ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

ধনকুবের প্রেসিডেন্ট
combsp120160120_low

হাউজ অব হররস্‌!

এটাই ছিল ১০ নভেম্বর ‘ডেইলি নিউজ’-র শিরোনাম। নিউ ইয়র্ক টাইমসের শিরোনাম: ট্রায়ামফ্যান্ট ট্রাম্প। ‘বহিরাগত মুঘল’। একই সুর ওয়াশিংটন পোস্টের। শিরোনাম ছিল ‘ট্রাম্প ট্রায়ামফস’। তাঁর অভাবনীয় জয়ের পরও হোয়াইট হাউজের পথে কাঁটা বিছাতে কসুর করেনি আমেরিকার প্রথম সারির প্রায় সবক’টি সংবাদপত্র।

বহিরাগত মুঘলই বটে! আমেরিকার রাজনীতিতে অচেনা মুখ। আমেরিকাকে ‘শ্রেষ্ঠত্বের’ মুকুট ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভোটারদের সামনে হাজির হওয়ার অনেক আগে থেকেই আমেরিকা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চিনত দেশের সবচেয়ে রঙদার, সবচেয়ে জাঁকালো-সফল ধনকুবের হিসাবে। প্রায় চার দশক আগে বাবা ফ্রেড ট্রাম্পের কাছ থেকে মোটা মূলধন পেয়ে সেই কারবার শুরু। ফোর্বসের সমীক্ষা বলছে, এখন ৩৭০ কোটি ডলার সম্পত্তির মালিক। সেইসঙ্গে রয়েছে নিজস্ব একটি বোয়িং ৭৫৭-২০০, একটি কর্পোরেট জেট এবং দুটি হেলিকপ্টার। এছাড়াও রোলস রয়েস, মার্সিডিজ, ল্যাম্বর্গিনি, টেসলা-সহ বহু গাড়ির সম্ভার রয়েছে তাঁর কাছে। বৈভবশালী জীবনযাপন। নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে হিরে আর সোনায় মোড়া তাঁর বিলাসবহুল পেন্টহাউস দেখলে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। ৬৬ তলা এই পেন্টহাউসের নাম ‘ট্রাম্প টাওয়ার’। পেন্টহাউসের মার্বেলগুলিতে ২৪ ক্যারেট সোনা বসানো। বাড়ির প্রধান দরজাটিতেও সোনা এবং হিরে বসানো। টাওয়ারটির বাজার দর প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলার। বিতর্ক তৈরিতে যেমন তিনি শিরোনামে, তেমনই সম্পদ আর ঐশ্বর্যেও দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় প্রথম সারিতে জায়গা করে নিয়েছেন।

নিজেকে রাজনীতিক নয়, তুখড় ব্যবসায়ী বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন ট্রাম্প। গোটা দেশজুড়ে বলে বেরিয়েছেন, বিজনেসটা বোঝেন বলেই মার্কিন প্রশাসন এবং অর্থনীতি দারুণ চালাতে পারবেন। সরকারকে ব্যাবসার মতো পরিচালনা করবেন। কীভাবে? সোজাসাপটা যুক্তি। এলিট গোষ্ঠীর ক্ষমতা ও ধন-সম্পদ বাড়লে নাকি সকলেরই মঙ্গল। অধস্তনদেরও বাড়বে মজুরি। প্রথমেই বিত্তবান শ্রেণির লোকদের দেবেন বিরাট একটা কর ছাড় এবং কমাবেন কর্পোরেট ট্যাক্স, এর ফলেই নাকি তৈরি হবে লক্ষ লক্ষ দারুণ মাইনের চাকরি। সেই চাকরি চুরি হয়ে যাচ্ছে। আউটসোর্সিং বন্ধ করবেন। স্লোগান তুলেছিলেন, ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’। প্রচারে হাতিয়ার করেছিলেন নরেন্দ্র মোদির স্লোগানও। ‘অব কি বার, ট্রাম্প সরকার!’ সেই বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়েছে অন্তত ২০টি মার্কিন চ্যানেলে। একই সঙ্গে তিনি মুসলিমদের আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধকরণ, মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল নির্মাণ এবং অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের ঘোষণার মাধ্যমে অতিরক্ষণশীল শ্বেতাঙ্গ খ্রীষ্টানদের উসকে দিয়েছেন। ট্রাম্পের হাত ধরেই পুনরুত্থানের স্বপ্ন দেখেছে আমেরিকানরা। যে আমেরিকা হবে শুধুমাত্র ‌আমেরিকানদেরই। যেখানে রাজ করবে শুধুই শ্বেতাঙ্গরা। রাজনীতির চেনা ছকের পরোয়া না করে এই সস্তা রাজনীতিতেই ট্রাম্পের বাজিমাত। পাণ্ডিত্যকে তুড়ি মেরে পপুলিজমের জয়।

