ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

এবারও জামায়াতের ইফতার পার্টিতে যথারীতি বেগম খালেদা জিয়া হাজির সদলবলে, সাথে বেশ কিছু ‘মুক্তিযোদ্ধা’ নিয়ে। বিদেশি কূটনৈতিক, দেশিয় রাজনীতিক ও সর্বশেষ ভারতীয় প্র্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হুশিয়ারির পরও বেগম জিয়া জামায়াতের দেয়া ইফতারে প্রধান অতিথী হিসেবে যোগ দেন, তবে দেরি হবার কারণে কোন বক্তব্য দেননি। বক্তব্য দেয়ার প্রয়োজনও নেই। অনেকের ধারণা, উনি অনেক কিছু ছেড়ে দিতে রাজি হলেও জামায়াত সঙ্গ ছাড়তে নারাজ।

সাবেক সেনা শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলেই মূলত বাংলাদেশে জোটের রাজনীতি শুরু হয়। জোটবদ্ধভাবেই দু’টি প্রধান রাজনৈতিক দল পুরো আশির দশক জুড়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলন হয়েছিল যা একসময় সফলতা লাভ করে। আওয়ামি লীগের নের্তৃত্বে ১৫ দল ও বিএনপিকে সামনে রেখে আরো ৬টি ধর্মভিত্তিক দল গড়ে তোলে ৭ দলীয় জোট। কৌশলগত কারণে সে সময় স্বাধীনতাবিরোধি শক্তি জামায়াতে ইসলামি উভয় জোটের পাশাপাশি যুগপৎ আন্দোলন করে। এ সময় জামায়াত উভয় জোটের কাছ থেকেই অনেক ছাড় পায়। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি দেশের মাটিতে শেকড় মাটির অনেক গভীরে প্রোথিত হয়।

এ বাংলাদেশে অবশ্য প্রথম জোটভিত্তিক প্রথম নির্বাচন হয় ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে। ঐ নির্বাচনে হক-ভাসানি-সোহরাওয়ার্দির যুক্তফ্রন্ট পাকিস্থানের ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে বিপুল বিজয় লাভ করে।

১৯৯০ সালে সেনা শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের ক্ষমতা হস্তান্তরের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনেই স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম রাজনৈতিক জোট ভোটের রাজনীতি শুরু হয়। আট দলকে সাথে নিয়ে আওয়ামি লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। অন্যদিকে, বিএনপি ৭ দলীয় জোট নিয়ে অংশ নেয়।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে অনেকটা অভাবিত ভাবেই বিএনপি জয়লাভ করে। বিএনপি’র সাথে সে সময় সরাসরি জামায়াত ভোটের ব্যাপারে জোটবদ্ধ হয়নি। তবে, সকলেই জানেন, পর্দার আড়ালে বিএনপি বেশ কিছু আসনে ও জামায়াত একইভাবে বিএনপিকে কিছু আসনে ছাড় দেয়। আর এ কারণেই সে আসনগুলোতে বিএনপি বা জামায়াত অল্প ভোটের ব্যবধানে আওয়ামি লীগের বা ৮দলীয় জোটের প্রার্থীকে হারিয়ে দেয়। আওয়ামি লীগ যেখানে নিশ্চিৎ জয় দেখছিল সেখানে এ হঠাৎ পরাজয়। আওয়ামি লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা সে নির্বাচনের ব্যাপারে তখন প্রশাসনিক (সেসময় প্রশাসনে জাতীয় পার্টির প্রভাববলয় বিএনপিকে সহযোগিতা করেছে বলে কানাঘুষা রয়েছে) সহযোগিতা ও বিএনপি-জামায়াতে গোপন সমজোতাকে ‘সুক্ষ কারচুপি’র নির্বাচন বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

বিএনপি ‘কার্যকর’ এক জোট করেছে আন্দোলন ও ভোটের রাজনীতিে যেখানে পুরোপুরিই উপেক্ষিত হয়েছে সামপ্রদায়িক শক্তির উত্থান, উপেক্ষিত হয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিকাশ। বিএনপির এ জোটের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশী উপকৃত হয়েছে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও একশ্রেনীর কপট স্বার্থপর একশ্রেনীর সুবিধাভোগী শ্রেনী। এ শ্রেনী না রাজনীতিক না ব্যবসায়ি। এরা খুব সহজেই রঙ পাল্টাতে পারে, পারে পরবর্তী সরকারের সাথে মিশে যেতে।

