ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

গিন্নির হাতের পুঁইশাক কতদিন খাইনি। ঠাকুরের হাতের আঝালা ঝোল খেতে খেতে পেটে চড়া। জীবন বলতে বারোয়ারি কলতলায় রোজকার কলহকেত্তন। ভরদুপুরে তাসের আড্ডা, রাতের অন্ধকারে কখনও সখনও নেশার চুমুক। ‘বালিগঞ্জ কোর্ট’ সিনেমার সেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে মনে আছে? একমাত্র ছেলের বিদেশে চাকরি করতে যাওয়া আটকাতে বদ্ধপরিকর ছিলেন বৃদ্ধ। অনেক বুঝিয়ে স্ত্রী ছেলেকে বিদেশে পাঠান। এর পর শূন্যতা ঘিরে ধরে বৃদ্ধ দম্পতিকে। অভিমানে স্ত্রী-র মৃত্যুসংবাদও ছেলেকে দেননি বৃদ্ধ। অশীতিপর সন্তানবিচ্ছিন্ন অপরেশ ঘোষের জীবনটাও যেন সেই সিনেমার গল্পের মতোই। বাবার আকুতি–মিনতিকে পাত্তা না দিয়ে সন্তু চলে গেল প্রথমে দিল্লিতে, সেখান থেকে বিলেতে, এখন মার্কিন মুলুকে।

—তারপর?

খুঁটখোলা মশারি আর এলোমেলো মাস-বচ্ছরে মায়া বাড়ে এই আশ্রমে। এই আশ্রমই এখন পরিবার। আশ্রমের লম্বা লম্বা গাছগুলিতে আশ্লেষে জড়িয়ে আছে অজস্র লতাপাতা। চশমাটা খুলে সেদিকে তাকান বৃদ্ধ। বললেন, গরম থাকে ঠিকই, কিন্তু আপনজনের হাতের ছোঁয়া তো থাকে না। ওটার যে কী স্বাদ! এঁদের কারও বাড়ি গড়িয়া, কারও সল্টলেক, কেউ থাকতেন যোধপুর পার্ক। এখন ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম। ফোন বা ক্বচিৎ কারও আসা এটুকুই যোগসূত্র। পুজো ওদের কাছে আলাদা কিছু নয়। পুজোয় কারও ঠাঁই হয় আত্মীয়বাড়ি। কিন্তু ভাল লাগে না। একাকীত্ব, তবুও স্বাধীন এই ঠিকানায়। সঙ্গী বলতে টিভি, খবরের কাগজ। সময় কাটাতে বিজ্ঞাপন পড়া। জীবনের সবকিছু এখন যেন একঘেয়েমির এক্কাগাড়ি!

—পুজোয় ঠাকুর দেখেন না?

পুজো এলেই তো পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে খুব। সাত রঙে রঙিন ছিল জীবনটা। পুজোর সময় নাতি-নাতনিকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে যাওয়া, রাতে আলোর রোশনাই দেখতে দেখতে এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো। এখন শুধুই অতীত। বয়স দিচ্ছে জীবন যন্ত্রণাও। বয়স যত বাড়ে, এই অতীত-চারণাও তত বাড়ে। মহালয়া মানেই মনখারাপের অতীতে ফেরা। অবাক হয়ে আবিষ্কার করি, চারপাশে প্রিয় মানুষ যত আছে, তার চেয়ে কম নয়, যারা আর ধরাছোঁয়ার মধ্যে নেই। বেদ-বেদান্ত, গুরুদেব, করতাল, খঞ্জনি নিয়ে দিন কাটে নব্বই ছুঁইছুঁই আরতিদেবীর।পারিবারিক সমস্যায় ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। ছেলে খোঁজখবর নিতে আসে না। মায়ের কাছে মেয়েরা আসে প্রতি পুজোয়।আবার চলেও যায়। পড়ে থাকে শূন্যতা। জীবন থেমে থাকে না। আবার নতুন পুজোর অপেক্ষা।

জানো বাবা, একসময় এই শরতের কোনও পড়ন্ত বিকালে খোলা জানালা দিয়ে যখন চোখ চলে যেত বাইরে, মনে হত কেউ যেন নীল রঙে ডুবিয়ে আকাশটাকে শুকোতে দিয়েছে। আর সেই আকাশের বুকে ভেসে বেড়ানো টুকরো টুকরো ধবধবে সাদা মেঘগুলো যেন সঙ্গী করত আমার কল্পনাকে। সোনালি রোদটাকে হয়তো অন্য সময়ে দেখা রোদের থেকে আলাদা করে চিনে নিতে পারতাম না। কিন্তু মন বলত, সময় হয়েছে, মা দুর্গার আসার। সেই কোন কালে কে যেন এসে রেখে গিয়েছিল, প্রথম প্রথম টাকা পাঠাত। তার পর কবে থেকে যেন সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। ডরমিটরিতে থাকা-খাওয়ার যৎসামান্য খরচ, সেটুকু দেওয়ার মতোও কেউ নেই। এই খরচাটুকু দিতেও যে কত টালবাহানা চলে! আরতিদেবীর চোখ ভিজে আসে। স্নেহের আঁচল এগিয়ে দেন কণিকা গঙ্গোপাধ্যায়। বললেন, বেশ আছি বাবা, বেশ আছি। পুজো-টুজো আর ভাল্লাগে না।

