ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

একদিন ক্লাসে এক ম্যাডাম আমাদেরকে আমেরিকার ষোড়শ প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের সেই চিঠিটি পড়ে আসতে বলেছিলেন যেটি তিনি তার সন্তানের জন্য প্রধান শিক্ষকের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন; কথামত আমরাও সেটি পড়ে গিয়েছিলাম ক্লাসে। পরের ক্লাসে তিনি এসে আমাদের কাছে জানতে চাইলেন আমরা কতগুলো মানবগুণ চিঠিটিতে পেয়েছিলাম। আমরা একেকজন একেক উত্তর দিচ্ছিলাম, কিন্তু ম্যাডাম বোর্ডে গোল দাগ দিয়ে সেটার ভেতরে লিখলেন ‘আব্রাহাম লিংকনের চিঠিতে মানবগুণ’, এরপর একেক করে সবাইকে বোর্ডে গিয়ে চিঠিটিতে যেসব গুণের কথা বলা রয়েছে তা থেকে প্রত্যেককে একটি করে লিখতে বললেন। একটি, দুটি, তিনটি এভাবে যখন লিখেই চলছিল তখন আমরা সত্যিকার অর্থেই চিঠিটি একটু একটু করে অনুধাবন করতে পারছিলাম। মনে মনে হাসছিলাম আর বলছিলাম যে, আমরা কতবড় বোকার কাতারে রয়েছি; কেবল একটা চিঠি বোঝার ক্ষমতা আমাদের নেই।

 

আমরা প্রথমেই যে গুণ খুঁজে পেয়েছিলাম সেটি হলো জ্ঞানার্জন করা, এটি প্রত্যেক আদর্শ মানুষের জন্য আবশ্যক। এরপরেই মি. লিংকন বলেছেন, প্রত্যেককেই ন্যায়পরায়ণ হতে হবে; পাশাপাশি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, আসলে সব মানুষই সত্যনিষ্ঠ নয়। আমরা যাদেরকে খারাপ মানুষ হিসেবে চিনে থাকি বা স্বীকৃতি দিয়ে থাকি সেটা অনেক সময় ভুল হয়ে থাকে বা আমরা যাকে বদ মনে করি তাদের দ্বারাও অন্যরা উপকৃত হতে পারে সেটা আমরা ভাবি না, আমরা ভাবি না তাদের মত এমন কেউ রয়েছে যে একজন বীরের ক্ষমতা রাখে, এমন ইঙ্গিত রয়েছে এ চিঠিতে। আমরা অনেকেই ভেবে থাকি যে, রাজনীতিবিদরা সর্বদা নিজের স্বার্থ দেখে চলেন, নিজের জন্য এরা যা খুশি তাই করতে পারে কিন্তু এদের পেছনেও কেউ না কেউ থাকে যারা সত্যিকার অর্থেই মানুষের পাশে দাঁড়ায় যা অগোচরেই থেকে যায়। আমাদের সবার এই রাজনীতির ওপরেও কম বেশি জ্ঞান থাকতে হবে।

 

আব্রাহাম লিংকন চিঠিটিতে অনেকটা এরকমই লিখেছিলেন, পাঁচটি ডলার কুড়িয়ে পাওয়ার চেয়ে একটি উপার্জিত ডলার অধিক মূল্যবান। এ বিষয়ে আমাদের প্রত্যেকেরই জ্ঞান থাকা জরুরি। সমাজে এক ধরনের মানুষ আছে যারা সব সময় অন্যের ধন-সম্পদের প্রতি লোভ করে থাকে, ওত পেতে থাকে কখন কাকে ঠকিয়ে বা ভয় দেখিয়ে অর্থকড়ি ও সম্পদ হাতিয়ে নেওয়া যায়; এ ধরনের মানুষদের জন্য এ কথাটি মানা ভীষণ জরুরি। আবার এটি আত্মনির্ভরশীল হতে ও নিজ সত্ কর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টিতেও সহায়ক।

 

আমরা অনেকেই আছি যারা কোনো পরাজয়কে খুব সহজে মেনে নিতে পারি না, পরাজয় নিয়ে আমাদের মনের মধ্যে নানান রকম নেতিবাচক চিন্তা কিংবা প্রতিপক্ষের প্রতি ক্ষোভ কাজ করে। অনেক সময় প্রতিহিংসার জেরে অপ্রত্যাশিত কিছু করে ফেলতেও দ্বিধা করি না, আবার কখনও পরাজিত ব্যক্তি নিজেকেই নিজে ক্ষত-বিক্ষত করে নানা পন্থায়; অনেক কিছু থেকেই নিজেকে আড়াল করে নেয়। এ সম্পর্কেও শিক্ষকের প্রতি অনুরোধ করে গেছেন কিভাবে পরাজয়কে মেনে নিতে হয় তা শেখানোর জন্য। কিভাবে বিজয়োল্লাস উপভোগ করতে হয় সে বিষয়েও শিক্ষা দিতে আব্রাহাম লিংকন শিক্ষককে অনুরোধ করে গেছেন, এ থেকেই বোঝা যায় পরাজয়কে যেমন মেনে নিতে হবে এবং বিজয়োল্লাসেরও একটা মাপকাঠি রয়েছে।

 

এছাড়াও তিনি শিক্ষকের কাছে আরো যেসব বিষয়ের ওপর সন্তানের শিক্ষালাভ করার প্রত্যাশা করেছিলেন তা হলো  কিভাবে দুঃখের মাঝে হাসতে হয়, কাঁদার মধ্যেও লজ্জা নেই একথা বোঝা, নির্দয় ও নির্মম মানুষদের ঘৃণা করতে শেখা এবং অতিরিক্ত আরাম-আয়েশ থেকে সাবধান থাকার কৌশল। তিনি চেয়েছিলেন শিক্ষক সন্তানের প্রতি সদয় আচরণ করুক তবে সোহাগ করা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করছিলেন। এই সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিশ্বাস করতেন  আগুনে পুড়েই ইস্পাত খাঁটি হয়। তিনি চাননি তার সন্তান খুব সহজেই কোনো কিছুতে অধৈর্য হয়ে পড়ুক বরং চিঠিতে অনুরোধ ছিল তার সন্তানকে শিক্ষক যেন ধৈর্য ধারণ করার সাহস জোগান। শেষের দিকে তিনি আবারও বলেছেন, নিজের প্রতি সন্তানের যেন সুমহান আস্থা থাকে আর এতেই তার সুমহান আস্থা থাকবে মানবজাতির প্রতি।
আব্রাহাম লিংকনের লেখা চিঠিটি যেমন একজন শিক্ষকের জন্য খুব মনোযোগ দিয়ে পড়া এবং সে অনুযায়ী কাজ করা উচিত, তেমনই উচিত একেকজন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সমাজের অন্য সদস্য, জনপ্রতিনিধি, কোনো প্রতিষ্ঠান প্রধানসহ সকল সাধারণ মানুষের। বহু ভাষায় অনূদিত এই চিঠিটিকে শুধুমাত্র একজন আব্রাহাম লিংকন এবং যাকে লিখেছিলেন সেই শিক্ষক কেন্দ্রিক চিন্তা করলে হবে না; এটি সকল অভিভাবকের প্রতিনিধিত্ব করছে। এছাড়া আমরা সাধারণেরা কি বুঝতে পারছি না যে, উপরের গুণগুলো সবার ভেতরই প্রোথিত করা উচিত? শ্রদ্ধা ও সম্মান রইল আদর্শ শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রতি।