ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

বিজেপি সরকার মানেই ইজরায়েলের সঙ্গে সখ্যতা।

দেশে বিজেপি সরকার আসার পর আরও নিবিড় ভাবে ইজরায়েল জড়িয়ে ধরছে ভারতকে। দু’দেশের সামরিক সম্পর্ক গভীর হয়েছে। ইজরায়েলের সাথে ভারতের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক নতুন করে গতি পেয়েছে বলে মনে করছেন নয়া দিল্লির সামরিক কর্মকর্তারা। নিউইয়র্কে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে গত ২৯ সেপ্টেম্বর ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে মোদির বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন গতির সঞ্চার হয়। বৈঠকের প্রধান বিষয় ছিল দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্ক।

ইজরায়েলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, ইজরায়েলের বর্বর দখলদারির বিরুদ্ধে প্যালেস্তিনীয় মানুষের সংগ্রামের প্রতি সমর্থন থেকে ভারত ঠিক কতটা দূরে সরে যেতে পারে! লেবানন ও সিরিয়ায় ইজরায়েলের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনায় এবং গাজায় বর্বরোচিত আক্রমণের ঘটনায় বামপন্থীরা ইজরায়েলের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি তোলে। অথচ, সেদিন দিল্লি কেন জোরালো প্রতিবাদ করেনি তা এখন টের পাওয়া যাচ্ছে। তবে তা নতুন কোনও ঘটনা নয়!

১৯৯২সালের জানুয়ারিতে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর ইজরায়েলের সাথে ভারতের কৌশলগত, সামরিক ও গোয়েন্দা সম্পর্ক এশিয়ায় সম্ভাব্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। ভারত ইতোমধ্যেই ইজরায়েলের বৃহত্তম প্রতিরক্ষা সামগ্রী আমদানিকারকে পরিণত হয়েছে।যদিও দিল্লি-তেল আবিবের সম্পর্কের বিষয়টি এ ধরনের অনেক সম্পর্কের মতোই রহস্যের আবরণে মোড়া। সামরিককর্তা, প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানীদের ঘনঘন সফর এবং ইউ এ ভি, মিসাইল সিস্টেম ও গোলাবারুদ বিক্রি হলেও কোনও পক্ষই নিরাপত্তা সম্পর্ক নিয়ে সরকারিভাবে মন্তব্য করতে আগ্রহী নয়।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী অরুন জেটলি গত ১২আগস্ট পার্লামেন্টে বলেছেন, ‘সামরিক সম্ভারের ক্ষেত্রে ২০১১ সালের পর ইজরায়েল পরিণত হয়েছে ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পর) রপ্তানিকারক দেশে। ভারতের আমদানি ৩৩.৮৯ বিলিয়ন টাকার সরঞ্জাম। বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে ইজরায়েলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বেড়েছে আগেও। ২০০৪ থেকে ছয় বছরের জন্য ক্ষমতায় থাকার সময়ও এমনটা ঘটেছিল। সামরিক বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার (অবসরপ্রাপ্ত) অরুন সাগাল বলেছেন, ‘বিজেপি ইজরায়েলের এই পরামর্শকে গুরুত্ব দেয় যে, ইজরায়েলের মতো ভারতও যেহেতু বৈরী প্রতিবেশীতে ঘেরাও, তাই তেল আবিবের সহায়তায় তার সামরিক সামর্থ্য বাড়ানোর বেপরোয়া উদ্যোগ নেওয়া দরকার।’

ইজরায়েলের সঙ্গে ভারতের কূটনেতিক ও সামরিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করে ২০০০থেকে। বি জে পি’র যশোবন্ত সিংই প্রথম ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রী হিসেবে ইজরায়েলে যান। একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক-রাজনৈতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হয়। একদিকে আমেরিকার আগ্রহ, অন্যদিকে বি জে পি’র আগ্রহে ইজরায়েলের সঙ্গে ভারত হাত মেলানো শুরু করে। ২০০৩-এ ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন ভারতে আসেন এবং ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে আরব দুনিয়ার বিরুদ্ধে যথেচ্ছ বিষোদগার করে যান। শ্যারনের ভারত সফরের বিরুদ্ধে বামপন্থীরা সেদিনও বিক্ষোভ দেখিয়েছিলো।

পালটা যুক্তিতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বলেছিল, ইজরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে ‘কার্যকরী ভাবে সন্ত্রাস রুখেছে’।তাই তাদের কাছ থেকে ভারতের নাকি শেখার আছে। জায়নবাদী ইজরায়েল এবং কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের মধ্যে সখ্য স্বাভাবিক। অভিন্ন লক্ষ্য ‘ইসলাম বিরোধিতা’। বস্তুত আমাদের দেশে ক্রমশ জায়গা করে নেওয়ার সুযোগে সঙ্ঘ পরিবারের উদ্যোগে ২০০৭-এ জায়নবাদী ও হিন্দুত্ববাদীদের যৌথ বিশ্ব সম্মেলনও সংগঠিত হয় দিল্লিতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে শরিক হওয়া আসলে জনসঙ্ঘ ও আর এস এসের চিরায়ত দৃষ্টিভঙ্গি।

