ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

আগমনি উৎসব থেকে বিদায়ের ক‌্যারিশমা— আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু তো সেই দেবী। অভয়দায়িনী মা দুর্গা। কেউ বলেন, তিনি সকল প্রাণে জ্বালিয়ে দেন আনন্দের বর্তিকা। কেউ আবার খোঁজেন, দুই নয়নে স্নেহের হাসি, ললাটনেত্র আগুনবরণ। হোক না, পুজোর চিরাচরিত সাবেকিয়ানার বদলে থিম-পুজোয় মাতামাতি। থিমের জমক-চমকের আড়ালে মা দুর্গার অমোঘ আকর্ষণও কম কিসের। তাই তো আজও পুজোর ক’টা দিন দেবীর চোখে চোখ মেলে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কিসের টানে? দেখে মনে হয় ছোঁয়া যায়, ছুঁতে চাইলে তো অধরা!

তিনি পরমাবিদ্যা স্বরূপিনী, যিনি সর্বভূতের প্রাণরূপী মহা দিব্য মূর্তি মা ও জগৎ মঙ্গলময়ী দুর্গা। ‘হে দেবী, তুমি জাগো, তুমি জাগো, তুমি জাগো।’ তোমার আগমনে এই পৃথিবীকে ধন্য কর। কলুষতা মুক্ত কর। মাতৃরূপে, বুদ্ধিরূপে, শক্তিরূপে আশীর্বাদ কর বিশ্বলোকের প্রতিটি মানুষকে। বিনাশ কর আমাদের অসুর প্রবৃত্তিকে। মহাশক্তিকেই তারা প্রতিমার মধ্য দিয়ে চিন্ময়ী ব্রহ্মশক্তিকে দর্শন করেন। শক্তির আরাধনা। অথচ, আদ্যোপ্রান্ত বাঙালি তরুণ প্রজন্মের মধ‌্যে আজ ত্রিনয়নীর প্রতি সেই আবেগ কই? মণ্ডপের মতো দেবী দুর্গা যেন আজ গ‌্যালারি কলকাতার থিমের মূর্তি ছাড়া কিছু নয়! ক্ষোভ ঝরে পরে ষাটোর্ধ অবিনাশবাবুর কথায়।

সত্যিই কি বদলে গিয়েছে পুজোর সুর? সেই যে গঙ্গাজল, ফুল-বেলপাতা, দিনক্ষণ-তিথি মেনে সবিস্তার মন্ত্রপাঠ-অঞ্জলি। জীবনের কথা, দহনের রেখা ভুলে এতো মানুষের মাতামাতি কি শুধুই শিল্পের টানে? মণ্ডপে মণ্ডপে হাতে হাতে নানা কিসিমের স্মার্টফোন। অবিরাম ‘পারফেক্ট সেলফি’র খোঁজ। হুহু করে বিকোতে থাকা স্মার্টফোনের ক্যামেরায় সেলফিবন্দি হয়ে সবাই এখন পৌঁছতে ব্যস্ত প্রিয়জনেদের মুঠোতে। নাকি নিষিদ্ধ পরকীয়ার স্বাদ পেতে? কিন্তু এমন কী আছে যা বদলে দিচ্ছে মুহূর্তের মধ্যে? পরপর সেলফি ক্লিক করে নিজের সবচেয়ে ভাল সেলফিটা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা। কমেন্ট পাওয়া। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি পোস্ট করে রাতারাতি হিরো। কুমোরটুলিতে কাঠামোয় মাটি লেপা থেকে সেই যে এক্সাইটমেন্ট শুরু হয়েছিল, মা দুগ্গার বরণের সময় পোজ মারা পর্যন্ত থামার অন্ত নেই। মনের মানুষটির নাগাল পেতে এক নিদারুণ তাড়না। পিছলে পড়তে থাকে পিরিতির কণা। ফেসবুক, হোয়াটস আপ জুড়ে অনেকেই মাসখানেক জুড়ে আপলোড মাঠঘাটে কাশফুলের ছবি, শরৎ আকাশের থোকা থোকা পুঞ্জীভূত মেঘের ছবি, মৃণ্ময় মূর্তির ছবি। বাকি চারদিন পুজোমণ্ডপে অবিরত মোবাইল ঝলক। সঙ্গে লাইক ও গুচ্ছের কমেন্টস। শুধু এরজন্যই কি দেবীর আরাধনা? কে অস্বীকার করবে, বাঙালির নস্টালজিক অনুভবের সাগরে ঢেউ তোলা শারদোৎসব ক্রমশ হুজুগ প্রিয় বাঙালির কাছে যতটা না ধর্মীয় উৎসব, তার বেশি যেন সামাজিক ব্যাঞ্জনাময়।

