ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘উপরের হাত নিচের হাতের তুলনায় উত্তম।’ তার মানে দাতার হাত গ্রহীতার হাতের চেয়ে উত্তম। এ হাদিসে রাসুল (সা.) প্রত্যক্ষভাবে দানের প্রতি এবং পরোক্ষভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার প্রতি উৎসাহিত করেন। দান করতে হলে নিজেকে আগে স্বাবলম্বী হতে হবে। নিজেই যদি দারিদ্র্যপীড়িত হয়, তাহলে সে দান করবে কীভাবে? রাসুল (সা.) অন্যের কাছে হাত না পেতে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রতি উৎসাহিত করেছেন। তাঁর কাছে যখন কোনো ভিক্ষুক সাহায্যের হাত বাড়াতেন, তিনি তাকে এ অপমানজনক জীবিকা পরিহার করে সম্মানজনক জীবিকা গ্রহণের রাস্তা দেখিয়ে দিতেন। তিনি এরশাদ করেন, ‘নিজের কষ্টার্জিত জীবিকা সবচেয়ে উত্তম।’ জীবিকা নির্বাহের জন্য রাস্তা বের করা শরিয়তেরই নির্দেশ। তবে সবসময়ই তা হারামমুক্ত হওয়ার শর্তযুক্ত। ‘যখন নামাজ শেষ হয়ে যায়, তখন তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহ তায়ালার দেয়া রিজিক অন্বেষণ করো।’ (সূরা জুমা : ১০)। অন্য আয়াতে এরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই তোমাদের জন্য ভূমিকে কর্ষণযোগ্য করে দিয়েছেন, অতএব তোমরা তার দিগদিগন্তে ছড়িয়ে পড় এবং তাঁর দেয়া আহার্য গ্রহণ করো।’ (সূরা মুলক : ১৫)। তবে আফসোসের বিষয় হলো, আমাদের দেশের ওলামায়ে কেরামকে সাধারণত দানকারীর ভূমিকায় দেখা যায় কম। সাহাবায়ে কেরাম দ্বীনের সব রাস্তায় মুক্তহস্তে দান করতেন। এ আদর্শ আমাদের জীবন চলার পাথেয়।

 

1105

 

