ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

আমেরিকার নয়া মিত্র নরেন্দ্র মোদির ‘ভারত’

obamainindia

১৯৪৯ সাল। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু রাষ্ট্রীয় সফরে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন আমেরিকায়। হোয়াইট হাউসে বৈঠকে প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান বললেন, সদ্য স্বাধীন ভারতের জন্য আমেরিকা কী করতে পারে বলুন। নেহরু বললেন, ‘আমাদের খাদ্যাভাব রয়েছে। বিশাল দেশ, বিপুল জনগোষ্ঠী। কৃষিকে সংগঠিত করে তুলতে চাই। শিল্পায়ন এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। শিল্পায়নের বিস্তারে প্রয়েজন বড় আকারে বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যবস্থা করা। আমি চাই আমেরিকা ভারতকে কৃষির বিকাশে সাহায্য করুক, এখানকার এমআইটির মডেলে ভারতে আইআইটি স্থাপন করতে সাহায্য করুক।’ স্বাধীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান আমেরিকায় রাষ্ট্রীয় সফরে যান ঠিক পরের বছর। ১৯৫০ সালে। দু’জনের সফরের সময় পার্থক্য সাত মাস। নেহরু গিয়েছিলেন ১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে, লিয়াকত আলি যান ১৯৫০-র মে মাসে। হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে সেই একই কথা। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আগ্রহ নিয়ে বললেন, নতুন স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য আমেরিকা কী করতে পারে? লিয়াকত আলি একটি অস্ত্রের তালিকা বের করে বললেন, ‘আমরা এসব অস্ত্র চাই।’ সেদিন আমেরিকা মিত্র হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন পাকিস্তানকেই। আর তারপর থেকে ফি বছর কাড়ি কাড়ি ডলার সামরিক সাহায্য পাঠিয়ে পাকিস্তানকে শক্তিশালী করেছে হোয়াইট হাউস।

শত চাপের কাছেও নেহরু সেদিন মাথা নত করেন নি। ১৩ই ‌অক্টোবর মার্কিন কংগ্রেসে সগর্বে ঘোষণা করেন, ‘মানুষের স্বাধীনতা যদি বিপন্ন হয়, সেরকম যেকোনও চ্যালেঞ্জ, তা সে যেখান থেকেই আসুক না কেন, ভারত তা মুখ বুজে মেনে নেবে না। যেখানে স্বাধীনতা বিপন্ন, যেখানে হুমকির মুখে ন্যায়বিচার, যেখানে আগ্রাসন, সেখানে আমরা নিরপেক্ষ থাকতে পারি না, থাকবও না’।

সেদিনের ‘টাইম’ পত্রিকায় ছিল তারই প্রতিফলন। ‘বর্তমান বিশ্ব সঙ্কটে ভারত কোথায় দাঁড়িয়ে আছে জানতে যাঁরা উৎসুক ছিলেন, এরপর (মার্কিন কংগ্রেসে নেহরুর ভাষনের পর)তাঁরা আর কোনও প্রশ্ন করেন নি। …….যাইহোক সপ্তাহজুড়ে অন্যান্য বক্তৃতায় নেহরু স্পষ্ট করে দেন, আমেরিকার সঙ্গে জোট বাধার তিনি বিরোধী। কারণ আগ্রাসন মোকাবিলার দৃষ্টিতে এটি তাঁর সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ’।

আর্থিক সাহায্যের প্রত্যাশায় সেদিন মার্কিন সফরে গিয়েছিলেন নেহরু। পরিবর্তে ট্রুম্যান প্রশাসন তাঁকে ভারতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নির্মাণসহ কমিউনিস্ট-বিরোধী শিবিরে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। ওয়াশিংটনের তাবৎ প্রস্তাব সেদিন তিনি খারিজ করে দেন চরম অবজ্ঞায়।

ফলে সেদিন নেহরুকে দেশে ফিরতে হয়েছিল শূন্য হাতেই। হাতে ছিলো না এক ডলার মার্কিন সহায়তাও।

