ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ফুল কই?
শুধুই তো অস্ত্রের উল্লাস
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে হত্যার হুমকি?

সম্প্রতি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ওবামাকে যে জেহাদি ‘রোমের কুকুর’ বলে কটাক্ষ করেছে, তার বয়স বড়জোর দশ বছর। তার ছোট্ট হাতে রকেট লঞ্চার। তুলতুলে মুখে আতঙ্কের আঁকিবুকি নেই। এতটুকুও। সেনা পোশাকে সজ্জিত শিশুটি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ্য করে আদোআদো সুরে বলছে, ‘রোমের কুকুর ওবামা, ঘুম ভেঙে ওঠ এবং খলিফার তরবারি তোমার নোংরা মাথা কাটার আগেই জিজিয়া (ধর্মীয় কর) পরিশোধ কর। তুমি যদি মনে করে থাক তোমার সেনারা খলিফার রাজত্বে প্রবেশ করবে এবং তা দখল করে নেবে, তা হলে তুমি দিবাস্বপ্ন দেখছ।’ একেবারে শেখানো বুলি!

সিরিয়ার শৈশব এখন বোমা চেনে। বোমা বিস্ফোরণের আওয়াজ চেনে। বন্দুক তো চেনেই। ওরা শিখে গিয়েছে বন্দুক দেখলেই আত্মসমর্পণ করতে হয়। ভয়ের কাছে। সন্তানহারা মায়ের শূন্য দৃষ্টি, দু’গালে শুকিয়ে থাকা চোখের জল। ওদের কল্পনার আকাশে পাখি ডানা মেলে না। সেই আকাশের দখল নেয় যুদ্ধবিমান আর হেলিকপ্টার। গুগল করলে এমন যে কতো ছবি মেলে! কিন্তু সেই শিশু যখন নিজে ভয় দেখায়? নিজে যখন হয়ে ওঠে মানববোমা?

শিশু আবার জঙ্গি হয় নাকি?

সম্প্রতি তেরো মিনিটের একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে সহজ ‌‘ডেসক্রিপশন’ দিয়েছে বিশ্ব-কুখ্যাত জঙ্গিরা। এবড়োখেবড়ো সবুজ মাঠের উপর হাঁটু মুড়ে বসে বছর উনিশের এক তরুণ। পরনে কমলা জাম্পস্যুট। সামনে কালো পোশাকে বছর দশেকের শিশু। হাতে বন্দুক। তারপর হঠাৎই ‘অপরাধী’র মাথা লক্ষ্য করে গুলি। মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর আরও তিনটে। ইজরায়েলের চর সন্দেহে নিমেষে খতম মহম্মদ মুসল্লম। চোখেমুখে নৃশংসতার উল্লাস। এও কি সাজানো?

এ যেন প্রায় খেলার ছলে মানুষ মারা। খুশিমতো, নিত্যনতুন পন্থায়। কখনও গলায় মর্টার শেল ঝুলিয়ে, কখনও লঞ্চার থেকে রকেট ছুড়ে, লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে গলা কেটে, অথবা নৌকোয় চাপিয়ে রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে। তারপর? ধোঁয়া, ধুলো আর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পড়ে থাকা ছিন্নভিন্ন অসহায় দেহগুলোর টুকরো টাকরা। মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা এলোমেলো লাশ। ওদের চোখে লেগে থাকে একটাই রঙ। রক্তের রং। লাল!

