ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

পুজো মানেই মণ্ডপে মণ্ডপে

নয়া হুজুগ, #সেলফি উইথ দুর্গা!

3

কেমন হত যদি গোটা সংসার নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াতেন একজন সাধারণ মানুষ হয়ে, যার নাম অভয়দায়িনী মা দুর্গা? সেলফির একই ফ্রেমে আপনি আর দুই নয়নে স্নেহের হাসি, ললাটনেত্র আগুনবরণ?

শুনেই হেসে ফেলেছিলেন স্বাগতা। টিসিএসের কর্মী স্বাগতার পালটা প্রশ্ন, ‘সত্যিই কি কোনও অবিকল প্রতিবিম্ব ধরা পড়ে সেলফিতে? সেলফি কি পারে প্রত্যেক মানুষের সঠিক ছবিটা তুলে ধরতে?’ তবুও তো দুর্গাপুজোয় ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে সেলফি তুলতে ব্যস্ত এমন একঝাঁক জেন-ওয়াইকে চোখে পড়বেই সব মণ্ডপে। তবে শুধু জেন-ওয়াই কেন? সেলফিতে সওয়ার এখন সব বয়সই। সেই সওয়ারিদের গতি দিচ্ছে হাতে হাতে থ্রিজি-ফোর জি স্মার্টফোন। সেলফি তোলার সঙ্গে সঙ্গেই আপলোড হয়ে যায় নিজস্ব ফেসবুক, ট্যুইটার, ইনস্টাগ্রামে। আর সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা মানেই কয়েকশো কমেন্ট পাওয়া। মনের মানুষটির নাগাল পেতে এক নিদারুণ তাড়না।

কিন্তু কেন? সত্যিই কি বদলে গিয়েছে পুজোর সুর? পিকনিক গার্ডেনের বাসিন্দা স্বাগতার কথায়, আগমনি উৎসব থেকে বিদায়ের ক‌্যারিশমা— আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু তো সেই দেবী। কুমোরটুলিতে কাঠামোয় মাটি লেপা থেকে সেই যে এক্সাইটমেন্ট শুরু হয়, মা দুগ্গার বরণের সময় পোজ মারা পর্যন্ত থামার অন্ত নেই। সঙ্গে হ্যাশট্যাগ। #সপ্তমীতে আড্ডা, #অষ্টমীতে ভুরিভোজ, #নবমীতে হুল্লোড়, #বিসর্জন@বিষাদ। আরও কত কী! সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি পোস্ট করে বন্ধুদের মধ্যে রাতারাতি হিরো। এই টুকুই।

ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ জুড়ে এখন শুধুই মাঠঘাটে কাশফুলের ছবি, শরৎ আকাশের থোকা থোকা পুঞ্জীভূত মেঘের ছবি, মৃণ্ময় মূর্তির ছবি। আজকাল নাকি লোকে দেবী মাকে দেখে না, মায়ের সঙ্গে ছবি তোলে! বেশ মাচো হলাম, সবাই প্রশংসা করল। এই আর কী। সারা বছর ডাঁটা চচ্চড়ি চেবানো একঘেয়ে জীবনে এসময় যেন ভিখারির ডাকাত হওয়ার! অতি আশ্চর্য, অতীব আশ্চর্য জাদুযন্ত্রকে আকড়ে ধরে যা কিছু ভালোবাসার— শোষ-কাগজের মতো চারটে দিন শুধু শুষে নেওয়া। বলছিলেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী রিয়াশ্রী চট্টোপাধ্যায়। আর বাকি চারদিন? পুজোমণ্ডপে অবিরত মোবাইল ঝলক। সঙ্গে লাইক ও গুচ্ছের কমেন্টস। এই কয়েকটা দিনেও সকালে ঘুম থেকে উঠেই হয় ফেসবুক, নয়তো হোয়াটসঅ্যাপে চ্যাট। ‘হাই, গুড মর্নিং, হ্যাভ এ নাইস ডে’।