কোল্ড ওয়ার অন দ্য পেরিফেরি, দ্য ইউনাইটেড স্টেটস,  ইন্ডিয়া অ‌্যান্ড পাকিস্তান বইয়ে রবার্ট ম্যাকমোহন লিখছেন, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আমেরিকার পারমাণবিক স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরেই উপমহাদেশে সম্ভাব্য কমিউনিস্ট আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য আমেরিকা দক্ষিণ এশিয়ায় মিত্রের অনুসন্ধান শুরু করেছিল হোয়াইট হাউস। আমেরিকার ধারনা ছিল, ভারতের কমিউনিস্টরা মূলত সোভিয়েতের দিকে এবং পাকিস্তানের কমিউনিস্টরা চীনের দিকে ঝুঁকছে। যা আমেরিকার জন্য বিপজ্জনক। এই সময় গোটা অঞ্চলেই কৌশলগত প্রভাব বিস্তার ছিল আমেরিকার কাছে মুখ্য বিষয়। এই সময় আমেরিকার উদ্দেশ্য ছিল ভারত ও পাকিস্তানে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা, যার মাধ্যমে আমেরিকা প্রয়োজনবোধে সোভিয়েতের উপর হামলা চালাতে পারে এবং দুই দেশকেই কমিউনিস্ট প্রভাব থেকে রক্ষা করা। প্রথমদিকে আমেরিকার লক্ষ্য ছিল ভারতে প্রভাব বিস্তার করা ও পাকিস্তানে ঘাঁটি স্থাপন করে সেখান থেকে দূরপাল্লার বোমারু বিমানের সাহায্য নিয়ে পারস্য উপসাগর এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখা। ভারতকে এত সহজে কাবু করা সহজ না হলেও আমেরিকা পাকিস্তানকে সহজেই রাজি করাতে সক্ষম হয়। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ইসলামাবাদকে প্রচুর পরিমাণ সামরিক সাহায্য দিয়ে আমেরিকা পাকিস্তানকে বাগদাদ চুক্তি (পরবর্তীকালে বাগদাদ চুক্তি সেন্টো-তে পরিণত হয়) ও সিয়াটোতে যোগ করে নেয়। নেহরুর মতে, তৎকালীন স্নায়ুযুদ্ধ ছিল একটা অস্ত্রের প্রতিযোগিতা। যা অচিরেই পারমাণবিক অস্ত্রযুদ্ধে পরিণত হবে এবং সারা পৃথিবীকে গ্রাস করবে। (টুওয়ার্ড ফ্রিডম, অ‌্যান অটোবায়োগ্রাফি অব জওহরলাল নেহেরু)। স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানকে বিপুল সামরিক সহযোগিতা করে আমেরিকা ভারতকে বিশাল অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন।

কাড়ি কাড়ি অর্থ সাহায্য পাকিস্তানকেই

ইতিহাস বলছে, ৬০ দশকের শুরুতে পাকিস্তানে প্রদত্ত আমেরিকার সাহায্যের পরিমাণ ছিল পাকিস্তানের প্রাপ্ত সামগ্রিক বিদেশি সাহায্যের অর্ধেকের চেয়েও বেশি। সেই সময় আমেরিকা সোভিয়েতের ওপর ইউ-২ গোয়েন্দা বিমান পরিচালনার জন্য পাকিস্তানে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করেছে। গত ১৫ বছর ধরে শুধুমাত্র আফগানিস্তানে লড়াই চালিয়ে তালিবান নির্মূল করতে এই পাকিস্তানকে আমেরিকা ৩,৩০০ কোটি ডলার আর্থিক সাহায্য দিয়েছে। হোয়াইট হাউস মনে করেছিল, ‘জঙ্গিরা যেখানে আমাদের উভয়ের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে পাকিস্তানের চেয়ে বড় অংশীদার আর কেউ নেই।’ গার্ডিয়ানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ থেকে এই পাকিস্তানই আমেরিকার থেকে গড়ে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার সাহায্য পেয়ে আসছে। ২০১০-এ পাকিস্তানে প্রদত্ত আমেরিকার সাহায্যের পরিমাণ বেড়ে হয়েছিল ২৫০ কোটি।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০১৬-১৭ সালের বাজেটে পাকিস্তানের জন্য মোট ৮৬ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। যার মধ্যে ২৬ কোটি ৫০ লক্ষ শুধুমাত্র সামরিকক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য। এরপরও রয়েছে আরও সাহায্য। কিন্তু হঠাৎই পাকিস্তান চীনের মিত্রশক্তি হয়ে ওঠায় মার্চ মাসে ৭০ কোটি মার্কিন ডলারের অনুদান বাতিল করেছিল মার্কিন কংগ্রেস। মার্কিন সেনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান তথা রিপাবলিকান সেনেটর বব কর্কার নিজেই পাকিস্তানকে সাহায্য দেওয়া আটকাতে তৎপর হয়েছিলেন। সেই সময় মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের অধিকাংশই মার্কিন নাগরিকদের করের টাকায় পাকিস্তানকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছিলেন। নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয় প্রতিবেদনে পাকিস্তানকে আমেরিকার সবচেয়ে ‘প্রতারক এবং বিপজ্জনক’সঙ্গী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অবিলম্বে পাকিস্তানকে সব রকমের সাহায্য দেওয়া বন্ধ করা উচিত বলেও মার্কিন মিডিয়ার মত দিয়েছে। তালিবান এবং হাক্কানি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমেরিকা পাকিস্তানকে বারবার চাপ দিলেও যে পাকিস্তান তা করেনি, তা এখন ওয়াশিংটনের কাছে পরিষ্কার। একইসঙ্গে ৩০ কোটি মার্কিন ডলারের অনুদান প্যাকেজ আটকে দিয়েছিলেন খোদ মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব অ্যাশটন কার্টার। এই ঋণ আটকে যাওয়ায় আমেরিকার কাছ থেকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমানও কেনাও থমকে গিয়েছে পাকিস্তানের। আটটি এফ-১৬-এর দাম স্থির হয় ৭০০ মিলিয়ন ডলার। সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ৭০০ মিলিয়ন ডলার থেকে পাকিস্তানকে ৪৩০ মিলিয়ন ডলার নগদ শোধ করতে হবে না, সেটি দেওয়া হবে আমেরিকার পক্ষ থেকে ঋণ হিসেবে। বাকি ডলার পাকিস্তান শোধ করবে। তাতে আপাতত জল ঢেলে দিয়েছে হোয়াইট হাউস।

