ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

Atanker Kanagoliআতঙ্কের কানাগলি

ব্যান্ডের উদ্দাম বাজনা চাপা পড়ে গিয়েছিল একটানা গুলির শব্দে। তারপর শুধুই রক্ত-কান্না-চিৎকার। প‌্যারিস নয়। এবার মার্কিন মুলুকের ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে ‘পালস’ নামে সমকামীদের একটি নাইট ক্লাব। সেই একই দৃশ্য! প্রাণচঞ্চল, উচ্ছ্বল শহর এক লহমায় হয়ে উঠেছিল মৃত্যু ও আতঙ্কের নগরী। লাইট, সাউন্ড, ক্যামেরা-এই সব কিছু নিয়েই ছিল জঙ্গির ‘অ্যাকশন’!

প‌্যারিসে গণহত‌্যার পরে একটা চাপা ভয় সঙ্গী ছিল মার্কিন মুলুকেও। প্রশ্ন ছিল, ঠিক কী ঘটতে পারে? কোথায় ঘটতে পারে? কবে? উত্তরের জন্য অবশ্য বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। ২০১৬-র ১১ জুন, আমেরিকার সঙ্গে গোটা দুনিয়া জেনে গিয়েছিল জবাব। প্যারিসের ঘা শুকোনোর আগেই ফের আইএস জঙ্গি হামলা অরল্যান্ডোয়। মানুষ মারার গল্প লিখেছিল খোদ মানুষই। ২০০১-এর ৯/১১-র পরে এত বড় হত্যালীলা দেখেনি আমেরিকা।

আততায়ীর নাম ওমর এস মতিন। মার্কিন নাগরিক নাগরিক হলেও আদতে আফগান বংশোদ্ভূত। আর এটুকু তথ্যই আমেরিকার শিরদাঁড়া কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট! মাত্র ২৪ ঘণ্টা ‌আগে এই অরল্যান্ডো শহরেই একটি অনুষ্ঠানের শেষে বন্দুকবাজের হানায় প্রাণ হারিয়েছিলেন মার্কিন গায়িকা ক্রিশ্চিয়ানা গ্রিমি। পরের হামলা সেখান থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরে। স্বাভাবিকভাবে অরল্যান্ডো এখন চরম আতঙ্কে। নানা চ্যানেলে আছড়ে পড়েছে ব্রেকিং নিউজ-এর ঢেউ। মৃত্যু, আতঙ্ক আর সন্ত্রাসের দৃশ্য চতুর্দিকে। রাস্তায় পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ, দমকলের গাড়ি। শুধুই সাইরেনের শব্দ আর ভীত-সন্ত্রস্ত মুখের ছুটোছুটি।

এই হামলার এই পদ্ধতিও কি সেই ‘সিম্ফনি সিস্টেম’? ঠিক প‌্যারিসের মতোই। সন্ত্রাস বিশেষজ্ঞরা বলেন, যে পদ্ধতিতে জঙ্গিদের হানাদারির অপারেশনে সিম্ফনির মতো পরিচালনা করে একজন ব্যান্ড মাস্টার! তার আগে অবশ্য নাদান ছেলেমেয়েদের ধরে ধরে জিহাদি জিগিরে শিক্ষিত করে তোলার পাঠ, যাতে একলা নেকড়ের মতো রক্তপিপাসু হয়ে ওঠে জঙ্গিরা। ১১ জুনের হামলার পর অবশ্য বোঝার উপায় ছিল না, কে ব্যান্ড মাস্টার আর কে-ই বা এই লোন উলফ (একাকী হামলা চালানো)। কারণ, ততক্ষণে পুলিশের গুলিতে খতম হয়ে গিয়েছিল ২৯ বছরের ওমর মতিন।

বাবা মির সিদ্দিকি মতিন অবশ্য বলছেন অণ্য কথা। দিন কয়েক আগে মায়ামিতে দুই যুবককে চুমু খেতে দেখেছিল মতিন। সঙ্গে তার তিন বছরের ছেলেও ছিল। অপ্রস্তুত ওমর সেই দেখে নাকি বেজায় চটে যায়। আর তার জেরেই নাকি অরল্যান্ডোয় সমকামীদের নাইট ক্লাবে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে ৫০ জনকে খুন করে। কিন্তু খুন তো খুনই!

