ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

একটা জীবনে সম্পর্কের সৃষ্টি হয় মানুষের জন্মের পরবর্তী মুহুর্ত থেকে। একটা সম্পর্কের সৃষ্টির পর থেকে শুরু হয় জীবনের নানা দিক। পাওয়া না পাওয়ার হিসাব নানান জল্পনা কল্পনা, শুরু হয় সম্পর্কের সফলতা- ব্যর্থতা।
একটা মানুষ যখন জন্ম নেয় তখন অনেক গুলো সম্পর্ক জড়িয়ে যায় তার সাথে। শুরু হয় একটা জীবনের।
আমাদের সম্পর্কের একটা দিক হলো টানাপোড়েন। এই টানাপোড়নের শুরু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। মা-বাবার দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মূলত মা-বাবার সাথে সন্তানের কিংবা সন্তানের সাথে সন্তানের সম্পর্কের টানাপোড়েনের অনেকটা সৃষ্টি হয়।
আমার আজকের লেখা মূলত পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে। মা-বাবার সাথে সন্তানের টানাপোড়নের শুরু হয় কোনখান থেকে-
মা-বাবার একপক্ষতা, সন্তানের প্রতি অবহেলা, সঠিক জবাবদিহিতা না চাওয়া, ভালোবাসা বা স্নেহ-মমতার পক্ষপাতিত্ব করা, স্বাধীনতায় সঠিকভাবে হস্তক্ষেপ না করা, শাসনের অভাব, তাদের ভালোবাসার সঠিক বন্টন না করা ইত্যাদি, ইত্যাদি।
প্রত্যেকটা মা-বাবার সাথে সন্তানের সম্পর্ক হওয়া উচিৎ বন্ধুত্বপূর্ণ। যদি তা হয় তাহলে সন্তানের মানসিক বিকাশ ঘটবে দ্রুত। শুধু মা-বাবা কেন একটা পরিবারের সব সদস্যের ভেতর একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা উচিৎ বলে আমি মনে করি। তাহলে পরিবার ভর্তি থাকবে আনন্দ। পরিবারের সবার যুক্তি পরামর্শে, সিদ্ধান্ত বা অনুভূতি আদান-প্রদানের মাধ্যমে পরিবার খুব সহজে যে কোন বিপদ কেটে উঠতে পারে। ছোট বড় সব ধরণের কাজে পরিবারের সবার মতামত নেয়া প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের সমাজে এমন কিছু পরিবার আছে যেখানে মা-বাবার সাথে সন্তানের একটা দুরত্ব, ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের কিংবা বোনের সাথে বোনের বা ভাইয়ের একটা দুরত্ব বিরাজ করে। কিন্তু কেন? আমার মনে হয় এর পেছনেও মা-বাবার একটা ভূমিকা রয়ে যায়। প্রশ্ন তুলতে পারেন কিভাবে?
-আমি মনে করি সন্তানদের সব কিছু বোঝার ক্ষমতা থাকেনা যা তার পিতা মাতা বুঝেন। যখন ভালো আর মন্দের মাঝামাঝি চলে বসবাস তখন সন্তানকে ভালোটা দেখানোর, বুঝানোর দায়িত্ব মা-বাবার। যদি মনে করেন আপনার সন্তান তার ইচ্ছামত চলুক সেখানে আপনি একটা ভুল করলেন। আর সন্তান যে ভুলটা করলো তাও আপনার জন্য। তাকে ভুল করতে সাহায্য করলেন আপনি বা আপনারা।
কোন সন্তান যদি বড় হয়ে ভুল করে কিংবা কাউকে হিংসা করে অথবা ভুল করতে করতে বড় হয় তখন কোন কোন মা-বাবাকে বলতে দেখা যায়-‘সে এখন বড় হয়ে গেছে কি বলবো’! আসলে তো কি বলবেন! আপনি একবার ভেবে দেখেছেন?-যদি ছোট থেকে আপনার সন্তানকে সেভাবে গড়ে তুলতেন, কিছু বলে বলে আসতেন তাহলে হয়তো সে এই ভুলটা করতো না। আর বড় হলেই বা কি হলো সন্তানতো আপনার তাকে মরার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত বলার অধিকার আপনি বা আপনারা রাখেন যদি সাহসের কমতি না থাকে।
