ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

 

donaldtrump-attrib-flickr-donkeyhotey-19225749489-640x360
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মুখে নিজের দল রিপাবলিকান পার্টিকে প্রায় দু’টুকরো করে ফেলেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প! ভোটে দলের মুখকেই মানতে চাননি রিপাবলিকান পার্টির অনেক নেতা। তাঁরা কেউ প্রকাশ্যে গাল পেড়েছেন দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ট্রাম্পকে। কেউ ট্রাম্পকে বলেছেন ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’। আসলে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির টিকিট পাওয়ার লড়াইতে যখন থেকে নেমেছিলেন, তখন থেকেই নানা বিতর্কের জন্ম দিতে শুরু করেছেন। তাঁর নানা মন্তব্য প্রচুর নিন্দা এবং বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প কোনও কিছুকেই পাত্তা দেননি। খোদ রিপাবলিকান নেতা তথা প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ট্রাম্পের নিন্দায় সরব হয়েছিলেন। রিপাবলিকান নেতা মিট রমনি বলেই ফেলেছিলেন, ট্রাম্প একটা প্রতারক। মাইক ব্লুমবার্গ ও জেব বুশ সুর মিলিয়ে বলেছেন, তিনি মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। টিভি ভাষ্যকার রবার্ট কেগান ট্রাম্পকে ফ্যাসিস্ট নামেও দাগিয়ে দিয়েছিলেন। দমে যাননি ট্রাম্প। বলেছিলেন, ভোটাররাই এর যোগ্য জবাব দেবে।
১৮৫৪ সালে জন্ম নেওয়া দলটির উদ্যোক্তা ছিলেন দাস প্রথা-বিরোধী লোকেরা। এরমধ্যে একটি বড় অংশ এসেছিলেন আমেরিকান হিগ পার্টি থেকে যারা ওই দলের ভিতর আধুনিক এবং উদারপন্থী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। রিপাবালিকান পার্টির প্রকৃত আদর্শ কি ছিল তার সবচেয়ে উজ্জল দৃষ্টান্ত আব্রাহাম লিংকন। এই দল থেকেই ১৮৬১ সালে প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ছিলেন বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তী লিংকন। ১০০ বছরের পুরানো সেই পার্টির প্রার্থী ধনকুবের ডোনাল্ড ট্রাম্প কি শুনিয়েছেন? এক দিকে ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’। একই সঙ্গে তিনি মুসলমানদের আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধকরণ, মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল নির্মাণ এবং অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের ঘোষণার মাধ্যমে অতিরক্ষণশীল শ্বেতাঙ্গ খ্রীষ্টানদের উসকে দিয়ে ছিনিয়ে নিলেন হোয়াইট হাউজ।

তাঁর দেখানো পথ ধরেই কি রিপাবলিকান পার্টি নতুন পথে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে এনবিসি টেলিভিশনের সাংবাদিক স্ট্যানলিরিও বলেন, নতুন পথে যাচ্ছে কিনা তা হয়তো এখন বলা যাবে না। তবে রিপাবলিকান স্টাবলিশমেন্ট তথা আমেরিকার উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি যে তিনি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ডোনাল্ড ট্র্যাম্প প্রকৃতপক্ষে এক সফল ব্যবসায়ী। একজন সফল ব্যবসায়ী হিসাবেই তার আবেদন ও খ্যাতি। তাই বেশির ভাগ সমর্থক তার রাজনৈতিক মতামতের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন নন। তারা তার অমার্জিত বা অপরিপক্ব বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য এবং আচরণ নিয়েও চিন্তিত নন। তিনি একজন মড় মাপের করপোরেট প্রধান এবং সেভাবেই তিনি কাজ করবেন। এটাই তাদের যুক্তি। ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেন, বাণিজ্যিক বিশ্বে তার অবাধ বিচরণ তাকে প্রেসিডেন্সির জন্য প্রস্তুত করেছে। প্রতিপক্ষকে বিভিন্ন অসম্মানজনক নামে ডাকা, ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা, নির্বাচনে হেরে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে অগ্রিম কারচুপির অভিযোগ করা এবং যুক্তিতর্কের ধার না ধেরে মনগড়া সব বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে দেশের কম শিক্ষিত, কর্মজীবী মানুষদের বিভ্রান্ত করে নির্বাচনী ফায়দা লোটার চেষ্টা করা– এসবই ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার ‘হলমার্ক’এ পরিণত হয়েছে। মার্কিন সমাজকে প্রায় আড়াআড়ি ভেঙে দিয়েছেন ট্রাম্প। এর পরেও মার্কিন জনতার একাংশ যে বেপরোয়া ভাবকেই পচ্ছন্দ করেন, তার প্রমাণ মিলল ভোটে।

