ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

ফের জ্বলছে কাশ্মীর। রক্তের গন্ধ। মৃত্যুর মিছিল ভূস্বর্গে। ‘হিজবুল মুজাহিদিন’ কমান্ডার, কাশ্মীরের ‘পোস্টার বয়’ বুরহান ওয়ানির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ‘ভারত বিরোধি’ বিক্ষোভে ফের সামিল কাশ্মীরিদের একাংশ। দফায় দফায় স্লোগান উঠছে— হম কেয়া চাহতে? আজাদি…

দেশের সংবাদমাধ্যম ডুবে রয়েছে সেই চিরাচরিত বিষয়ের বিতর্ক নিয়ে। ভারতীয় বনাম কাশ্মীরী। আর যাবতীয় বিতর্কের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে সেই তিন অক্ষরের শব্দ। যে শব্দ নিয়েই যাবতীয় আতঙ্ক। আজাদি! এই ‘আজাদি’-র আতঙ্ক কেড়ে নিয়েছে হাজার খানেক কাশ্মীরীর জীবন। যে আতঙ্ক কয়েক লক্ষ বন্দুকধারী মোতায়েন করে কাশ্মীরকে জেলখানা বানিয়ে রেখেছে। যে আতঙ্ক বারবার পাহাড়ের গলি-বস্তি ছাপিয়ে রাজপথে এসে হাজির হয়েছে। ভারতীয় মূলস্রোতের রাজনীতিবিদদের হৃৎকম্পন বাড়িয়ে দিয়েছে। তবুও তো কাশ্মীর ভারতেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

১৯৪৭-৪৮-এ প্রথম পাকিস্তানের মদতে কাবাইলি আদিবাসীরা কাশ্মীরীদের উপরে আক্রমণ চালিয়েছিল। কাশ্মীরীদের উপরে ধর্ষণ, অত্যাচার সবই চালিয়েছিল তারা। এই নির্যাতনের ফলে পাকিস্তানের উপরে কাশ্মীরীরা এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিল যে, ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের মদতে আবারও যখন কাশ্মীরীদের উপরে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ তৈরি করার ছক করা হয়, সেই পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ভেস্তে যায়। ব্যর্থ হয় ‘অপারেশন জিব্রাল্টার’। একই কারণে ১৯৭১-এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও পাকিস্তান ব্যর্থ হয়। সেই অঙ্গহানি আজও তাড়া করে বেড়াচ্ছে ইসলামাবাদকে। আর কাশ্মীরকে অগ্নিগর্ভ করে তারই প্রতিশোধ নিতে চাইছে। আজও। কাশ্মীর যেন এখন দুই রাষ্ট্রের পেশিশক্তি দেখানোর ‘গিনিপিগ’!

স্বাধীনতার প্রায় ৭০ বছর পরেও কাশ্মীরে নেভেনি আগুন।

kasmir

তবুও কাশ্মীর মানে প্রতারণা

ইতিহাস বলছে, ১৯৩১ সাল থেকে জম্মু-কাশ্মীরের মানুষ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পথেই ছিল। নেতৃত্ব কখনই জনসাধারণকে হিংসাত্মক আন্দোলনের দিকে ঠেলে দেয়নি। সমস্যার সূত্রপাত ’৪৭ পরবর্তী অধ্যায়ে। প্রশ্নটা আজাদির ছিল না। প্রশ্নটা ছিল কাশ্মীরের অবস্থানের। কাশ্মীর কোন দিকে থাকবে? স্বাধীনতার পর ভারত এবং পাকিস্তান— দু’পক্ষই কাশ্মীরে গণভোট চেয়েছে। কিন্তু মন থেকে চায়নি। রাষ্ট্রপুঞ্জ নির্দেশিত গণভোটের পরিবেশটাই গড়ে তোলা যায়নি। যার সম্পূর্ণ দায় দু’টি রাষ্ট্রের। দু’দেশই প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে, অন্য দেশের আগ্রাসী নীতির কারণেই গণভোট সম্ভব হচ্ছে না। কাশ্মীর থেকে সেনা সরাতে রাজি হয়নি ভারত। রাজি হয়নি পাকিস্তানও। স্থিতিশীলতার মোড়কে আন্তর্জাতিক বিশ্ব মেনে নিয়েছে দ্বিখণ্ডিত কাশ্মীর। সেক্ষেত্রে কাশ্মীরবাসীর ইচ্ছাকে মর্যাদা দেওয়া হয়নি। গণভোট অবহেলিতই থেকে গিয়েছে। তবুও গত শতাব্দীর ষাটের দশকের মাঝামাঝি ‘জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট’ (জেকেএলএফ) যখন সশস্ত্র আন্দোলনের ডাক নিয়ে হাজির হল, এই কাশ্মীরের মানুষই তাতে সাড়া দেয়নি। কাশ্মীর রক্ত ঝরা দিনগুলি ফিরে পেতে চায় না। তারা চায় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান। তাই আজও কাশ্মীর ভোটেও আছে, আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতেও। আর অন্ধ গণতন্ত্রকে পাহারা দেয় জলপাই রঙা উর্দি।