তবে এই প্রথম নয়! এর আগেও একাধিক বার শিশু-কিশোরদের হাতে বন্দুক ধরিয়ে, কাটা মাথা ঝুলিয়ে রাখার ছবি ও ভিডিও পোস্ট করেছে জঙ্গিরা। গোটা দুনিয়াকে বার্তা দিয়েছে, কীভাবে খুদে হাতে বন্দুক তুলে জঙ্গি গড়ার পাঠ দিচ্ছে তারা। প্রশিক্ষণ দিয়ে এইসব শিশুদের গড়ে তোলা হচ্ছে ঠান্ডা মাথার খুনি হিসেবে। নিজেদের আদর্শে কীভাবে তারা গড়ে তুলছে বাচ্চাদের, তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বন্দুক চালানোর, মুখোমুখি যুদ্ধের। যেখানে নৃশংস খুন, আর্তনাদ, রক্ত সবকিছুর মধ্যে হঠাৎ-হঠাৎ একটাই শব্দ কানে ভেসে আসে। মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা, হাতে বন্দুক উঁচিয়ে চিৎকার। আল্লাহু আকবর…। শৈশবকে হিংসা আর নৃশংসতায় ডুবিয়ে দেওয়ার ভয়ঙ্কর ভিডিও-র সমালোচনায় মুখর গোটা বিশ্ব। ভয়াল এই সন্ত্রাসের নেপথ্যে সেই আইএস। ইসলামিক স্টেট। মৌলবাদ, যে রঙেরই হোক, তা যে কত ভয়ানক হতে পারে তা টের পাচ্ছে খিলাফতের ভূখণ্ড!

শিশু আবার জঙ্গি হয় নাকি? সবই কি সাজানো?

শিশু তো জানে না মৌলবাদ কাকে বলে, কারা জঙ্গি? কী চায় তারা? যেমন জানে না, কম্বলে জড়ানো সেই চোখ-বোজা সদ্যোজাত। যার বিছানার পাশে সাজানো গ্রেনেড আর হ্যান্ড গান। ট্যুইটারে এই ছবিই পোস্ট করেছে আইএস-এর সদস্য আবু ওয়ার্দ আল-রাক্কাওয়ি। সঙ্গে বার্তা, ‘শুধু আমাদের নয়, এই খুদে বিপদ ডেকে আনবে তোমাদেরও৷’‌ মাথার কাছে আইডি-তে রয়েছে শিশুটির পরিচয়। নাম জ্রাহত, মায়ের নাম ওম। বাবা আবু। একের পর এক শিরচ্ছেদের ভিডিও আগেই প্রকাশ করেছে আইএস। এমনকী খুদেদের বন্দুক হাতে প্রশিক্ষণের ছবিও। তা বলে মারণাস্ত্র পাশে নিয়ে ঘুমন্ত একরত্তির ছবি! ‘বিপদ’ বইকি!

ধরুন সেই ব্রিটিশ শিশুর কথাই। শিশুসুলভ মনভুলানো হাসি নিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ছয় বছরের সেই শিশু। এই শিশু বয়সেই নাকি তার মনে গেঁথে দেওয়া হয়েছে জেহাদি গোষ্ঠী আইএসের মূল্যবোধ। শুধু এই শিশুটিই নয়, তার আট বছরের ভাই এবং মাত্র তিন বছরের বোনকে আইএসের সদস্য হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। শুনলে অবাক হবেন, এই শিশুদের ধীরে ধীরে জেহাদিগোষ্ঠী আইএসের মতাদর্শে উজ্জীবিত করছিল তাদের বাবা ইব্রাহিম অ্যান্ডারসন। নিজের হাতেই। ব্যাট-বল নয়, ছোট থেকেই নিজের বাচ্চাদের হাতে তুলে দিয়েছে অস্ত্র। মনে পুঁতে দিয়েছে হিংসার বীজ। সম্প্রতি ব্রিটেনে আইএসের পক্ষে প্রচার চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে। ২০১৪-র অক্টোবরে এই ছবিগুলো ইব্রাহিমের ক্যামেরায় তোলা হয়েছিল। পুলিশ তার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে এই ছবিগুলো খুঁজে পেয়েছে। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা জানতে পেরেছে, বছর তিনেক আগে অ্যান্ড্রু অ্যান্ডারসন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে খ্রিস্টান থেকে মুসলিম বনে যায়। নতুন নাম হয় ইব্রাহিম। লন্ডনের কেন্দ্রে অক্সফোর্ড স্ট্রিটে আইএসের সদস্য নিয়োগের জন্য অফিস চালাত সে। ব্রিটিশ সংসদ সদস্য কিথ ভেজ উদ্বেগ জানিয়ে বলেছিলেন, জেহাদিরা খুব সতর্কভাবে তাদের সন্তানদের আইএসের মতাদর্শে গড়ে তুলছে। ভয়টা সেখানেই।

