ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ধর্ষিতা কোন নারীকে স্বাভাবিক জীবনে ফির আসতে যত সমর্থনই আমরা দেইনা কেন, ভেতরে ভেতরে তাঁর ক্ষরণ রক্তঝরা কাটা দাগের মতো থাকে। ধর্ষণ এমন একটি ঘটনা, যে ক্ষত বেশির ভাগ নারীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলে। আমাদের সমাজে এই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠে সামনে এগিয়ে যেতে পারে এম নারীর সংখ্যা নগন্য। চলন্ত বাসে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার রূপা ও অন্যান্যদের কথা ভাবলে দু’চোখে আঁধার নেমে আসে। মনে হয় চলন্ত বাসের কিছু ধর্ষকামী ছুঁচোর মতো মুখিয়ে থাকে, বাসে কাউকে একলা পেলেই হয়!

নিম্নের ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে মনে হয় আমরা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল বা ডিসকভারী চ্যানেলের কোনো বুনো প্রান্তরে আছি। যেখানে অসহায় এক হরিণকে ঘিরে ধরেছে কয়েকটি হায়েনা। রক্ত আর মাংসের গন্ধে তর সয় না ওদের লোলুপ জিহবার।

এই ঘটনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজ-রাষ্ট্র আমাদের নারীদের সব সময় রক্ষা করতে পারে না। আমাদের শিক্ষা, সামাজিক দ্বায়িত্ববোধ কতটা অবদমিত হয়েছে তা কয়েকটি ঘটনা পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে। দেশে বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস এমনকি নৌযানেও নারীরা ধর্ষণ, গণধর্ষণ এবং যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে এসব আমরা জানতে পারছি।

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৪। মানিকগঞ্জে চলন্ত একটি বাসে তরুণী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বাসচালক ও সহকারীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত।

২০১৫ সালের মে মাসে গাজীপুরের কালীগঞ্জে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এক নারী শ্রমিক নৌকায় ধর্ষণের শিকার হয়ে মামলা করেন। কাজ শেষে রাত আটটার দিকে গাজীপুরের কালীগঞ্জে নিজবাড়ি ফিরছিলেন। পথে তিনি সহকর্মীদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের একটি নৌকায় ওঠেন। নৌকাটি শীতলক্ষ্যা নদীর ফকিরবাড়ি ঘাটে পৌঁছালে সব শ্রমিক নেমে যান। এরপর নৌকার দুই মাঝি কৌশলে তাঁর মুখ বেঁধে ধর্ষণ করেন। পরে তাঁরা মুঠোফোনে প্রতিষ্ঠানের অপর নৌকার দুই মাঝিকে ডেকে আনেন। এই দুই মাঝিও তাঁকে ধর্ষণ করেন।

১২ মে ২০১৫। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে চলন্ত বাসে এক পোশাককর্মীকে ধর্ষণ করে রাস্তায় ফেলে দেন বাসচালক ও চালকের সহকারী।

২০১৫ সালের মে মাসে কর্মক্ষেত্র থেকে ঘরে ফেরার পথে রাজধানীতে গণধর্ষণের শিকার হন এক গারো তরুণী। কুড়িল বাসস্ট্যান্ড থেকে তাঁকে জোর করে মাইক্রোবাসে তুলে ধর্ষণ করে একদল ধর্ষক।

২৩ জানুয়ারি ২০১৬। গভীর রাতে বরিশালের বানারীপাড়ার চাখারের বাসিন্দা দুই যুবতী কুয়াকাটা থেকে বরিশালে আসেন। তারা বরিশাল-বানারীপাড়া রুটের সেবা পরিবহন নামের একটি বাসে চাখারে নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য ওঠেন। সেই সুযোগে নথুল্লাবাদ মাইক্রোস্ট্যান্ড থেকে রামপট্টি পর্যন্ত দুই যুবতীকে বাসের মধ্যে আটকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে চলন্ত বাসে থাকা চালক, হেলপার এবং সুপারভাইজারসহ ৬ শ্রমিক।

৩ জানুয়ারি ২০১৭। ময়মনসিংহের নান্দাইলে একটি বাসে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে চালকসহ তিন পরিবহনকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়।

