ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

 

 

সেই দারিদ্র দূর হবে কীভাবে?

 

‘টাইম’ পত্রিকার সাক্ষাৎকারে নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ‘‘খুব কাছ থেকে আমি দারিদ্র্য প্রত্যক্ষ করেছি। দারিদ্র্যের মধ্যে আমি বেঁচেবর্তে থেকেছি। আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে দারিদ্র্যে ডুবে থেকে। আমার কাছে তাই দারিদ্র্য হলো আমার জীবনের প্রথম উদ্দীপক…তাই আমি স্থির করেছি আমি আমার নিজের জন্যে বাঁচবো না, বাঁচবো অন্যের জন্য।’’

গত ১৩ মে শিশু শ্রমিক আইন পরিবর্তনে সম্মতি জানিয়েছে সেই নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভা। সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুরা এখন থেকে ‘বিপজ্জনক নয়’ এমন শিল্পে কাজ করতে পারবে। আইন সংশোধন করে শিশুদের বিশেষত পারিবারিক এবং বিনোদন শিল্পে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। সরকার অবশ্য বলেছে, অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক শিক্ষা আইনের অধীনে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের অবশ্যই স্কুলে যেতে হবে। যেসময় তাদের স্কুল থাকবে না বা ছুটি চলবে—একমাত্র সেই সময়ই তারা কাজ করতে পারবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনটি লঘু করলে আসলে তা শিশুশ্রমিকের সংখ্যাই বাড়াবে।

অবৈতনিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেও সব শিশুকে এখনও শিক্ষার আঙিনায় নিয়ে আসা যায়নি। সরকারী সূত্রে এই সংশোধনী আনার কারণ জানিয়ে বলা হয়েছে, সম্পূর্ণভাবে শিশুদের কাজ করতে না দিলে ভারতীয় সমাজের গঠন নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সরকারের উদ্দেশ্য জানিয়ে এক অফিসার বলেছেন, সরকার ভারতীয় সমাজের কাঠামো আবার নতুন করে গঠন করতে চায় না। পরিবারের মধ্যে শিশুরা বড়দের সঙ্গে কাজে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমেই কাজ শেখে। সরকার বাড়িতেই শিশুদের এই কাজের প্রশিক্ষণ নেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ দিচ্ছে। কারণ এটিই তাদের ভবিষ্যতে উদ্যোগপতি হতে সাহায্য করবে। কৃষিকাজ, বিভিন্ন পারিবারিক শিল্পে শিশুরা ছোটো থেকেই বড়দের সঙ্গে কাজ করে এবং সেই পারিবারিক শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। সেই কাজই শিশু শ্রম প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতা থেকে বাদ রাখতে চাইছে সরকার। ফলে পারিবারিক কাজকর্মে যদি শিশুদের কাজে লাগানো হয় তবে সেটি শিশু শ্রমিক আইন লঙ্ঘনের আওতায় পড়বে না। আবার অনেক শিশু বিনোদন শিল্পে কাজ করে। সেই শিশু শিল্পীদের বিকাশের স্বার্থে এই আইনে তাদেরও কাজের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এই সমস্ত যুক্তি পশ্চাদমুখী বলেই পর্যবেক্ষকদের সমালোচনা। ‘সমাজের গঠন’ অব্যাহত রাখার নামে শিশুর ন্যূনতম মানবিক অধিকার লঙ্ঘনকেও এভাবে সরকারী শিলমোহর দেওয়ায় বিস্মিত সংশ্লিষ্ট মহল।

