতটা নির্ভর করবে। বাত্রা বলেন, তিনি এখনো স্মৃতি ইরানি বা নরেন্দ্র মোদির সাথে দেখা করেননি। তবে সরকারে বৃহত্তর ভূমিকা পালন করবেন কি না সে প্রশ্ন কৌশলে এড়িয়ে বলেন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কাজেই তিনি বেশির ভাগ সময় ও চিন্তা-ভাবনা ব্যয় করেন।

তিনি ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর টিচার এডুকেশনের (এন সি টি ই) চারজন সদস্যকে অপসারণের (তার ভাষায় তারা নন-অফিসিয়াল সদস্য) আন্দোলন করছেন। এই চারজনের অন্যতম ভারজিনিয়াস জাজা ইতোমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন। বাত্রা অপর তিন সদস্যের- কৃষ্ণ কুমার, জানকি রাজন, পদ্ম সারঙ্গপানির ব্যাপারে রাইট টু ইনফরমেশনের (আর টি আই) আওতায় আবেদন করেছেন। তিনি কাউন্সিলে তাদের সদস্যপদ চ্যালেঞ্জ নিয়ে আইনি অভিমতও চেয়েছেন।

দিব্য ত্রিবেদী লিখছেন, আধুনিকায়ন প্রশ্নে পাশ্চাত্যের শিক্ষা শেষ কথা নয়। তবে আর এস এসের ম্যাককুলের শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘একান্ত বাধ্যগত দাস হিসেবে রাজকীয় প্রশাসনের সেবা করার জন্য বাদামি চামড়ার ইংরেজ বাহিনী উৎপাদনকারী’ হিসেবে অভিহিত করাটা নিতান্তই বিপজ্জনক বলা যেতে পারে। সংঘ পরিবারের স্কুলগুলো তাদের মতাদর্শই প্রচার করে আসছে। ১৯৫২ সালে সংগঠনটি তার প্রথম স্কুল হিসেবে উত্তর প্রদেশের গোরক্ষপুরে সরস্বতী শিশু মন্দির (নার্সারি স্কুল) প্রতিষ্ঠা করে। আর এস এসের নিজের ভাষায় এর উদ্দেশ্য ছিল ‘বাধ্যতামূলক শিক্ষাগত জ্ঞান, শৃঙ্খলা, দেশত্ববোধ দৃষ্টিভঙ্গি, মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা, উচ্চ নৈতিক ও হিন্দু মূল্যবোধের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টির’ পাশাপাশি ‘ছাত্রদের শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার দিকে ছাত্রদের আকৃষ্ট’ করা। শিশু মন্দির আজ বিদ্যা ভারতীতে পরিণত হয়েছে। হিন্দু মূল্যবোধের ভিত্তিতে এর আওতায় রয়েছে হাজার হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। হিন্দু মূল্যবোধের ভিত্তিতে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠান নার্সারি থেকে পোস্ট গ্রাজুয়েট পর্যায় পর্যন্ত পড়ানো হয়। খ্রিস্টান মিশনারিদের মোকাবিলার লক্ষ্যে ১৯৮০-এর দশকের প্রথম দিকে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় বনবাসী কল্যাণ আশ্রম এখন ২১টি রাজ্যের শতাধিক জেলায় বিস্তৃত। আর এস এসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই আশ্রম কেবল ‘সংশ্লিষ্ট এলাকায় ধর্মান্তরণের কাজই বন্ধ করেনি, সেই সাথে ধর্মান্তরিতদের হিন্দু পতাকাতলেও ফিরিয়ে এনেছে’।

সমস্যাগ্রস্ত লোকজনকে খুঁজে বেড়ানো বা ইতিহাস নতুন করে লেখা ফ্যাসিবাদী কৌশলের বিশেষ স্মারক হলেও বর্তমান সময়েও এখনো বিরল নয়। আগের আমলেও সমাজের একটি অংশের প্রতি একই ধরনের আচরণ দেখা গিয়েছিল। তবে এখন সেগুলো আরো সংঘবদ্ধ এবং সমন্বিত পদ্ধতিতে করা হচ্ছে। গুজরাট ও কর্নাটকের মতো কয়েকটি রাজ্যে শিক্ষাব্যবস্থার গেরুয়াকরণ চিহ্নিত করার কিছু কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ২০০৬ সালে ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এন সি ই আর টি) প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল ফোকাস গ্রুপ অন জেন্ডার ইস্যুজ ইন এডুকেশন শিক্ষাকে সাম্প্রদায়িকতাপূর্ণ করার উদাহরণ উল্লেখ করেছে। এতে বলা হয়েছে : ‘আগের মেয়াদগুলোতেও পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও এই দৃষ্টিভঙ্গিতে পাঠ্যপুস্তক নতুন করে লেখার (গুজরাটের উদাহরণে) বিষয়টি ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সাংস্কৃতিক বিভক্তি বাড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। এর প্রভাবে ছেলেরা উগ্র ভাবাপন্ন হওয়ার প্রচন্ড চাপে থাকে, আর মহিলারা আরো বেশি করে নিজ সম্প্রদায়ে গন্ডিবদ্ধ হয়ে মূলত রীতি রেওয়াজ এবং পারিবারিক মূল্যবোধ সমুন্নতকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়। এন পি ই ২০০৬-এর বিপুল অর্জন নস্যাৎ করে দিয়েছে ন্যাশনাল কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্ক (২০০৬)। শিক্ষায় মূল্যবোধ সংযোজনের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে ধর্মের ওপর ভরসা করা হয়েছে এবং এতে মহিলাদের জন্য আদর্শ ও প্রথা হিসেবে ধর্মের ভূমিকা বাড়িয়ে দিয়েছে।’

