ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

একটি জাতির রক্তাক্ত অভ্যূদয় কখনোই মসৃণ পথে হয় না, বাঙালি জাতিরও হয়নি। হাজার বছরের পরাধীনতার শেকল ছিঁড়ে প্রথম জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বাঙালি জাতিকে দিতে হয়েছে এক সাগর রক্ত। স্বীকার করতে হয়েছে অফুরন্ত বলিদান। বিশ্ব ইতিহাসে এমন নজির কোন জাতিই স্থাপন করতে পারেনি। বৃটিশ উপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকল থেকে মুক্ত হয়ে বাঙালি জাতি নিজ সত্ত্বাকে বিসর্জন দিয়ে পাকিস্তানের নব্য উপনিবেশের শেকল পরে নিয়েছিলো ফুলের মালা ভেবে। কিন্তু সেই বিভ্রম ছুটে যেতে বেশীদিন লাগেনি। তবে নয়া উপনিবেশের শাসকগোষ্ঠী ধর্মের বাতাবরন ব্যবহার করে তাদের শোষণ শাসন দীর্ঘায়িত করতে সক্ষম হয়। যাতে স্বাধীনতাকামী বাঙালির শোনিতধারা প্রলম্বিত হতে থাকে। বায়ান্নের ভাষা শহিদদের রক্তধারা বাঙালি জাতির স্বাধীনতার স্পৃহাকে বেগবান করে তোলে যাতে বিশ্বব্যাপী দেশে দেশে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের বিজয় সমূহ বাঙালি জাতির প্রেরণা হয়ে ওঠে।আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের প্রশ্নে বাঙালির জাতীয় ঐক্য একশিলা পাথরে পরিণত হলে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী নৃশংসভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঙালি জাতির ওপর বিশ্বর শক্তিধর সেনাবাহিনী নিয়ে। কিন্তু পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বাঙালির স্বাধীনতার স্পৃহাকে পরিমাপ করতে ব্যর্থ হয়। বাঙালি জাতি মরণপণ অসম যুদ্ধে সামিল হয় এবং পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীসহ সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে অল্প দিনে।দীর্ঘ নয় মাসের গেরিলা যুদ্ধে ত্রিশলাখ সন্তান হারিয়ে ও দু’লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাঙালি জাতি প্রতিষ্ঠা করে প্রথম জাতিরাষ্ট্র।

ওপরে আমি যে সরলীকরন করেছি তা শুধু সারমর্ম এবং যে কেউ তা সহজে করতে পারে। কিন্তু আমরা জানি বাঙালি জাতির স্বাধীনতার্জন কোনভাবেই সরল পথে আসে নি।নিজেদের শাসন-শোষণকে বলবৎ রাখার জন্য শাসকগোষ্ঠী বলপ্রয়োগের পাশাপাশি ধর্মানুভূতিকে ব্যবহার দানবীয় গণহত্যা সংঘটিত করে। বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে কন্টকিত করার লক্ষ্যে ধর্মান্ধ জাতিদ্রৌহী রাজাকার আলবদর আলশামস নামক জল্লাদ বাহিনী গঠন করে বাঙালি নিধনে লেলিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু বাঙালি জাতির অদম্য স্বাধীনতাস্পৃহার কাছে সকল নৃশংসতা পরাভূত হয় একাত্তরে। বাঙালি জাতি অর্জন করে হাজার বছরের আরাধ্য প্রথম জাতিরাষ্ট্র। কিন্তু পরাজিত দেশীয় জাতিদ্রৌহী গোষ্ঠীকে সমূলে বিনাশ না করার অদূরদর্শি রাজনৈতিক ভুলের মাশুল জাতিকে গুণতে হয়েছে বিগত চল্লিশটি বছর। মুক্তিযোদ্ধা নামধারী ক্ষমতালিপ্সু দল,ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলো স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করে বাংলাদেশকে কার্যতঃ পাকিস্তানের বশংবদ রাষ্ট্রে পরিণত করে, স্বাধীনতার মৌলনীতিকে আমূল বদলে ফেলে এবং ধর্মান্ধ উন্মাদনার রাজনৈতিক শক্তির বিকাশের মাধ্যমে বাঙালি জাতির স্বপ্ন চুরমার করে দেয়া হয়। স্বাধীনতাবিরোধীরা ক্ষমতাকেন্দ্রে চলে আসে। ত্রিশলাখ শহিদের রক্তের সাথে বেঈমানী করা হয় এবং ভূলুন্ঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। যা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।

২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। ট্রাইব্যুনাল একে একে গোলাম আজম, আবদুল কাদের মোল্লা, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী প্রমুখদের বিচার সম্পন্ন করে। জল্লাদবাহিনী আলবদরের নৃশংস কসাই জামাতের সেক্রেটারী জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদ ও বৃহত্তর চট্রগ্রামের ত্রাস তৎকালীন মুসলিম লীগের ও বর্তমান বিএনপি’র গাগু নেতা সাকা চৌধুরীর চুড়ান্ত বিচারের মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনাল জাতির ওপর রক্তঋণ শোধ করার যে দায় ছিলো তা অনেকাংশে শোধ করতে সক্ষম হয়েছে। এখন বাকী আছে আলবদর বাহিনীর প্রধান বর্তমান জামাতের আমীর মতিউর রহমান নিজামী ও মকবুল হোসেনসহ আরো কিছু দুধর্ষ যুদ্ধাপরাধী। আশা করি এদের বিচার সম্পন্ন করে ট্রাইব্যুনাল জাতিকে কলংকমুক্ত করবে। অতঃপর বাকী থাকবে যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক দল জামাতে ইসলামীসহ অন্যান্যদের রাজনীতি চিরতরে নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশকে ত্রিশলাখ শহিদের স্বপ্নের ধারায় ফিরিয়ে এনে সকল রক্তঋণ শোধ করা। আর তারপরই বংলাদেশ ও বাঙালি জাতি মাথা সমুন্নত করে দাঁড়াতে পারবে।

 

***
যুক্তরাষ্ট্র।