ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

বিহারের নির্বাচনে কোনওভাবে যদি বিজেপি হেরে যায়, তাহলে হার-জিত ভারতের মাটিতে হওয়া সত্ত্বেও, উৎসবের বাজি পুড়বে পাকিস্তানে। আপনারা কি সেটাই চান? রক্সৌলের নির্বাচনী জনসভায় এমনই মন্তব্য করেছিলেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। বিজেপিকে ভোট দেওয়া এবং জয়ী করাকে প্রায় দেশভক্তির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিলেন অমিত শাহ। ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টায় মেতেছিল বিজেপি। পালটা জবাবে লালু বলেছিলেন, ‘নরখাদক’ শাহ, ‘ব্রহ্মপিশাচ’ মোদি। এরই মাঝে এসে পরে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। উত্তরপ্রদেশের দাদরিতে গো-মাংসের গুজবে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষকে খুনের অভিযোগ এবং হরিয়ানার দুই দলিত শিশুর অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা। ভোটের প্রচারে ওই দু’টি ঘটনা গুরুত্ব পাওয়ায় মেরুকরণ আরও স্পষ্ট হয়ে যায়। আর এই মেরুকরণই বিজেপির ভরাডুবির কারণ, বলছেন বিশেষজ্ঞরা। শুধু তাই-ই নয়, অমিত শাহের সেই চড়া প্রচারই এখন দলের অন্দরে সমালোচিত।

বিহারের নির্বাচনী বিপর্যয়ের দায় এড়াতে পারেন না প্রধানমন্ত্রীও। বিহারে তিরিশটির বেশি জনসভা করেছেন নরেন্দ্র মোদি। লালুপ্রসাদ যাদব কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘জনসভা নয়, প্রধানমন্ত্রী পথসভা করছেন’। বিহারে এনডিএ কাউকে মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে সামনে আনেনি। মোদিই ছিলেন বিজেপি-র মুখ। মোদির সঙ্গে প্রায় ৪০জন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বিহার চষে বেড়িয়েছেন। মোদিকেই ভরসা করে বিজেপি ভোটে গিয়েছিল।

সেই নব্বইয়ের দশকে, লালকৃষ্ণ আদবানির উত্থানের দিনে বিহারে তাঁর রথ আটকে দিয়েছিলেন লালু প্রসাদ যাদব। আর নীতীশ কুমারের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থামিয়ে দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদির জয়যাত্রা। লোকসভা ভোটে বিপুল জয়ের পর এই নিয়ে দ্বিতীয় বার মুখ থুবড়ে পড়ল নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ জুটি। সরকার গড়ছিই বলে দাবি করে আসা বিজেপি বিহারে কোনওক্রমে ২৪৩ আসনের বিধানসভার সিকি ভাগ দখল করতে পেরেছে। অনেকে বলছেন, এ বারের ভোটে শেষ পর্যন্ত জাতপাতের রাজনীতিটাই থেকে গেল। উন্নয়নের স্লোগান বা ধর্মীয় মেরুকরণ দিয়ে তাকে ঢাকা গেল না। আর তার জেরেই দলগত আসন সংখ্যার নিরিখে এক ধাক্কায় তিন নম্বরে চলে গেল বিজেপি। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে এ বছরের গোড়ায় দিল্লির ভোটে কেজরিওয়ালের কাছে যে মার শুরু হয়েছিল, বছর শেষে লালু-নীতীশের কাছে তার করুণ পরিসমাপ্তি!