আপনার বাগানে একটা গাছের সাথে আরেকটা গাছের ধাক্কা লাগবেই। একটা গাছ আরেকটা গাছের ওপর পড়বেই সেটা যদি আপনি খেয়াল না করেন। আপনি যদি ভালোভাবে তদারকি না করেন তাহলে সবল গাছের ধাক্কায় দূর্বল গাছটা ভেঙ্গে পড়বে। আপনি যদি মনে করেন দুটো গাছকে আপনার বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন তাহলে দুটোর পরিচর্যা ভালোভাবে করবেন, নচেৎ সবল দূর্বলের ওপর বল প্রয়োগ করবেই শুধু আপনারই কারণেই।
আপনার প্রত্যেকটা সন্তানকে যদি আলাদা আলাদাভাবে দেখেন তাহলে একটু খেয়াল করলে দেখবেন আপনার কোন সন্তান আপনার খুব কাছে চলে এসেছে কোন সন্তান আপনার কাছ থেকে অনেক দূরে সরে গেছে একান্ত নিজের মত করে মনে কিছু জমানো দুঃখ নিয়ে। শুধুমাত্র আপনার দেখার ভুলের কারণে।
এখানে প্রশ্ন তুলতে পারেন মা-বাবা কি পারে তার সন্তানদের ভিন্ন ভিন্ন চোখে দেখতে? তাহলে আমি হলফ করে বলবো- হ্যাঁ, পারে।
কোন কোন মা-বাবা অর্থের কাছে কেনা হয়ে যায়। তাদের পরবর্তী জীবন চলার ক্ষমতা থাকা সর্ত্বেও তারা অর্থের কাছে কেনা হয়ে যায়। যে সন্তানের আয় বেশী তারা তার হয়ে কথা বলে, তার কথা মত চলে। পরিবারে তখন মতামত বা পরামর্শ এক কেন্দ্রিক হয়ে যায়। আর্থিকভাবে দূর্বল সন্তানকে গুরুত্ব দেয় না মা-বাবারা। মা-বাবার কর্মের কারণে দূর্বল সন্তানটি যদি মনে কষ্ট পেয়ে কিছু বলে বা করে তখন সমাজের কাছে মা-বাবারা এই কথার বা কর্মের অন্য ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে। সমাজ তখন সন্তান নয় মা-বাবারটাই গ্রহন করে। শুধু মা-বাবা বলে সমাজ তখন অযুক্তিক ও অন্যায়টা গ্রহন করে। প্রশ্ন উঠে -কি করবা ওরা মা-বাবাতো! আসলেই কি করবে-ওরাতো মা-বাবা!
অনেকই মনে করে দু-তিনটা সন্তানের মধ্যে একটা তাদের সুখ দিতে পারবে,ওই একটাই তাদের মধ্যমণি হয়ে রয়। তাহলে আমার প্রশ্ন কেন জন্ম দেয়া একের অধিক সন্তান? অবহেলা আর গুরুত্বহীন করে রাখার প্রয়োজনতো নেই, আদৌ কি আছে?
অতি আদুরের সন্তানের কাছে সঠিক জবাবদিহিতা না চাওয়া ও সন্তানের ক্ষতির কারণ, সন্তান বখে যাওয়ার একটা অংশ। এজন্য মা-বাবারা পরবর্তীতে করে হায় হায়। যদি মা-বাবারা শুরু থেকে সঠিক এবং ভালো মন্দের জবাবদিহিতা চায় তাহলে সন্তান বখে যাওয়ার ভয় থাকেনা। আর জবাবদিহিতা হতে হবে সঠিক, অনুমানের ওপরে নয়।