তবে আমাদের এ অঞ্চলের আলেমরা ঐতিহ্যগতভাবেই শিক্ষা সমাপনের পর দ্বীনি খেদমতের সঙ্গেই জড়িয়ে পড়েন। আর এটি জানা কথা যে, যাদের মূল পেশা দ্বীনি খেদমত, তাদের স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করার জন্য যে পরিমাণ জীবিকার প্রয়োজন সাধারণত তা দ্বীনি পেশা থেকে আসে না। ফলে হয়তো অস্বাভাবিক কষ্ট করতে হয় অথবা ঋণ করে সংসার চালাতে হয়। এ অবস্থায় অন্যকে দান করার প্রশ্নই আসে না। তবে ইসলাম এ ধরনের অস্বাভাবিক কষ্ট স্বীকার করতে বলেনি। ইসলাম মানুষের জীবিকার প্রয়োজনেই ব্যবসাকে হালাল করেছে। তাই ওলামায়ে কেরামের ব্যাপকভাবে ব্যবসার অঙ্গনে আসা এখন সময়ের দাবি। কেননা কালের বিবর্তনে মুসলিম জাতি, বিশেষ করে ওলামায়ে কেরাম আজ কোরআন ও হাদিসের এসব নির্দেশনা ভুলতে বসেছেন। ফলে তাদের ঘাড়ে চেপে বসছে অপমান ও জিল্লতি। ব্যক্তিগতভাবে যেমন তারা ‘উপরের হাতে’র অধিকারী হতে পারেননি, তেমনি রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবেও নন। ফলে আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রগুলো ‘উপরের হাতে’র প্রভাবে মুসলমানদের নানাভাবে জিম্মি করে রেখেছে।
সুতরাং মুসলমানদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এসব বাধা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য তাদের অথনৈতিকভাবেও শক্তিশালী হতে হবে। আর তাই মুসলমানদের অগ্রকাতারে অবস্থানকারী ওলামায়ে কেরামের অথনৈতিক অঙ্গনে বিচরণ করা এখন সময়ের দাবি। ওলামায়ে কেরামের সামনে দুইটি রাস্তা খোলা রয়েছে। অর্থনৈতিক অঙ্গনের কথা এলে প্রথমে আসে ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা। বড় না হোক অন্তত ছোট পরিসর থেকে ওলামায়ে কেরাম ব্যবসা শুরু করতে পারেন। এক্ষেত্রে তাদের সামনে দুইটি রাস্তা খোলা রয়েছে। এক. ব্যক্তিগত উদ্যোগ। দুই. সম্মিলিত বা যৌথ উদ্যোগ।
ব্যক্তিগত উদ্যোগ হলো নিজের মেধা ও বুদ্ধি খাটিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে সীমিত পর্যায়ের কিছু ব্যবসা করা। এ ধরনের ব্যবসায় যেহেতু পুঁজি কম, তাই লোকসানের ঝুঁকিও কম। তবে এ সীমিত পরিসরের ব্যবসা দ্বারা খুব বেশিদূর অগ্রসর হওয়া যায় না। যেসব আলেমের নিয়মিত কোনো দ্বীনি পেশা রয়েছে, তারা তাদের পুরো সময় ব্যবসায়িক কাজে দিতে পারেন না। তাদের জন্য ব্যবসায় পূর্ণ সময় ও শ্রম না দিয়েও অর্থায়ন করা যায়। যাদের অর্থ কম এককভাবে ব্যবসা করতে পারেন না, তাদের জন্য এককভাবে ব্যবসা করা কষ্টকর। তাই একাধিক ব্যক্তি মিলে অল্প অল্প করে মূলধন জোগাড় করবে। এটি শরিয়তের পরিভাষায় শিরকতের সঙ্গে তুলনা করা যায়। শক্ত ও দক্ষ হাতে পরিচালনা করলে আশা করা যায় কাক্সিক্ষত সফলতা খুব সহজেই ধরা দেবে।
তাছাড়া মূলধন সংগ্রহের আরেকটি পদ্ধতি হলো মুদারাবা। ছোটখাটো কোনো কিছু দাঁড় করানো। সততা ও বিশ্বস্ততার প্রমাণ করতে পারলে মানুষ ছোটখাটো বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণ বোধ করবে। বলা থাকবে যে, এটি লাভের অংশিদারভিত্তিক ব্যবসা। লাভ হলে উভয়ে পূর্বনির্ধারিত হারে লভ্যাংশ পাবেন। আর লোকসান হলে রব্বুল বা অর্থদাতাকে তা বহন করতে হবে। মানুষ ছোটখাটো অর্থ বিনিয়োগ করার জন্য নিরাপদ জায়গা খোঁজেন।
শেষ কথা হলো, মুসলমানকে মনে রাখতে হবে, পাশ্চাত্য দুনিয়া এবং লোভী ও আধিপত্যবাদী শক্তি মূলত মুসলিম অর্থবিত্তে স্বাবলম্বী হয়ে উঠলে তাদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারেÑ এ আশঙ্কায় তারা মুসলমানদের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে সুকৌশলে রোধ করার চেষ্টা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় তারা মুসলমানদের মধ্যে রুহবানিয়্যাত তথা বৈরাগ্যবাদের ধারণা ঢুকিয়ে দিয়েছে। ফলে মুসলমানরা সংসারবিরাগী হয়ে দুনিয়াত্যাগী হওয়াতেই প্রভূত কল্যাণ মনে করছেন। অথচ পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাকে এই মর্মে দোয়া করতে নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতেও হাসানা তথা সুখ-সমৃদ্ধি ও কল্যাণ দান করুন, আখেরাতেও হাসানা তথা সুখ-সমৃদ্ধি ও কল্যাণ দান করুন।’ ইসলাম-পূর্ব যুগে একদল খ্রিস্টান নেতা আল্লাহর প্রতি ভক্তির আতিশয্যে সংসার ত্যাগ করে জঙ্গলে গিয়ে ইবাদত-বন্দেগিতে লিপ্ত হয়ে পড়েন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা এ কার্যক্রমের নিন্দা করে বলেন, ‘তারা যে বৈরাগ্য গ্রহণ করেছে, আমি তাদের এ দায়িত্ব দিইনি। এটা তাদেরই মনগড়া উদ্ভাবিত বিষয়।’ সুতরাং দুনিয়াকে ত্যাগ করার কথা বলা হয়নি; বরং দুনিয়াকে ছেড়ে দেয়ার কারণে নিন্দা করা হয়েছে। আল্লাহর রাসুল (সা.) মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার পর তাঁর শত্রুরা তাঁকে শিখিয়ে দিয়েছে, মুসলিম জাতির অর্থনীতির প্রতি ভাবনা থাকবে না; বরং তারা ঘর-সংসার ছেড়ে ইবাদত-বন্দেগিতে লিপ্ত থাকবে। তাদের শেখানো পথ অনুসরণ করে মুসলমানরা অর্থনীতিতে স্বাবলম্বী হওয়ার চিন্তা একদম ছেড়ে দিয়েছেন। বিশ্বের মুসলিম দেশগুলো বলতে গেলে ভিক্ষাবৃত্তিতে আত্মতুষ্টি বোধ করছে। দখলদার প্রভুদের কাছে হাত পেতে তারা দেশ চালাচ্ছেন। জাতি হিসেবে তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর কথা কখনোই ভাবেননি।
এসবই হচ্ছে মুসলিম জাতির অর্থনৈতিক দুর্বলতার সুযোগে। মুসলিম রাষ্ট্র পরিচালনায় যদি বিদেশিদের টাকার প্রয়োজন না হতো, তাহলে তারা তাদের দেশের পচা-নোংরা অপসংস্কৃতি আমাদের দেশে ঢুকিয়ে দেয়ার সাহস পেত না। সুতরাং আমাদের দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, শিক্ষা-সংস্কৃতি রক্ষার জন্য অর্থনীতিতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। আর এ কথাগুলো এখন ওলামায়ে কেরামকে উঁচু আওয়াজে বলতে হবে এবং নিজেরা প্র্যাকটিক্যাল আমল করে দেখিয়ে দিতে হবে।