ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, রাজনীতি

 

কাগজে-কলমে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টি যে’টির চেয়ারম্যান সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। কাগজ-কলমে বলার কারণ হলো গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ায় জাতীয় পার্টি ৪০টি আসন লাভ করে। এর মধ্যে কয়েকটি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নির্বাচিত হওয়া সাংসদও রয়েছেন।

জাতীয় পার্টি হঠাৎ করেই আবার আলোচনায় উঠে আসে। গত রোববার পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ তাঁর নির্বাহি ক্ষমতাবলে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন এবং একই সংবাদ সম্মেলনে জানান, তাঁর অবর্তমানে ছোট ভাই জি এম কাদেরই দলের হাল ধরবেন। কো-চেয়ারম্যান নামে কোন পদ দলের গঠনতন্ত্রে নেই। সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ জানিয়েছেন, পরবর্তি সম্মেলনের গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে পদটি সৃষ্টি করে তা অনুমোদন করিয়ে নেয়া হবে। একই সম্মেলনে এরশাদ দলের কাউন্সিল প্রস্তুতি কমিটির সদস্যসচিব পদে রুহুল আমিন হাওলাদারকে মনোনীত করেন। রুহুল আমিন হাওলাদার আবার দৃশ্যপটে ফিরে আসেন। এর পূর্বে এরশাদ একবার আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও প্রায় দু’বছর আগে সরকারের চাপে জিয়াউদ্দিন বাবলুকে মহাসচিব পদে নিয়োগ দেন যা প্রত্যেক নেতা-কর্মিই মেনে নেন।

04_Ershad_181113

স্বাভাবিকভাবেই সংসদের বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ তা মেনে নেননি। তাঁর আস্থাভাজন নেতাদের একত্রিত করে নিজেকে ‘ভারপ্রাপ্ত’ চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেন। এ কাজে অতি উৎসাহি ছিলেন জিয়াউদ্দিন বাবলু ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। একসময় এ দু’জনই এরশাদের মূল মন্ত্রণাদাতা হিসেবে কাজ করেছেন যাতে দলটি নির্বাচনের সময় আওয়ামি লীগের সাথে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করে। তাঁরা দু’জন সফলও হয়েছেন ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় যখন বেগম রওশন এরশাদ বিএনপি’র সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করেছেন।

জাতীয় পার্টির এ ‘গৃহদাহ’ শুরু হয়েছে ২০১৩ সালের নির্বাচণের সময়। এরশাদের দোদূল্যতা আওয়ামি লীগকে কিছুটা সঙ্কটে ফেলেছিল যখন নিশ্চিৎ হলো বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। এক্ষেত্রে জাতীয় পার্টিই ছিল একমাত্র ভরসা। এরশাদকে ‘অসুস্থ’ বানিয়ে সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে রওশন এরশাদকে সামনে নিয়ে আসে সরকার, সাথে যোগ দেন এরশাদের দু’ ‘অনুগত’ নেতা বাবলু ও আনিস। এরশাদের নির্বাচন ‘বয়কট’র আহ্বান অধিকাংশ নেতা-কর্মি মেনেও নেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

সকলেই বলেন, এরশাদ সব সময় যে কথা বলেন সেটির স্থায়িত্ব থাকে না। সকালে এক কথা বলেন তো বিকেলে আর এক কথা বলেন। এরশাদ নিজেও এটা স্বীকার করে বলেন, কথাটি কিছুটা সত্য। আসলে এরশাদের জাতীয় পার্টির এরশাদের হাতে নেই। অনেকেই মনে করেন ‘নাটাই’ এখন বেগম রওশন এরশাদের হাতে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক তা মনে করেন না। তাঁরা মনে করেন, এরশাদ আসলে বন্দি। তাঁর মৃর্ত্যূর আগ পর্যন্ত তাঁর এ বন্দিদশা কাটবে না। আওয়ামি লীগ ও বিএনপি, দু’দলেরই নির্বাচনি দাবার গুটি। মামলা ও জেলের ভয়ে এরশাদ পুরোটাই মেনে নেয়ার ভান করেন। সরকার রওশন এরশাদকে সামনে নিয়ে এসে পরিস্থিতি এরশাদের জন্যে আরো জটিল হয়ে পরে। এক পর্যায়ে সরকারের চাঁপে রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে জিয়াউদ্দিন বাবলুকে বাধ্য হয়ে মহাসচিব নিয়োগ দেন। বাবলু চেয়েছিলেন মন্ত্রী হত, সরকার তাঁকে বানালো বিরোধী দলের মহাসচিব।