অভিযোগ, কোনও শিশু বাইরের জগতে মজুরির বিনিময়ে কাজ করলে সে শিশু শ্রমিক হিসেবে গণ্য হয়। এই গোত্রের কাজ নিয়েই যত আপত্তি, কারণ মনে করা হয় যে এর ফলে শৈশবের আনন্দ হারিয়ে যায়, গরিব গরিব থেকে যায়, আর্থিক উন্নতি ব্যাহত হয়; সুতরাং শিশু শ্রম অন্যায়। অন্য দিকে, পরিবারের বলয়ে শিশুরা যা কাজ করে, সে সবই বৈধতার স্বীকৃতি পায়। এটাই শিশুদের কর্মজগতের দ্বিতীয় ভুবন, যাকে বলছি শিশুদের কাজ। শিশুকর্মীদের শতকরা নব্বই ভাগই এমন কাজে নিযুক্ত আছে যেখানে মজুরি দেওয়া হয় না, সে কাজ হয় পরিবারের ভিতরে অথবা ‘তৃতীয় বিশ্ব’র তথাকথিত সাবেকি অর্থনীতিতে। এই সব ক্ষেত্রে সচরাচর কাজ হয় পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে, মজুরির বদলে এটা-সেটা ধরিয়ে দেওয়া হয়, কখনও বিভিন্ন পরিবার পারস্পরিক সাহায্য বিনিময় করে। আর্থিক লেনদেনের বাইরে এই বিশাল কর্মজগৎটার অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয় না, কিন্তু সেখানকার কর্মীরা শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। শিশুদের শ্রম এমনভাবে দেখা হয়, যেন তারা অর্থনীতির বাইরে। সম্পদ সৃষ্টিতে অর্থাৎ উদ্বৃত্তের আহরণ, বণ্টন কিংবা প্রাপ্তিতে শিশুদের ভূমিকা ও অধিকারের প্রশ্ন আমাদের দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়।

কে না জানেন, দারিদ্রের তাড়না, একটু ভাল ভাবে বাঁচার তাগিদ বাবা- মা’দের অনুপ্রাণিত করে ছেলেমেয়েদের কাজে লাগিয়ে দিতে। দারিদ্রের বিনাশ না হলে শিশুশ্রমের বিনাশ নেই। শিশুশ্রমিক নিষিদ্ধ করে সরকার দরিদ্র জনসাধারণকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে। দরিদ্রের স্বল্পমেয়াদি সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলবে এই আইন। আর দীর্ঘমেয়াদে তো তাঁরা সবাই মৃত।গত শতকে নব্বইয়ের দশকে মার্কিন কংগ্রেসে সেনেটর টম হারকিন আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞার জন্য বিল আনেন, যে-বিল আইনে পরিণত হলে শিশুশ্রম ব্যবহৃত হয়েছে এমন কোনও পণ্যই আমেরিকায় আমদানি হবে না। তখন দেখা গিয়েছে বিল থেকে আইন হয়ে যাবে, এই আশংকায় বাংলাদেশে তৈরি-পোশাক শিল্পে প্রায় ৫০ হাজার শিশুশ্রমিকের কাজ চলে যায়। বিদেশের বাজার হারানোর ভয়ে ওই শিল্পের মালিকরা আর ঝুঁকি নিতে চান না। পরবর্তী কালে গবেষণা থেকে জানা যায়, ওই ৫০ হাজার শিশুর অনেকেই পোশাক শিল্পের থেকে অনেক বেশি বিপজ্জনক কাজে নিয়োজিত হয়েছে, যে-সব ক্ষেত্র থেকে রফতানিযোগ্য পণ্য উৎপন্ন হয় না। অনেকেই পাথরভাঙা কিংবা ভিক্ষাবৃত্তি, এমনকী শিশু-যৌনকর্মী হিসেবেও কাজ করতে বাধ্য হয়েছে। মূল সমস্যাটি হল, ওই শিশুরা যে-সব পরিবার থেকে আসছে, তাদের নিদারুণ দারিদ্র।

তা হলে প্রশ্ন থেকে যায়, দরিদ্র পরিবারগুলির কবে অবস্থার উন্নতি হবে, সেই অপেক্ষায় কি আমরা থেকে যাব অনন্তকাল? দারিদ্র ও তার কারণে শিশুদের কাজে পাঠানোর বাধ্যবাধকতা পরিবারগুলিকে দারিদ্রের ফাঁদে আটকে রাখে। বুনিয়াদি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত শিশু বড় হয়ে অদক্ষ শ্রমিকে পরিণত হয়, ফলে তাদের আয়ও কম হয়। এই ভাবে দারিদ্র এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়, পরিবারগুলি দারিদ্র-শিশুশ্রম-দারিদ্রের দুষ্টচক্রে ঘুরপাক খেতে থাকে। শিশুশ্রমের কারণ হিসেবে দারিদ্রের তত্ত্ব মেনে নিলেও, উন্নয়নের অপেক্ষায় হাত গুটিয়ে বসে থাকাটা তাই সমস্যার সমাধানকে বিলম্বিত করবে।