কাশ্মীরীরা অনেকে মনে করেন, তাদের বর্তমান অবস্থার জন্য শেখ আবদুল্লার পরিবার দায়ী। প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু জম্মু ও কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লা ও তাঁর সমর্থকদের গ্রেপ্তার করে জেলে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। শুধুমাত্র গায়ের জোরে। তিনি কোন নৈতিকতার ধার ধারেননি। তার জেরে ১৯৫৩ সালের ৯ আগস্ট থেকে কাশ্মীর বারবার প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠেছে। শেখ আবদুল্লাকে গ্রেপ্তার করার প্রতিবাদে এবং পরবর্তী গণভোটের আন্দোলনে ১,২০০ কাশ্মীরী প্রাণ দিয়েছিল। এত ত্যাগ স্বীকার করার পর তারা কী পেয়েছিল? শেখ আবদুল্লার প্রতারণা। ১৯৭৫ সালে দিল্লির কাছে তাঁর আত্মসমর্পণ কাশ্মীরীদের আত্মসম্মানে প্রচণ্ড আঘাত করে। শুরু হয় নতুন পথের সন্ধান। কখনও গোপনে, কখনও প্রকাশ্যে গড়ে উঠেছিল ছোট ছোট রাজনৈতিক দল। কেউ সশস্ত্র, কেউ শুধুমাত্র রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে আবদ্ধ ছিল। একইসঙ্গে শেখ আবদুল্লার বংশগত শাসনের অবসানের জন্য আন্দোলন চলতে থাকে। এরই ফলে ১৯৮৬ সালের সেপ্টেম্বরে ‘মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্ট’ নামে এক রাজনৈতিক দলের উত্থান। ১৯৮৭-তে নির্বাচনে অংশ নেয় কাশ্মীর উপত্যকা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অভিযোগ, শুধু রিগিং বা বুথ দখল নয়, গণনাকেন্দ্রে জয়ী প্রার্থীকে পরাজিত ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই ঘৃণিত রিগিং-এর মাধ্যমে মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্ট ১৯৮৭ সালের ২৩ মার্চের নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিল। অনেকেই বলেন, এই দিনটি কাশ্মীরের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত দিন। নির্বাচনের নামে প্রহসন ও তার সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘হাতের পুতুল’ রাজ্য সরকারের সাধারণ কাশ্মীরবাসীর মৌলিক চাহিদার অবমাননা কাশ্মীরকে দ্রুত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়।

