ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

রিপাবলিকান প্রার্থী কি ডেমোক্র্যাটদের ট্রাম্পকার্ড?

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হেন নাম নেই যে নামে ডাকা হয়নি। কেউ তাঁকে বলেছেন ফ্যাসিস্ট। কেউ বলেছেন হিটলার। উন্মাদ নামেও তাঁকে ডাকা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ওবামা ও জর্জ বুশ উভয়েই ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করেছেন। কারণ তাঁর বক্তব্য ‘মার্কিন মূল্যবোধবিরোধী’।

পরিচিতি বলতে পৈতৃকসূত্রে পাওয়া রিয়েল এস্টেটের ব্যাবসার বাইরেও দীর্ঘদিন টিভিতে রিয়্যালিটি শো-র পরিচালনা করা। গত বছর প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কথা ঘোষণা করার আগে উল্লেখযোগ্য কোনও রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড তাঁর ছিল না। তাই প্রাইমারি নির্বাচনের শুরুর দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনেকে তেমন গু‌রুত্বই দেয়নি। তবে ট্র্যাডিশনাল রাজনীতিবিরোধী, ইসলামবিদ্বেষী বা মেক্সিকানবিরোধী খোলামেলা বক্তব্যের মাধ্যমে, শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের মধ্যে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা জাগিয়ে তুলে রক্ষণশীল রিপাবলিকান দলের নীচের স্তরের সমর্থকদের মন জয় করে নিয়েছিলেন সহজেই। কিন্তু ট্রাম্পের বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করার মাধ্যমে সংবাদ শিরোনামে আসার ব্যাপারটি একেবারেই অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়। ভিত্তিহীন মন্তব্য, প্রতিপক্ষের ওপর ব্যক্তিগত আক্রমণ, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে প্রতিনিয়ত অবজ্ঞা করে বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়া ট্রাম্পের ‘নির্বাচনী ব্র্যান্ডে’ পরিণত হয়েছে। গত কয়েক মাসের নির্বাচনী প্রচারে অসংখ্যবার তিনি তাঁর রাজনৈতিক অপরিপক্কতা ও বদমেজাজের পরিচয় দিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি করেছেন।

প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে ট্রাম্প কি দুমুখো গুপ্তচর? রিপাবলিকান দলকে ধ্বংস করার জন্যই কি তাঁকে পাঠানো হয়েছে? তিনি কি তবে ডেমোক্র্যাটদের তুরুপের তাস (ট্রাম্পকার্ড)? রিপাবলিকান দলের নেতা ও ফ্লোরিডার প্রাক্তন গভর্নর জেব বুশ তো বলেই ফেলেছেন: ট্রাম্প তাঁর বন্ধু হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে একটা সমঝোতা করে থাকতেও পারেন। ট্রাম্পের তৃতীয় বিয়েতেও উপস্থিত ছিলেন ক্লিনটন দম্পতি। একসময় ক্লিনটন ফাউন্ডেশনকে বিপুল সাহায্য করেছেন তিনি। হিলারির সিনেট নির্বাচনের প্রচারেও ট্রাম্পের ভূমিকা ছিল। এসব বিষয় খুবই সন্দেহজনক। কার্লোস কারবেলোর মতো অনেক রিপাবলিকান নেতার দাবি, আমেরিকার প্রতি গভীর ভালোবাসা, রিপাবলিকান হওয়া কিংবা রক্ষণশীলতার প্রতি দায় থেকে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামেননি ট্রাম্প। বিল ক্লিনটন অনুরোধ করেছেন বলেই ট্রাম্প এই লড়াইয়ে নেমেছেন। রাজনৈতিক সার্কাস সৃষ্টির জন্যই ট্রাম্পকে নিয়োগ করেছে ডেমোক্র্যাট পার্টি। সমালোচকদের পর্যবেক্ষণ, ট্রাম্পের উলটোপালটা কথায় ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ও হিলারির দুর্বলতা, সমালোচনা চাপা পড়ে গিয়েছে। কারণ, সবাই ট্রাম্পকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