বাজারের হাতছানির এক মারাত্মক টান আছে। শিশুশ্রমিক কাজ করে দুটো পয়সা রোজগার করছে, তার বাবা অভিযোগ আনবেন না, আপনি অভিযোগ আনতে চাইলে তিনি হাতে-পায়ে ধরবেন। যদি আপনি অভিযোগ আনেন, অমুকে বাচ্চা ছেলে দিয়ে কাজ করাচ্ছে, আদালতে সে অভিযোগ প্রমাণ করা যাবে না। ব্যবসায়ী বলবেন, ও আমার ছেলের মতো, ভালবেসে করে দেয় এ-সব। বাবা-মা বলবেন একই কথা। যদি শিশুশ্রমিক ব্যবহার করে প্রচুর মুনাফা করেন ব্যবসায়ীরা, আর তার ফলে শিশুশ্রমিকের মজুরি, অন্তত বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় হয়, অথবা তা হলে সে আকর্ষণ উপেক্ষা করে কে? আর তাই শিশুদের উদ্বৃত্ত শ্রম আত্মসাৎ করা নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠে না। এই আদর্শের বাতাবরণেই মা-বাবা এবং সন্তানের সম্পর্কের নীতিমূলক কাঠামো তৈরি হয়েছে।

কিন্তু একই সঙ্গে এটাও ঠিক যে, সরকার গত ষাট বছরে প্রাথমিক বা মাধ্যমিক শিক্ষার যে ব্যবস্থা করেছে, দরিদ্র ছেলেমেয়েরা তাতে শিক্ষিত হতে পারে না। ভারতে মোটামুটি পঞ্চাশ কোটি লোক এখন বিদ্যালয়ের প্রাথমিক গণ্ডি পেরোতে পারেন না, তাই মিড- ডে- মিল, সর্বশিক্ষা অভিযান, সেলফ-হেল্প গ্রুপ ইত্যাদি ইত্যাদি। তা হলে ‘শিশুশ্রমের বিনাশ হোক’ বলার সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবস্থা করা উচিত ছিল, যাতে সব শিশুই প্রাথমিক শিক্ষা পায়। সেই লক্ষ্যও এখনও খাতায়-কলমে আর সরকারি ভাষণেই সীমিত থেকে গিয়েছে।

সরকারি ভাবনার প্রমাণ খুঁজলে হাতের কাছেই অরুণ জেটলির বাজেট রয়েছে। জেটলি শিক্ষা খাতে মোট ৬৮,৯৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন। গত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৬৮,৬২৮ কোটি টাকা। টাকার অঙ্কেই বৃদ্ধির পরিমাণ ০.৪৯ শতাংশ। স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ হয়েছে ৩৩,১৫২ কোটি টাকা। গত বছর এই খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ৩৫,১৬৩ কোটি টাকা। মানে, সরাসরি বরাদ্দ কমেছে। বাজেটে খাদ্যের অধিকার আইনের উল্লেখ নেই কোথাও। নারী ও শিশুকল্যাণের খাতে বাজেট বরাদ্দ কমেছে ৪৪ শতাংশ।

দরিদ্র ছেলেমেয়েদের মূলধারার সাবেকি শিক্ষার পথে সমাজে প্রতিষ্ঠিত শ্রেণির সমকক্ষ হওয়া মুশকিল। তাই, প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি সমান ভাবে পেশাদারি শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া সরকারের কর্তব্য। অন্তত পঁচিশ বছর আগেই এটা ভাবা উচিত ছিল। অথচ, হয়নি। সামাজিক বৈষম্যের দোহাই দিয়ে বলা হয়েছে, ‘বড়লোক বাবার ছেলেমেয়েরা প্রথামত শিক্ষা পাবে আর গরিবের ছেলে ইলেকট্রিশিয়ান হবে! এ বৈষম্য রোখা অবশ্যকর্তব্য!’

