ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

‘আত্মবিশ্বাসের জেরে তিনি নিজেকে ক্রমে দেশের সর্বময় কর্তা ভাবছেন। মন্ত্রিসভা নয়, একমাত্র তাঁর কথাই সরকারের শেষ কথা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিজেপি দলের ভিতরেও অবস্থাটা একই। একক ব্যক্তির হাতে সমস্ত ক্ষমতা এলে গণতন্ত্রে সংকট তৈরি হয়। নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বকালে দেশে চলছে একনায়কতন্ত্র, যাকে হিটলারি শাসন বলা যায়।’ বলেছিলেন শিবসেনার নেত্রী তথা মুম্বইয়ের মেয়র স্নেহল অম্বেকর।

একই কথা শোনা গিয়েছিল বিজেপির বর্ষীয়ান নেতা লালকৃষ্ণ আদবানির মন্তব্যে। ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা জমানায় ২ বছরের জন্য যে জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিল, ২৫ জুন তাঁর ৪০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে এক ইংরেজি দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিজেপির বর্ষীয়ান নেতা বলেছিলেন, আমি মনে করি না যে, দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব অপরিণত। কিন্তু, তাদের কিছু দুর্বলতা থাকায় একথা বলার মতো আমার আত্মবিশ্বাস নেই যে, দেশে ফের জরুরি অবস্থা জারি হবে না। এই মুহূর্তে যে সমস্ত শক্তি গণতন্ত্র ও সংবিধানকে পদদলিত করতে পারে, তারা অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু, কেন সেদিন এই কথা বলেছিলেন আদবানি? এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে এমন কোনও অসাধারণ বৈশিষ্ট আমার চোখে পড়েনি, যা দেখে আমি তাদের সম্পর্কে আশ্বস্ত হতে পারি। গণতন্ত্রের প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতাও ক্রমশ কমছে। এই প্রজন্মের মানুষের মধ্যে কমছে গণতন্ত্র ও নাগরিক স্বাধীনতায় বিশ্বাসীর সংখ্যা।

ধরুন ইতিহাস পরিষদের কথাই। সঙ্ঘ পরিবারের কুৎসিত সাম্প্রদায়িক তৎপরতায় তিতিবিরক্ত হয়ে মেয়াদ শেষের আগেই ইস্তফা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন ভারতীয় ইতিহাস গবেষণা পরিষদের সদস্য-সচিব গোপীনাথ রবীন্দ্রন। আরএসএস মনোনীত নবনিযুক্ত চেয়ারপারসন ওয়াই সুদর্শন রাও যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই গবেষণা সংস্থাটির ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ধ্বংস করতে পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগী হয়েছেন, তার প্রতিবাদেই রবীন্দ্রন পদত্যাগ করেছেন বলে খবর। সদস্য-সচিব হিসেবে ২০১৬সাল পর্যন্ত তাঁর মেয়াদ ছিল।কেন্দ্রে মোদি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পরেই গত জানুয়ারিতে ভারতীয় ইতিহাস গবেষণা পরিষদ (আইসিএইচআর)-এর মাথায় বিতর্কিত সুদর্শন রাওকে বসিয়ে দেওয়া হয়। ধর্মনিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস গবেষণার জন্য সুদীর্ঘকাল ধরে আন্তর্জাতিক স্তরে অত্যন্ত সুনামের অধিকারী এই সংস্থায় সাম্প্রদায়িক হানাদারি শুরু হয় তখন থেকেই। এরপরই ইতিহাস পরিষদের অতি মর্যাদাসম্পন্ন জার্নাল ‘দি ইন্ডিয়ান হিস্টরিক্যাল রিভিউ’-এর সম্পাদকীয় বোর্ড এবং উপদেষ্টা কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। সরিয়ে দেওয়া হয় রোমিলা থাপার, ইরফান হাবিবের মতো বিশ্ববন্দিত ২১জন ঐতিহাসিককে। যেসব বিশিষ্ট ঐতিহাসিকের পরিশ্রমের জন্য এই জার্নাল খ্যাতিমান হয়েছে, মোদি সরকারের ব্লু-প্রিন্ট তাঁদেরই ছেঁটে ফেলায় সাময়িকীটির ভবিষ্যৎ নিয়েই বিদগ্ধ মহলে জোরালো প্রশ্ন উঠে যায়। জানা গিয়েছে, পরিষদের পক্ষে এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন রবীন্দ্রন। কিন্তু সঙ্ঘ পরিবারের দাপটে তাঁর মতামত গুরুত্ব পায়নি। বরং এই প্রতিবাদের কারণেই পরিষদের অভ্যন্তরে তাঁকে কোণঠাসা করে ফেলা হয়। আসলে যাঁর হাতে ক্ষমতা, তাঁর কথাই শেষ কথা। যেখানে বিরোধিতার কোনও ঠাঁই নেই।

