ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এম মুনিরুজ্জামান-এর একটি সাক্ষাৎকার প্রথম আলো’য় প্রকাশিত হবার পর বিষয়টি নিয়ে একটু কথা বলতে ইচ্ছে হলো বলে কলম ধরলাম। যদিও জনাব মনিরুজ্জামানের মতো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সাক্ষাৎকার গ্রহনকারী মিজানুর রহমান খান ভাইয়ের মতো ধীশক্তি আমার নেই তবু একজন সচেতন মানুষ হিসেবে আমাদের জাতীয় জীবনে ক্রমবর্ধমান উগ্র ধর্মীয় জঙ্গীবাদের কারনে সৃষ্ট উৎকন্ঠা ও শংকার বিষয়টি অন্য সকলের মতো আমাকেও উৎকন্ঠিত করেছে। কারন ধর্মের বাতাবরনে যে গতিতে মৌলবাদী জঙ্গীগোষ্ঠী আক্রমণাত্বক হয়ে উঠছে তাতে উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় নেই।

আমি জনাব মুনিরুজ্জামানের সাথে একমত যে, সাম্প্রতিক সময়ে মৌলবাদী আক্রমণগুলো ট্র্যাডিশনাল কৌশল ভেঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে আর তা হলো সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ। অতীতে বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বরাবরই হিংসাত্বক আচরণ করেছে এবং এজন্য বহু প্রাণ ঝরে গেছে। কিন্তু সেসব আক্রমণের পেছনে ক্ষমতার রাজনীতির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক কখনোই দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি। যদিও নোংরা রাজনীতির পরোক্ষ উসকানি সম্পর্কে কোন সন্দেহ ছিলো না। পাকিস্তানে নষ্ট রাজনীতির ক্রীড়নকরা ধর্মীয় উত্তেজনা জিইয়ে রাখার মাধ্যমে বিভাজনের ক্রুর নীতি অনুসরন করে আহমদিয়া ও শিয়া সম্প্রদায়ের ওপর ধারাবাহিক সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়েছে ক্ষমতার হালুয়া-রুটির ভাগ পাতি উগ্র রাজনৈতিক দলগুলোকে দিয়ে।কিন্তু ভারতে অঞ্চল ভেদে ধর্মীয় সন্ত্রাস চালিত হলেও তা রাষ্ট্রব্যাপী পরিব্যাপ্ত হয় নি।

বাংলাদেশে উগ্র ধর্মীয় রাজনীতির ব্যাপক বিস্তার ঘটে সাতাত্তর সালে জিয়াউর রহমানের রাজনীতি পুনরুজ্জীবন বিলের মাধ্যমে যা স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করে। পরবর্তীতে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য চিন্হিত স্বাধীনতাবিরোধীদের মন্ত্রিত্ব দেয় এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিষবাষ্প শিক্ষাঙ্গন থেকে সমাজের সর্বস্তরে বিস্তার লাভ করে অস্ত্র ও অর্থের জোরে। পরবর্তীতে এরশাদও জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে যা উগ্র মৌলবাদী রাজনীতির পথ অনেক প্রশস্ত করে দেয়। নব্বুইয়ের গণঅভ্যূত্থানের মাধ্যমে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে একই ধারা বজায় রাখে এবং ধর্মীয় জঙ্গীবাদ নানান নামের আবরনে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে।

পঁচাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি একাত্তরের রক্তস্নাত বাংলাদেশের সকল অর্জনকে ভূলুন্ঠিত করে এবং স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিগুলোকে চরম দুর্যোগের ভেতর দিয়ে যেতে হয় যার বিক্ষুব্ধ প্রতিফলন ঘটলো ২০০৮ সালের নির্বাচনে। মৌলবাদী জঙ্গীদের উত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবমাননার বিরুদ্ধে দেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। আওয়ামী লীগও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আদালত গঠন করে বিচার কাজ শুরু করে এবং অনেক চিন্হিত যুদ্ধাপরাধীদের জেলে ঢোকায়। আর তখন থেকে মৌলবাদী দলগুলো মরিয়া হয়ে ওঠে সরকারকে উৎখাতের জন্য। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ যুদ্ধাপরাধীদের অন্যতম দল জামাত আফগান ফেরৎ মুজাহিদদের সাথে ঘনিষ্ট যোগাযোগ স্থাপন করে এবং কক্ষচ্যুত বিএনপি তাতে ইন্ধন জোগাতে থাকে। খন্ড খন্ড আক্রমণ পরিচালনার মাধ্যমে জঙ্গীগোষ্ঠীগুলো নিজেদের মারখুীনতাকে শানিত করে তোলে যাতে রাষ্ট্র এবং সমাজে ভীতির বিস্তার ঘটে। যার প্রতধ্বনি জনাব মুনীরুজ্জামান সাহেবের কথাতেও পরিষ্কার। এটা এখন অত্যন্ত স্পষ্ট যে, মৌলবাদীরা সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার যে কৌশল নিয়েছে তাতে রাষ্ট্র গোষ্ঠীগত সংঘাতের এক ভয়াবহ সংকটে পড়তে চলেছে।

