ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

 

একটু ভাবব না আমরা?

কলকাতায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার অভিঘাত সমাজের বহু মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। বহু অভিভাবক ছেলেমেয়েদের নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। শিক্ষক-শিক্ষিকারা পড়ুয়াদের নিয়ে চিন্তিত। ঘটনায় ‘হাই-সোসাইটি’র কিছু কিশোর-কিশোরী, নামীদামি স্কুলের কিছু পড়ুয়ার নাম এখনও অবধি জড়িয়ে রয়েছে। তার অভিঘাতই ভাবিয়ে তুলেছে সমাজের সচ্ছল অংশের মানুষকে।

প্রাণ গেল এক কিশোরের। জড়িয়ে গেল আরও কয়েকজন কিশোর-কিশোরীর নাম। এরা সকলেই কোনও না কোনওভাবে ওই মর্মান্তিক ঘটনার ‘ভিক্টিম’ বা শিকার। কয়েকটি প্রশ্ন উঠে আসছে এই ঘটনায়। অপ্রাপ্তবয়স্কের নেশার বিষয়টিকে আমরা কীভাবে দেখব? কোনও বিশেষ উপলক্ষে হলেও কীভাবে দেখা উচিত?

আজকাল বেশির ভাগ পরিবারেই একটি করে ছেলেমেয়ে। ওদের ভালবাসতে গিয়ে শাসনের সীমানা ছোট করে ফেললে জীবন-বিকাশ কি সুস্থতার পথে চলতে পারে?

আজকে যখন স্ন্যাপচ্যাটের দৌলতে সানি পার্কের ফ্ল্যাটের পার্টিতে অংশ নেওয়া কোনও এক কিশোর ছাত্রের তিনটি ফ্লেভার্ড ভদকার বোতল হাতে নিয়ে ছবি প্রকাশ্যে চলে এসেছে, তখন অনেকেই আতঙ্কে শিউরে উঠছেন৷ এমনকী, কলকাতা পুলিশের কর্তারাও এমন ছবি দেখে বিস্মিত৷ কিন্তু কলকাতা-সহ গোটা রাজ্যের অসংখ্য তথাকথিত নামী স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এই ঘটনা জলভাতের মতো৷ ‘সারপ্রাইজ পার্টি’, মদ্যপান, কথায় কথায় রেস্তোরাঁ বা বার-এ যাওয়া, এইসব কার্যত রুটিনের মধ্যেই৷

জীবনের বিকাশের স্তরে কৈশোর এক মাধুর্যময় সময়। সে তখন পূর্ণ শিশুও নয়, সম্পূর্ণ পরিণতও নয়। মা-বাবার আদরের বেড়াজালও যেমন আছে, তেমনই নীতিশিক্ষার বহরও তখন পর্যন্ত যথেষ্ট ছড়ানো। একটু বড় হওয়ার দিকে এগিয়ে যেতে বড়দের মতো জীবন তাদের কাঙ্খিত। কিন্তু সামাজিক শিক্ষায় তুলে ধরা দরকার তাদের এক্তিয়ারের সীমা। ওদের বোঝার ও বোঝানোর দায়িত্ব যে আমাদের, বড়দের। একটু ভাবব না আমরা?

মনস্তত্ত্বের অধ্যাপক নীলাঞ্জনা সান্যাল বলছেন, আজকের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এই জায়গাটাতেই অসুবিধা চোখে পড়ছে। অর্থাৎ, মা-বাবার আদরের সীমা প্রকট, কিন্তু নিষেধের বেড়াজাল ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছে। ফলে ঘটনার পুনরাবৃত্তি— অনেক অনেক আবেশ হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের ছবি থেকে। নানা ভাবে, নানা কারণে। এই দুর্ঘটনাগুলোয় একটা দুটো বিষয় বারবারই চোখে পড়ছে। কিশোরদের উচ্ছৃঙ্খলতা ও সেই আচরণের পরিধিতে মাদকের ব্যবহার। কোথা থেকে শিখছে ওরা? আর কেনই বা এমন আচরণ? মনস্তত্ত্বের বিচার বলছে অনেক কথা।

‘সেলিব্রেশনে’ মদ্যপান এখন প্রায় অপরিহার্য  হয়ে উঠছে সমাজের একটা বড় অংশে। এমনকী, কমবয়সিদের মধ্যেও তা সঞ্চারিত। কিন্তু এই পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হল?

কমবয়সিদের মধ্যে স্বেচ্ছাচারী, বেহিসেবি জীবনযাপনের মূলে বড়দের ভূমিকা কতখানি? বড়দের কি কিছুই করার নেই? স্কুলের ভূমিকাই-বা কী?