১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমানের রাজনীতির বিধান সম্বলিত বিধি তৈরি করেছিলেন যার দ্বারা দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি শুরু হয়। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ১৯৭৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আওয়ামি লীগ সমর্থণ করেছিল মুক্তিযুদ্ধের সামরিক প্রধান আতাউল গণি ওসমানিকে। কিন্তু, সবাইকে অবাক করে দিয়ে ভোটের হিসেবে হাফেজ্জি হুজুর ওসমানির প্রায় কাছাকাছি অবস্থানে ছিল। ধর্মভিত্তিক দলগুলো হয়ে উঠে উজ্জ্বেবিত। একবছরের চেয়েও কম বয়সি নয়া সংগঠন হেফাজতে ইসলাম ২০১৩ সালের ৫ই মে মহাসমাবেশ করে সরকারকে অনেকটা বেকায়দায় ফেলে দিয়েছিল। এ সমাবেশে মুলতঃ জামাতি ক্যাডার পুরো ঢাকা শহরে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। যদিও সমাবেশের অধিকাংশ অংশগ্রহণকারিদের বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে আনা হয়। পাশাপাশি হেফাজতে ইসলামের কয়েকজন শীর্ষ নেতা আবার বিএনপি নের্তৃত্বাধীন জোটের কয়েকটি ইসলামি দলের নেতা।

ভোটের রাজনীতিতে বিএনপি ও আওয়ামি লীগের ভোটের শতকরা হার খুব কাছাকাছি। বিএনপি ও জামায়াতের প্রোপাগান্ডার কাছে আওয়ামি লীগের নেতা-কর্মিরা কখনো কখনো অসহায় বোধ করে। জামায়াতের রাজনীতির মূল ভিত্তিই হলো প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যাচার। স্বাধীনতার অনেক আগে থেকেই জামায়াতের এ মিথ্যাচার। ৭৫ পরবর্তী বিএনপি শাসনামলে জামায়াতসহ অন্যান্য ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতি করার সুযোগ পায়।

এটি অত্যন্ত সত্যি কথা যে, ভোটের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলগুলো বিরাট অনেক এগিয়ে। দেশের রাজনীতিতে বাম ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটের সংখ্যা একেবারেই নেই। এ দলগুলোতে বড় বড় নেতা আর তার চেয়েও বড় বড় বুলি আছে, কিন্তু ভোটের বাক্স একেবারেই শুন্য। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন উত্তর ও দক্ষিণের নির্বাচনে (২০১৫) বাম সংগঠনগুলোর প্রার্থিদের, উত্তরের জাসদ সমর্থিত প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। এ দলগুলোকে নিয়ে অাওয়ামি লীগ শুধুমাত্র সংখ্যাটাই বৃদ্ধি করে।

আওয়ামি লীগ জাসদ, ন্যাপ, ও আরো নামগোত্রহীন কয়েকটি দল নিয়ে ভোটে অংশগ্রহণ করে। আওয়ামি লীগের ভোটেই অন্যদলগুলোর নেতারা নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামির ভোটের সংখ্যা বলে দেয় বিএনপি কেন জামায়াতকে জোট থেকে বের করে দিতে নারাজ। ঐ নির্বাচনে জামায়াতের দুই শতাংশেরর কাছাকাছি ভোট পায় এবং এটাই মুলতঃ জামায়েতের ভোটশক্তি। আর জামায়াতের এ ভোটশক্তির কারণেই বিএনপি দু’বার নির্বাচনে জয়লাভ করে।