বিহার দখলে দু’মুখো রণকৌশল নিয়েছিলেন মোদি-অমিত জুটি। প্রধানমন্ত্রী নিজে উন্নয়নের স্লোগানের বাইরে বিশেষ হাঁটেননি। যে স্লোগান হাতিয়ার করে লোকসভা ভোটে তাঁর বিপুল জয়। বিহারে এসে একের পর এক জনসভায় গত দশ বছরের জঙ্গল-রাজের কথা বলেছেন মোদি। ঘোষণা করেছেন লক্ষ কোটি টাকার উন্নয়নের প্যাকেজ। আর্জি জানিয়েছেন, আমাকে এক বার সুযোগ দিন, বিহারের হাল পাল্টে দেব। অন্য দিকে, বিজেপি নেতৃত্বের পরের ধাপ এবং নিচুতলা হাতিয়ার করেছিল ধর্মীয় মেরুকরণকে। সেখানে প্রচারের মূল বিষয় ছিল গো-রক্ষা, হিন্দু-জাগরণ। আসলে লোকসভা ভোটের আগে মুজফ্ফর নগরের দাঙ্গার যে সুফল বিজেপি তুলেছিল, তার আরও বড় প্রেক্ষিত তৈরি করে, হিন্দু জাতীয়তাবাদ উস্কে দিয়ে, সাম্প্রদায়িক বিভাজন ঘটিয়ে লালু-নীতীশদের জাতপাতের অঙ্ক গুলিয়ে দেওয়া। বিজেপি ভুলে গিয়েছিল, গত দশ বছর ধরে, নীতীশকুমারের নেতৃত্বে বিহারও তার ‘নিজস্ব’ উন্নয়নের পথ বেছে নিয়েছে। এই পথ অবশ্যই বিহারের প্রেক্ষিতে উন্নয়ন চিন্তা।

ভোট শুরুর আগেই জাতপাতের অঙ্ক কষে নেমেছিল বিজেপি। রামবিলাস পাশোয়ান ছাড়াও জিতনরাম মাঝির দলের সঙ্গে সমঝোতা করা হয়েছিল। প্রার্থী বাছাই হয়েছে জাতবিন্যাসের হিসেবে। প্রচার শুরু হয়েছিল জাতপাত ধরে। সংঘ পরিবারের বিভিন্ন সংগঠন জাতপাতভিত্তিক সমাবেশ করে বিজেপি-কে সামনে আনতে শুরু করে। এমনকি মোদিও নিজেকে ‘ওবিসি’ পরিচয়ে পেশ করেন। কিন্তু সেই অঙ্কেও বড় ধাক্কা খেয়েছে বিজেপি। আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত সংরক্ষণ বহাল রাখা নিয়ে প্রশ্ন তোলা মাত্র লালুপ্রসাদ যাদব সেই বল লুফে নিয়েছেন। লাগাতার প্রশ্নের মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত বিজেপি-কে প্রচার করে বেড়াতে হয় তারা সংরক্ষণের বিরোধী নয়। এর পরে বিপজ্জনক সাম্প্রদায়িক বিভাজনের তাস খেলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলতে থাকেন, নীতীশ-লালু দলিতদের সংরক্ষণ কেটে নিয়ে তা সংখ্যালঘুদের দিতে চান। এমনকি এ নিয়ে নীতীশের কুড়ি বছর আগের ভাষণের কপি সভায় সভায় পড়তে থাকেন মোদি। জালে জড়িয়ে এই প্রশ্নে একেবারেই ভূপতিত মোদি-অমিত শাহের বিজেপি। দলের বাইরে তো বটেই, দলের ভিতরেও কি প্রবীণ আদবানি থেকে সুষমা স্বরাজ, রাজনাথ সিংদের তির্যক হাসি থেকে পার পাবেন গুজরাতের মহাজুটি?

মোদি নিজে বিহারে যে সুরে, যে উপাদান নিয়ে প্রচার করেছেন তা বিস্মিত করেছে রাজনৈতিক মহলকে। প্রধানমন্ত্রী দলের হয়ে প্রচার করেন, তা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নিজের প্রচারে সাম্প্রদায়িক ও জাতপাতের প্ররোচনা দেন, তা নজিরবিহীন। বিহারে বিজেপি ক্রমেই সে পথে গিয়েছে এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিজেপি গালভরা ‘বিকাশের’ কথা বলে প্রচার শুরু করেছিল। কিন্তু দ্রুত তা থেকে সরেও আসে। প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে কোনও নির্দিষ্ট আশ্বাস পাননি বিহারের ভোটাররা। বরং ‘জঙ্গল রাজের’ ভয় দেখানোই হয়ে ওঠে তাঁর মুখ্য সওয়াল। লালুপ্রসাদ যাদব ছিলেন মোদির বিশেষ লক্ষ্য। তাঁকে আক্রমণ করতে গিয়ে এমনকি তাঁর কন্যা সম্পর্কেও অসৌজন্যের মন্তব্য করে নিজেকে পাড়ার নেতার স্তরে নামিয়ে আনেন প্রধানমন্ত্রী।