এইসব প্রশ্ন ভাবাচ্ছে। ভাবাচ্ছে বহু মানুষকেই।

অনেকেই একরাশ খেদ নিয়ে বলছেন, আবেশ তো কবেই মারা গেছে ? আবেশ মারা গেছে সেদিন যেদিন ইংরাজি মাধ্যম স্কুলে পড়া ১২ বা ১৩ বছরের বালক হওয়া সত্ত্বেও বাবা-মা তার হাতে একগুচ্ছ টাকা তুলে দিয়েছে বন্ধুদের সাথে পার্টি করার জন্য। আবেশ মারা গেছে সেদিনই যেদিন ক্লাস এইটে উঠতে না উঠতে হাতে পেয়ে গেছে দামী মোবাইল।

আবেশ মারা গেছে সেদিনই যেদিন টিউশনের নাম করে ক্লাব রেস্তোরাঁতে ঘুরে রাত করে বাড়ি ফিরলেও মা এর একগোছা প্রশ্নের সামনে পড়তে হয়নি। আবেশ মারা গেছে সেদিনই যেদিন রাত জেগে বান্ধবীদের সাথে চ্যাট করার পরও মা তাকে জিজ্ঞাসা করেনি এত রাত জেগে কি করছিস? শুয়ে পড়, সকালে স্কুল আছে ।

আবেশরা বেঁচে ছিল কবে? ওরা তো কবেই মরে গেছে ।

আবেশরা মারা যাচ্ছে, দিন দিন প্রতিদিন। আধুনিক সমাজ, পারিবারিক শিক্ষার অভাব, মা বাবার আপাত ব্যস্ততা, স্কুলে নীতিশিক্ষার অভাব, সামাজিক নজরদারির অভাব, তুচ্ছ বিষয়ে রাজনীতির অনুপ্রবেশ মেরে ফেলছে শত শত আবেশকে। একটু ভাবব না আমরা? খুন-জখম-ধর্ষণ-রাহাজানি হবে, নৈতিকতার অপমৃত্যু নিত্য দৃশ্যমান হবে আর ছোট ছেলেমেয়েরা সেই পরিবেশে বাস করেও ‘যুধিষ্ঠির’ হবে, এমন আশা খুব বাস্তবসম্মত নয়। শিক্ষাযাপনের চেয়ে জীবনযাপন নিশ্চয়ই বেশি কার্যকরী। জীবনযাপনে মূল্যবোধ গুরুত্ব পেলে সমাজে সুস্থতা পরিলক্ষিত হওয়াই স্বাভাবিক।

কৈশোরের অপরিণত মন প্রবৃত্তির তাগিদে সারাক্ষণ সুখ খুঁজছে। আজকের সমাজে ওরা সারা দিন উত্তেজনার খোরাক খুঁজতে ব্যস্ত, হয় মোবাইল নিয়ে, নয় ভিডিও গেম, না হলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এ। প্রায় প্রতি মুহূর্তে হোয়্যাট্সঅ্যাপে চোখ রেখে, ফেসবুক পেজ খুলে সারা পৃথিবীর খবর রাখছে ওরা। এটাই নাকি জীবন চলার ধরন। সবাই তা-ই করে, সকলের সঙ্গে সকলে সারা দিন যুক্ত হচ্ছে, যুক্ত থাকছে। কে কী করল, কোথায় গেল, কোথায় যাবে— তার হদিস ছড়াতেই হবে। এ ছাড়া আছে উত্তেজনা-প্রণোদিত আলোচনা, খাওয়াদাওয়ার অভ্যেস, পারস্পরিক যোগাযোগে অনেকটা সময় ব্যবহার করা ইত্যাদি। প্রবৃত্তি বলছে, এগুলো কর। ওরা করছে। এক বারও ভেবে দেখছে না শান্ত হয়ে থাকার অনভ্যাস তার কত বড় ক্ষতি করছে। উদ্দাম শব্দে গান শোনা, উদ্দাম ভাবে নাচ, সবই উত্তেজিত রাখার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা। সেখানে একটু-আধটু নেশার খোরাক শরীর-মনকে কিছুটা অবশ করে, ঠান্ডা রাখে। ফলত মাদকদ্রব্যের ব্যবহার।

কোথাও কোথাও মাদক ব্যবহারের কারণ শুনি কল্পনার জগতে নিয়ে গিয়ে ওদের তৃপ্তি দেয়, জগৎ-সংসারের চাপ থেকে মুক্তি দেয়। মাদকই নাকি সৃজনশীলতার উৎস। তবে সাধারণ ভাবে যখন এ ছবি আমাদের সামনে ফুটে উঠছে, তখন বুঝতে হবে এ সব উপাদানের ব্যবহারও ওরা স্বাভাবিক ধর্ম অর্থাৎ norm মনে করে। আর আজকাল আড়ালের প্রয়োজনও হয় না। ক্লাস এইট-নাইনের ছেলেমেয়েরাও একত্রিত হয়ে মজা করার সময়ে মদ্যপান করতে চায়।