অনেকেই বলছেন, ট্রাম্পের এই জয় আসলে অ-রাজনীতির কাছে রাজনীতির পরাজয়। আমেরিকা বুঝিয়ে দিয়েছে, বনজোভি, ব্রুস স্প্রিংস্টিন, ম্যাডোনা… গিটার, পিয়ানো, গান, বাঁধিয়ে রাখার মতো বক্তব্য— কোনওটাই আর নির্বাচনে কাজে লাগে না। এলিটিজম নয়, আসল কথাটা হল তৃণমূলে পৌঁছনো। হয়তো তাই গত ২৩ ফেব্রুয়ারি এক ভাষণে ট্রাম্প বলেই ফেলেছিলেন, ‘আমি অর্ধশিক্ষিতদের মন জয় করেছি। অর্ধশিক্ষিতদের আমি ভালবাসি।’ তাঁর হাত ধরেই আজ রিপাবালিকান পার্টিতে নয়া ঘরানার ‘সস্তার রাজনীতি’। নিজের লড়াই সম্পূর্ণ নিজের অ্যাজেন্ডা মেনেই লড়েছেন। জেতার জন্য আমরা-ওরার বিভাজনে টুকরো করে দিয়েছেন গোটা দেশটাই। সাপে-নেউলে সম্পর্ক রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ভূয়সী প্রশংসা করতেও ডরাননি। তাঁর জয়ের পথেই ১০০ বছরের পুরানো পার্টির যাবতীয় রক্ষণশীলতা ভেঙে ছাড়খার। ধুলোয় মিশেছে দলের সনাতন বিশ্বাস কিংবা কর্মপন্থা। ভেঙে চুরমার বুশ পরিবারের মৌরসিপাট্টাও। অথচ, ১৮৫৪ সালে জন্ম নেওয়া দলটির উদ্যোক্তা ছিলেন দাস প্রথা-বিরোধী লোকেরা। এরমধ্যে একটি বড় অংশ এসেছিলেন আমেরিকান হিগ পার্টি থেকে। যারা ওই দলের ভিতর আধুনিক এবং উদারপন্থী হিসাবে পরিচিত ছিলেন। রিপাবালিকান পার্টির প্রকৃত আদর্শ কি ছিল তার সবচেয়ে উজ্জল দৃষ্টান্ত আব্রাহাম লিংকন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মুখে সেই রিপাবলিকান পার্টিকেও প্রায় দু’টুকরো করে ফেলেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প! ভোটে দলের মুখকেই মানতে চাননি রিপাবলিকান পার্টির প্রবীন নেতারা। মাইক ব্লুমবার্গ ও জেব বুশের মতো নেতারা সুর মিলিয়ে বলেছেন, ট্রাম্প মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। টিভি ভাষ্যকার রবার্ট কেগান ট্রাম্পকে ফ্যাসিস্ট নামেও দাগিয়ে দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক পত্রিকা পলিটিকো বলতে বাধ্য হয়েছিল, ট্রাম্পের কথাবার্তা ‘তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রের মতো’। কন্যা ইভাঙ্কা ‘প্লেবয়’-এর মডেল হলে তিনি কী করবেন, টিভি সঞ্চালিকা ওয়েন্ডি উইলিয়ামসের এমন প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প-উবাচ: ‘ইভাঙ্কা এ কাজ করবে বলে মনে হয় না। যদিও ওর ফিগারটা দারুণ। ও আমার মেয়ে না হলে আমি ওকে ডেট করতাম।’ অনেকেই আশঙ্কিত এই ভেবে যে, ‘ভয়ংকর’ এই লোকটিই হোয়াইট হাউজের মসনদে! যে হামেশাই বলেন, মেয়ে ইভাঙ্কা আর আমার প্রিয় কমন বিষয় হল সেক্স!