১৯৭১ সালে সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াত নেতাদের বিচার শুরুর পর থেকেই জামায়াত নিজেদের অস্তিত্বের প্রশ্নে মারমুখী অবস্থান নেয়। শুরুতে বিএনপি চুপ করে থাকে। জামায়াত-শিবির প্রশ্রয় পায় এবং ওরা হয়ে উঠে আরো ভয়ঙ্কর। বিএনপি কোন ভাবেই জামায়াতের এই ভোট ব্যাঙ্ক হারাতে চায় না। অন্যদিকে, আওয়ামি লীগও বিশ্ব প্রতিষ্ঠা করতে করতে পেরেছে যে জামায়াত একটি অপশক্তি। যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যুতে ২০১০ সাল থেকেই কোণঠাসা অবস্থায় আছে জামায়াত। নানামুখী তৎপরতা চালানোর পরও, চাপ না কমে আরও বেড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর এক সময়কার মিত্র যুক্তরাষ্ট্রেরও জামায়াতের বিষয়ে মনোভাব পরিবর্তিত হয়েছে। সরকারের কঠোর মনোভাবের কারণে কর্মসূচি ঘোষণা করেও তা পালন করতে পারছে না। ২০১৩ সালে বছরব্যাপী সহিংসতায় জড়িয়ে সাংগঠনিক শক্তিও খর্ব হয়েছে। শীর্ষ নেতৃত্বসহ সক্রিয় নেতাকর্মীর অধিকাংশ কারাগারে থাকায় ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে জামায়াত। ২০০২ সালে জামায়াতকে ‘গণতান্ত্রিক ইসলামিক দল’ বলে আখ্যা দেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জার্নাল ‘ব্যাকগ্রাউন্ড’-এ। কিন্তু গত ১৩ বছরে জামায়াতের বিষয়য়ে অবস্থান বদলে গেছে বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি দেশটির। গত ৩০ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ ‘হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকমিটির শুনানিতে’ জঙ্গিবাদ ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের জন্য জামায়াতকে দায়ী করা হয়। শুনানিতে জামায়াতের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট কিছু অভিযোগ তুলে ধরা হয়। এর আগে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টে বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করারও দাবি করা হয়। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের পদক্ষেপে বেশি চাপে পড়ে জামায়াত।

আওয়ামি লীগ এখানে তার অবস্থান হাবে-ভাবে পরিস্কার করেছে যাতে বিএনপি আর কখনোই ভোটের রাজনীতিতে জামায়াতকে কাছে না রাখতে পারে। বৃটেনসহ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও ভারতকে দিয়ে বিএনপির উপর চাপও সৃষ্টি করাতে সক্ষম হয়েছে যাতে করে বিএনপি জোট থেকে বের করে দেয়। তবে, বিএনপি’র অধিকাংশ নেতা-কর্মিই মনে করেন, লোক দেখানোর জন্যে হলেও জোট থেকে জামায়াতকে আপাতত দুরে সরিয়ে রাখবে। নির্বাচনের সময় দু’দলের মধ্যে ঠিকই গোপন সমজোতা হবে। বিএনপি কোনভাবেই জামায়াতের ভোট হারাতে রাজি নয় এবং অপরদিকে, জামায়াত বিএনপি’র সহায়তায় সংসদে কম করে হলেও ১৫ থেকে ২০টি আসন জিতে নেয়া। এখানে বিএনপি ও জামায়াত একে অপরের পরিপুরক।

আওয়ামি লীগ আরো একটি বিষয় নিশ্চিৎ করতে চায় যে জাতীয় পার্টি নির্বাচনের সময় আওয়ামি লীগের সাথেই জোটবদ্ধ থাকে। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিকে আওয়ামি লীগ বা বিএনপি বিশ্বাস করে না। এ কারণেই উভয় দলই ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এরশাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হয়নি। লোভ দেখিয়ে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মিদের সামলে রাখে। লোভ দেখিয়ে কাজ না হলে প্রয়োজনের সময় যাতে এরশাদকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে নিজেদের কক্ষপথে রাখা যায় সে কারণেই মূলতঃ মামলাগুলো জিইয়ে রাখা। বার বার চেষ্টা করেও এরশাদ ও জাতীয় পার্টি একলা চলতে পারেনি শুুধুমাত্র ১৯৯১ সালের নির্বাচন ছাড়া।

জোটবদ্ধ রাজনীতি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে সকল দেশেই লক্ষ্য করা যায়। ভোটের সময়ই দলগুলো জোটবদ্ধ হয়। অন্য দেশগুলোতে সরকারবিরোধী আন্দোলনের জন্যে জোটের দেখা না গেলেও ভোটের রাজনীতিতে লক্ষ্যনীয়। ভারতে আঞ্চলিক দলগুলোর সাথেই প্রধান দু’টো দল জোটবদ্ধ হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ভোটের রাজনীতি করে।

বাংলাদেশেও দেশকে বা দেশের স্বার্থকে উপেক্ষা করে জোটবদ্ধ হয়। পুরোটার পেছনে জনগণের স্বার্থ থাকে না, থাকে ক্ষমতায় যাবার স্বার্থ। আরো নির্দিষ্ট করে বলা যায় ব্যক্তিস্বার্থ।

দেশের রাজনীতিকে এ ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রীক জোট বা মহাজোট যাই বলা হোক না কেন, বেরিয়ে আসতে হবে। জোট হতে হবে আদর্শকেন্দ্রীক, দেশ ও জনগণের স্বার্থে।