বিহার নির্বাচন চলাকালীনই অসহিষ্ণুতা এবং হিন্দুত্ববাদী হিংস্রতার বেশ কিছু ঘটনা ঘটে যায় দেশের নানা প্রান্তে। তার কড়া নিন্দা করার বদলে প্রধানমন্ত্রীর মৌনতা নিয়ে দেশব্যাপী প্রশ্ন ওঠে। মোদি অভিযুক্ত হন প্রকারান্তরে এই আগ্রাসী হিন্দুত্বকে সমর্থন করার দায়েই। তবে, শুধু এই স্পর্শকাতর বিষয়ের জন্যই নয়, প্রতিদিনের জীবনযন্ত্রণার বৃদ্ধিও বিজেপি-র বিরুদ্ধে গিয়েছে। জিনিসের দাম দ্রুত বাড়ছে। বিহারে ডালের দাম বৃদ্ধি গুরুতর প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। বিজেপি-র কাছে ভাত-ডালের দাম বৃদ্ধির থেকে গোহত্যা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিহারের মানুষ তা মেনে নেয়নি। কোনও ইসলামি মৌলবাদকেও জায়গা দেয়নি বিহারবাসী।

গোটা দেশের মুসলিমদের মসিহা হয়ে ওঠার যে স্বপ্ন দেখছিলেন হায়দরাবাদের বিতর্কিত নেতা মজলিস-এ-ইত্তেহাদ-মুসলিমিন (এমআইএম)-র নেতা আসাউদ্দিন ওয়াইসি, তাতে একেবারেই জল ঢেলে দিয়েছেন বিহারবাসী। কিষানগঞ্জকে ঘাঁটি করে পূর্ব ভারতে প্রভাব বাড়ানোর লড়াইয়ে নেমে পড়েছিলেন ওয়াইসি, সব থেকে বড় ধাক্কা এসেছে সেখান থেকেই। ওয়াইসির মতো নেতাদের ঘাঁটি গাড়তে দেওয়ার অর্থ হল, আগামী দিনে হিন্দু মৌলবাদী শক্তির বাড়বাড়ন্ত— নীতীশ শিবিরের পক্ষ থেকে এমন প্রচারও করা হয় স্থানীয় সংখ্যালঘু সমাজের মধ্যে। বিহার ভোটে ওয়াইসির হঠাৎ আগমনের পিছনে নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহের হাত রয়েছে বলেও প্রচার করেন নীতীশ-লালু জোট। সেই প্রচার সংখ্যালঘু সমাজের একেবারে নিচু স্তর পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হয়। তার ফল পেয়েছে মহাজোট।

নীতীশ-লালুর জোট বিজেপি-র মুখে শুধু বিরাশি সিক্কার চপেটাঘাতই করেনি, মোদি-অমিত শাহ অ্যান্ড কোং-কেও বুঝিয়ে দিয়েছে, নব্য উদারবাদী ‘ইন্ডিয়া’ ও ‘ভারত’-এর ফারাক! দিল্লির বিধানসভা ভোটে ধুয়েমুছে যাবার পরে বিহারেও এহেন শোচনীয় ফলাফল নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বকে গুরুতর সংকটের সামনে দাঁড় করিয়েছে। কারণ একটাই, জো জিতা ওহি সিকন্দর! লালু-নীতীশের মহাজোট বুঝিয়ে দিয়েছে, গুজরাত মানেই ভারত নয়, তার একটা বিহার আছে, ঝাড়খণ্ড আছে, পশ্চিমবঙ্গ আছে, উত্তর-পূর্ব ভারতের বৈচিত্র্য আছে।