একটি আপাতঃ স্থিতিশীল দেশে ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করা কোন সুস্থ মানুষ ও রাজনৈতিক দলের কাম্য হতে পারে না। সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রেক্ষাপটে অবদমিত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে দানবীয়রুপে আবির্ভূত ইসলামী স্টেট-এর আদলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণাত্বক হয়ে উঠেছে। এর একটাই উদ্দেশ্যঃ দেশে গোষ্ঠীগত সংঘাত ছড়িয়ে দিয়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা। এক্ষেত্রে জেএমবি ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিম-এর নাম ব্যবহার করা হলেও নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে রাজনৈতিকভাবে চাপে পড়া ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো এবং তাদের পৃষ্ঠপোষক দেশীয় রাজনৈতিক দলগুলো।

এটা এখন অনস্বীকার্য যে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক প্রাধান্য বিস্তারের প্রতিযোগিতার সাথে আল কায়েদাকে কোণঠাসা করে ইসলামী স্টেট-এর অভ্যূদয়ের পেছনে সুগভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে। আল কায়েদার লক্ষ্যবস্তু ছিলো মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্র ও তাদের পৃষ্ঠপোষক পশ্চিমা দেশসমূহ। আমেরিকায় আল কায়েদার হামলা ও তৎপরবর্তীতে আফগানিস্থান ও ইরাকে হামলা, সাদ্দাম ও গাদ্দাফি নিধন, ইরাকে শিয়া প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা, সিরিয়া ও ইয়েমেনে শিয়া শক্তির উত্থান এবং ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসন সবকিছু মিলিয়ে সৌদি ও ইরানের প্রভাব বিস্তারের দ্বন্ধ চরম আকার ধারণ করে। স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র ও ইরানের সাথে পশ্চিমাদের পরমাণু চুক্তির ঘোরবিরোধী ইসরাইলের বিরুদ্ধে যে বিক্ষোভ দানা বেঁধেছিলো তাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হলো মধ্যপ্রাচ্যে রাষ্ট্রহারা সুন্নীদের সাম্প্রদায়িক হানাহানিতে লেলিয়ে দিয়ে। পশ্চিমা বিশ্বের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়ে ওয়াহাবী মতাদর্শী সৌদি আরবের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা, ইসরাইলের তথ্যগত সমর্থনে ও পশ্চিমাদের সামরিক এবং অর্থনৈতিক মদদপুষ্ট হয়ে ইসলামী স্টেট নারকীয় কায়দায় সাম্প্রদায়িক সংঘাত ছড়িয়ে দিলো মধ্যপ্রাচ্যসহ সারাবিশ্বে।বিশ্বব্যাপী নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামো বিস্তার না করলেও দেশে দেশে ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীসমূহকে সমান্তরাল এবং সমচরিত্রের সংঘাত সৃষ্টিকারী সন্ত্রাস পরিচালনায় উদ্বুদ্ধু করে চলেছে। বাংলাদেশও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। সাম্প্রতিক কালের সন্ত্রাসী হামলা ও কৃতিত্বের দাবীদার আইএস-এর নাম ব্যবহার তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

আরেকটি বিষয় বাংলাদেশের মানুষকে উপলব্ধি করা উচিত যে, আইএস-এর নামে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে দিয়ে আইএস-এর স্রষ্টারাই আবার তাদের দমনের নামে দেশে দেশে সহযোগিতার নামে হস্তক্ষেপ করার পাঁয়তারা করবে এবং করছেও। তারা শুধু চায় সংশ্লিষ্ট দেশের আইএস-এর অস্তিত্বের স্বীকৃতি। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা সহজে এই সত্য উপলব্ধি করতে পারি। বিচ্ছিন্নভাবে কিন্তু সমচরিত্রের কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলা হলেও উপরোক্ত ষড়যন্ত্র অনুধাবন করেই বাংলাদেশ সরকার আইএস-এর অস্তিত্ব অস্বীকার করছে এবং প্রকাশ্যে আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের সমন্বিত উদ্যোগের সাথে দ্বিমত পোষণ করছে। আর এই অস্বীকৃতিকে কিছু কিছু গণতন্ত্রের লেবাসধারী রাজনৈতিক দল নিজেদের ক্ষমতার রাজনীতির দরকষাকষির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে যা সাপের লেজ দিয়ে পিঠ চুলকানোর সামিল।