ভারত সরকার শত্রু, এই মনোভাবটা সবথেকে বেশি মাথা চাড়া দিয়েছিল ১৯৮৭’র নির্বাচনের পর থেকেই। যে ভাবে ভোট লুঠ হয়েছিল, রক্ত ঝরেছিল তাতে কাশ্মীর উপত্যকার মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। উপত্যকার যুবসমাজ ভারত বিরোধী জেহাদ ঘোষণা করে। সুযোগ পেয়ে যায় প্রতিবেশী পাকিস্তান। তারা আগুনে ঘি ঢালে। ইয়াসিন মালিকের মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের নেতৃত্বে ভারত বিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। দ্রুত উত্থান ঘটে পাকিস্থানের মদতপুষ্ট জেকেএলএফ, হিজবুল মুজাহিদিন, লস্কর-ই-তইবা, হরকত-উল-আনসারের মত মৌলবাদী এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলির। উত্তাল হয়ে ওঠে ভূস্বর্গ। ‘আজাদি-র’ স্লোগানের গগনভেদী চিৎকারে কাশ্মীর হয় বিপন্ন। কাশ্মীর-গবেষকেরা বলেন, আশি-নব্বইয়ের দশকে সেখানকার আন্দোলনে ‘আজাদি’র আওয়াজ যতটা স্বতঃস্ফূর্ত ছিল, পরবর্তী সময়ে তা ক্রমশ পাকিস্তানপন্থী অবস্থানে রূপান্তরিত হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে উপত্যকায় সেনাবাহিনী নামাতে বাধ্য হয় তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার। আরোপিত হয় ভয়ংকর আফস্পা। মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়, স্তব্ধ হয়ে যায় উন্নয়ন। তরুণ’রা দলে দলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দলে নাম লেখায়।

১৯৪৭-৪৮’এ যে কাশ্মীরীরা ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন পাকিস্তানী অধিবাসীদের সীমান্তের ও’পারে পাঠানোর জন্য, ১৯৮৭-র নির্বাচনের পর সেই কাশ্মীরীদের একটি বড় অংশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছিলেন পাকিস্তানের মদতে। পাকিস্তানের জঙ্গিশিবিরে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় কাশ্মীরি তরুণদের। প্রায় প্রতিটি শিবিরের সঙ্গেই কোনও না কোনওভাবে মৌলবাদী শক্তির যোগাযোগ আছে। ফলে, খুব স্বাভাবিকভাবেই কাশ্মীরের স্বতঃস্ফূর্ত, ধর্মনিরপেক্ষ ‘আজাদি’র লড়াইকে ধর্মীয় মৌলবাদ গ্রাস করে ফেলে। আক্রান্ত হয় উপত্যকার পণ্ডিত সম্প্রদায়। তবুও একটা সময় কাশ্মীরের মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। তারা বুঝতে পারলেন বেশ অনেকগুলো বছর তারা পিছিয়ে গিয়েছেন।

 

তবুও কাশ্মীর মানে রাজনীতি

১৯৯৬ সালের মে মাস। লোকসভা নির্বাচন। কাশ্মীরের প্রধান আঞ্চলিক দলগুলি ভোট বয়কটের ডাক দিয়েছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, স্বশাসন না দিয়ে রাজ্যে নির্বাচন করা যাবে না। নয়াদিল্লির পক্ষে এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার কাশ্মীরেও নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্তে অনড়। সাত বছর পরে রাজ্যে ভোট হয়। সেই বছরই সেপ্টেম্বর মাসে রাজ্যে যে বিধানসভা নির্বাচন হবে, লোকসভা ভোট ছিল কার্যত তার একটা প্রস্তুতি। ভোটের দিন সকাল থেকেই চার দিকে টানটান উত্তেজনা। মানুষের ভোট দিতে আসার বিশেষ কোনও লক্ষণ নেই। সর্বত্র সেনায় সেনায় ছয়লাপ। ভোটকেন্দ্রগুলি যেন একটা গ্যারিসনের চেহারা নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত জওয়ানরা লোকজনকে কার্যত ধরে বেঁধে বুথে নিয়ে এলেন, যাতে তাঁরা ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করতে পারেন। অনেকেই বাধা দিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটদানের হার একটা শতাংশে পৌঁছল। প্রায় গোটা রাজ্যেই সে বার মোটামুটি এই ছবি দেখা গিয়েছিল। বেশির ভাগ মানুষ দূরে সরে থেকেছিলেন। তবু, ভোট একটা হয়েছিল বটে।