নিউইয়র্কে ২৯ সেপ্টেম্বর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে মোদির এ ধরনের বৈঠক প্রায় এক দশক পর এই প্রথম। মোদি তার ‘মেইড ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগ এবং প্রতিরক্ষা খাতে প্রত্যক্ষ সরকারি বিনিয়োগ ২৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪৯ করা নিয়ে তার প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিষয়টি মাথায় রেখে প্রতিরক্ষা অংশিদারিত্ব বিবেচনা করার জন্য নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ভারতের বর্তমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ পূরণ করা হয় আমদানিকৃত সামগ্রী দিয়ে। মোদি এই নির্ভরশীলতা কাটাতে ভারতের অভ্যন্তরীণ সামরিক-শিল্পক্ষেত্র শক্তিশালী করতে চাইছেন। জেরুজালেম পোস্টের খবর অনুযায়ী, বৈঠকের পর নেতানিয়াহু বলেছেন যে, ভারত-ইজরায়েল সম্পর্কটি এমন যে তা ‘আকাশের মতো সীমাহীন।’ মোদির নেতৃত্বে প্রতিরক্ষাবিষয়ক ক্যাবিনেট কমিটি ২৪ সেপ্টেম্বর ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা ১৪ কোটি ৩৯ লাখ ডলারের রাফায়েল-ইজরায়েল অ্যারোস্পেশ ইন্ড্রাস্ট্রিজের ডিজাইন করা ২৬২টি বারাক-১ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার বিষয়টি অনুমোদন করে।

গত জুলাই মাসের প্রথম দিকে ভারতীয় প্রতিরক্ষা সচিব আর কে মাথুর তিন দিনের সফরে (বিষয়টি তেমন প্রচার পায়নি) তেল আবিবে গিয়ে যৌথ ব্যবস্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র উদ্ভাবন নিয়ে আলোচনা করেছেন। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, আলোচ্যসূচিতে সম্ভাব্য নিখুঁত নিয়ন্ত্রিত গোলা এবং ১.২ বিলিয়ন অর্থের হেরন মনুষ্যবিহীন আকাশ যান (ইউ এ ভি) কেনার বিষয়ও ছিল। ভারতের তিন বাহিনী ইতোমধ্যেই এ ধরনের ৩২টি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। মাথুর আরও দুটি আগাম হুঁশিয়ারি ও নিয়ন্ত্রণ বিমান ভাড়া নেওয়া নিয়েও আলোচনা করেন। এগুলো হবে ২০০৪ সালে ভারতীয় বিমান বাহিনীর জন্য প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারে কেনা আইএআই/ইএলটিএ ফ্যালকন রাডার সিস্টেম-সংবলিত তিনটি বেরিয়েভ এ-৫০ইআই প্ল্যাটফর্মের অতিরিক্ত।

ভারতের কাছে রাফায়েলের ডিজাইন করা আয়রন ডোম বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র সিস্টেম বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে ইজরায়েল। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, বিএমডির সোর্ডফিশ দূরপাল্লার শনাক্তকরণ রাডার ‘সমস্যাপূর্ণ’ বলেও প্রমাণিত হয়েছে। ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ডিআরডিও)-আইএআই/ইলটিএ আবিষ্কৃত দুটি ইএল/এম ২০৮০ গ্রিন পাইন রাডার ভারত কিনেছিল ২০০০-০১ সালেই।

ইজরায়েলের সঙ্গে এই একটিই নয়, একের  পর এক অস্ত্র কেনার চুক্তি হতে হতে এখন তারাই ভারতের বৃহত্তম প্রতিরক্ষা সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়েছে। বি জে পি-র মতো ইউ পি এ জমানাতেও ২০০৭, ২০০৮দু’বছরই ১০০কোটি ডলারের বরাত পেয়েছিল তারা। পরের বছরগুলিতে আরও বেশি। ক্ষেপণাস্ত্র বরাতের ঠিক পরেই বিহারের নালন্দায় পাঁচটি অস্ত্র তৈরির কারখানার একটি কমপ্লেক্সের বরাত দেওয়া হয়েছিল ইজরায়েলি মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রি (আই এম আই)-কে।

লেবানন, প্যালেস্তাইনে নৃশংস আক্রমণ, আরব দুনিয়ার দেশগুলির ওপর পর্যায়ক্রমে সামরিক আগ্রাসন চালালেও ইজরায়েলের ভূমিকা নিয়ে ভারত সরকারের এই পদক্ষেপ কিসের ইঙ্গিত? প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। বি জে পি সরকার আমেরিকা-ইজরায়েল-ভারত অক্ষ গড়ে তুলতে উৎসাহী। সন্ত্রাসবাদকে অজুহাত করে এ কাজে এগোনো হচ্ছে। ইজরায়েল এখন এতোটাই প্রভাবশালী যে আন্তর্জাতিক মহলে ইজরায়েলের হয়ে দালালি করা ব্যক্তিও বি জে পি-র সাংসদ।