সরকারে থেকেও বিরোধী দলের তকমা তৃণমূলের নেতা-কর্মি, জনগণ ও দলের সমর্থকরা স্বাভাবিকভাবে নেননি। এরই প্রভাব পরেছে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা নির্বাচনে। অধিকাংশ স্থানে এক শতাংশ ভোট পায়নি। সারাদেশের ২৩৪টি পৌরসভার মেয়র পদের মধ্যে মাত্র একটি আসনে জয়লাভ করে বর্তমান সময়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল। অন্যদিকে, গত তিন বছরে গণবিরোধী আন্দোলন করার পরও বিএনপি ত্রিশের অধিক আসনে জয়লাভ করে।

টনক নড়ে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের। নিজের গড়া দলটি আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নেতারা সরকারি সিদ্ধান্তে চলে, স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি দলের প্রার্থীকে সমর্থন করে। তৃণমূল পর্যায়ে জাতীয় পার্টি ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। তৃণমূলের নেতা-কর্মিরা মনে করেন, দলকে বাঁচাতে হলে সরকারের বাহুলগ্ন হয়ে থাকা চলবে না।

এরশাদের বয়স হয়েছে। বার্ধক্য তাঁকে কাবু করেছে; এর চেয়েও বেশী কাবু জেলের ভয়। এ মুহুর্তে সরকারও চাইবে না জাতীয় পার্টির উপর নিয়ন্ত্রণ আলগা করতে। সামনেই জাতীয় সংসদের নির্বাচন। তার আগে দু’মাসের মাথায় কয়েক হাজার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। জাতীয় পার্টি আরেকবার নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য দেখতে চায়। সরকারের বাহুবন্দি অবস্থায় নির্বাচনে অংশ নিলে অন্য নির্বাচনের ফলাফলই আসবে। আর, সরকার যদিও বারবার বলে আসছে ২০১৯ সালে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হলেই নির্বাচন। কিন্তু, দ্রুত নির্বাচনের প্রশ্নে রয়েছে সরকারের উপর বিভিন্ন পক্ষের চাপ। সরকার এ চাপ মোকাবেলা করে যদি ২০১৯ সালেই নির্বাচন করে তবে জাতীয় পার্টি বেশ কিছুটা সময় পাবে নিজেদের গুছিয়ে নিতে পারবে। এরশাদ সম্ভবত এটাই চাচ্ছেন তাঁর জীবনে শেষ নির্বাচনে যা তিনি একাধিকবার বলেছেন।

এ কথা অনস্বীকার্য যে জাতীয় পার্টি ১৯৯১ সালের পর থেকে যখনই নিজেদের দ্বারা চালিত হওয়ার চেষ্টা করেছে তখনই হয় এরশাদকে জেলে যেতে হয়েছে নতুবা দল ভেঙ্গে গেছে। বাকি সময়টা জাতীয় পার্টি সরকার দিয়েই পরিচালিত হতো (বিএনপি ও আওয়ামি লীগ, দু’দলই পালা করে জাতীয় পার্টি পরিচালিত করেছে)।

ক্ষমতা হারানের পর থেকেই জাতীয় পার্টি হাজারো নাটকের জন্ম দিয়েছে। তবে, ২০১৩ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নে জাতীয় পার্টির মঞ্চস্থ নাটকটি ছিল নানা নাটকীয়তা, হাসি-কান্নায় পরিপূর্ণ। এরশাদ আত্মহত্যার হুমকিও দিয়েছিলেন।

এবারের হঠাৎ আলোরিত জাতীয় পার্টির এ অবস্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে বা নিদেন পক্ষে দলীয় রাজনীতিতে কোন পরিবর্তন আনবে তা সময়ই বলে দেবে।