তিন মাস পরে ভারত সরকার কাশ্মীরে বিধানসভা নির্বাচন ডাকল। তিন মাসে আন্দোলনের পরিস্থিতি বিশেষ বদলায়নি। কেবল সরকার-পন্থী ইখওয়ানের শক্তি বেড়েছিল। নির্বাচনের ব্যাপারে রাজ্য জুড়ে প্রবল আপত্তি ছিল। কিন্তু ন্যাশনাল কনফারেন্স রাজনৈতিক ময়দান থেকে আর সরে থাকতে ভয় পেল। স্বশাসনের পূর্বশর্ত বিসর্জন দিয়ে তারা ভোটে যোগ দিল। এ বারের ভোটেও মোটের উপর মে মাসের অভিজ্ঞতারই পুনরাবৃত্তি হল। তবে ভোটদানের হার কিছুটা বাড়ল বটে, কিন্তু জবরদস্তি এ বারও কম হল না। অনেক বুথেই মানুষ খোলাখুলি বললেন, তাঁরা তিন দিক থেকে বন্দুকের শিকার। জঙ্গি গোষ্ঠী, জঙ্গি-দমনে নিযুক্ত সংগঠন এবং সেনাবাহিনী। তাঁরা এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চান, তাই একটা অসামরিক সরকার দরকার। এই প্রেক্ষিতে ন্যাশনাল কনফারেন্স ক্ষমতায় এল।

ক্রমশ কাশ্মীরে নির্বাচন বৈধতা অর্জন করতে শুরু করল। গত বিধানসভা ভোটে মানুষ যে ভাবে ভোট দিতে এগিয়ে এসেছেন, সেটা ওই প্রক্রিয়ারই পরিণাম। দলীয় রাজনীতিতে মানুষের ভূমিকা ক্রমশ প্রসারিত হয়েছে। এর ফলে ২০০২ সালের পর থেকে সমস্ত নির্বাচনেই বেশ ভাল ভোট পড়েছে। ২০০৮-এর কাশ্মীর বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল সাত দফায়।

সেই বছরই জম্মু-কাশ্মীরের তৎকালীন রাজ্যপাল এস কে সিং ‘শ্রী অমরনাথ শ্রাইন বোর্ড’কে বনভূমির একটা বড় অংশ হস্তান্তরের কথা ঘোষণা করার পর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল কাশ্মীরীরা। অশান্ত হয়ে উঠেছিল জম্মু-কাশ্মীর। অনেকে প্রাণ হারিয়েছিলেন এবং ধর্মীয় ভাবাবেগের ভিত্তিতে জম্মু ও কাশ্মীরের মধ্যেকার বিভেদ আরও বেড়ে যায়।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং কাশ্মীরীদের কাছে আবেদন রেখেছিলেন-‘গণতন্ত্রের জন্য ভোট দিন’। জঙ্গিদের সবরকম ফতোয়া উপেক্ষা করেই কাশ্মীরীরা তবুও ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশনের হিসেব অনুযায়ী ওই নির্বাচনে ভোট পড়েছিল প্রায় ৬২ শতাংশ। যেখানে ২০০২ সালে চার দফা নির্বাচনে পড়েছিল প্রায় ৪৭ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ ২০০৮ সালের নির্বাচনে নজির তৈরি হয়।

২০০৩ থেকে ২০০৮— এই সময়পর্বে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শান্তিপ্রক্রিয়া যখন বেশ এগচ্ছিল, ভারত সরকার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গেও আলোচনা চালাচ্ছিল, তখন কাশ্মীরের মানুষ সেই সব উদ্যোগে প্রবল সমর্থন জানিয়েছিলেন। তাঁদের আশা হয়েছিল যে একটা সমাধানের পথ বেরোবে। কিন্তু ২০০৮-এর ২৬ নভেম্বর মুম্বই সন্ত্রাস সেই প্রক্রিয়াকে বিপর্যস্ত করে দেয়।