গত বছর রমিলা থাপার, এন রাম, মুশিরুল হাসান, সোমনাথ চ্যাটার্জি, গোপালকৃষ্ণ গান্ধী, বি জি ভারগিজ এবং অন্যরা এক যৌথ বিবৃতিতে পাঠ্যপুস্তকের বিশেষ করে কর্নাটক, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব ও অন্যান্য রাজ্যে (অধ্যাপক জয়া হাসানের সভাপতিত্বে বেসরকারি স্কুলগুলোতে পঠিত বইগুলো প্রশ্নে গঠিত সেন্ট্রাল অ্যাডভাইজরি বোর্ড অব এডুকেশন (সি এ বি ই-কর্তৃক উদ্ধৃত) গেরুয়াকরণে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কর্নাটকে ‘কমিটি ফর রেসিস্টিং স্যাফরোনাইজেশন অব টেক্সট’ (সি আর এস টি) পাঠ্যপুস্তকে মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্পর্কে গদবাঁধা ধারণা জোরদার করা এবং মহিলা, দলিত ও অ-বৈদিক প্রথার কণ্ঠস্বরকে দমন করার বিষয়গুলোর ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে। পাঠ্যপুস্তকগুলোকে ‘দক্ষিণপন্থী মতাদর্শ’ প্রচার করায় কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করে। তাদের উদ্বেগগুলোর একটি ছিল এই যে, ইউরোপিয়ানদের নির্যাতনের কথা পাঠ্যপুস্তকে উল্লেখ থাকলেও ‘উচ্চবর্ণের’ লোকদের হাতে দলিতদের নির্যাতনের বিষয়টি চেপে যাওয়া হয়েছে। কমিটি জানায়, পাঠ্যপুস্তকে ছয়টি আলোচিত সন্ত্রাসী হামলার কথা উল্লেখ করা হলেও ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘সমঝোতা এক্সপ্রেসে’ গেরুয়া সন্ত্রাসের কোনো উল্লেখ নেই। কমিটির প্রতিবেদনে অ-নিরামিশ খাবার অন্তর্ভুক্ত না করা, বর্ণবাদী ব্যবস্থা ও অচ্ছুদের মধ্যে সম্পর্ক, দেশের ইতিহাস লিখতে ভারতীয় লেখকদের ব্যর্থতার বিষয়গুলো কেন পাঠ্যপুস্তকে স্থান পায়নি তার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ব্যাঙ্গালোর ডায়াসিস বার্নার্ড মোরাস ২০১২ সালের আগস্টে গভর্নর এইচ আর ভরদ্বাজকে একটি স্মারকলিপিতে ২০১২ সালে প্রকাশিত পাঠ্যপুস্তকগুলোতে বিশেষ করে অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান ও হিন্দি এবং সপ্তম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বইতে গেরুয়া প্রবণতা বৃদ্ধির প্রতি দৃষ্টিপাত করার আহ্বান জানান।

আসলে আর এস এস এবং বি জে পি ধর্ম বর্ণের নামে মানুষকে বিভাজিত করে রাখতে চাইছে। কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস সূচনা থেকেই এরকম সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতার। বহু কমিউনিস্ট নেতা কর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সম্প্রীতি রক্ষার জন্য কাজ করেছেন। ১৯০৫ সাল থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে ব্রিটিশরা বাংলায় সাম্প্রদায়িক বিভাজনের চেষ্টা করেছে বারবার। তারপরেও ভারতের বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হাঙ্গামা হয়েছে ব্রিটিশদের অপকৌশলের কারণে। ভারতের অনেক জায়গায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সময় ১৯২৬ সালের ১২ই আগস্ট গণবাণী পত্রিকায় কমরেড মুজফ্‌ফর আহমদ্‌ প্রবন্ধ লিখে আহবান জানিয়েছিলেন, ‘সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও’।