ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

ধূসর এবড়োখেবড়ো কলকাতার বুকে তখন সবুজ কৃষ্ণচূড়া-দেবদারু-নিমে ঢাকা ফাঁকা রাস্তা, সাজানো কোয়ার্টার, কুলিকামিন-সুপারভাইজার-রিকশর ব্যস্ততা, শহরের আনাচকানাচ ক্রমেই ভরে ওঠা উন্নয়নের উচ্ছিষ্টে সুবিন্যস্ত শহর। সেই শরতও ছিল ললাটনেত্র আগুনবরণ। কৈশোরের চোখে-চাখার মতো ছুটির শহর। হয়তো ঘুণ তখনই ধরেছিল বনেদিয়ানার আনাচে কানাচে, কিন্ত্ত কিশোর-চোখে তার সঙ্কেত ধরা পড়ার কথা ছিল না।

আকাশে আজও সাদা মেঘের স্তূপ। ঝোপের আড়াল থেকে উঁকি মারা হাতেগোনা গুটি কতক কাশফুল। বাওর জুড়ে ফোটা পদ্ম। এ শহরের বুকে বাসা বেঁধে আছে হাজারো গল্পের কোলাজ। সে গল্প কখনও মনে করিয়ে দেয় পথের বাঁকে ভুলে ফেলে আসা মাটির সোঁদা গন্ধ, কখনও বা চলতি পথের আধুনিকতার জয়গান। শরতের মিঠে-কড়া রোদ, কাশফুলের রাশ, নীল আকাশের হাতছানিতে ডাক দিয়ে বাঙালি মণ্ডপে মণ্ডপে গল্প বলে জীবনের। সেই পুরানো কলকাতার মতো।

ইতিহাস বলে, পলাশির যুদ্ধের পরে বাংলার মূল শাসন ক্ষমতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে চলে যাওয়ায় সমগ্র পূর্ব ভারতের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে ওঠে এই কলকাতা। ইংরেজদের সঙ্গে বাণিজ্য করে বা তাদের ব্যাবসা-সহায়ক হয়ে এক শ্রেণির মানুষের হাতে জমে উঠতে থাকে প্রভূত ধনসম্পত্তি। আর সে যুগে যেহেতু বিত্ত ভোগ করার প্রচুর আয়োজন বিশেষ ছিল না তাই দুর্গাপুজো ক্রমশ হয়ে ওঠে বিত্তবান শ্রেণির বৈভব প্রদর্শনের অন্যতম মাধ্যম। কলকাতায় যত বাড়তে থাকে ধনীর সংখ্যা, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে দুর্গাপুজোর জন্য ঠাকুরদালানের সংখ্যাও। সেসময় অধিকাংশ পুজোয় ডাকের সাজের প্রতিমা। ডাকের সাজের শুভ্রতায় দালানবাড়ির ঔজ্জল্য যেত বেড়ে, দেখলেই মনে হত শুচিতা যেন ছড়িয়ে রয়েছে দালানবাড়ির সর্বত্র। পুজো তখনও প্রতিটা মোড়ে ছড়ায়নি।

গা-গঞ্জের পাড়াতে তখন ঠাকুর আনা হত পঞ্চমীতে। আর তখন ছোটদের মনে কী কৌতূহল। চেরা কাঠের বেদিতে উঠে নীচ দিয়ে খবরের কাগজে ঢাকা ঠাকুরের মুখ দেখার কী চেষ্টা! পুরোহিত আর পাড়ার দাদাদের ধমক। দেখিস না, পাপ লাগবে। প্যান্ডেলগুলো তখন ডেকরেটার্সদের লাল, সাদা, বেগুনি, নীল কাপড় দিয়েই রঙিন। তার উপরে বড়জোর কিছু চুমকি লাগানো শোলার কাজ। এখন তো ডেকরেটার্সদের ডাক পড়ে শুধু প্যান্ডেলের ছাউনি বানাতে। চায়না টুনি লাইটের রমরমা তখনও শুরু হয়নি। রাস্তার ধারের বাড়িগুলোতে বড় বড় হলুদ বাল্বের মালা, বড়জোর গুটিকয় সবুজ প্ল্যামস্টিকে মোড়া টিউবলাইট।

বড় পুজো বলতে কোথাও কোথাও ঠাকুর পুরো সিনেমার সিনের মতো হত। পেছনে সমুদ্রের উপর দেবী যুদ্ধ করছেন, আকাশে উড়ে আসছে কার্তিক-গণেশ, সমুদ্রের মাঝে পদ্ম থেকে উঠেছেন লক্ষ্মী-সরস্বতী। তা দেখতেই উপচে পড়া ভিড়। আর মহানগরের বয়েস বাড়তেই একডালিয়াতে বাবার কাঁধে উঠে ঝাড়লণ্ঠন দেখা, কলেজ স্কোয়ারে পুকুরের ওপর টুনিলাইটের এনিমেশন, কুমারটুলি সর্বজনীনের প্রতিমা, মহম্মদ আলি পার্কের মেলা। ওইটুকুই। মাইকে মাইকে আশা থেকে মিতা চ্যাটার্জি, অমানুষ বা অনুরাগের ছোঁয়া। পরে কুমার শানুর ‘কত যে সাগর-নদী পেরিয়ে এলাম আমি…।’ ছোটদের হাতে খেলনা পিস্তল আর একটা গোলাপি কাগজের বাক্সে ক্যাপের রোল। দেদার চলত ক্যাপ ফাটানোর যুদ্ধ। বাজারের এগরোলের দোকানে স্পেশাল বিরিয়ানি। পুরনো দিনগুলোতে ছিল না ফ্লেক্সের বিজ্ঞাপন। বড় বড় পুজোর হোর্ডিংয়ে তেল, ক্রিমের সুবাস ছিল পুজোর সব কিছু। তবুও উৎসবে মশগুল নগরবাসী মন্ডপ গুনতে গুনতে জানতেও চাইত না, রাত কত হল।