সেটাই স্বাভাবিক। না হলে কেউ নিজের সন্তানকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়? ছেলে জেহাদি। মরলে সে শহিদ হবে। পাবে অনন্ত বেহেস্ত। সঙ্গে শরাব, হুর এবং আরও অনেক কিছু। ছেলের সুপারিশে বাবা-মায়ের ভাগ্যেও নিশ্চিত জুটে যাবে স্বর্গের একফালি জমি। ভাবুন একবার, ধর্মের ভুল, মিথ্যে এবং উদ্ভট ব্যাখ্যা কী পরিমাণ মাথায় ঢুকলে জেহাদের নামে সশস্ত্র হিংসাকে মানুষ এভাবে ধর্মের আওতাভুক্ত করে ফেলে!

মার্কিন সেনাবাহিনীর কর্নেল প্যাট রাইডারের কথায়, সম্প্রতি মার্কিন বিমান হানায় অনেক আইএস জঙ্গির মৃত্যু হয়েছে। সেই ক্ষতিটাকেই পূরণ করতে আইএস নিজেদের শিশু ব্রিগেড সাজাচ্ছে। সন্ত্রাসবাদীরা নতুন এমন এক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে, যেখানে শুধু থাকবে তাদের নিজস্ব মূল্যবোধ। আর শিশুদের ইচ্ছেমতো গড়ে নেওয়া যায় বলে আইএসের মূল শিকার হচ্ছে শিশুরাই। গোলাগুলির শব্দ, রক্ত আর বারুদের ঘ্রাণ— কেড়ে নিয়েছে, চুরি করছে ওদের ছেলেবেলা। ছোট ছেলেমেয়েগুলোর নিঃশ্বাসে শুধুই রক্তের ঘ্রাণ!

মুখে নিষ্পাপ হাসি, হাতে একে-৪৭!

হাতে লাটাই নয়, বন্দুক। ফুল কই? শুধুই তো অস্ত্রের উল্লাস। পিঠে ঝোলানো স্কুলের ব্যাগের বদলে পেটে বাঁধা বোমা। ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস জঙ্গি শিবিরে এ ভাবেই দিনের পর দিন খুন হচ্ছে লক্ষ লক্ষ শৈশব। ভবিষ্যতের জন্য আগামী প্রজন্মকে প্রস্তুত করার তোড়জোড় ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে আইএস।

গত বছর আগস্টে আইএসের ছড়ানো এক ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, টেডি বিয়ারের শিরোচ্ছেদ করছে এক শিশু। যার বয়স তিন বছরের বেশি নয়। এটাই নাকি ‌‘শিরোচ্ছেদ’-এর প্রাথমিক পাঠ! দু’বছর বয়সে যখন স্নায়ুপথ তৈরি হয়, তখন থেকে কৈশোর পর্যন্ত শিশুদের মনোবিকাশকে বিরাটভাবে প্রভাবিত করে যে কোনও রকমের ভায়োলেন্স। তার আবেগ-অনুভূতিকে একেবারেই অন্য খাতে বইয়ে দেয় ‘ওয়ার উইদিন’ এবং ‘ওয়ার উইদাউট’। সন্ত্রাস এসে ভেঙে দিয়ে যায় শৈশব নামক একটা পর্যায়কে। এই কালপর্বে যে সব শিশু সন্ত্রাসকে প্রত্যক্ষ করেছে, তাদের দেহে যদি যুদ্ধ বা সন্ত্রাসের দাগ নাও পড়ে, তাদের মনকে ক্ষতবিক্ষত করবেই। তাই বইয়ের বদলে বন্দুকের পাঠ্যে শিশুরা। ৫-৬ বছরের বাচ্চাদের বলা হচ্ছে বন্দুকের শিক্ষাই নাকি ‘খিলাফতগিরি’। আইএস শেখায়, বন্দুক হল ধর্মের সবচেয়ে বন্ধু। ফুলপাতার চেয়ে অনেক জরুরি উপচার।