ভয়ঙ্কর এক প্রত্যাশার চক্রব্যূহে আটকে মোদি সরকার। একটা ধারণা ছিল নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বকে প্রকাশ্যে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন না। তাঁর ক্ষমতার কর্তৃত্ব এতটাই যেমনটি ছিল ইন্দিরা গান্ধীর। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, ইন্দিরা গান্ধীকেও সিন্ডিকেটের হ্যাপা কম সামলাতে হয়নি। নরেন্দ্র মোদির কাছে কার্যত যাঁরা নিতান্তই তুচ্ছ চরিত্র, স্বাধ্বী নিরঞ্জন জ্যোতি অথবা গিরিরাজ সিংহ বা সাক্ষী মহারাজ, এঁদের মুখ বন্ধ করতে তিনি সক্ষম হচ্ছেন না। রাম জেঠমলানি থেকে অরুণ শৌরি, সরকারের সার্বিক নীতির সমালোচনায় মুখর। মোদির উপর ভর করে একটা ‘বিগ ব্যাং’ সংস্কারের প্রত্যাশায় ছিলেন যাঁরা, তাঁরাই আজ বিক্ষুব্ধদের প্রথম সারিতে। ভোটের সময়ে মোদিকে ঘিরে যে ধরনের একটা অবাস্তব প্রত্যাশা ফেনিয়ে উঠে ভারতের আকাশ ছেয়ে ফেলেছিল, তার পর তো এই অতল হতাশার সাগরে ডুববারই কথা! মোদিভক্তরা আজ মাথা চাপড়াচ্ছেন যে, যতটা ভাবা গিয়েছিল, তাঁদের ভগবানের অতটা বল নেই। প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছিটকে আসছে: কোথায় লগ্নি? কোথায় চাকরি? অথচ, সরকারের গরিমা কীর্তন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, গত ৩৬৫দিনে সরকার নাকি এত কাজ করেছে যে হিসেব দিতে গেলে ৩৬৫ঘণ্টা লাগবে। তাঁর মুখের উপর কথা বলার সাহস কারোর নেই! এই আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধও এক বিপরীতমুখী ঐতিহাসিক অনিবার্যতা।

যে কোনও গোষ্ঠীজীবনে সংঘাত ও হিংসা অনিবার্য। ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি, ব্যক্তি বনাম গোষ্ঠী, গোষ্ঠী বনাম গোষ্ঠী, সম্প্রদায় বনাম সম্প্রদায়, জাতি বনাম জাতি— এ সব নানা ভাবে হিংসার বহিঃপ্রকাশ। এই সব দ্বন্দ্ব নিরসন করতে গিয়ে রাষ্ট্রর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়, নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। এই মনোভাবের মধ্যেই আছে হিংসার সবথেকে বড় সম্ভাবনাময় উৎস। এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বহুত্ববাদী। কিন্তু সঙ্ঘজীবনে আত্মস্বার্থরক্ষা ভারতবাসীর কাছে যতই বড় হয়ে ওঠে, পরমত সহিষ্ণুতা ততই কমে। অমর্ত্য সেনের ভাবনা অনুসারে আত্মপরিচয়ের আধিপত্য কায়েমের জন্য অন্য মত অন্য পরিচয়ের প্রতি আস্থা না রাখাই হিংসার উৎস। আর এই আত্মপরিচয়ের আধিপত্য কায়েম চলছে সর্বত্র।

গত দশ বছরে কখনও টু-জি স্পেকট্রাম সংক্রান্ত কারণে, কখনও কোলগেট কেলেংকারি নিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি শুধু বারংবার গোটা মরসুম ধরে সংসদ অচল করেই রাখেনি, সংসদ অচলের মাহাত্ম্যটিও ব্যাখ্যা করে এসেছে। আজ নেহাত আসন পালটে গিয়েছে বলে সংসদের দায়িত্ব ও মহত্ত্ব প্রচার শুরু করলে তাঁরা একটিই উপাধি লাভ করতে পারেন: দ্বিচারী। এর মূল ধর্ম: যখন যা সুবিধা তাই আসলে উচিত কাজ। এই রাজনীতির একটি বড় সমস্যা আছে। নিজের ফাঁদে নিজেকেই পড়তে হয়। বিজেপির অবস্থা এখন তাই। শুনলে অবাক হবেন, আরএসএস এবং বিজেপি-র বিরুদ্ধে কেউ সমালোচনা করলে তাকে সোজাসুজি এখন হিন্দু-বিরোধী আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রের বি জে পি-র নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরোধিতা কিংবা সমা‍‌লোচনা করলে তাকে ভারত-বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এধরনের কথা কোনও ব্যক্তি বিশেষের মুখ থেকে বের হয়নি। খোদ আরএসএস অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের মুখপত্র ‘অরগানাইজার’-এ ছাপার অক্ষরে বেরিয়েছে।