পুজো এলেই এসএলআর ক্যামেরা হাতে এখন তো সকলেই ফটোগ্রাফার। বাগবাজারের ডাকের সাজের মায়ের মুখটা কতোটা জুম করা যায়? সনাতন দিন্দার প্রতিমার শার্পনেসের ডিটেলিং কত দূর ছুঁতে পারবে? তা নিয়ে কত তর্ক। নিত্যনতুন স্মার্ট ফোনের যুগে ছবি তোলার জ্বরটা আরও চরমে। বাগবাজার থেকে চেতলা, নিউ আলিপুর থেকে নিউ টাউন— ট্যুইটার, ফেসবুকে, ইনস্টাগ্রামে চাইলেই হরেক মুহূর্তের ছবি ফটাফট আপলোড করা। স্ট‌্যাটাসে কয়েক লাইন, ‘তুমি চেয়েছ বলে আজ সকালে,/ সূর্যখানার কানটা ধরে/ শরৎ রাঙা আলোয় মুড়ে/ তোমার দুটো হাতের মুঠোয়/ এনে দিলাম আমি।/ দেখেছ!/ তুমি চাইলেই কী না দিতে পারি আমি।’ মা দুগ্গার ফুল ফ্যামিলির সামনে দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বাস, ফিলিং এক্সাইটেড। এই কয়েকটা দিনেও সকালে ঘুম থেকে উঠেই হয় ফেসবুক, নয়তো হোয়াটস অ্যাপে চ্যাট। ‘হাই, গুড মর্নিং, হ্যাভ এ নাইস ডে’।

মোবাইলে ইন্টারনেট না থাকলে এখন যেন অসহায় ই-জনতা। এই অস্বস্তি যেন মানিব্যাগ না নিয়ে বেরোনোর থেকেও বেশি! জেন ওয়াইকে টানতে মণ্ডপে মণ্ডপে ওয়াই-ফাই। আড্ডা দেওয়ার মাঝে আপনি সেলফি তুলুন। সেই সেলফি আপনার ফেসবুকে-ট্যুইটার বা ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করতে ইচ্ছে করল। মণ্ডপে আপনি নিখরচায় সেই সেলফি আপলোড করতে পারেন। পুরো মণ্ডপ ওয়াইফাই জোনের মধ্যে। ফোনের ব্যাটারি রক্তচক্ষু দেখাচ্ছে? চার্জ নেমেছে ৫ পার্সেন্টে! নিজের পাওয়ার ব্যাঙ্কটা যেন সঙ্গে থাকে। শুধু তাই-ই নয়, ঢাকে কাঠি পড়ার আগে থিমযুদ্ধের মেজাজটা বাঁধা পড়ছে গানের সুরেও। থিমের অঙ্গ হিসেবে কলকাতার পুজোয় ক্রমশ জায়গা করে নিচ্ছে গান বা আবহ-সঙ্গীতও। সানাই, মন্দ্রসপ্তকের বাঁশি, নেপালি মাদলের সমাহার। বদলে যাচ্ছে মোবাইলের কলার টিউন। পুজো চলে গেলেও রয়ে যাবে পুজোর সুর। মানুষের হাতে হাতে, কানে কানে। আরও কিছুদিন। অদ্ভুত মাদকতা, এক অন্য মদিরতা।

প্রযুক্তির বদলের সঙ্গে অতীতের সেই নিষ্ঠাভরে পূজো ও নির্ভেজাল আড্ডার জন্য হা-হুতাশটা তো লেগে থাকবেই। আজকাল নাকি লোকে দেবী মাকে দেখে না, মায়ের সঙ্গে ছবি তোলে! বেশ মাচো হলাম, সবাই প্রশংসা করল। এই আর কী। সারা বছর ডাঁটা চচ্চড়ি চেবানো একঘেয়ে জীবনে এসময় যেন ভিখারির ডাকাত হওয়ার! অতি আশ্চর্য, অতীব আশ্চর্য জাদুযন্ত্রকে আকড়ে ধরে যা কিছু ভালোবাসার— শোষ-কাগজের মতো চারটে দিন শুধু শুষে নেওয়া। এছাড়া কিছু নয়। তবুও পুজোর জন্য মানুষ, না মানুষের জন্য পুজো— এই সংশয়ের দোলাচলে কখন যেন মানু্য তার অনেক অলৌকিক অভীপ্সার কাছে পৌঁছে যায়। বলছিলেন হাতিবাগানের শৈলবাবু।