ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

ইউরো ইস্যুতে ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগ করার পরে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে নতুন মুখ। মার্গারেট থ্যাচারের পর দ্বিতীয় মহিলা প্রধানমন্ত্রী পেল গ্রেট ব্রিটেন। ক্যামেরনের বিদায়ের পর ১০, ডাউনিং স্ট্রিটের বাসিন্দা এখন ৫৯ বছরের কনজারভেটিভ নেত্রী টেরিজা মে। ক্যামেরনের মন্ত্রকের স্বরাষ্ট্রসচিব। রাজনৈতিক আদর্শগত ভাবে ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষপাতী ছিলেন টেরিজা। এখন ‘ব্রেক্সিট’ কার্যকর করার দায়িত্ব বর্তাবে তাঁরই উপরে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিলেও পরে ‘মোহভঙ্গ’ হয়েছিল থ্যাচারের। একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘ইইউ ব্রিটেনের স্বার্থ এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিপন্থী’। গোড়ায় ‘ব্রেক্সিটে’র বিপক্ষে থাকলেও মে পরে জানিয়েছেন, তিনি ইইউ’য়ের বাইরে গিয়েই ব্রিটেনের শক্তি বাড়াতে চান। টেরিজা বলছেন ‘ঐক্যবদ্ধ’ ব্রিটেনের কথা। টেরিজা জানেন, ভাঙন মানেই ভাঙাগড়া। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কিন্তু ইইউ ছাড়ার প্রবণতা অনেক কম। তাদের কাছে ইইউ ছিল সম্ভাবনার দুনিয়া। বর্ষীয়ান সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তে সে সম্ভাবনা হারানোয় তরুণ মুখগুলি ক্ষুণ্ণ এবং ক্ষুব্ধ। ক্ষুব্ধ স্কটল্যান্ড, আয়ার্ল্যান্ডও।

Theresa-May-2-(1)

গার্ডিয়ান–এর প্রাক্তন সহসম্পাদক ইয়ান বিরেল লিখছেন, ঝানু রাজনীতিক হিসেবে মে জানেন, কনজারভেটিভ পার্টির তেড়েফুঁড়ে ডান দিক ধরে না হেঁটে মাঝপথ বরাবর হাঁটার মহিমা কী। বিশেষ করে লেবার পার্টি যখন নিজেদের সমস্যা নিয়েই ব্যতিব্যস্ত। তাঁর শেষ বক্তৃতার কথাই ধরুন, সেখানে মে বলেছেন, তাঁর সরকার গরিব, কালো, শ্বেতাঙ্গ শ্রমিক ও মানসিক রোগীদের জন্য কাজ করবে। বলেছেন, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের বন্ধন সযত্নে রক্ষা করে এমন এক দেশ তিনি গড়তে চান, যে দেশ সকলের। যেখানে গুরুত্ব পাবে সামাজিক ন্যায়, খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ডেভিড ক্যামেরনের গণভোট অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্তকে অনেকে নিজেই নিজের কবর খোঁড়ার মতো কাজ বলে মন্তব্য করেছিলেন। ক্ষমতাসীন টোরি পার্টির কট্টর ডানপন্থীদের চাপের মুখে তাঁদের তুষ্ট করার সিদ্ধান্তটি যে শুধু তাঁর জন্য আত্মঘাতী হয়েছে তা-ই নয়, পুরো মূলধারার রাজনীতিকে ওলট-পালট করে দিয়েছে। ১১ বছরের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের দু’বছর আগেই ডেভিড ক্যামেরনকে ডাউনিং স্ট্রিট ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। তাঁর যাবতীয় সাফল্য এক অনাবশ্যক গণভোটের আড়ালে হারিয়ে গিয়েছে। ব্রিটেনের ইউরোপ থেকে এক্সিটকে ‘ব্রেক্সিট’ বলা হলেও কার্যত তা প্রথম সারির রাজনীতিকদের অনেকেরই মহাপ্রস্থানে পরিণত হয়েছে। ব্রেক্সিটের পক্ষে প্রচারে যাঁরা নেতৃত্ব দিলেন, তাঁদের যখন পথ দেখানোর কথা, তখন তাঁরাও সরে যেতে বাধ্য হলেন। টোরি পার্টির ডানপন্থী অংশের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন লন্ডনের প্রাক্তন মেয়র বরিস জনসন ও আইনমন্ত্রী মাইকেল গোভ। টোরি পার্টির বাইরে এই প্রচারের নেতৃত্বে ছিলেন উগ্র জাতীয়তাবাদী ইউকে ইনডিপেনডেন্টস পার্টির নাইজেল ফারাজ। ব্রেক্সিটের চ্যাম্পিয়ন এই তিনজনই এখন হয় অবসরে, নয়তো পিছনের সারিতে।