বারবার অগ্নিগর্ভ হলেও একটা জিনিস লক্ষ্যনীয়। কাশ্মীরীদের মধ্যে ক্ষোভ আছে। কিন্তু কাশ্মীরের যুবসমাজ কিন্তু আর অস্ত্র তুলে নিতে চায়নি। শিক্ষিত তরুণ, যুবকরা কর্মসংস্থান চাইছিলেন। কোনও বিদেশি শক্তির প্ররোচনায় না গিয়ে তারা ভারত সরকারের উপরই আস্থা রেখেছিল। তাই তো ২০১৪-তে তারা আবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল, ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিলেন।

 

তবুও কাশ্মীর মানে সন্দেহ

২০১৩-র ফেব্রুয়ারি মাসে তিহার জেলে ফাঁসি হয়েছিল আফজাল গুরু’র। তখন তো ক্ষোভ দানাই বাধতে পারেনি। কিন্তু বুরহান ওয়ানির মৃত্যু? কেন ফেটে পড়ছে কাশ্মীর? হাজার হাজার মানুষ কেন রাজপথে নেমে প্রবল বিক্ষোভে উত্তাল হয়েছেন? বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গিরা নিহত হলে তাঁদের শবযাত্রায় কেন শামিল হন অগণিত উপত্যকাবাসী?

বিক্ষোভকারীদের মূল টার্গেট মিলিটারি, কাশ্মীর পুলিশ-সহ সামগ্রিক ভাবে গোটা রাষ্ট্রশক্তিই। মিলিটারিদের ওপর কাশ্মীরীদের রাগ-ঘৃণার কারণ অবশ্যই আছে। ১৯৯৮ থেকে এখনও পর্যন্ত ৮ হাজারের বেশি মানুষ স্রেফ উধাও হয়ে গিয়েছেন। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভিযো‌গের আঙুল উঠেছে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর দিকে। বারে বারে অভিযোগ উঠেছে, ভুয়ো সংঘর্ষের নাম করে এঁদের অনেককেই মেরে ফেলেছে নিরাপত্তা বাহিনী। একটি ক্ষেত্রেও তদন্ত হয়নি, কেউ দোষী সাব্যস্তও হয়নি। সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইনকে (আফস্পা) ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে সেনাবাহিনী। উপত্যকার মানুষ প্রশ্ন তুলছেন, তাদের তার বিচার কেন হবে না?

১৯৪৭-র স্বাধীনতা পর থেকে সময় এগিয়েছে নিজের নিয়মে। সমাজ বদলেছে। বদলেছে রাজ্যপাটও। সার্ক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রসংঘে, দ্বি-পাক্ষিক, ত্রি-পাক্ষিক বৈঠকে জলঘোলাও হয়েছে বিস্তর। সেই ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমেছে, কখন ‘আমরা’ কখনও ‘ওঁরা’। সমাধানের আশায় বুক বেঁধেছে সাধারণ মানুষও। কিন্তু কাশ্মীর রয়ে গেছে কাশ্মীরেই। ব্যাহত হয়েছে সেখানকার পর্যটন শিল্প। বেড়েছে বেকার, হয়নি শিল্প। বারবার গোষ্ঠীদাঙ্গা কাশ্মীরকে উন্নতির মুখ দেখাতে পারেনি। ভারত বা পাকিস্থানের রাষ্ট্রক্ষমতায় যেই এসেছে, দেশপ্রেম আর জাতীয়তাবাদ, ধর্মের জিগির উসকে দিয়ে কাশ্মীর সমস্যা সেই তিমিরেই রেখে দিয়েছেন। বাস্তবের কঠিন মাটিতে দুই দেশের রাজনৈতিক জাঁতাকলে আর কূটনৈতিক তরজার চোরাস্রোতে সাধের ভূস্বর্গ কিন্তু রয়ে গিয়েছে ‘অবরুদ্ধ কাশ্মীর’ হয়েই। কাশ্মীর মানেই অনন্ত কার্ফু। ফোন অচল। কাগজ বন্ধ। চোখ খুললেই বেয়নেট। রাস্তায় বেরোলেই পদে পদে তল্লাশি আর উর্দিধারীদের শরীর ও চোখের চাউনি থেকে ঝরে পড়া সন্দেহ। সর্বত্র আজাদির আতঙ্ক! আজও।