কিন্তু মাত্র ১২ বছরের শিশু নাসিরের জীবন তো অন্য কথা বলে। আইএস তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল একজন আত্মঘাতী যোদ্ধা হিসেবে। খিলাফতের দুনিয়ায় কেমন ছিল নাসিরসহ অন্য শিশুদের জীবন, সিএনএনকে তাই জানিয়েছে নাসির। তার জবানবন্দি থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, কী ভাবে আইএস-কবলিত এলাকার অধিকাংশ শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে উঠছে হিংসা আর রক্তলিপ্সার পাঠে। তার মতো আরও ৬০ জন শিশুকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে আইএস। নাসিরদের ৬০ জনের দলে সবচেয়ে ছোট ছিল পাঁচ বছরের একটি শিশু। আইএসের স্বঘোষিত রাজধানী সিরিয়ার রাকাতে তারা স্থাপন করেছে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। আল-ফারুক নামে এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে শিশুদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেয় আইএস। ঘুম ভাঙা থেকে শুরু। গুলি, কামান, বোমা— কোনও কিছুই বাদ যায় না দিনভর। বার বার কাঁপিয়ে যায় কংক্রিটের বাড়িগুলি। এক মাস ধরে চলে সামরিক প্রশিক্ষণ, বন্দুক ধরতে শেখে নাসির, শেখে লুঠপাট করতে। পেটে বাঁধা বোমা ফাটাতে হয় কীকরে। ছোট্ট মাথায় কিন্ত্ত তখন থেকেই দানা বাঁধছিল সন্দেহ, এরা যা করছে তার সঙ্গে তো ইসলামেরও বিশেষ মিল নেই! তাদের শহরে কেউ সিগারেট খেলে শাস্তি ছিল ভয়ঙ্কর, অথচ শিবিরে খোলাখুলিই চলত ধূমপান, এমনকী যৌনাচারও। কিন্তু কতক্ষণ? কতদিন‍? স্কুলে যাওয়া, ঘুরতে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে বেরনো— একে একে সব বন্ধ হয়েছে। হাঁসফাঁস মন একফালি আকাশ খোঁজে। কিন্তু কোথায় আকাশ? কোথায় খোলা জানলা? কোথায় মুক্তি? জঙ্গিদের কথা না শুনলে ছিল শাস্তি। শেষে নাসির আইএসের থাবা থেকে পালিয়েছে।

পালিয়ে আসা আরও এক শিশু ১১ বছরের নুরি। উত্তর ইরাকে আইএসের তেল আফার ক্যাম্পে ছিল সে। অন্যদের সঙ্গে প্রশিক্ষণে যেতে সে প্রথমে অস্বীকার করেছিল। আর তাই আইএস তার পা ভেঙে দিয়েছে। তবু তার ভাগ্য ভালো, সে পালিয়ে তার পরিবারের কাছে আসতে পেরেছে। এ যেন নরক থেকে মুক্তি। যে নরকে হা‍নাহানির স্মৃতি আর বারুদের গন্ধ ছাড়া আর যে কিছুই নেই! ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলোর চোখে রূপকথার কাজল লাগে না। বরং গাঢ় হয়ে লেগে থাকে, লেগে আছে বাস্তবের রং। কেন ছেলেমেয়েগুলোর মনে বাসা বেঁধে আছে ভয়? কেন ওরা ঘুমোতে পারে না একটা রাতও? উত্তরগুলো জানা। কিন্তু ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলোকে ওই চক্রব্যূহ থেকে মুক্তি দেওয়ার উপায় জানা নেই।

নৃশংসতার সীমা বলে কি কিছু হয়?
তবুও প্রশ্ন ওঠে, শিশু আবার জঙ্গি হয় নাকি?