ভাবছি, এঁদের অধিকাংশই একসময়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিলেন যে সংসারে, মনে করতেন তিনি বিহনে সেটি অচল, এখন সেই সংসারেরই সুখদুঃখ হাসি বেদনা কিছুতেই তাঁদের আর প্রত্যক্ষ অংশীদারি নেই। বড় জোর ভাল কোনও খবর পেলে আনন্দে উদ্বেল হতে পারেন, দুঃসংবাদে ডুকরে উঠতে পারেন একা একা। ওইটুকুই, তার বেশি নয়। হিন্দুশাস্ত্রে একেই কি বাণপ্রস্থ বলেছিল? সংসারের মোহ মায়া থেকে মুক্তি? তাঁরা যে এখন শুধু একটাই কথা বোঝেন, ছেলেমেয়ের বিয়ে হয়ে গেলে মা’দের চলে আসতে হয় এই ওল্ড এজ হোমে। সময় মেনেই একসময় নিথর দেহটাকে বরফ-চাপা দিয়ে অপেক্ষা করতে হবে পিস হাভেনে। যদি কেউ নিতে আসে। কী তীব্র অবিশ্বাস নিয়ে এই শেষ কটা দিন বেঁচে থাকা! কী সাংঘাতিক অভিমান আপনজনদের ওপর, শেষ জীবনে!

কণিকাদেবীর কথাই ধরুন। মা থাকেন বৃদ্ধাশ্রমে। ছেলের সঙ্গে কতদিন দেখা হয় না। শুধু কথা হয় মোবাইলে। ফোনটাকে মাথার কাছে নিয়ে শুতে যান বৃদ্ধা। এক সময়ে ওই মোবাইলকেই যেন ছেলে ভাবতে শুরু করেন তিনি। পুজোয় আর ছেলে আসে না। মোবাইলের জন্য কেনা হয় নতুন ‘কভার’। ঘাত-প্রতিঘাতের টানাপড়েনে মানুষের সঙ্গে যন্ত্রের তৈরি হয়েছে এক জটিল সম্পর্ক। সম্বল বলতে স্বামীর রেখে যাওয়া সামান্য কটা টাকা। আজকাল কেউ আর আসে না তাঁর কাছে। ছেলে মেয়ে নাতি নাতনি— কেউ না।

—পুজোয় কি এখানেই থাকেন? লজ্জায় দু’হাঁটুর ফাঁকে মুখ লুকোন বৃদ্ধা। কণিকাদেবী বললেন, যাব কোথায়? ঢাক বাজে। সেই আওয়াজ আর কানে আসে না। পুজো আসে, পুজো যায়, টের পাই না। তাকাও চারদিকে, দেখো কারও স্বামী মারা গেছেন, কারও ছেলেপুলে নেই। ভাইরা থাকেন কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত পাড়ায়, সংসারের গলগ্রহ বোনটিকে বৃদ্ধাশ্রমে ঢুকিয়ে দিয়ে মাস মাস টাকা পাঠিয়েই তাঁরা নিশ্চিন্ত, ভুলেও পা বাড়ান না বৃদ্ধাশ্রমে। যে দিন এলাম, সে দিনও জানতাম না, বৃদ্ধাশ্রম কী! কথা বলতে বলতেই কণিকাদেবীর হাতের মোবাইল বেজে ওঠে। রিংটোনে শ্রাবন্তী মজুমদার গান, ‘মনে হয় বাবা যদি বলত আমায়…।’

—ছেলের ফোন নাকি? নির্বাক মুখটা কোথায় হারিয়ে গেল!

পশ্চিমের রোদ এসে পড়েছে ঘরের কোণে। পড়ন্ত বেলায় প্রতীক্ষার ঘোর। হয়তো ছেলেমেয়ে দেখতে আসবে, হয়তো এ বার বাড়ি নিয়ে যাবে ক’দিনের জন্য। এই অপেক্ষা করতে করতে এই মানুষগুলির কাছে কখন যেন এই মহানগর হয়ে উঠেছে এক ‌‘নিঃসঙ্গ নগরী’।

একলা ঘরে পুজো এলে এঁদের কী যায় আসে?