নিন্দুকেরা ভেবেছিলেন, জয় নয়, গোড়া থেকেই লক্ষ্য ছিল তাঁর ‘ট্রাম্প ব্র্যান্ড’ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে পোক্ত করা। রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী আর দলীয় নেতাদের এতটা অনাস্থা নিয়ে, একের পর এক যৌন কেচ্ছার অভিযোগ সামাল দিয়ে ধনতন্ত্রের মক্কায় নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া সম্ভব কি না— সেই প্রশ্নও তাড়া করেছে। নির্বাচনের দিন যত গড়িয়েছে, সামনে এসেছে ট্রাম্পের ব্যক্তিজীবনের রসালো গল্পগাথা। গত কয়েক মাসেই দুনিয়া জেনে গিয়েছে, নিজের অধস্তন কর্মচারী হোক কিংবা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসা রিপোর্টার, এমনকী এরোপ্লেনের সহযাত্রী— যে কোনও সুন্দরী মহিলা দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়া তাঁর বেশ পুরনো অভ্যেস। যাবতীয় বিতর্ক ভেসে গিয়েছে মার্কিন অস্মিতার আবেগে।

donald_trump_3409690b

ধনকুবের ফ্রেড ট্রাম্পের পাঁচ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ ডোনাল্ড ছোটবেলা থেকেই দুরন্ত। জন্ম ১৯৪৬-র ১৪ জুন, কুইন্সে। বাবা ফ্রেডরিক কুইন্স, স্টাটান আইল্যান্ড আর ব্রুকলিন এলাকায় সাধারণ মধ্যবিত্তদের জন্য অ্যাপার্টমেন্ট বানাতেন। অভিবাসীবিরোধী ইমেজ গড়ে তোলা ট্রাম্পের মা স্কটিশ বংশোদ্ভূত। শৃঙ্খলা শেখানোর জন্য ১৩ বছর বয়সে আর্মি স্কুলে ভরতিও করা হয়েছিল। লাভ হয়নি। দেশের হয়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যাওয়ার সুযোগ পেলেও সেমুখো হওয়ার সাহস দেখাননি। ১৯৬৪ সালে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ভরতি হন ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। দু’বছর পর ট্রান্সফার হন পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির হোয়ার্টন স্কুল অব ফাইন্যান্সে। ১৯৬৮-তে সেখান থেকেই অর্থনীতিতে ডিগ্রি। হোয়ার্টন স্কুলে পড়াশোনা শেষ করার পরই বাবার ব্যাবসায় যোগদান। বাবার সূত্রে হাতে আসা রিয়েল এস্টেটের ব্যাবসা দিয়েই তাঁর হাতেখড়ি। এলিজাবেথ ট্রাম্প অ্যান্ড সন্স কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার আগে বাবার কাছ থেকে ১০ লক্ষ ডলার ঋণ নিয়েছিলেন ডোনাল্ড। সেই টাকা জলে যায়নি। ব্যাবসায় সাহায্য করতে করতে এক সময় পুরোটাই ডোনাল্ডের। ১৯৭১-এ নাম বদলে আত্মপ্রকাশ ‘ট্রাম্প অর্গানাইজেশন’-এর। পারিবারিক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ বুঝে নেওয়ার পর ব্রুকলিন ও কুইন্স থেকে প্রকল্প সরিয়ে ম্যানহাটানে বড় বড় ভবন নির্মাণে নজর দেন ট্রাম্প। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে উঠতে থাকে। ম্যানহাটানের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরে সেখানে বিনিয়োগ বাড়াতে থাকেন। মুনাফার পাহাড় জমতে থাকে সমানতালেই।