ভারতের বিদেশ নীতির অভিমুখ পরিবর্তন

দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানকে বরাবরই তার বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে দেখে এসেছে আমেরিকা। আজ থেকে নয়, সেই ঠান্ডা যুদ্ধের সময় থেকেই। মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রাধান্য বিস্তারে মার্কিন স্ট্র্যাটেজির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল পাকিস্তান। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ছিল অগ্রনী রাষ্ট্র। আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহার এবং ’৯১-এ সোভিয়েত ইউনিয়নের অবসানের পর ভারতের ভূমিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্হিতিকে নতুন করে মূল্যায়ণ করতে শুরু করে আমেরিকা।

নব্বইয়ের প্রথম অর্ধে আমেরিকা তার স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনায় ভারতকে যুক্ত করতে শুরু করে। উদারীকরণ এবং ফান্ড-ব্যাঙ্কের নীতি রূপায়নের পাশাপাশি ওয়াশিংটন সামরিক ও নিরাপত্তা চুক্তি করতেও তৎপর হয়।

ভারত-মার্কিন সামরিক সহযোগিতা শুরু হয় ’৯২-এর জানুয়ারিতে। নরসিমা রাও সরকারের আমলে। সেসময় দু’দেশের সেনা কর্তাদের নিয়ে গঠিত হয় একটি স্টিয়ারিং কমিটি। এরপরেই দুই নৌবাহিনীকে নিয়ে গঠিত হয় যৌথ স্টিয়ারিং কমিটি। ওই বছরই হয় প্রথম যৌথ নৌমহড়া। পরে দু’দেশের বায়ুসেনার মধ্যে গঠিত হয় যৌথ স্টিয়ারিং কমিটি।

’৯৫-এ দুই সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ‘এগ্রিড মিনিটস অব ডিফেন্স কোঅপারেশন’ চুক্তি। এধরনের চুক্তি এই প্রথম। যাতে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর অফিসারদের প্রশিক্ষনের জন্য মার্কিন মুলুকে পাঠানো এবং যৌথ মহড়ার সুযোগ তৈরি হয়।

তখন ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য ছিল একইসঙ্গে দিল্লি, ইসলামাবাদের সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক চুক্তি করা। যদিও, পাকিস্তান ছিল তার বিশ্বস্ত সহযোগী।