ফোর্ট পিয়ার্সের যে মসজিদে ওমর ছোটবেলা থেকে যেত, তার ইমামও অভিযুক্তের মধ্যে ধর্মপ্রাণের কোনও লক্ষণ খুঁজে পাননি। জানিয়েছেন, সবার শেষে মসজিদে এসে সবার আগে বেরিয়ে যেত ওমর। মসজিদে কারও সঙ্গে কথাও বলত না। অথচ আফগান বংশোদ্ভূত এই ওমরই ‘‌পালস’‌ নাইট ক্লাবে হত্যালীলা চালানোর সময় পুলিসকে ফোন করে জানায়, সে আইএস জঙ্গি। পরস্পরবিরোধী এই তত্ত্ব নিয়েই ধন্দে গোয়েন্দারা। তবুও প্রশ্ন, ওমরের অতীত রেকর্ড তো খুব সাফসুতরোও ছিল না।

সপ্তাহান্তের উৎসবে মত্ত নিশি নিলয়ে আচম্বিতে শুরু মৃত্যুর উৎসব। গুলি শুরু হয়েছিল ড্রামের তালের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। অনেকেই ভেবেছিলেন এ-ও বাজনারই অংশ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মতিনের অ্যাসল্ট রাইফেলের গুলিতে ঝাঁঝরা বহু মানুষ। অ্যাসল্ট রাইফেলের সঙ্গে একটা হ্যান্ডগানও ছিল মতিনের হাতে। কোমরে ধারালো ছুরি। পরনে বিস্ফোরক লাগানো আত্মঘাতী জ্যাকেট। নাইটক্লাবে ঢোকার মুখেই নিরাপত্তা রক্ষীদের সঙ্গে এক দফা গুলির লড়াই। ভিতরে ঢুকে প্রথমে শূন্যে গুলি। তারপর নিশানা ভিড়ে। পর পর গুলি চলার শব্দ। বিছিয়ে দেয় শবের পর শব। ২০…৩০…৫০। যে পঞ্চাশ জনের মৃত্যু হল, যুদ্ধটা কি ঠিক এঁদেরই বিরুদ্ধে? এই প্রাণগুলো ছিনিয়ে নিয়েই কি যুদ্ধে অনেকটা এগিয়ে যেতে পারল সন্ত্রাস? আসলে কোনও নির্দিষ্ট প্রাণ নয়, সন্ত্রাসের নিশানা একসঙ্গে অনেক প্রাণ। সন্ত্রাসের অভীষ্ট এক নিশানায় অনেকটা হানি।

ভয়াল এই সন্ত্রাসের নেপথ্যে সেই আইএস! দাবি তুলে গিয়েছে আততায়ী নিজেই।

ইসলামিক স্টেট। আল-কায়েদা নয়, আবু বকর আল-বাগদাদির নেতৃত্বাধীন যে সংগঠনই এখন বিশ্ব-সন্ত্রাসের মুখ। কালাশনিকভ-গ্রেনেড-বোমায় যারা বুঝিয়ে দিচ্ছে, ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর সঙ্গে সন্ত্রাসের শেষ হয়নি। আল-কায়েদা হীনবল হয়েছে বটে, কিন্তু সেই ফাঁকা জায়গাটা নিয়ে নতুন জিহাদ জারি রেখেছে আইএস।

