ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

ছবি – রয়টার্স

কেউ যখন আমার উচ্চতর শিক্ষা স্তরের ডিসিপ্লিন জানতে চান তখন আমি স্বাভাবিক ভাবেই বলি ‘শিক্ষা’ কিংবা ‘শিক্ষা ও গবেষণা’। কখনও শিক্ষাবিজ্ঞানও বলি। ইংরেজিতে বলি এডুকেশন।

বেশিরভাগই পুনরায় প্রশ্ন করেন অথবা এ সম্পর্কে না বুঝেই মাথা নাড়েন আর বলেন  ‘ভাল’। একদিন আমাকে এক বন্ধু জিজ্ঞেস করেন, কিরে তোর অনার্সের সাবজেক্ট কী? উত্তর দিলাম, শিক্ষা। সৌজন্যতা দেখিয়ে বন্ধু বলল, ভাল। এবার আমি জিজ্ঞেস করলাম- বুঝে বলেছিস? বন্ধু ওর উত্তরে আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের আমার এক শিক্ষকও এই নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি তাকে বলেছিলাম, আমার বিষয় হল ‘বিএড’। আমাকে তিনি বলেন, “ও মাস্টার হবে নাকি?”

দুজনকেই পরে আমি আমার ডিসিপ্লিন সম্পর্কে যতটা সম্ভব বিস্তারিত বলেছি। অন্তত এতটুকু বোঝাতে পেরেছি যে, ব্যাচেলর অফ এডুকেশনে অধ্যয়ন করা মানে টিচার এডুকেশন বা শিক্ষক শিক্ষায় অধ্যয়ন নয়; শিক্ষক শিক্ষা হতে পারে এর একটি চ্যাপ্টার বা কোর্স।

তাদেরকে আমি বোঝাতে পেরেছিলাম, ‘শিক্ষা’ বিষয়টি সামগ্রিক শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করে আর ‘শিক্ষক শিক্ষা’ শিক্ষকতা এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের সঙ্গে জড়িত।

আমার চেনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের বেশ কিছু শিক্ষার্থীই ঠিক একই বিষয়ে মনঃক্ষুন্ন এই ভেবে যে, দেশের প্রধান একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান একটি ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী হয়েও এভাবে লজ্জায় পড়তে হয়।

কেনই বা লজ্জিত হবে না? এ বিষয়ে যে সাধারণ মানুষের একটি বিশাল অংশই অজ্ঞাত। জরিপে হয়ত এর পরিমান ৮০ বা ৮৫ শতাংশ পেরিয়ে যাবে। আর যারা একটু জানেন তারাও ভাবেন, কোথাও সুযোগ না পেয়েই এখানে ঠাঁই নিয়েছে এই নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীরা।

আমরা যারা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে আছি তাদেরও অনেকের মধ্যে এই একই ভাবনা কাজ করছে। মানুষের জানা প্রয়োজন, বেশির ভাগ শিক্ষার্থী শিক্ষায় পড়াশোনা করতে এসেছে বাধ্য হয়ে নয়, বরং সচেতন ভাবে নিজের ইচ্ছাতেই।

শিক্ষার শিক্ষার্থীরা দেশের মধ্যে নিজেদের আভিজাত্য দিনে দিনে রঙিন করেই চলেছে। শিক্ষক ও নিজেদের প্রচেষ্টায় দেশের বড় বড় আসনগুলো দখল করে নিচ্ছে যা আমাদের মত অনুজদের উৎসাহিত করে।

বাংলাদেশে  বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ সমূহে), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা ইনস্টিটিউট রয়েছে। যেসব ইনস্টিটিউট থেকে শিক্ষা বিষয়ের ওপর বিভিন্ন প্রোগ্রাম চালু রয়েছে যেমন, ব্যাচেলর অব এডুকেশন (১ বছর), ব্যাচেলর অব এডুকেশন (অনার্স), মাস্টার্স অব এডুকেশন (১ বছর), ঢাবিতে সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স ( ১ ও ২ বছর) ইত্যাদি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে এবং সেসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়মিত শিক্ষাবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল, পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করা হয়ে থাকে।

ডিসিপ্লিনটির পরিসর অত্যন্ত বিস্তৃত হবার পরও পরিচিতি তেমন না থাকার কারণে বাংলাদেশে শিক্ষার ওপর ডিগ্রিকে অনেকেই ‘শিক্ষক শিক্ষা’ বা ‘টিচার্স এডুকেশন’ বলে মনে করেন।