পরে ছ’বছরের বি জে পি শাসনে, এই স্ট্র্যাটেজিক জোট সৃষ্টির চেষ্ঠাই বাড়তি গতি পায়। সামরিক সহযোগিতাকে বাজপেয়ী সরকার নিয়ে যায় স্ট্র্যাটেজিক জোটের স্তরে। ’৯৮-এর মে মাসে পোখরান বিস্ফোরণ। ওয়াশিংটন-দিল্লির মধ্যে সম্পর্কের অবনতি। মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ। সামরিক সহযোগিতা বাতিল। যদিও বেশি দিনের জন্য নয়। মার্কিন চাপের কাছে বাজপেয়ী সরকারের নতি স্বীকার। মার্কিন বিদেশ সচিব স্ট্রোব ট্যালবটের সঙ্গে ভারতের বিদেশ মন্ত্রী যশবন্ত সিংয়ের দফায়-দফায় দীর্ঘ গোপন বৈঠক। ওয়াশিংটন দেখে নয়াদিল্লির নীতিকে প্রভাবিত করার এটাই মহার্ঘ সুযোগ।

নিয়মিতভাবে শুরু হয় যৌথ মহড়া। দু’দেশের মহড়া ’৯২ থেকে শুরু হলেও, তা সীমাবদ্ধ ছিল কেবলমাত্র নৌমহড়ার মধ্যে। এবার সেইসঙ্গে শুরু হয় স্থল ও আকাশ পথে যৌথ মহড়া।

নিরানব্বইয়ের শেষে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে সামরিক প্রশিক্ষন দিতে রাজি হয় আমেরিকা। কুখ্যাত ইন্টারন্যাশনল মিলিটারি এক্সচেঞ্জ ট্রেনিং প্রোগ্রাম (আই এম ই টি)-এর অধীনে। এর আগে ভারত কখনও আই এম ই টি-তে অংশগ্রহন করে নি। বিশ্ব জানে এই সামরিক প্রোগ্রামের মাধ্যমেই পেন্টাগন বিভিন্ন দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে প্রশিক্ষন দেয়। সেইসঙ্গে সামরিক সম্পর্ক রক্ষা করে। চিলি, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে, গুয়েতেমালা, এমনকী পাকিস্তানেও তারা প্রশিক্ষন দেয় এই কর্মসূচীর মাধ্যমে। বস্তুত এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় প্রতিটি সামরিক স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে পেন্টাগনের গভীর যোগাযোগের মাধ্যম হলো এই আই এম ই টি।

এসময়ই ভারত সরকার প্রথম এফ বি আই-কে দিল্লিতে অফিস খোলার অনুমতি দেয়। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার নামে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাকে দেশের সর্বত্র অবাধ গতিবিধির সুযোগ করে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাল কৃষ্ণ আদবানি। বস্তুত, এই আদবানিই দেশের প্রথম কোনও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যিনি ভার্জিনিয়ার সি আই এ দপ্তরে যান। এই একই আদবানি গিয়েছিলেন ইজরায়েলে। সেদেশের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং শিনরেটের সঙ্গে জোট বাধতে।

২০০০-এর মার্চে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ক্লিন্টনের ভারত সফর। যৌথ বিবৃতি। শিরোনাম ছিল, ‘ভারত-মার্কিন সম্পর্ক : একুশ শতকের জন্য একটি দৃষ্টিভঙ্গী’। ক্লিন্টনের এই সফর দু’দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ন মাইলফলক। ওয়াশিংটনের বার্তা ছিল স্পষ্ট — সর্বশ্রেষ্ঠ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারতের স্বীকৃতি। মার্কিন রাষ্ট্রপতি পাঁচ দিন ছিলেন ভারতে। আর পাঁচ ঘন্টা পাকিস্তানে। দৃশ্যতই আপ্লুত বাজপেয়ী বলেন, আমেরিকা ভারতকে গ্রহন করেছে তার ‘স্বাভাবিক মিত্র’ হিসেবে।

৯/১১-র পর আমেরিকা আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করলে বাজপেয়ী সরকার আগ বাড়িয়ে ভারতের সমুদ্র বন্দর, বিমান বন্দর, বায়ুসেনার ঘাঁটি ব্যবহারের প্রস্তাব দেয়। ২০০১-এ স্বাক্ষর করে ‘স্ট্র্যাটেজিক সহযোগিতার পরবর্তী পদক্ষেপে’।

বস্তুত, জোট-নিরপেক্ষতা ভিত্তিক ভারতের বিদেশ নীতিকে ঝেড়ে ফেলার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেওয়ার শুরু সেদিনই।