গত জুনে ডেমোক্র্যাট পার্টির বেশ কয়েকটি সংস্থার ইমেল হ্যাক করার ঘটনা প্রকাশিত হয়। গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইসহ আইটি বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই হ্যাকিংয়ের ঘটনায় রাশিয়ার যুক্ত থাকার সম্ভবনা রয়েছে। রাশিয়ার সরকারি সংস্থা যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান একটি রাজনৈতিক দলের সার্ভার হ্যাক করে, সেটি সার্বভৌমত্বে আঘাত হানার সামিল। ট্র্যাম্প এর বিরোধিতা না করে উলটে বিদেশসচিব থাকাকালীন হিলারি ক্লিনটনের মুছে ফেলা ইমেল উদ্ধার করতে রাশিয়ান হ্যাকরদের আহবান জানান। চির শত্রু রাশিয়ার গোয়েন্দাদের ওপর ট্রাম্পের এত আস্থা দেখে তাঁর দলের নেতারাও হতবাক। স্পষ্ট হয়ে যায়, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য দেশের নিরাপত্তা নিয়ে খেলতেও বাধা নেই ট্রাম্পের! এই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঠেকাতে খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন আমেরিকার তথ্যপ্রযুক্তিশিল্পের কেন্দ্রস্থল সিলিকন ভ্যালির শতাধিক ব্যক্তি। অ্যাপলের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্টিভ ওজনিয়াক, ট্যুইটারের সহপ্রতিষ্ঠাতা এভেন উইলিয়ামস ও উইকিপিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা জিমি ওয়েলস তাঁদের অন্যতম। ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পলিটিকসের জিওফ্রে স্কেলির কথায়, প্রযুক্তি খাতের ব্যবসায়ীরা আসলে ভয় পাচ্ছেন, ক্ষমতায় বসলে ট্রাম্প হয়তো বাণিজ্যযুদ্ধ বাধিয়ে বসবেন।

অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করেন, ধর্মান্ধ, অহংকারী ও বর্ণবাদী ট্রাম্পের উত্থানের পিছনে মূল ভূমিকা রেখেছে তাঁর মেক্সিকানবিরোধী, ইসলামবিরোধী এবং অভিবাসীবিরোধী সস্তা রাজনৈতিক বক্তব্য। বিভিন্ন সময়ে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী মেক্সিকান অভিবাসীদের ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘ধর্ষক’ বলে আক্রমণ করেন। মেক্সিকোর সীমান্তে তাদেরই অর্থায়নে দেওয়াল তৈরি করার কথাও ঘোষণা করেছেন তিনি। আইএস তকমা লাগানো বিপথগামী জঙ্গিদের সঙ্গে ধর্মপ্রাণ, শান্তিপ্রিয় মুসলিমদের এক করে, ইসলাম ধর্মের প্রতি ভীতি ও বিদ্বেষ সৃষ্টিতে ট্রাম্প নেতৃত্ব দিয়েছেন। সব মুসলিমকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার কথাও ঘোষণা করেছেন। আমেরিকার একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে তিনি জাগিয়ে তুলেছেন বর্ণবাদ, অসহনশীলতা ও ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব। ট্রাম্প এমন একজন ব্যক্তি যিনি নিজের স্বার্থের বাইরে কিছুই বুঝতে চান না। তাঁর বিভিন্ন বিতর্কিত মন্তব্যের সমালোচনাকারী রিপাবলিকান নেতাদের একহাত নিতেও তিনি দ্বিধা করেননি। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভের স্পিকার, রিপাবলিকান নেতা পল রায়ান এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও সিনেটর জন ম্যাকেইনও ট্রাম্পের আক্রমণ থেকে বাদ যাননি। ট্রাম্পের খামখেয়ালি ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তৃতা-বিতর্ক নিয়ে খোদ রিপাবলিকান পার্টিতেই বিরোধ রয়েছে। সম্প্রতি রিপাবলিকান দলীয় বেশ কিছু প্রভাবশালী নেতাও ট্রাম্পের পক্ষ থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। কেউ কেউ বরং হিলারিকেই সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স কিংবা রিপাবলিকান দলের বর্তমান কংগেসম্যান রিচার্ড হান্নাসহ রিপাবলিকান বিভিন্ন ক্যাবিনেটের প্রাক্তন সদস্যও রয়েছেন এই তালিকায়।