আসল কথা হল ‘শিক্ষক শিক্ষা’ হল শিক্ষাবিজ্ঞানেরই একটি অংশ। এ দুটি বিষয়ের মধ্যে যে পার্থক্য বিদ্যমান তা সহজে বোঝানোর জন্য আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে শিক্ষা এবং শিক্ষক শিক্ষা দুই নামে দুটি ডিগ্রি পরিচালনা করে। আমাদের দেশেও এমন ব্যবস্থা করলে মানুষের মধ্য থেকে বিভ্রান্তি দূর হবে। পাশাপাশি এর ক্ষেত্র সম্পর্কেও মানুষ জানতে পারবে। এর থেকেও বেশি ভাল হয় যদি আমাদের দেশে একটি শিক্ষা বিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।

শুধু কি এই বিষয় পরিচিতির জন্যই একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে? না, এটি আমাদের এখন প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দেশে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি চিকিৎসা, প্রকৌশল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং কৃষি বিষয়ক ভিন্ন ভিন্ন পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়। প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন কিছু উদ্দেশ্য। তবে কী ধরণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য বাংলাদেশে একটি শিক্ষা বিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন?

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মালয়েশিয়া, মিশরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিজ দেশের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বাইরের শিক্ষার্থীদেরও ডিগ্রি প্রদান করছে। বাংলাদেশের বহু শিক্ষার্থী-শিক্ষকরাও এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে থাকেন। তবে যারাই ডিগ্রি নিয়েছেন বা নিচ্ছেন তাদের অধিকাংশই নিজের খরচে নেননি। কখনও সরকার, আবার কখনও বা ওই বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর খরচ বহন করেছে।

সরকার যেহেতু দেশের ও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার স্বার্থে লাখ লাখ টাকা খরচ করে প্রতি বছরই এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানার্জনের জন্য শিক্ষার্থী পাঠায়, এ থেকেই এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের গুরুত্ব বোঝা যায়।

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নানা সময়ে নানা বিতর্কের মধ্য দিয়ে গেছে। এই বিতর্ক সৃষ্টির মূলে ভাল শিক্ষাবিশেষজ্ঞের অভাবকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখতে পারি। দেশি ও বিদেশি শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ও খুব ভাল এনে দিতে পারছেনা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়।

মাধ্যমিক পর্যায়ে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া হয় অথচ বেশিরভাগ শিক্ষকই জানেন না বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কীভাবে কাজ করতে হয়। যারা মোটামুটি জানেন তারাও নিজেদের জ্ঞানকে প্রয়োগ করতে পারছেন না উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাবে। যদি ভাল মানের প্রশিক্ষক তৈরি করা না যায়, তবে তারা ভাল মানের প্রশিক্ষণ পাবেন কীভাবে?

টিচার্স ট্রেনিং কলেজের ছাত্র হওয়ায় আমি দেখেছি, যারাই এখানে ভাল প্রশিক্ষণ দেয়ার চেষ্টা করেন তারা বিদেশ থেকে কোনো শিক্ষা বিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা শিক্ষার কোনো একটি বিষয়ে ডিগ্রি-প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন। এরপরও কিছু সংখ্যক রয়েছেন যারা কেবল ডিগ্রি নেওয়ার জন্যই নিয়েছেন।

ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এতে সরকারের অর্থের ক্ষতি হয়েছে। কারণ তারা নিজেদের অর্থে সে ডিগ্রি অর্জন করেননি। আবার অনেকে নিজেদের মেধার পরিচয় দিয়ে স্কলারশিপ পেয়েছে ওইসব প্রতিষ্ঠানে।

তবে এমন না যে, বিদেশে ডিগ্রি ছাড়া প্রশিক্ষকরা ভাল করছেন না। করছেন, তাদের সংখ্যা কম। কিন্তু তাদেরও তো প্রশিক্ষণের দরকার আছে।

আমার চেনা কিছু শিক্ষক ও প্রশিক্ষক রয়েছেন যাদের ক্লাস পারফরমেন্সই বিরক্তিকর। এরা যখন প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন তখন প্রশিক্ষণার্থীরা নিশ্চয়ই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এসব সমস্যা থেকে উঠে আসা সম্ভব হয় যদি প্রত্যেক শিক্ষক-প্রশিক্ষককে সঠিক ভাবে শিক্ষাবিজ্ঞানে দক্ষ করে তোলা যায়। আজ এ অভাববোধ হয়তো হতো না যদি আমাদের একটি  শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় থাকত।

শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি নতুন নয়, বেশ পুরোনো। বিভিন্ন শিক্ষাবিদদের মতামত ও সুপারিশ রয়েছে, কেউ কেউ তো রূপরেখাও তুলে ধরেছেন।

উচ্চশিক্ষার প্রসারে প্রতিটি জেলায় একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের। আর তাই বলছি, অন্তত একটি শিক্ষা স্পেশালিস্ট  বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হোক এবং সেটি হতে পারে বাংলাদেশের যে কোনো জেলায়।