২ আগস্ট ২০১৭। নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সিদ্ধিরগঞ্জে চলন্ত ট্রাকে ১৫ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণ করেন ট্রাকের চালক ও হেলপার। ধর্ষণের স্বীকার ওই কিশোরী মায়ের সাথে অভিমান করে বাড়ি থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকায় চলে আসে। আনুমানিক রাত ৮টার দিকে একটি মালবাহী ট্রাকের চালক ও হেলপার তাকে একা পেয়ে জোরপূর্বক ট্রাকে তুলে নেয়। পথিমধ্যে চালক ও হেলপার পালাক্রমে ৬ বার ধর্ষণ করে।

২৫ আগস্ট ২০১৭। টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে এক তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যা করেন বাসচালক, সহকারীসহ পাঁচ পরিবহনশ্রমিক।

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭। চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় এক গৃহবধূকে চলন্ত বাসে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়।

এখনো পর্যন্ত প্রকাশিত খবরের হিসাবে সর্বশেষ ২৭ অক্টোবর ২০১৭ শুক্রবার। ছুটির দিনে দুই বান্ধবীকে নিয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে যান এক পোশাককর্মী। সন্ধ্যার পর বাসে করে তাঁরা ফিরছিলেন। শহরের বহদ্দারহাট এলাকায় অন্য যাত্রীদের সঙ্গে তার দুই বান্ধবীও বাস থেকে নেমে যান। রাত তখন সাড়ে আটটা। বাসে একা ওই তরুণী। তিনি যাবেন আরও দুই কিলোমিটার দূরে।

বহদ্দারহাটে যাত্রী নামিয়ে বাসটি আবার চলা শুরু করার পরই চালকের সহকারী সব জানালা বন্ধ করে দরজাও আটকে দেন। রাস্তায় তখন স্বাভাবিক নিয়মেই চলছে অন্য গাড়ি। হঠাৎ ছোরা নিয়ে এসে বাসের একমাত্র যাত্রী ওই তরুণীকে প্রাণে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করেন চালকের সহকারী। এরপর ওই সহকারী চালকের আসনে বসেন। আর চালক উঠে এসে ধর্ষণ করেন তরুণীকে।

ঘটনার পর সাত দিন চুপচাপ ছিলেন ওই তরুণী। পরে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে ৩ নভেম্বর ২০১৭ চট্টগ্রাম শহরের চান্দগাঁও থানায় সাহস করে দুজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করেন তিনি। পুলিশ আটক করে দুজনকে।

আমরা অনেকেই জানি ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতের দিল্লিতে চলন্ত বাসে নির্ভয়া (ছদ্মনাম) নামের এক ছাত্রী ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সেদিনের ভারতের সেই ঘটনার মত আমাদের দেশে এখন নিয়মিত হয়ে যাচ্ছে চলন্ত বাহনে ধর্ষণ।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ৪০১ জন, ২০১৪ সালে ৬৬৬, ২০১৫ সালে প্রায় ৭০০ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। মহিলা পরিষদের তথ্য মতে, ২০১৬ সালে দেশে ১০৫০ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম ৭ মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৪২৪টি। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৮৮ নারী ও শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৩ জনকে। এছাড়া ধর্ষণের অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে ৫ জন। বাংলাদেশের ১৪টি দৈনিক পত্রিকার খবর বিশ্লেষণ করে সংগঠনটি এ তথ্য দিয়েছে। এই চিত্র সত্যিই আতঙ্কের। বেশ কিছু ক্ষেত্রে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এসব নারীদের। এমনকি কোন কোন ঘটনায় ধর্ষণের চিত্র মুঠোফোনে ধারণ করে তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে বার বার ধর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটেছে।

আজকের এই চলন্ত বাহনে ধর্ষণকে কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। পত্র-পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যায় প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণ বা গণধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। আর ঘটনা কেবল ধর্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্ষিতাকে হত্যা করা হচ্ছে নির্মমভাবে অথবা ধর্ষিতা পরিবার, সমাজ ও লোকলজ্জার ভয়ে আত্মহত্যা করছে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক বিচারের রায়ে ধর্ষকের পরিবর্তে শাস্তি দেয়া হয় ধর্ষিতাকে। ধর্ষিতার পরিবারটিকে করা হচ্ছে একঘরে।

চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণের ঘটনার বিস্তারটা একটু ভয়াবহ রকমেরই হয়ে ওঠছে দিন দিন। মনে হচ্ছে যৌন অপরাধীদের জন্য এটা একটা ট্র্যাডিশনে পরিণত হয়েছে। তবে কয়েকটি ঘটনার প্রেক্ষিতে কিছু নরপিশাসের শাস্তি হলেও থেমে নেই ধর্ষণের ঘটনা, ঘটেই চলেছে। এ ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি বিশেষ জরুরি।