আমাদের সমাজের অনেক মা-বাবাই মনে করেন তাদের সন্তানের কৃতিত্বের পেছনে, সন্তান অনেক কিছু জানার-বুঝার পেছনে শুধুমাত্র তাদেরই অবদান রয়েছে। অন্যের বা অন্যকিছুর অবদান তারা অনায়াসে অস্বীকার করেন। তারা বলেন ‘আমি না শিখালে তুমি শিখেছো কোথায়’। ওখানেও আমার মন প্রশ্ন তুলে-তাহলে তার সমাজ তাকে কি দিলো? অন্যের সাথে মিশে তার কি লাভ হলো? তাহলে সমাজ কি ব্যর্থ? প্রশ্ন আরো-যে পরিবারের দুই বা ততোধিক সন্তান থাকে তাদের কেউ কেউ ভালো হয় কেউ বা বখে যায় তখন ওইসব মা-বাবার কাছে এর উত্তর কি হবে? বখে যাওয়া বা খারাপ হয়ে যাওয়া সন্তানের দায় কার? মা-বাবাতো ভালো! শিক্ষাও ভালো দিয়েছে কিন্তু সমাজ তাকে নষ্ট করেছে, সমাজকে কি দোষ দেবেনা মা-বাবারা? নাকি নিজের করে রাখবেন সন্তানের কুকৃতিগুলো? প্রশ্ন আরেকটা- আমাদের সমাজে আমরা এমনও দেখতে পাই অনেক সন্তান আছে যাদেরকে মা-বাবা জন্ম দিয়েছেন ঠিকে কিন্তু মানুষ হয়েছে অন্যর কাছে। সে নিজেও জানে না কারা তাকে জন্ম দিয়েছে। আজ সে অনেক ভালো অনেক পরিচিতি অর্জন করেছে তার ক্ষমতাবলে-তাহলে এর কৃতিত্ব কার? সম্পূর্ণ কি মা-বাবার নাকি যে সমাজ এবং তার বোধজ্ঞান তাকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে তার? মা-বাবাতো শুধু জন্ম দিয়েছে, এর পর রেখে গেছেন অন্যের কাছে। জন্ম দিলেই কি সন্তানের সব কৃতিত্ব নেয়া যায়? জন্ম দিলেই কি শুধু মা-বাবা হওয়া যায়?
প্রত্যেক মা-বাবা তাঁদের সন্তানের জন্ম দেন অনেক কষ্ট করে। তাঁদের খাটো করা বা তাঁদের অস্বীকার করার কিংবা অসম্মান করার মত সাহস আমার নেই। মা-বাবা জন্ম দিয়েছে বলেই আমরা সবাই এই পৃথিবীটা দেখেছি, দেখছি। তাই বলে মা-বাবাদের কি উচিৎ তাদের সন্তানদের জীবনে অন্যের অবদানকে অস্বীকার করা?
আমার এই লেখায় কেউ কেউ প্রতিবাদ তুলতে পারেন, বলতে পারেন পাগলের প্রলেপ, হয়তো এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার অনুরোধ প্রতিবাদের আগে লেখাটি পড়ে সমাজের চোখে একবার তাকাবেন কি।
আমি জানি আমার এই লেখায় অনেক অনেক কিছু উঠে আসেনি। অনেকের কাছে মনে হতে পারে এটা শুধু পাগলামি, এক তরফা। হয়তো তাই। তবে আমি চেষ্টা করেছি কিছু মা-বাবার ভুল ভাঙ্গাতে। জাগিয়ে দিতে ঘুম থেকে। সমাজের কিছু মা-বাবার এক তরফা কর্মকে তুলে ধরতে চেয়েছি। কেউ কেউ বলতে পারেন মা-বাবা যতই মন্দ হোক না কেন তাদের নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হতে পারেনা। আসলে কি তাই? তাহলে তো ভালোই আমিও একজন বাবা তাহলে আমার মন্দ কর্মের ও আলোচনা সমালোচনা হবে না, তাহলে আমরা বাবারাতো সুখি। কিন্তু অনেক মা-বাবা ভালো হওয়ার পরেও আজ ঘর ছাড়া, পথে। এই কথাটিও অস্বীকার করার কোন জো নেই। সন্তানকে সু শিক্ষা দেওয়ার পরেও মা-বাবারা আজ বৃদ্ধাশ্রমে। এই কথাটিও সঠিক। মনে হয় আমাদের সম্পর্ক গুলো টানাপোড়েনে মাঝে এমনই হয়, এমনই হয়ে যায়। যা হওয়া মোটেই আমাদের কাম্য নয়।
আজ আমিও একজন বাবা আমার প্রার্থনা যেসব সন্তানের কথা লিখেছি তাদের মত করে আমি আমার সন্তানকে দেখতে চাইনা,তাদের লাইনে যেন আমার সন্তানকে দাঁড়াতে না হয়। আমি যে বিষয়ে আজ কলম ধরেছি কেউ যেন আর এই বিষয়টা নিয়ে কলম ধরতে না হয় সে প্রার্থনা করি।