পেনসিলভানিয়া সেন্ট্রাল রেইলরোড কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে গেলে ট্রাম্পের হাতে ম্যানহাটানের পশ্চিমে রেলের জমি কেনার সুযোগ তৈরি হয়। তুলনামূলকভাবে গরিব ওই এলাকায় অ্যাপার্টমেন্ট ব্য বসায় লাভের আশা না থাকায় ট্রাম্প সেখানে কনভেনশন সেন্টার নির্মাণের প্রস্তাব দেন। ১৯৭৮ সালে শহর কর্তৃপক্ষ আরও দুটি জায়গার সঙ্গে সেখানেও কনভেনশন সেন্টার নির্মাণের অনুমতি দেয়। ট্রাম্প ওই কনভেনশন সেন্টার নিজের পরিবারের নামে বানানোর আগ্রহ দেখান। তার প্রস্তাব ছিল, কর্তৃপক্ষ ‘ট্রাম্প’ নামটি নিলে তিনি নির্মাণ কাজের ফি নেবেন না। কিন্তু তার সেই প্রস্তাব খারিজ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। ওই কনভেনশন সেন্টারের নামকরণ হয় সিনেটর জ্যাকব জাভিটসের নামে। ব্যাবসা করতে গিয়ে ট্রাম্প প্রথম প্রশ্নের মুখোমুখি হন ১৯৭৩ সালে। সরকার তাঁর কোম্পানির বিরুদ্ধে জাতিবিদ্বেষের অভিযোগ আনে। ‘ফেয়ার হাউজিং অ্যাক্টের’ স্পষ্ট লঙ্ঘন। ট্রাম্প অবশ্য বরাবরই সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ১৯৭৫ সালে ট্রাম্পের কোম্পানির সঙ্গে রফায় আসে সরকার। ১৯৮৭ সালে নিজের আত্মজীবনী ‘আর্ট অব দ্য ডিল’-এ ওই ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। ওই মামলা চলার সময়ই গ্র্যান্ড হায়াত হোটেল নির্মাণে হাত দেন। ম্যানহাটানের গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল স্টেশনের কাছে পেন সেন্ট্রাল কোম্পানির কমোডোর হোটেল তখন লোকসানে চলছিল। ১৯৭৫ সালে ট্রাম্প হায়াত হোটেল কর্পোরেশনের সঙ্গে চুক্তি করে সেখানে নতুন হোটেল নির্মাণের কাজ শুরু করেন। হায়াতের ঝুলিতে তখনও কোনও বড় হোটেল ছিল না। দের স্কাটের নির্মাণ শৈলীতে ট্রাম্প সেখানে নির্মাণ করেন দৃষ্টিনন্দন এক কাচের ভবন। ১৯৮০ সালে গ্র্যান্ড হায়াত হোটেল খুলে দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। লোকসানি একটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসায়িক সাফল্য এনে দেওয়ায় ট্রাম্পের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সেই শুরু।

আর এখন? ট্রাম্প প্লেস, ট্রাম্প ওয়ার্ল্ড টাওয়ার, ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড টাওয়ার। সর্বত্র ডোনাল্ডের সম্পত্তির ছড়াছড়ি। নিউ ইয়র্কে ট্রাম্পের সিগনেচার টাওয়ারগুলিই অভিজাত হিসেবে গণ্য হয়। উচ্চতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাদের দামও আকাশছোঁয়া। আর শুধু দেশের মাটিই নয়, মুম্বাই, ইস্তানবুল, ফিলিপিন্সেও রয়েছে ট্রাম্পের সম্পত্তি। ২০১৫ সাল পর্যন্ত মিস ইউনিভার্স, মিস ইউএসএ, মিস টিন ইউএসএ-এই তিনটি সৌন্দর্য্য প্রতিযোগিতার মালিক ছিলেন তিনিই।