প্রতিপক্ষকে বিভিন্ন অসম্মানজনক নামে ডাকা, ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা, নির্বাচনে হেরে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে অগ্রিম কারচুপির অভিযোগ করা এবং যুক্তিতর্কের ধার না ধেরে মনগড়া সব বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে দেশের কম শিক্ষিত, কর্মজীবী মানুষদের বিভ্রান্ত করে নির্বাচনী ফায়দা লোটার চেষ্টা করা– এসবই ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার ‘হলমার্ক’এ পরিণত হয়েছে।

অধিকাংশ নির্বাচনী সমীক্ষা বলছে, ট্রাম্প হিলারির তুলনায় বেশ খানিকটা পিছিয়ে রয়েছেন। আমেরিকার সাধারণ মানুষ গত ১৫ মাস ধরে যে ট্রাম্পকে দেখেছেন, তাতে কিছু রক্ষণশীল রিপাবলিকান নতুন করে আশার আলো দেখলেও আশাবাদী হওয়ার কোনও কারণ নেই। কারণ, ভোট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিলারিকে প্রার্থী হিসেবে পছন্দ না হলেও ট্রাম্পের মতো ধর্মান্ধ ও বর্ণবাদীকে আমেরিকার ভোটাররা মেনে নেবে না।

আমেরিকার রাজনৈতিক মানচিত্র এমন অদ্ভুত যে কৃষ্ণাঙ্গ ও অভিবাসীদের অধিকাংশই আটলান্টিকের পূর্ব পাড়ে ও প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম তীরঘেঁষা শহরপ্রধান রাজ্যগুলিতে বাস করে। ফলে গুটি কয়েক ছাড়া আমেরিকার অধিকাংশ রাজ্যেই ‘লাল’ রিপাবলিকানদের আধিপত্য। কোনও কোনও রাজ্য অভিবাসীদের আগমনের ফলে লাল ফিকে হতে শুরু করেছে, তবে তার ফল পেতে আরও আট-দশ বছর অপেক্ষা করতে হবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে চলতি রিপাবলিকান নেতৃত্বের সব বাঘা বাঘা প্রতিনিধি আমেরিকার এই জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের কথা জানেন। শুধু সাদা মানুষের ভোটে হোয়াইট হাউস দখলে আনা যাবে না, এ কথাও তাঁরা জানেন। তা সত্ত্বেও শুধু সাদা মানুষদের খুশি করা যায়, এমন নীতি তাঁরা অনুসরণ করে চলেছেন। যার মূলে রয়েছে সব রকম অশ্বেতাঙ্গদের ব্যাপারে ভীতি। এই অশ্বেতাঙ্গদের তালিকায় যেমন আফ্রিকান-আমেরিকান আছে, তেমনি আছে মেক্সিকান ও অন্যান্য বহিরাগত। এর সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে মুসলিমরা। ভোট বিশেষজ্ঞদের ধারণা, রিপাবলিকান দল হিসাব করে দেখেছে, ভীতিভিত্তিক যে বর্ণ বিভাজন, তা যদি শ্বেতাঙ্গ মনের ভিতরে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে যে ‘শ্বেত ঐক্য’ গড়ে উঠবে, শুধু তা দিয়েই হয়তো কোনও রিপাবলিকান প্রার্থী হোয়াইট হাউস ছিনিয়ে নেবেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো সেই অঙ্কই কষে রেখেছেন!

প্রেসিডেন্ট ওবামা যখন নিজের নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছিলেন ‘ইয়েস উই ক্যান’ স্লোগান নিয়ে। তখন দেশবাসী ঐক্যের পথে এগিয়েছিল। আর এবারের নির্বাচনের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রচারে জনগণের মধ্যে যেন ভয়টাই বেশি প্রভাব বিস্তার করছে। প্রচারের চাপে ক্লান্ত মার্কিনীরা। বলছে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠন আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (এপিএ) সমীক্ষা।