কিন্তু দমছুট ভিড়ে মণ্ডপে মণ্ডপে নয়া হুজুগ সেলফির অমোঘ টানের আড়ালে মা দুর্গার অমোঘ আকর্ষণও কম কিসের। তাই তো আজও পুজোর ক’টা দিন দেবীর চোখে চোখ মেলে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কিসের টানে? দেখে মনে হয় ছোঁয়া যায়, ছুঁতে চাইলে তো অধরা! রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ওডিশি নৃত্যের ছাত্রী সোহিনী বিশ্বাসের কথায়, মোবাইলে ইন্টারনেট না থাকলে এখন যেন অসহায় ই-জনতা। এই অস্বস্তি যেন মানিব্যাগ না নিয়ে বেরোনোর থেকেও বেশি! ভিড় টানতে মণ্ডপে মণ্ডপে ওয়াই-ফাই। আড্ডা দেওয়ার মাঝে আপনি সেলফি তুলুন। সেই সেলফি আপনার ফেসবুকে-ট্যুইটার বা ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করতে পারেন ইচ্ছে করলেই। মণ্ডপে আপনি নিখরচায় সেই সেলফি আপলোড করতে পারেন। পুরো মণ্ডপ ওয়াইফাই জোনের মধ্যে। বাগবাজারের ডাকের সাজের মায়ের মুখটা কতোটা জুম করা যায়? সনাতন দিন্দার প্রতিমার শার্পনেসের ডিটেলিং কত দূর ছুঁতে পারবে? তা নিয়ে কত তর্ক। তাতেই তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে মণ্ডপের ভিতরের ভিড়। সেই ভিড়ের দাপটে মণ্ডপের ক্ষতি হবে কি না, দুর্ভাবনায় মাথার চুল ছিঁড়ছেন পুজো-কর্তারা। সেলিমপুর পল্লির মতো বহু ক্লাব তাই গত কয়েক বছর ধরে মণ্ডপের ভিতরে ‘নো সেলফি জোন’ নোটিসও টাঙিয়ে দিচ্ছে। গ্রাম থেকে শহর, শিলিগুড়ি থেকে এই কলকাতা—ছবিটা একই! প্যান্ডেলে মা দুর্গার সঙ্গে সেলফি তুলে তা সঙ্গে সঙ্গে আপলোড করে বন্ধুদের ট্যাগ করা। সঙ্গে একগাদা হ্যাশট্যাগ। #দুর্গাপুজোয় ঢাকের বাদ্যি, #সেলফি উইথ দুর্গা! আরও কত কী!

এই আপলোড-আঁচে হাত সেঁকছে নানা ব্র্যান্ডও। গত বছর পুজোর সময় ‘সেরা সেলফি’ তোলা নিয়ে একাধিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল একাধিক সংস্থা।

হাসতে হাসতে স্বাগতা দাস বলে গিয়েছিলেন, পুজোর চারটি দিন সেলফির চরিত্রগুলি যেন আটকে পড়ে স্বপ্ন, বাস্তব, পরাবাস্তবের গোলকধাধায়। বারবার মনে পড়ে, ‘সেলফি’ ছবিতে অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সেই স্বরচিত কবিতা: ‘যদি কোনও প্রতিবিম্ব থাকে/ যোগভ্রষ্ট আত্মপ্রতিকৃতি ছাড়া…’

শুধু তাই-ই নয়, ঢাকে কাঠি পড়ার আগে থিমযুদ্ধের মেজাজটা বাঁধা পড়ছে গানের সুরেও। থিমের অঙ্গ হিসেবে কলকাতার পুজোয় ক্রমশ জায়গা করে নিচ্ছে গান বা আবহ-সঙ্গীতও। সানাই, মন্দ্রসপ্তকের বাঁশি, নেপালি মাদলের সমাহার। বদলে যাচ্ছে মোবাইলের কলার টিউন। পুজো চলে গেলেও রয়ে যাবে পুজোর সুর। মানুষের হাতে হাতে, কানে কানে। আরও কিছুদিন। অদ্ভুত মাদকতা, এক অন্য মদিরতা। এরই মধ্যে আপনার ফোনের ব্যাটারি রক্তচক্ষু দেখাচ্ছে? চার্জ নেমেছে ৫ পার্সেন্টে! নিজের পাওয়ার ব্যাঙ্কটা যেন সঙ্গে থাকে। মনে করিয়ে দিয়েছেন স্বাগতা।