এসবের মাঝেই রয়েছে মিথ্যাচার, ব্যাবসায়িক অ-সাধুতার ফিরিস্তি। গত দু’দশকে ট্রাম্প পরিচালিত কোম্পানিগুলি, ট্রাম্প তাজমহল, ট্রাম্প হোটেলস অ্যান্ড ক্যাসিনোস বা ট্রাম্প এনটারটেনমেন্ট রিসর্টস ছ’বার নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। তালা ঝুলেছে ট্রাম্প এয়ারলাইনস, ট্রাম্প ইউনিভার্সিটি বা ট্রাম্প ম্যাগাজিন-এর মতো এক ডজনেরও বেশি সংস্থার। ট্রাম্প নিজে এবং তাঁর ব্যাবসা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গত তিন দশকে দায়ের হয়েছে সাড়ে তিন হাজার মামলা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বকেয়া মাইনে না পাওয়া কর্মীরা এবং সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা। কে না জানে, কানুনি প্যাঁচে নিজের আখেরটি গুছিয়ে ট্রাম্প সরে পড়েছেন। সম্প্রতি ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এ ফাঁস হয়ে যাওয়া ট্যাক্স রিটার্ন থেকে জানা গিয়েছে, এই দুর্দান্ত সফল ব্যবসায়ী ১৯৯৫ সালে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ক্ষতি দেখিয়ে পরবর্তী আঠেরো বছর কোনও ইনকাম ট্যাক্স দেননি। করফাঁকি দেওয়া ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ সামলাবেন? তবুও তাঁকে ঘিরেই স্বপ্ন দেখেছে আমেরিকানরা। আসলে পোড়-খাওয়া ব্যাবসায়ী ট্রাম্প সার সত্যটি বুঝতে পেরেছিলেন। সেই সত্যটি হল, মার্কিন সমাজের একটা বড় অংশ ইসলামোফোবিয়া, অভিবাসন, বেকারত্বের মতো নানাবিধ কারণে এতটাই ক্ষুব্ধ যে প্রচলিত রাজনীতির ব্যাকরণ অমান্য করেই তারা পাশা উলটে দিতে প্রস্তুত।

সেই ক্ষোভে জল না ঢেলে তাদের স্বপ্ন ভাঙতে কম উদ্যোগ নেয়নি বিরোধীরা। মস্করা করে নিউ ইয়র্কের সুপ্রশস্ত ইউনিয়ন স্কোয়ারে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল ট্রাম্পের প্রমাণ মাপের সম্পূর্ণ নিরাবরণ মূর্তি। ঠিক যেন হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের গল্পের উলঙ্গ রাজা! সান ফ্রান্সিসকো, লস অ্যাঞ্জেলেস, সিয়াটল এবং ক্লিভল্যান্ডেও বসানো হয়েছিল ঝুলে পড়া মধ্যপ্রদেশের উপরে দু’হাত ভাঁজ করে গম্ভীর মুখে, চিবুক উঁচু করে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীকে। মাথায় কায়দা করে আঁচড়ানো সোনালি চুলও বাদ যায়নি। বিতর্কে স্বামী ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছেন স্ত্রী মেলানিয়া। সম্প্রতি ফ্রান্সের একটি পত্রিকায় তাঁর কিছু পুরনো নগ্ন ছবি প্রকাশিত হয়েছিল। ছবিগুলি ১৯৯৫ সালে ম্যানহাটনে তোলা। তুলেছিলেন ফ্রান্সেরই এক চিত্রগ্রাহক। তখন অবশ্য স্লোভানিয়ার বাসিন্দা মেলানিয়া পেশায় মডেল। বয়স ২৫। ফ্যাশন দুনিয়ায় তাঁর পরিচিতি তখন ‘মেলানিয়া কে’ নামে। সেই ছবিগুলি নিউ ইয়র্ক পোস্ট পুনরায় প্রকাশ করে। ফলে বিতর্কে জড়িয়েছেন মেলানিয়া। প্রশ্ন উঠেছিল, এই মেলানিয়া হবে আমেরিকার ‘ফার্স্ট লেডি’?