৯/১১-র পর বদলে গিয়েছিল সন্ত্রাসের মুখচ্ছবি, বদলে গিয়েছিল তার কার্যকারিতা। গুপ্তঘাতককে তবু ধরা যেত। সে একা। অন্তরালে শক্তিমান পৃষ্ঠপোষকের দল। কিন্তু আল-কায়েদা তো অজস্র সংগঠনের ছাতা। সে কখনও অর্থসাহায্য করে, কখনও বা দেয় বুদ্ধি। পুরো বোমা কেউ বাঁধে না। এই শহরে কারও দায়িত্ব ডিটোনেটর তৈরি, তো পাঁচশো মাইল দূরে কেউ ‘প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ্‌স’ বানায়। কেউ কাউকে চেনে না। বিন লাদেনের অন্যতম কৃতিত্ব, তিনি এই দুনিয়ায় হিমশীতল এক অবিশ্বাসের যুগ নিয়ে এসেছিলেন। ৬ ফুট ৪ ইঞ্চির দোহারা চেহারা। শান্ত, সৌম্য, মুখভর্তি দাড়ি। এই মুখ আর সন্ত্রাস এখনও প্রায় সমার্থক। ‘আমাকে মারলে প্রতিশোধ নিতে আরও লাদেন জন্মাবে,’ হুঙ্কার দিয়েছিলেন ওসামা।

আজ সে ভাবে আল-কায়েদার নাম সামনে আসে না। হিংসা, রসদ, এলাকা দখল— নানা সূচকে আল-কায়েদাকে বেশ কয়েক কদম পিছনে ফেলে দিয়েছে আইএস। সম্প্রতি এর সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে পশ্চিমি বিশ্বের বুকের ভিতরে আঘাত হানার দক্ষতা। সব মিলিয়ে উগ্র মৌলবাদীদের চোখের মণি হয়ে উঠেছে সংগঠনটি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা, প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ক্লিন্টন, প্রত্যেকেই মনে করিয়ে দিয়েছেন, Osama is dead but Al Qaida is not. আয়মান আল-জাওয়াহিরি থেকে শুরু করে লিবিয়ার আবু ইয়াহিয়া আল-লিবি, আল-কায়েদার পরের ধাপের নেতারা তৈরি। উত্থান ইমলামিক স্টেটের মতো ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠন। সুতরাং একই রকম আতঙ্ক, সতর্কতা। একই মার্কিন পুতুল-নাচ, লাদেনীয় স্ক্রিপ্টের সঙ্গে। যে স্ক্রিপ্টের শেষ সংযোজন ওমর মতিন।

তাই আরও এক বার! ভয়ঙ্কর হত্যালীলায় রক্তাক্ত মার্কিন ভূমি। আর কোথাও কোনও নিকষ অন্ধকার প্রান্তে সন্ত্রাসের উপাসনা গৃহে যেন চকচক করে উঠল ভীষণদর্শন কোনও বিগ্রহের চোখের মণি।

অরল্যান্ডোর ‘পালস্’ ক্লাবে তারাই হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে জঙ্গি সংগঠন আইএস। ওই জঙ্গি সংগঠনের বেতারকেন্দ্র ‘আল-বয়ানে’-র ঘোষণা, ‘‘আমেরিকা থেকে কাজ শুরু করেছি। উপরওয়ালা আমাদের ভাই ওমর মতিনকে পাঠিয়েছিলেন। খিলাফতের সৈনিক ওমর ফ্লরিডার অরল্যান্ডোর ক্লাবে হামলা চালিয়েছে।… শতাধিক মানুষকে সে হত্যা এবং জখম করেছে। ১৬ বছর আগে ম্যানহাটন-সন্ত্রাসের পর আমেরিকায় এটাই সবচেয়ে বড় হামলা।’’ বিভিন্ন সংবাদপত্রের দাবি, আমেরিকার আপৎকালীন নম্বর ৯১১-এ ফোন করে নিজেকে আইএস নেতা আবু বকর আল-বাগদাদির অনুগামী বলে জানিয়েছিল মতিন। সন্ত্রাস-বিশেষজ্ঞদের অন্য একটি অংশ আবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, আমেরিকায় ‘লোন উলফ’ হামলার অনুপ্রেরণা জোগাতে আইএস কয়েকমাস আগে ইন্টারনেটে একটি ‘খতম তালিকা’ প্রকাশ করেছিল। সেই তালিকার প্রভাব মতিনের উপরে পড়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট খোদ বারাক ওবামা জানিয়েছেন, ‘‘ইন্টারনেটে বিভিন্ন চরমপন্থী লেখা থেকেই ও অনুপ্রাণিত হয়েছিল।’’