আর এখানেই একটা বড় কারণ মা-বাবার দায়িত্বের গাফিলতি। আজকাল যে কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে মদ্যপানের ব্যবস্থা প্রায় স্টেটাস সিম্বল। বড়দের এত খোলাখুলি মদ্যপান করতে দেখেও ছোটরা একে স্বাভাবিক ব্যবহার মনে করে। মা-বাবা নিশ্চয়ই নিজেদের উৎসাহে ওদের এই উপাদান গ্রহণ করতে শেখান না। তবে এ বয়সের কিশোর-কিশোরীকে তাঁরা শাসনের আওতায় কঠিন ভাবে ধরেও রাখেন না। তাই ওরা নিজেরা ঠিক করে ডিজে পার্টিতে যায়, বন্ধুদের সঙ্গে নাইট-আউট করে। অভিজাত পরিবারে বলতে শুনেছি, ছেলেমেয়েরা অল্প বেশবাশে সারা রাত হুল্লোড় করে একই ঘরে পাশাপাশি শুয়ে পড়েছে। ফলে মনে হয় আত্মসংযম, নিজস্ব নিয়মের সীমারেখা, সঙ্কোচ, অস্বস্তির মানসিক অবস্থানগুলো নিয়ে এদের ভাবার অবকাশই নেই। সহজাত প্রবৃত্তি তো সবাইকে সারাক্ষণ হাতছানি দেবেই আপাত সুখের গণ্ডিতে পা রাখার জন্য। কিন্তু প্রকৃত সুখ বোঝার জন্য যে শাসন প্রয়োজন। বড়রা নিজেদের আচরিত ধর্মে সংযমের প্রয়োজনীয়তা দেখাতে না পারলে, ওরা যে মানছে না, মানবে না। ঘটনা-দুর্ঘটনায় বারেবারে পর্যবসিত হবে। সংশয়হীন, শঙ্কাহীন কৈশোর শুধু সংযমের অভ্যাসেই পাওয়া সম্ভব। কৈশোরের সবুজ আভা, না ছোট-না বড়র মাঝের যে হাল্কা সুখ— তা-ই জীবন। সেখানে মাদক নিয়ে ওরা ভাল-টা ভুলে থাকবে কেন? একটু ভাবব না আমরা?

ছাত্র-ছাত্রীদের উচ্ছৃঙ্খলতা ও আচরণগত সমস্যাটি শুধু অভিভাবকদের উপর ছেড়ে দিলে মনে হয় কোথাও ভুল হবে৷ ছেলেমেয়েদের হাতে অতিরিক্ত টাকা চলে আসাটাও মনে হয় সমস্যার একমাত্র কারণ নয়৷ ছোটবেলায় তো দেখেছি, যে বন্ধুর হাতে টাকা রয়েছে সে নিজের পছন্দমতো গল্পের বই কিনতে পারছে৷ আজ আমাদের সন্তানদের হাতে গল্পের বই তুলে দিলেও সে সেটা পাশে সরিয়ে রাখে৷ এখনও মনে আছে, ছাত্রাবস্থায় বুধ ও বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাড়িতে টিভি বন্ধ থাকত৷ কারণ ওই দু’দিন দূরদর্শনে ‘চিত্রমালা’ ও ‘চিত্রহার’ হত৷ মাধ্যমিক পরীক্ষার পরেও যা দেখার অনুমতি ছিল না৷ উঁচু ক্লাসে উঠেও ‘বিবিধ ভারতী’ শুনতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলে বকুনি খেতে হত৷ এখন সন্তানের স্কুলের বাৎসরিক অনুষ্ঠানে দেখি চটুল ফিল্মি গানের সঙ্গে নাচ হচ্ছে৷ শিক্ষক-শিক্ষিকারাও তা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছেন৷ একটু ভাবব না আমরা?

ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলির শিক্ষার এই ভয়াবহ মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক সংকট৷ ‘স্ট্রিট স্মার্ট’ ছাত্র তৈরির নামে চলছে বিজাতীয় সংস্কৃতির চর্চা৷ সর্বভারতীয় বোর্ডের রেজাল্টের ভিত্তিতে অনেক স্কুল নামী বলেও বিবেচিত হচ্ছে৷ যদিও আধুনিক সিলেবাসের নাম করে লেখাপড়া এসে ঠেকেছে অসংখ্য টিক চিহ্ন মারায় ও কিছু প্রযুক্তি শিক্ষায়৷ এইসব স্কুলের অনুষ্ঠানে গেলে ভয় হয়৷ বুক কাঁপে৷ কোথায় আমাদের রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, মাইকেল, সুকান্ত, জীবনানন্দ? কোথায় ঘনাদা, ফেলুদা, প্রফেসর শঙ্কুরা? কোন পোকেমনের হাতছানিতে তলিয়ে যাচ্ছে আমাদের সন্তানদের শৈশব! আবেশের পরিণতি দেখে আজ আমরা সত্যিই আতঙ্কিত৷