ট্রাম্পের চেয়ে কম বর্ণময় নয় নতুন ফার্স্ট লেডির জীবন। আমেরিকায় এসেছিলেন মডেলিং করতে। সেখানেই একটি পার্টিতে আলাপ তাঁর থেকে অনেকটাই বড় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে। পোশাকি আলাপ প্রেমের সম্পর্কে বদলাতে সময় লাগেনি। কয়েক বছর পর জমকালো বিয়ে। আমেরিকার ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট জন কুইন্সি জোন্সের স্ত্রী লুইসা অ্যাডামসের পর ৪৬ বছরের মেলানিয়া ট্রাম্পই হলেন দ্বিতীয় ফার্স্ট লেডি যিনি বিদেশে জন্মেছেন। রিপাবলিকান কনভেনশনে ট্রাম্পের হয়ে নির্বাচনী প্রচারে দুর্দান্ত ভাষণে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন মেলানিয়া। তবে তা নিয়ে জলঘোলা হতেও সময় লাগেনি। অভিযোগ, মেলানিয়া যে বক্তৃতা করেছেন তা হুবহু মিশেল ওবামার ২০০৮-এর বক্তৃতার অংশবিশেষের নকল। অভিযোগ উড়িয়ে স্ত্রীকে প্রকাশ্যেই ক্লিনচিট ট্রাম্পের।

নির্বাচনের আগে প্রায় ১২ জন মহিলা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ এনেছেন। কখনও চুমু খাওয়ার অভিয়োগ, তো কখনও টাকার বিনিময়ে রাত কাটানোর প্রস্তাব। নারী-বিদ্বেষী বলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলই। যৌন হেনস্থার অভিযোগেও তিনি বারেবারে বিদ্ধ হয়েছেন। বেপরোয়া ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, এসবে যেন চুম্বকের মতো আকর্ষণ। নিজের আচরণের সমর্থনে ট্রাম্পের যুক্তি, ‘তুমি যদি তারকা হও, কেউ কিছু মনে করবে না। যা খুশি করতে পারো। আমার কাছে সৌন্দর্য হল আমি বেশ ধনী।’ এই ঔদ্ধত্যই তাঁর ‘ট্রেডমার্ক’৷ সেই ট্রাম্প এখন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি। তাঁর বৈবাহিক জীবনও ছাড় পায়নি। গোটা দুনিয়া জেনে গিয়েছে তাঁর বিয়ের গপ্প। নিজেই বলেন, প্রথম স্ত্রী চেক অ্যাথলিট ও মডেল ইভানা জেলনিকোভা উইঙ্কেল মেয়ারই ছিলেন তার কাছে সবচেয়ে ‘প্রিয়’। নিউ ইয়র্কের ফ্যাশন মডেল ইভানা ১৯৭২ সালের চেক অলিম্পিক দলের স্কি টিমে ছিলেন। ইভানা ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। গ্র্যান্ড হায়াত হোটেল ও প্লাজা হোটেল সংস্কারেও তাঁর ভূমিকা ছিল। এই দম্পতির তিন সন্তান— ট্রাম্প জুনিয়র, ইভাঙ্কা ও এরিক। ১৯৯০ সালে তাদের বিচ্ছেদ। ১৯৯৩ সালে মডেল মার্লা ম্যাপলসকে বিয়ে করেন ট্রাম্প। ছ’বছর পর ২০ লক্ষ ডলারের বিনিময়ে বিচ্ছেদের আগে তাদের ঘরে আসে কন্যাসন্তান টিফানি। মেলানিয়া নউসের সঙ্গে ট্রাম্পের বিয়ে হয় ২০০৫ সালে। সেই বিয়ের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অতিথি হয়েছিলেন হিলারি ও বিল ক্লিনটন। বয়সে ২০ বছরের ছোট মেলানিয়ার ঘরে একটি ছেলে আছে ট্রাম্পের, তার নাম ব্যারন উইলিয়াম ট্রাম্প। আদর করে ‘মিনি-ডোনাল্ড’ বলে ডাকেন মেলানিয়া।