মুশকিল হল, জঙ্গিদের ‘ধর্ম’টি কী, তা জঙ্গিরা ছাড়া আর কেউ জানেন না! কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম এবং মানবধর্ম জঙ্গিদের তথাকথিত ধর্মোদ্ধারের ছেঁদো যুক্তি মানে না। বরং বিষয়টিকে সপাট মৌলবাদ বলেই মনে করে। প্রকৃতপক্ষে, ধর্মই মনে করে যে, সন্ত্রাসের কোনও ধর্ম নেই। মৌলবাদের কোনও দেশ নেই। শুধু তাই নয়, ইতিহাস সাক্ষী, ধর্ম মানার অধিকারের মতোই ধর্ম না-মানার অধিকারকেও যুগে যুগে স্বীকৃতি দিয়েছে পৃথিবীর দর্শন। ধর্মচিন্তা এবং খুন— এক পঙ্‌ক্তির বস্তু নয়। বস্তুত, খুনির যুক্তির অভাব হয় না। তাই দেশের মধ্যে মুক্তাঞ্চল তৈরি করে মথুরায় শিশুদের জঙ্গিপনার পাঠ দেওয়া যায়! আর চট্টগ্রামে কুপিয়ে খুন করা যায় নিরপরাধ নারীকে! বাঁচার একটিই পথ। শুভ ভাবনাকে ছড়িয়ে দেওয়া। এবং তারও আগে সমাজকে তথাকথিত শিক্ষার অন্ধকূপ থেকে বার করে আনা। উপমহাদেশে মৌলবাদী সংগঠনের রমরমার কারণ নিহিত অশিক্ষা এবং অন্ধশিক্ষায়। প্রকৃত শিক্ষার আলো বিচ্ছুরণ প্রয়োজন মৌলবাদের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে।

এই ভয়ংকর বিশ্ব পরিস্থিতিকেই তুলে ধরেছেন লেখক মৃণালকান্তি দাস। যেখানে তিনি লিখেছেন, আসলে, ‘সৃষ্টির মনের কথা মনে হয়— দ্বেষ’। আজ থেকে বহু বছর আগে বিক্ষুব্ধ পৃথিবীর দিকে চেয়ে এমনটাই অনুভব করেছিলেন কবি (জীবনানন্দ দাশ)। আজ আবারও কবির সেই অনুভূতির খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আমরা। যে-পৃথিবীতে শিশুর প্রথম শয্যা পাতা হয় মারণাস্ত্রের সমাহারে, মানুষেরই হাতে মানুষের প্রাণনাশের ভিডিও আপলোড করা হয় উৎসাহের সঙ্গে, সেখানে দ্বেষ ছাড়া আর কীই-বা রয়েছে আমাদের?

প্রতিদিন বিভিন্ন বাংলা, ইংরেজি সংবাদপত্রে-ওয়েবসাইটে সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদের ইতিহাস খুঁজতে খুঁজতে অশান্ত দুনিয়ার নানা পর্যায় তুলে ধরার চেষ্টা এই পরিসরে। এ বই বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের সংকলনও বটে। সেই সব লেখা নিয়েই ‘আতঙ্কের কানাগলি’ প্রকাশের উদ‌্যোগ নিয়েছেন ‘বাংলার মুখ’ প্রকাশনের প্রদীপ চক্রবর্তী। এই বইয়ে আন্তর্জাতিক-জাতীয় প্রেক্ষাপটে সন্ত্রাসবাদ-মৌলবাদের গভীরতর বিপদের ধারনা পেতে পারেন পাঠক।

…………………………..

আতঙ্কের কানাগলি

(আল-কায়েদা থেকে ইসলামিক স্টেট)

দাম ২৫০ টাকা

বাংলার মুখ প্রকাশন

২১/১এ, পটুয়াটোলা লেন, কলকাতা-৯

ফোন- ৯১৬৩৬৩২৭৭৭/৯০৫১৪৪৬২৯৯