চীনের ঘনিষ্ঠ পাকিস্তান, তাই ভারত এখন মিত্র

চীনের দোসর হয়ে ওঠায় পাকিস্তানকে চাপে রাখার জন্য পেন্টাগনের প্রয়োজন পালটা শক্তি তৈরি করা। এশিয়ার বুকে নতুন বন্ধু চাইছে হোয়াইট হাউস। অবশেষে নয়া মিত্রের খোঁজ পেয়েছে আমেরিকা। আর সেই নয়া মিত্র এখন নরেন্দ্র মোদির ‘ভারত’। একদিকে সাহায্য বন্ধের হুমকি দিয়ে ইসলামাবাদকে চাপে রাখা, অন্যদিকে অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে একের পর এক সামরিক চুক্তি। এই দ্বিমুখী নীতিতেই আমেরিকা ঘিরে ফেলতে চায় ‘চিরশত্রু’ চীনকে। তাই আটলান্তিকে আধিপত্য অটুট রেখে এবারে প্রশান্ত মহাসাগর হয়ে ভারত মহাসাগর। ভারসাম্য বজায় রাখার বিদেশনীতিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ভারত আমেরিকার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক যত উন্নত হচ্ছে ততই কাছাকাছি আসছে ভারত–আমেরিকা। সম্প্রতি প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিক্কার মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিবের সঙ্গে ‘লেমোয়া’ নামে যে সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন, তা সেই সমীকরণেরই ফল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ‘লেমোয়া’ চুক্তির সার কথা হল: এ বার থেকে আমেরিকা জ্বালানি ভরার জন্য বা অন্য কোনও সামরিক সহায়তার জন্য ভারতের যে কোনও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে। এই চুক্তি অনুযায়ী দু’দেশের জল, স্থল ও বায়ুসেনা ঘাঁটিকে উভয়েই রসদ সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করতে পারবে। সন্ত্রাস মোকাবিলায় কার্যকরী হবে এই চুক্তি।

কে না জানে, আমেরিকার সামরিক মিত্র হওয়া মানেই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় মেতে ওঠা। অস্ত্রের ঝনঝনানি। বর্তমান বিশ্বের ১৩২টি দেশে আমেরিকার ৭০২টি সামরিক ঘাঁটি আছে। প্রায় দশ হাজার সক্রিয় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র, যার মধ্যে দু’হাজারটি হেয়ার ট্রিগার এলার্ট। ঠান্ডাযুদ্ধের কালে বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের ৩৬ শতাংশ ছিল আমেরিকার, আর বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৪১.৫ শতাংশ। মার্কিন বিমানবাহিনীর এফ-২২ যুদ্ধবিমানগুলির প্রায় অর্ধেকই মোতায়েন করা আছে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। যুদ্ধ বিমানবাহী দু’টি মার্কিন রণতরী সবসময়ই টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে এই অঞ্চলে। জাপানে স্থায়ীভাবেই মোতায়েন রয়েছে অন্তত ৪০ হাজার মার্কিন সেনা। দক্ষিণ কোরিয়ায় ২৮হাজার। ২০০৬সালে পেন্টাগন এই প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ করে ৬টি বিমানবাহী রণতরীসহ মার্কিন সাবমেরিনের ৬০শতাংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে করেছে ৬০০ কোটি ডলারের অস্ত্র কেনাবেচার চুক্তি। আমেরিকা চায় তার সামরিক আধিপত্য বিস্তার করতে। আমেরিকার সঙ্গে থাকলে তুমি দুনিয়ার শক্তিশালী অস্ত্র সমৃদ্ধ দেশ হবে। বাকি দেশকে চোখ রাঙাবে। যা এতদিন করে এসেছে পাকিস্তান। কিন্তু একইসঙ্গে রক্তাক্ত হবে তোমার ভূখণ্ডও। তারও জ্বলন্ত প্রমাণ পাকিস্তানই।

পেন্টাগন প্রকাশিত স্ট্র্যাটেজিক রিপোর্টেই তো উল্লেখ রয়েছে: জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন এবং ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে শক্তিশালী একটি সামরিক জোট গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে আমেরিকা। একইসঙ্গে চীন-বিরোধী এই সামরিক জোটে ভারত এবং ভিয়েতনামকে যুক্ত করার চেষ্টাও যে অব্যাহত থাকবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সেই ‘স্ট্র্যাটেজি’-র নয়া সংযোজন ভারতের সঙ্গে ‘লেমোয়া’ চুক্তি। লক্ষ্য অবশ্যই ৭০ বছরের পুরানো বন্ধু ইসলামাবাদ নয়। বেজিং।