trumptower

ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্নের কথা প্রথম প্রকাশ্যে আনেন ১৯৮৭ সালে। ১৯৯৯ সালে শুরু হয় তাঁর চেষ্টা। তবে ক্যালিফোর্নিয়া প্রাইমারিতে রিফর্ম পার্টির হয়ে বাজে ভাবে হারার পর তিনি প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করে নেন। ২০০৮ সালে বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ‘বার্থার’ আন্দোলনের জনপ্রিয় মুখপাত্রে পরিণত হন ট্রাম্প। ওই আন্দোলনে ওবামার জন্মস্থান নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রশ্ন তোলা হয়। ২০১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দেওয়ার পর বিপুল অর্থ সাহায্য করেন ট্রাম্প। ২০১৫-র জুনে আনুষ্ঠানিকভাবে রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার মনোনয়ন দৌঁড়ে নামেন ৭০ বছরের তরতাজা তরুণ!

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারের শুরু থেকেই ট্রাম্পের একমাত্র স্লোগানই ছিল শ্বেতাঙ্গদের পক্ষে। মার্কিন মুলুকের অভিবাসী থেকে কালো মানুষ কাউকে ছেড়ে কথা বলেননি। দীর্ঘ নির্বাচনী প্রচারে এত বেশি তিক্ততা আর নোংরা বাকযুদ্ধ, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রশ্নে এতটা বিভক্তি নিয়ে এর আগে কখনও আমেরিকানদের ভোটের বুথে যেতে হয়েছে কি না— সেই উদ্বেগও তাড়িয়ে বেরিয়েছে ভোটারদের। প্রায় ১৫ মাস স্থায়ী নির্বাচনী প্রচার শেষে আমেরিকা এখন প্রবলভাবে বিভক্ত এক দেশ। একদিকে শ্বেত আধিপত্যের অবসানে উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ রক্ষণশীল রিপাবলিকান সমর্থকরা, অন্যদিকে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের বাস্তবতা স্বীকার করে ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এক বহুজাতিক জোট।

নির্বাচনে যে বিষবাষ্প তৈরি হয়েছে তার দুর্গন্ধ আরও বহু বছর দেশটিকে সইতে হবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। আতঙ্কিত নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্টের মতো মার্কিন দৈনিকগুলি। তবুও মেনে নিতেই হবে জনগণের রায়। ভোটের দিন ট্রাম্পের সেই স্পষ্টতায় গলা মিলিয়েছে প্রায় অর্ধেক আমেরিকা। রায় ঘোষণার পর সিএনএনের ভাষ্যকার ভ্যান জোন্স বলেই ফেলেছেন, ‘আমরা সবাই এক অলৌকিক সম্ভাবনার অপেক্ষায় ছিলাম। তার বদলে আমরা পেলাম এক দুঃস্বপ্ন। একজন ভাড়াটে গুন্ডা দেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, এ কথা এখন আমরা কীভাবে নিজের ছেলেমেয়ের কাছে ব্যাখ্যা করব?’ এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ফাঁকেই হয়তো মার্কিন মুলুকে বিশ্বায়ন এবং বহুত্ববাদের মতো অনেক মিথের মৃত্যু হয়ে গিয়েছে।