ভারতে ১০০ ব্যক্তি ২৫ শতাংশ জিডিপির সমান সম্পদের মালিক। ভারতে পুঁজিবাদ সম্পর্কিত পুরো বিতর্ক এটা নিয়ে। এখানে যা ঘটছে, অতীতে ঠিক তা-ই ইউরোপ ও আমেরিকায় ঘটেছিল। ভারতের একটি এলিট শ্রেণি আছে যারা বাইরের পরিমন্ডলে ছিটকে গিয়েছে। সেখান থেকে তারা গ্রামবাসী আর আদিবাসী জনগণের বাস করা ভূমির দিকে, বক্সাইডের দিকে, লোহার খনির দিকে, জলের দিকে, বনের দিকে নজর দিচ্ছে। তারা কেবল বলছে, তাদের পাহাড়গুলোতে আমাদের বক্সাইড সেখানে পড়ে আছে কেন? তাদের নদীতে আমাদের জল কেন? এটা হলো শোষণের অর্থনীতি। যে অর্থনীতির পৃষ্ঠপোষকতাই করছে মোদি সরকার। সেই বিপুল অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন শিশুশ্রমিকদের। শিশুদের কর্মজগতের দ্বিতীয় ভুবনে। পরিবারের বলয়ে। সোজা কথা হল, সরকারের বহু ভুল নীতি, দুর্নীতি, ছলচাতুরি এবং বহু ব্যর্থ প্রতিশ্রুতির ফল শিশুশ্রমিক। পড়াশুনোর সুযোগ নেই, অল্প পড়লে কাজ নেই, চার দিকে নতুন নতুন গাড়ি-বাড়ি চকচকে জিনিসের ভোগবাজিতে চরম বৈষম্য, খোলাখুলি সরকারি টাকার নয়ছয়, ব্যর্থ প্রতিশ্রুতি— সব কিছু থেকে মুক্তির একটাই পথ: তাড়াতাড়ি রোজগার করতে হবে, যত ছোটবেলায় পারো কাজে লেগে পড়ো।

হবেই বা না কেন! শুধু গ্রাম ভারতের অর্থনীতির দিকে তাকান। ফসলের দর কমেছে, সহায়ক মূল্যের বৃদ্ধির হার সবচেয়ে কম, উত্তর ও পশ্চিম ভারতে ফসলহানির ঘটনায় হাহাকার পড়ে গেছে। সরকার কোনও পদক্ষেপ নিতে পারেনি। মোদি বলেছিলেন, ফসলের দামে কৃষকদের উৎপাদন খরচের তুলনায় অন্তত ৫০শতাংশ লাভজনক দাম দেওয়া হবে। এই প্রতিশ্রুতি বেমালুম ভুলে গিয়েছেন তিনি। গত ২৪ মে’র ‘দ্য উইক’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘এলিফ্যান্ট মার্চ’ শিরোনামার এক নিবন্ধে জানানো হয়েছে, ‘বিশ্ব ব্যাঙ্কের ‘বিজনেস ইনডেক্স’-এ ২০১৪-য় মোট ১৮৯টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ছিল ১৪০ এবং তা এবছরে ১৪২-এ নেমে গিয়েছে। মোদি জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাপী এই ব্যবসা-বাণিজ্যের সূচকে তাঁর সরকার ভারতকে শীর্ষ ৫০ নম্বর স্থানে তুলে নিয়ে যাবেন। কীভাবে? ওই একই পত্রিকায় কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী শ্রীমতী নির্মলা সীতারামন ইংরেজিতে জানিয়েছেন, ‘দ্য গভর্নমেন্ট ইজ নাউ ফ্যাসিলিটেটর, নট রেগুলেটর’। অর্থাৎ সোজা বাংলায়, তাঁর সরকার এখন শিল্প-বাণিজ্যের সুযোগ-সুবিধাদায়ক, নিয়ন্ত্রক নয়’। এ থেকে বুঝতে কারোর অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, মোদি সরকার ভারতের অর্থনীতিকে আরও উন্মুক্ত করে দিতে চায় দেশি-বিদেশি বণিকদের কাছে। যে-কারণে আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ক্রিস্টিন ল্যাগার্ড ‘‘মেঘাচ্ছন্ন বিশ্ব-বাণিজ্যের আকাশে ভারতকে এক উজ্জ্বল বিন্দু’’ অ্যাখ্যা দিয়েছেন এবং ‘কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’-এর মতে মোদি সরকার হল ‘প্রো-বিজনেস্‌’ অর্থাৎ ব্যবসা-বান্ধব। মোদি সরকারের বারো মাসে বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণ খাতে বাজেট বরাদ্দ হ্রাস করার মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ৭৫ হাজার ১২২ কোটি টাকা। তাহলে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ কীভাবে হবে? বস্তুত, একদিকে গরিব মানুষের কল্যাণের দায়-দায়িত্ব মোদি সরকার তার কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলছে এবং অন্যদিকে, নিয়ন্ত্রক হওয়ার বদলে শিল্প-বাণিজ্য বাড়ানোর সুযোগ-সুবিধাদায়কের ভূমিকা পালন করছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনের (আইএলও) হিসেব অনুযায়ী বিশ্বে প্রায় ২০ কোটি শ্রমিক শিশু। একটি সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী গোটা দুনিয়ার শিশুদের দুরবস্থার নিরিখে ভারতের স্থান ষষ্ঠ। আমাদের দেশে নানা ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় এখনও প্রায় ৭ কোটি শিশু এবং কিশোরকিশোরী নিয়োজিত। পাশাপাশি ইউনিসেফের দেওয়া শিশুশ্রম সংক্রান্ত হিসেব মোতাবেক ভারতে বর্তমানে ১৪ বছরের নীচে প্রায় ২ কোটি শিশু কাজ করে। উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের গৃহস্থালির কাজে যৎসামান্য বেতন ও যৎকিঞ্চিৎ ভাতকাপড়ের বিনিময়ে পরিচারক কিংবা পরিচারিকা পদে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয় অনূর্ধ ১৪ বছর বয়সি প্রায় ১ কোটি শিশুকে। তা ছাড়া পথ-ফুটপাথের অজস্র চায়ের দোকান, গাড়ি মেরামতের গ্যারেজ এবং ধাবাতে বহাল তবিয়তে বিদ্যমান ৫০ লক্ষাধিক নাবালক শ্রমিকের দল। উপরি পাওনা হিসেবে এই শিশু শ্রমিকদের অনেকের উপর অহরহ চলে গৃহকর্তা-কত্রী ও মালিকদের চড়, থাপ্পড়, কিল ও ঘুষি। অনেক সময় এদের যৌনকর্মেও ব্যবহার করা হয়।