মোদি সরকারের প্রথম বর্ষপূর্তিতে ৫৬ ইঞ্চি বুকের ছাতি বাজিয়ে দাবি করা হয়েছিল দুর্নীতি মুক্ত সুশাসনের এক বছর। এক সপ্তাহ কাটতে না কাটতেই নিষ্কলঙ্কের বাহারি মোড়কের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেছে স্বজনপোষণ, আত্মস্বার্থসিদ্ধি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ক্লেদাক্ত মুখ। প্রথমে বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের তারপর রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া। গণ্ডা গণ্ডা দুর্নীতি, জালিয়াতি, কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত ব্যবসায়ী-ক্রিকেটকর্তা ললিত মোদির সাহায্যকারী ও ত্রাতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বি জে পি-র এই দুই শীর্ষ নেত্রী। সুষমার দাবি তিনি মানবিক কারণে ললিতের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। অথচ এই মানবিকতার আড়ালে বিরাজ করছে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতিতে অভিযুক্ত এক ব্যক্তির সঙ্গে দু’দশকেরও বেশি সময়ব্যাপী ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্ক। আশ্চর্যের বিষয় মোদি সরকার এবং বিজেপি একবাক্যে সুষমার এই মানবিকতার তত্ত্বেও শিলমোহর দিয়ে দিয়েছে। এত কিছুর পরও মোদির মুখে রা নেই। নির্বাচনের আগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যিনি গলা ফাটিয়েছিলেন, দুর্নীতিমুক্ত সরকার গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এই সেদিনও তাঁর সরকারকে দুর্নীতিমুক্ত বলে আত্মস্তুতি করেছিলেন এখন দেখা যাচ্ছে মুখোশের আড়ালে তাঁর সরকারই দুর্নীতির আখড়া হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় তিনি মৌনব্রত নিয়েছেন। এরপরও কি সরকারের সমালোচনা করা ‘ভারত-বিরোধী’?

শিবসেনার নেত্রী স্নেহল অম্বেকর বলেছিলেন, ‘নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বকালে দেশে চলছে একনায়কতন্ত্র।’ সেই ‌অভিযোগের প্রমাণ খুঁজতে বেশি দূর যেতে হবে না। পুণে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া (এফটিআইআই)–র চেয়ারম্যানের পদ নিয়ে যা হচ্ছে, তাতেই একনায়কতন্ত্রের কুৎসিত মুখ প্রকাশে চলে এসেছে। এক সময় যে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সামলেছেন ঋত্বিক ঘটক, শ্যাম বেনেগাল, গিরিশ কারনাড, আদুর গোপালকৃষ্ণনের মতো ব্যক্তিত্বরা, সেই একই আসনে বসানো হয়েছে অভিনেতা গজেন্দ্র চৌহানকে।প্রতিবাদে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে ক্লাস বয়কট করে চলেছেন এফটিআইআই–র ছাত্রছাত্রীরা। কোনও হেলদোল নেই। ইস্তফা দিতে নারাজ গজেন্দ্র। আসলে নিজের নামে নয়, ইনি বিখ্যাত তাঁর অভিনীত একটি নির্দিষ্ট চরিত্রের জন্য। বি আর চোপড়ার ‘মহাভারত’ সিরিয়ালে যুধিষ্ঠির হয়েছিলেন গজেন্দ্র। তার পর তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য ভূমিকায় অভিনয় করতে দেখা যায়নি তাঁকে। কিন্তু প্রায় দশ বছর ধরে বিজেপির পরিচিত মুখ তিনি। বিজেপির জাতীয় কর্মসমিতিতেও গুরুত্বপূর্ণ পদে দেখা গিয়েছে তাঁকে। এটাই তাঁর যোগ্যতা! এরপরও কি সরকারের সমালোচনা করলে বলা হবে ‘ভারত-বিরোধী’?

আসলে বহু ক্ষেত্রেই প্রকাশ্যে চলে আসছে নেতৃত্বের আত্মকেন্দ্রিকতা, রাজনৈতিক মোক্ষলাভের নীল নকশা। আজ সর্বত্র যে দলতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, সেই সঙ্কীর্ণ দলীয় আধিপত্য আসলে সমাজে অবৈধ ভাবে নিয়ন্ত্রণের জাল বিস্তার ছাড়া কিছু নয়। এখান থেকেই শুরু হয় আমরা-ওরার বিভাজন। যা দেখেছি আমাদের রাজ্যেও।