জনাব মুনিরুজ্জামান এই বলে ভবিষ্যত বাণী করেছেন যে, আইএস মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের মধ্যে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য বাংলাদেশকে করিডোর হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রকৃতপক্ষে, আইএস নিজেকে আন্তর্জাতিকভাবে সম্প্রসারিত করার কোন বৈশ্বক সাংগঠনিক পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে না। পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, আইএস কোন সেন্ট্রালাইজড রাজনৈতিক সংগঠন নয় বরং পশ্চিমা ও ওয়াহাবী এজেন্ডা বাস্তবায়নে নিযুক্ত সুন্নী এবং ওয়াহাবীদের সন্ত্রাসী সংগঠন যারা সীমানাহীন।

বাংলাদেশের জন্য বিপদের বিষয় হলো দেশে বিদ্যমান উগ্রপন্থী ধর্মীয় রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী ও তাদের পৃষ্ঠপোষক গণতন্ত্রের লেবাসধারী সুযোগ সন্ধানী রাজনৈতিক দলসমূহ। উগ্রপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম পৃষ্ঠপোষক তথাকথিত “মডারেট” ইসলামী দল জামাতে ইসলামী যুদ্ধাপরাধের দায়ে নিষিদ্ধ হলে তাদের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী সন্ত্রাসের পথই বেছে নেবে। অবশ্য এরমধ্যেই সকল সংঘটিত সন্ত্রাসের সাথে জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলাটিম ও হিযবুত তাহরির-এর নামের আড়ালে তাদের সম্পৃক্তাই বেশী পাওয়া গেছে। জামাত ও অন্যান্য জঙ্গী গোষ্ঠীগুলোর পৃষ্ঠপোষক লেবাসধারী গণতন্ত্রীরা এই আশংকার ধুয়ো তুলে যুদ্ধাপরাধী জামাতকে নিষিদ্ধ না করার জন্য উচ্চকন্ঠ। ওদের লাভ হলো জামাত প্রকাশ্য রাজনীতিতে থাকলে ভোটের লড়াইয়ে যেমন মোক্ষলাভ হবে তেমনি স্বাধীনতার পক্ষশক্তির জন্য একটি হুমকিকে জিইয়ে রাখা যাবে। যদি সরকার জামাতকে নিষিদ্ধ করে তাহলে এই অপশক্তিগুলো উগ্রপন্থীদের মদদ দিয়ে সরকার উৎখাতের জন্য সকল কুটিল ও ক্রুর পথ বেছে নেবে। এমন পরিবেশ সৃষ্টি করারচেষ্টা করবে যাতে সরকার অপারগ হয়ে হয় তাদের সাথে আপোষরফা করবে নয়তো পশ্চিমাদের ডেকে এনে নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করে বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করবে।

বিপদ শুধু আন্তর্জাতিক চক্রান্ত নয়, আভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র, নাশকতা ও প্রতিশোধপরায়নতা বাংলাদেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। জামাতসহ সকল স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করতে হবে এক্ষুনি এবং তারা যদি কারো প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদদে সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয় তাহলে কঠোর হাতে তাদের দমন করতে হবে। এটি ত্রিশলক্ষ শহীদের রক্তের ঋণ এবং বাঙালি জাতিকে এই ঋণ শোধ করে অভিশাপমুক্ত হতে হবে। বাঙালি জাতির সাহসিকতার সবচেয়ে বড় উৎস হলো জাতিগত ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক বন্ধন, অসম্প্রদায়িক চেতনা, মুক্তিসংগ্রামের রক্তস্নাত ইতিহাস এবং বাঙালি জাতির এই সংগ্রামী চেতনার কাছে মধ্যপ্রাচ্যের ঊষর মরুভূমির দানবীয় হিংস্র সংস্কৃতির আস্ফালন কোনভাবেই টিকতে পারবে না। পাকিস্তানীদের মতো তারা হয়তো ঝরাবে বিপুল রক্ত, ধ্বংস করবে বাঙালির কষ্টার্জিত সম্পদ ও অবকাঠামো কিন্তু কোনভাবেই বাঙালির জাতীয় চেতনাকে পরাভূত করে বাংলাদেশকে মরুভূমি বানাতে পারবে না।