১৯৯৬ সালে কেন্দ্রের যুক্তফ্রন্ট সরকার শিশু শ্রম (নিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ) বিধি প্রবর্তন করে ১৩টি বৃত্তি এবং ৫১টি প্রক্রিয়ার পেশাকে বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করে সেখানে শিশুদের নিয়োগে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। আইএলও এবং মানবাধিকার কমিশনের লাগাতার চাপের দরুন ২০০৬-এর ১ অক্টোবর ওই বিধি পরিমার্জিত হয়ে ১৪ বছরের নীচে শিশুদের বাড়ি, হোটেল, ধাবা এবং পথ-ফুটপাথের দোকানের কাজে নিয়োগের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে কেন্দ্র। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে শিশুদের দিয়ে কাজ করালে মনিবের দণ্ড হবে ৩ মাস থেকে ১ বছর অবধি জেল বা ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা। মোদি সরকার সেই আইনেই পরিবর্তন আনতে চলেছে। কিন্তু অনেকেই মনে করছেন এরফলে আসলে বাড়বে শিশুশ্রমিকের সংখ্যাই। এখনো বহু শিশু শ্রমিক কাজ করেন বাজি কারখানা, দেশলাই কারখানা, জুতো, কার্পেটের মতো শিল্পেও।

আইন সংশোধনের উদ্দেশ্য সাধু, কিন্তু রাতারাতি দেশ জুড়ে ১৪ বছরের কম বয়সি ছেলেমেয়ের গৃহস্থালি বা খাবারের দোকানের কাজ থেকে সরিয়ে আনা কি সম্ভব? পরিবারের যৎসামান্য রোজগারে পেট ভরে না বলেই তো নিজেদের বাবা-মা বাড়িঘর ছেড়ে কর্মজগতে প্রবেশ করতে বাধ্য হয় কচিকাঁচারা। কাজ চলে গেলে এরা খাবে কী? পরিবারের অন্য পাঁচটা পেটেরই বা কী গতি হবে? এই প্রশ্নগুলি পাক খেতে খেতে বড় হয়ে সরকারের দিকে তীব্রগতিতে ধাবিত হয়ে আঘাত হানছে না। কারণ, মোদি আমূল পালটে দেবেন সবকিছু, তাঁকে আরও সময় দেওয়া দরকার, এই ধারণাটা এখনও অধিকাংশের মনে গেঁথে রয়েছে।

slide

শিশুশ্রমের মূল সমস‌্যা তো নিদারুণ দারিদ্র...