বরাবরই বেপরোয়া ট্রাম্প। নির্মাণ শিল্পে গগনচুম্বী সাফল্য নিয়ে রাজনীতির প্রাঙ্গণে এসেছেন। পোড়খাওয়া রিপাবলিকান নেতাদের মার্জিত যুক্তিকে মুখের তোড়ে উড়িয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। ট্রাম্পের এই অরাজনৈতিক আচরণই জনতার মন জিতেছে। প্রাইমারি লড়াইয়ে প্রথম থেকেই বাকি প্রার্থীদের পিছনে ফেলতে শুরু করেন ট্রাম্প। আজ পিছনে ফেলে দিলেন আর এক পোড়খাওয়া রাজনীতিক হিলারিকেও। গত দেড় বছরে তার নানা কথায় আমেরিকার উদারবাদী রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও বিশেষত অভিবাসীরা, এমনকি দুনিয়ার অধিকাংশ মানুষ ক্রমাগত আতঙ্কিত বোধ করলেও নিজের বর্ণ ও ধর্মবিদ্বেষী অবস্থান থেকে মুহূর্তের জন্যও সরেননি রিপাবলিকান প্রার্থী। আর তাতে আমেরিকারই অর্ধেকের কাছাকাছি মানুষ ছুটেছে তার পিছনে। এই মানুষগুলি যেন বহুকাল ধরেই এমন একজন নেতার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। নিজেদের চিন্তার মানুষ ভেবে এতকাল রিপাবালিকান পার্টির যেসব নেতাদের ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট বানিয়েছিলেন তার সবই যেন ভুল ছিল।

সম্প্রতি একটি জনমত সমীক্ষা অন্তত তাই বলছে। কংগ্রেসের রিপাবালিকান দলীয় স্পিকার, দলের চেয়ারপার্সনও পল রায়ান এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে কে যথাযথভাবে দলীয় আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ৫১ শতাংশ রিপাবলিকান বলেছেন ট্রাম্পের কথা। অন্যদিকে পল রায়ানের নাম বলেছেন মাত্র ৩৩ শতাংশ। এই চিত্র দেখে রিপাবালিকান নয় এমন মানুষের ভ্রু কুঁচকে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু খোদ রিপাবালিকান পার্টির দীর্ঘদিনের নেতারা আঁতকে উঠছেন। ট্রাম্পের বক্তৃতা নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছিলেন রিপাবলিকান দলের শীর্ষ নেতৃত্বই। তাঁরা কবুল করেছেন, আমেরিকার মূল মন্ত্রেই আঘাত করছেন তিনি। দমে যাননি ট্রাম্প। বলেছিলেন, ভোটাররাই এর যোগ্য জবাব দেবে।

প্রাইমারি লড়াইয়ে প্রথম থেকেই বাকি প্রার্থীদের পিছনে ফেলতে শুরু করেছিলেন ট্রাম্প। বুধবার সবাইকে তাজ্জব বানিয়ে পিছনে ফেলে দিলেন আর এক পোড়খাওয়া রাজনীতিক হিলারিকেও।