প্রবীনরা বলেন, অষ্টমী-নবমীর সন্ধিলগ্নে সন্ধিপুজোর সময় মা নাকি জাগ্রত হন। সন্ধিপুজো দেখার সময় তখন এক অদ্ভুত অনুভূতি। পুজো শুরুর বেশ কিছু আগে মন্ডপে লোকে লোকারণ্য হয়ে যেত অথচ গভীর অরণ্যের মতো নিস্তব্ধতা। পাঁজি নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী পুরোহিতের নির্দেশ পাওয়া মাত্র ঢাকের বাদ্যির শব্দে শুরু হত পুজো। প্রদীপের আলো, ধূপের ধোঁয়া, ধুনোর গন্ধ, কাসর-ঘণ্টা, উলু, শঙ্খধ্বনি, পুরোহিতের মন্ত্র— সব মিলিয়ে এক মায়াময় বাতাবরন তৈরি হত।

আর এখন? পুজোর চিরাচরিত সাবেকিয়ানায় বদল এসেছিল বেশ কয়েক বছর আগেই। বদলে যাচ্ছে পুজো প্রচারের ভাবনাও। যার হাত ধরে পুজোর লড়াইয়ে হোক না কেন, প্রচারের লড়াইয়ে সমানে সমানে ‘দাদার’ পুজোর সঙ্গে টক্কর দিচ্ছে ‘পাড়ার’ পুজো। পুজোর স্বাদে বদল দিতে শহরে এসেছিল থিম পুজো। কর্পোরেট সংস্কৃতির ধাঁচে শহরের অনেক কম বাজেটের পুজোও নিজেদের প্রচারে রেখেছিল পেশাদার ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট। কী ভাবে বিজ্ঞাপন হবে, কী ভাবে সাজাতে হবে প্রচারের মাধ্যম, সে সবের নীল নকশা করে দেন তাঁরাই। এমনকী পুজো প্রচারে এ বার ঢুকে পড়েছে অ্যাপও। লড়াই চলছে ফেসবুকেও। দুর্গাকে নিয়ে এমন শিল্প তো আর দুনিয়ার অন্য কোনও কোণে হওয়ার নয়। শিল্পের মাধ্যমে ঐতিহ্যের এগিয়ে চলার ইতিহাস ধরে রাখতে চায় কলকাতা।

পুজোর সময় গোটা কলকাতা তো এখন স্লো মোশনে। দুটো পুজো দেখতে পাঁচ ঘণ্টা কাবার। কলকাতা অনায়াসে ‘সিটি দ্যাট নেভার শ্লিপ’কে টেক্কা দিতে পারে। রোজ চার ঘণ্টা ধরে সাজো, দুনিয়ার ঠাকুর দ্যাখো ও মোবাইলে তোলো ও ফরোয়ার্ড করো। নতুন হেয়ারকাট, আলোর মালা, প্রেম, নিষিদ্ধ বাজি আর সেলফি। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ট্রফি: শ্রেষ্ঠ অসুর, শ্রেষ্ঠ ইঁদুর, শ্রেষ্ঠ ঝাড়লণ্ঠন! যত পুজো, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রাইজদাতা। সেই যে কে যেন লিখেছিলেন, ‘ম্যানহোলের সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়ুন,/ আন্ডারগ্রাউন্ডে হেঁটে প্যান্ডেলের/ সামনে ঢাকনা খুলে বেরিয়ে আসুন/ চোঙা হাতে চেঁচান: পাশের প্যান্ডেলে/ বচ্চন এসেছেন!’

আজো এ শহরে শরৎ আসে- শারদীয় আকাশ, সেই শিউলি, শাপলা, সেই সুচি স্নিগ্ধ পবিত্র বাতাস, কাশফুল সবই আছে কিন্তু কোথায় যেন কী নেই। সে কি হারিয়ে যাওয়া বাল্য, কৈশোর নাকি অন্য কিছু? নাকি নেই বাল্যের সেই চোখ? পুজোর দিনগুলো তো আর ডায়েরির পাতা ধরে চলে না। তবুও তো দশমীতে আজও মিষ্টির দোকানে গজা-মিহিদানা-রসগোল্লা কেনার লাইন। বিজয়ার কোলাকুলি আর বিসর্জনের কষ্ট। উৎসবের এটাই তো টিকে থাকা আবেগ।