‘টু দ্য সানস অব জিউস’ শিরোনামে প্রকাশ করা এক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ধু-ধু মরুপ্রান্তর। হাঁটু গেড়ে নতজানু হয়ে বসে জনা ছয়-সাত বন্দি। পরনে কমলা পোশাক। মুখে অসহায়তা সুস্পষ্ট। হুবহু এমনই পোশাক পরানো হয় গুয়ান্তানামো বে-র কারাগারে আমেরিকার কয়েদিদের। বন্দিদের পিছনে আগাগোড়া কালো কাপড়ে ঢাকা জনা পাঁচেক ঘাতক। চোস্ত ইংরেজিতে বারাক ওবামার প্রশাসন ও পশ্চিমি দেশগুলির বিরুদ্ধে কয়েক মিনিটের বিষোদগার। কম্যান্ডোর থেকে আদেশ পেয়েই গুলি চালাল একসঙ্গে। আর অন্য আর একজন তখন সিরীয় সেনাদের আক্রমণ করেছে তার হাতের ধারালো অস্ত্রটা দিয়ে। আইএসের এমন একটি ভিডিও সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়েছে ইন্টারনেটে। ইদানীং মাঝে মধ্যেই যেমন ছড়িয়ে থাকে। আল-কায়েদার হাতে এর আগেও শিরচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ঠিকই। কিন্ত্ত দুনিয়ার অন্য কোথাও অন্য কোনও সন্ত্রাসী সংগঠন এই ভাবে মুরগির মতো আকছার মানুষের ধড় থেকে মুন্ডু আলাদা করে দেওয়ার নৃশংস খেলায় নামেনি। এমনকী মধ্যযুগীয় বর্বরতার প্রথম আস্ফালন করা খাইবার পাস অথবা হিন্দুকুশের তালিবানরাও নয়। মানুষ মারায় শিশুদের হাত পাকানোর কী অসহনীয় সেই দৃশ্য!

নৃশংসতা ইসলামিক স্টেটের কাছে এসব নতুন কিছু নয়। কিন্ত্ত তা বলে ছেলের হাতে মাকে খুন? তাও ঘটেছে সিরিয়ায় আইএসের দখলে থাকা এলাকার মূল ঘাঁটি রাকায়। এক জঙ্গি তার মাকে ‘চরম ধর্মবিরোধী’ আখ্যা দিনের আলোয় গুলি করে মেরে ফেলার ঘটনায় অবাক গোটা দুনিয়া। নিজের মাকে মারার সময় এক বারের জন্যও আলি সাকর আল-কাসেমের(২১) হাত কাঁপেনি। বরং ‘অপরাধীকে’ শাস্তি দিয়ে চরম শান্তি পেয়েছে! বছর পঁয়তাল্লিশের ওই মহিলার ‘অপরাধ’? ছেলেকে আইএস জঙ্গিদের সঙ্গ ত্যাগ করতে বলেছিলেন তিনি। আলি সাকর আল-কাসেম নামে ওই তরুণের মনে হয়েছিল, মা তাঁকে ধর্মত্যাগের জন্য উস্কানি দিচ্ছেন! তা হলে তিনি বেঁচে থাকবেন কীসের অধিকারে? অ্যাসল্ট রাইফেল থেকে মায়ের মাথায় গুলি করে আলি সাকর। এবং এ সমস্তই ঘটছে, ঘটানো হচ্ছে ইসলামের নামে, শুদ্ধ আদি ইসলামে ফিরে যাওয়ার আন্দোলনের অংশ হিসাবে। এই যদি শুদ্ধ ইসলাম হয়, তবে মানবসভ্যতার ক্ষয়িষ্ণু বর্বরতা কাকে বলে?

দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকার সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক যথার্থই বলেছেন, আইএস জঙ্গিদের কর্মকাণ্ডের সঠিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এখন ভাষাও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ‘রক্তপিপাসু, অসুস্থ, অশ্লীল, বর্বর, বিকৃত, নৃশংস, কুৎসিত’ এই শব্দগুলো আজকাল আইএস জঙ্গিদের কর্মকাণ্ড ও বাস্তবতাকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে আর যথেষ্ট বলে মনে হচ্ছে না। জঙ্গিরা একেকটা ঘটনার জন্ম দিচ্ছে আর সেই বাস্তবতা তুলে ধরতে গিয়ে সংবাদকর্মীদের রীতিমতো ভাষার পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের কাছে সন্তানতুল্য পালমিরার ধ্বংসযজ্ঞ কেবলই ‘অসুস্থ-বিকৃত’ নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। কিংবা অস্ত্রের মুখে তুলে নেওয়া অমুসলিম কিশোরী আর নারীদের রোজ ধর্ষণের আগে জঙ্গিদের নফল নমাজ পড়াটাকে আপনি কী বলবেন? শুধুই কি ‘অশ্লীল বিকৃতি’? তার চেয়েও বেশি কিছু নয়?