ইয়ান বিরেলের কথায়, টেরিজা মে কিছুটা পাগলাটে স্বভাবের! রাজনীতিক হিসেবে তাঁকে বিরলই বলতে হয়। কারণ এত দীর্ঘ সময় রাজনীতিতে থেকেও তিনি লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিলেন। টেরিজা বেশ কঠিন স্বভাবের একজন মানুষও। অনেকেই বলেন, স্বভাবে মে নাকি থ্যাচারের কয়েককাঠি উপর দিয়ে যান! ‘আয়রন লেডি’ থ্যাচার ব্যক্তিত্বের দিক থেকে কঠিন ছিলেন। কিন্তু ‘আইস কুইন’ মে’র ব্যক্তিত্বে সেই কাঠিন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হিমশীতলতা। তিনি তাঁর নিজের টোরি পার্টির প্রতিনিধিদের মুখের ওপর বলে দিতে পারেন, লোকে তাদের জঘন্য পার্টি মনে করে। ওয়েস্টমিনস্টারের পুরুষপ্রধান রাজনীতিকে ঠুকে থ্যাচার একবার বলেছিলেন, কথা শুনতে চাইলে কোনও পুরুষের কাছে যাও। কাজ চাইলে মহিলার শরণ নাও। আর ব্রিটেনের প্রাক্তন অর্থসচিব কেন ক্লার্ক একবার মে-কে ‘ব্লাডি ডিফিকাল্ট উওম্যান’ বলায় সপাট জবাব এসেছিল, বিরক্তিকর মহিলারা থাকলেই রাজনীতিটা বাস্তবিক হয়! কিন্তু তা সত্ত্বেও টেরিজা মে মানুষকে তাক লাগিয়ে দিতে পারেন। যাজকের মেয়ে হিসেবে তাঁর মধ্যে বোধবুদ্ধিসম্পন্ন প্রধান শিক্ষিকার চরিত্র আছে, যিনি কথা বলেন খুব কম, যাকে প্রায়ই প্রথাগত ‘শায়ার টোরি’ বলা হয়। যিনি মেপে মেপে সিদ্ধান্ত নেন এবং সেগুলি বাস্তবায়নও করেন। তিনি অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাশী, যাকে ডাউনিং স্ট্রিটের জন্য প্রয়োজনীয় আলোচনা বা সমঝোতার শিল্পটা শিখতে হবে। তিনি দেশকে নাড়া দেওয়ার মতো আদর্শবাদী নন, ফলে তিনি সাধারণ ব্যঙ্গ চরিত্রের চেয়ে বেশি জটিল ও আকর্ষণীয়। হয়তো তাই আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই মে’র সঙ্গে তাঁর পূর্বসুরি, প্রয়াত মার্গারেট থ্যাচারের তুলনায় মুখর হয়েছে ব্রিটেন।

margaret thacher

অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠছে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কি আরও একজন ম্যাগি থ্যাচারের আবির্ভাব ঘটছে? এ রকম মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। মার্গারেট থ্যাচার লৌহমানবী খেতাব পেয়েছিলেন ট্রেড ইউনিয়ন দমন এবং ফকল্যান্ড যুদ্ধে তাঁর অনমনীয় ভূমিকার কারণে। পার্লামেন্টে টেরিজা মের ভোটের রেকর্ড বলছে, তিনি ইরাক যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন। সিরিয়া ও লিবিয়ায় সামরিক অভিযানের সমর্থনে ভোট দিয়েছিলেন। অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে তাঁর আমলেই সবচেয়ে বেশি ধরপাকড় হয়েছে এবং সরকারি প্রচারও ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। সন্ত্রাসবাদ দমন ও নিরাপত্তার প্রশ্নে ব্যক্তির গোপনীয়তার অধিকারে হস্তক্ষেপের মতো আইন করার ক্ষেত্রেও তিনি সমালোচকদের প্রতিবাদ গায়ে মাখেননি। আর মানবাধিকার প্রশ্নে তিনি ছিলেন ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের বিরুদ্ধে।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদে একটি প্রশ্নই তাঁর মাথার ওপর ঝুলবে, সেটা হল কীভাবে ব্রেক্সিটের দুঃস্বপ্নের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়। তাঁর একজন সহযোগী পরামর্শ দিয়েছেন, ব্রেক্সিটের ফলে অনিবার্যভাবে যে মন্দা হবে, তাতে অভিবাসন এমনিতেই কমে আসবে। যেটা তাঁকে সীমান্ত বন্ধ না করে মুক্তবাজারের পক্ষে থাকার সুযোগ করে দেবে। যার মাধ্যমে আবার ভোটারদেরও নিশ্চিন্ত রাখা যাবে। কিন্তু খুব ছোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও তিক্ত ডানপন্থীদের নিয়ে সমস্যার সমাধান বের করা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে, যেখানে তাঁকে রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে অর্থনৈতিক চাহিদার ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। কিন্তু দুঃখের কথা হল, টেরিজা মে হয়তো আরও একজন টোরি প্রধানমন্ত্রী, যাঁর জমানাও সংকীর্ণমনা ইংরেজরা ক্ষতবিক্ষত করবে। যে ইংরেজরা ইউরোপের চেয়েও নিজেদের স্বার্থপরতাকেই বেশি মূল্য দেয়।

তার উপর অদূর ভবিষ্যতে আরও একটি সাধারণ নির্বাচনের দাবি যে উঠবে না, সে কথা বলা যায় না। ইতিমধ্যে লেবার পার্টি ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা এই দাবির কথা জানিয়ে রেখেছে। টনি ব্লেয়ারের কাছ থেকে তাঁর উত্তরসূরি গর্ডন ব্রাউন যখন এভাবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন টোরি পার্টি থেকে দাবি উঠেছিল যে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্রাউনের নতুন করে জনগণের রায় নেওয়া উচিত। সেই জনগণের রায় না নেওয়াকেই পরবর্তী নির্বাচনে তাঁর পরাজয়ের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। টেরিজা মে–ও কি সেই একই ফাঁদে পা দিচ্ছেন?