ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

 

সব কিছু ঠিক-ঠাক মত চলছিল। শিক্ষকতা, মিরসরাই কবিতা পরিষদ, উদ্দীপন ক্লাব, স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ভালোই কাটছিল জীবনের প্রতিটি প্রহর। সুখের শিখরে পৌঁছাতে না পারলেও দুঃখ তাকে ছুঁয়েনি কখনও। মানুষটি কথা বলতেন আমাদের সমাজ-সংস্কৃতির পালাবদলের। কথা বলতেন সকল অপ্রিয় সত্য এবং সুন্দরকে নিয়ে। যার কথায় মন ছুঁয়ে যেত। মিরসরাই’র সাহিত্য,সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে একটি মানে দাঁড় করিয়ে অকালেই ঝরে গেলেন এ মানুষটি।

একটি কবিতায় তিনি লিখেছিলেন, ‘কবিরা সবার কথা লেখে, কবিরা মরে গেলে কেউ খবর রাখে না’। অপর একটি কবিতায় লিখেছেন, ‘কে কথার কথা শুনেছে কবে, কথা দিয়ে কথা রেখেছেটা কে/এমনতো কেউ কেউ থাকে, কথা দেয় না শুধু কথা রাখে’। কিন্তু কেউ তার কথা রাখেনি। কেউ তার খবর রাখেনি। তিনি পৃথিবী ত্যাগ করেছেন। মৃত্যু পরবর্তী কেউ তার খবর রাখেনি। তা বোধহয় তিনি আগে থেকেই জানতেন। জানতেন বলেই কবিতায় ছুঁড়েছেন এমন অভিমানী সব বাক্য।

আমি যাঁর কথা বলছি তিনি আমাদের প্রিয় জুবাইদ ভাই। দুলাল জুবাইদ। দুলাল জুবাইদ ছিলেন একাধারে নাট্যকার, কবি, প্রাবন্ধিক, শিক্ষক। দেশের প্রখ্যাত কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, তসলিমা নাসরিন, কবি সোহেল অমিতাভ ছিলেন দুলাল জুবাইদের সহকর্মী। তিনি ছিলেন ঢাকা জনপদ নাট্যদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। জাতীয় কবিতা পরিষদ, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনসহ জাতীয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠায় দুলাল জুবাইদের ভূমিকা ছিল অনন্য। আশির দশকে ঢাকার মহিলা সমিতি মঞ্চ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, টিএসসি প্রাঙ্গণ দুলাল জুবাইদের নিয়মিত পদচারণায় হয়ে উঠতো মুখরিত।

মূলত, দুলাল জুবাইদের সাহিত্যচর্চা শুরু হয় ছোট গল্প লেখার মধ্যে দিয়ে। তবে সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতে তাঁর পর্দাপণ কুষ্টিয়া জেলা হাইস্কুলের ছাত্র থাকাকালীন। স্কুলের দেওয়াল পত্রিকা,স্মরণিকা প্রকাশ ও সাংস্কৃতি সংগঠনের সাথে জড়িয়ে ছিলেন তিনি ওতপ্রোতভাবে।File-1-2

দুলাল জুবাইদ’র প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকান্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ছাত্র থাকাকালে। ১৯৭৭ সালে নাট্য,সাহিত্য ও সংস্কৃতির্চ্চা পুরোদমে শুরু করেণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন তোলপাড় করা সংগঠন ‘রাখাল’ এর তিনি ছিলেন অন্যতম উদ্যোক্তা যা পরবর্তীতে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট নামে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরী চত্তরে তাঁর নেতৃত্বে ‘জনপদ’ নাট্যদল জন্মলাভ করে।

ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শীর্ষস্থানীয় নাট্যকারদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন দুলাল জুবাইদ। ‘ইজ্জ্বত আলীর প্রেষ্টিজ’(১৯৮১), ‘কার্ফু পাস’(১৯৯০), ‘গুজবে কান দেবে না’, ‘আমি বিজয় এনেছি’, ‘একদিন অপু’(১৯৮০),‘একে ধরিয়ে দেন’(১৯৯৩) ‘সাগর কুলের নাইয়া’সহ মঞ্চস্থ হতে থাকে একের পর এক প্রতিবাদী নাটক। এরশাদ সরকারের সময়ে ঢাকায় দুলাল জুবাইদের নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয় তারই লেখা নাটক ‘একে ধরিয়ে দিন’। স্বৈরাচারী শাষকগোষ্ঠী তখন মেনে নিতে পারেনি নাটকটি। পুলিশ হামলা চালায় নাট্যকর্মীদের ওপর।

আশির দশকে হামলার ঘটনায় দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ‘সন্ত্রাস বিরোধী নাটকে হামলা’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হলেও তার সহকর্মীরা ছিটকে পড়েছিলেন। অনেকটা অভিমান করে চলে এলেন মিরসরাইয়ে। সে থেকে মিরসরাই জনপদে কাটতে লাগলো জীবনের প্রতিটি মূহুর্ত। সন্দ্বীপে জন্মগ্রহণকারী এ নাট্য ব্যক্তিত্ব মিরসরাইকে বেশি ভালোবাসতেন। ১৯৯২ সালে তিনি মিরসরাইয়ের বারইয়াহাট পৌরসভাস্থ মেহেদীনগর গ্রামে স্ব-পরিবারে বসবাস শুরু করেন। অথচ এ মানুষটি মিরসরাইয়ের মত ছোট্ট পরিমন্ডলে আবদ্ধ থাকার কথা ছিল না।

দুলাল জুবাইদ ১৯৫৭ সালের ২৮ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার কাটগড় ইউনিয়নের এক সম্ভান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মাওলানা নুরুল হক, মাতা ফয়েজা খাতুন। পিতা কুষ্টিয়ায় বিভিন্ন সরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করার সুবাদে দুলাল জুবাইদ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করেন কুষ্টিয়া জেলা স্কুলে। পরবর্তীতে গাজীপুরস্থ ভাওয়াল বদরুল আলম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন বিষয়ে অনার্স পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালীন কেন্দ্রীয় নাট্য, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জড়িয়ে পড়েন। ঢাকায় অবস্থানকালীন কেন্দ্রীয় গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, জাতীয় কবিতা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন।

নাটক রচনার পাশাপাশি শিক্ষকতায় দুলাল জুবাইদ ২০০৩ সালে মিরসরাইয়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন। তাঁর অসামান্য কর্মের অবদানের হিসেবে জাতীয় কবিতা পরিষদ ২০০৮ সালে ‘জাতীয় কবিতা উৎসব’ তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন।

উল্লেখ্য,দুলাল জুবাইদ ২০০৭ সালের ৯ জুলাই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উচ্চ রক্তচাপ ও অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।