কিছুদিন পর পরই এমন নিত্য-নতুন আরও ‘বেশি কিছু’র জন্ম দিয়ে চলেছে আইএস জঙ্গিরা। হয়তো অনির্দিষ্ট কাল ধরেই জঙ্গিদলটির এমন কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দুনিয়াজুড়ে সাংবাদিকদের শব্দের ভাণ্ডারে খাবি খেতে হবে। কিন্তু কতদিন? কোথায় গিয়ে থামবে আইএস? ইরাক-সিরিয়ার বহুধা বিভক্ত রণাঙ্গনের মতোই জটিল এই প্রশ্নের উত্তরটাও।

মানববোমা হবে শিশুরা?

নিউ ইয়র্কের রাষ্ট্রসংঘের সদর দপ্তরের সামনে ব্যাকপ্যাক পিঠে একটু কুঁজো হয়ে হাঁটছে লোকটা। কিন্তু তার পিঠের ব্যাগে টিক টিক করে এগিয়ে চলেছে একটি ঘড়ি। রাশিয়ার অস্ত্র ভাণ্ডার থেকে চুরি করা একটি পরমাণু বোমা পিঠের ব্যাগে ভরে শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিস্ফোরণ ঘটাতে এগিয়ে চলেছে সে। নিউ ইয়র্ক থেকে বহু দূরে, সুদূর সারাজেভোতে ন্যাটো বাহিনীর হাতে স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এগিয়ে চলা ওই লোকটাকে ভিড়ের মধ্যে আলাদা করে চিনে নেওয়ার উপায় নেই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর। ১৯৯৭ সালে হলিউডের ছবি ‘দ্য পিসমেকার’-এর এই দৃশ্যেরই পুনরাভিনয় হতে পারে বিশ্বের যে কোনও দেশে। ভারতও রয়েছে সেই তালিকায়। আর সেখানে মানববোমা হিসাবে ব্যবহার করা হতে পারে শিশুদের। ‘দ্য সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস’ জানিয়েছে, শুধুমাত্র ২০১৫-র জুলাই মাসে আইএসের ১৯ হামলায় শিশুদের আত্মঘাতী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। গত বছর আইএসের হয়ে লড়াই করতে গিয়ে ১৬ বছরের নিচে ৫২ শিশু নিহত হয়েছে। আইএস তাদের মুখপত্র ‘দাবিক’-এ একের পর এক সংখ্যায় তার পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ইসলাম রক্ষায় নাকি শিশুদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া পবিত্র কাজ!

ধর্মের নামে, স্রেফ ধর্মকে ব্যবহার করে হিংসার বাতাবরণ তৈরির চেষ্টা চলছে দিনের পর দিন। এই সন্ত্রাসবাদীদের হাত ধরে শুদ্ধ ইসলামে ফেরার নামে বিশ্বজুড়ে চলছে অনাচার আর বর্বরতা। এত যুদ্ধ, অস্ত্রশস্ত্রের ঝঙ্কার, গোলাবারুদের ধোঁয়ায় ইসলামের ভুবন ভরে উঠেছে, যেন ইসলামের সাম্রাজ্য বিস্তারের আদি যুগই ফিরে এসেছে। সশস্ত্র, কালো মুখোশের আড়ালে আবৃত এই জঙ্গিরা নিজেদের ‘ইসলামের যোদ্ধা’ বলে দাবি করছে, জেহাদি বলছে। কিন্তু এখন, দেড়শো কোটির বেশি মুসলিম জনসংখ্যার এই বিশ্বে ইসলাম যখন একটি প্রতিষ্ঠিত ধর্ম, তখন এমন হিংসার জেহাদের প্রয়োজন কী? যেখানে শিশুদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে মানব-ঢাল বানাতে হয়!

সত্যিই তো, কোথায় পালাবে নুরি? কোথায় পালাবে নাসির? কোথায় পালাবে ছোট ছেলেমেয়েগুলো? হারানো শৈশব, চুরি হয়ে যাওয়া শৈশব আর কি ফিরে পাবে ওরা? আদৌ কি ফিরে পাবে?