ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

ইসলামের সূচনালগ্নে যখন মানুষ কবর পূজা করত তখন আল্লাহর নবী সা. কবর যেয়ারত করতে নিষেধ করেছিলেন। সুনানে ইবনে মাজাহ শরিফের ১৫৭১ নং হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “আমি তোমাদের কবর-যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। (এখন ঐ নিষেধাজ্ঞা মানসূখ করা হচ্ছে) এখন তোমরা কবর যিয়ারত করতে পার। কারণ তা দুনিয়ার মোহ দূর করে এবং আখিরাতকে মনে করিয়ে দেয়। (মিশকাত পৃ ১৫৪)

 

এরপর ইসলাম আসার পর সাহাবায়ে কেরাম যখন জাহিলিয়্যাতের রীতিনীতি ভুলে যান তখন রাসুল সা. আবার কবর যেয়ারতের অনুমতি প্রদান করেন। কারণ কবরের দৃশ্য দেখে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্বের বিশ্বাস তাজা হয়, নিজের মৃত্যু ও কবর-জীবনকে স্মরণ করে আখিরাতের প্রস্তুতির সংকল্প গ্রহণ করা যায়। তাছাড়া আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় করা এবং মাগফিরাতের দুআ ও ঈসালে ছওয়াবের মাধ্যমে তাদের উপকৃত করা যায়। আর আল্লাহওয়ালাদের কবর যিয়ারতের দ্বারা যে পথে চলে তারা আল্লাহর দরবারে মাকবুল হয়েছেন ওই পথে চলার পাক্কা এরাদা করা যায়। এ ধরনের বিভিন্ন মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে কবর যেয়ারতকে নিষিদ্ধ করার পরও আবার অনুমতি দান করা হয়েছে।
তবে পুরুষরাই শুধু এই অনুমতির আওতায় পড়ে। নারীদের জন্য কবর যেয়ারতের অনুমতি নেই। যেহেতু তারা কবরে গিয়ে সেখানে কান্নাকাটি ও অস্থিরতা প্রকাশ করার আশংকা থাকায় তাদেরকে কবরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। সুনানে তিরমিযীর একটি হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযাসাল্লাম কবর যিযারতকারী নারীদের উপর অভিসম্পাত করেছেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৮৪৪৯; জামে তিরমিযী, হাদীস ১০৫৬; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৫৭৫; মিশকাত পৃ ১৫৪)
কবর বা মাজার যিয়ারতের জন্য নিজের এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় যাওয়া ঠিক নয়। তবে সেখানে যদি ভিন্ন কোনো কারণে গিয়ে থাকে তাহলে সে এলাকার ওলী বুজুর্গদের কবর যিয়ারত করে আসাতে সমস্যা নেই। তবে রাসুল সা. এর কবর যিয়ারতের বিষয়টি ভিন্ন। অন্যদের কবর বা মাজারকে এর ওপর কিয়াস করা সঠিক নয়। (মায়ারিফুস সুনান ৩/৩৩৫)

 

উল্লেখ্য, কবর যিয়ারতে গিয়ে কবরওয়ালার কাছে কিছু প্রার্থনা করা যাবে না। যিয়ারতের আসল উদ্দেশ্য হলো, কবরওয়ালার জন্য ঈসালে সাওয়াবের দ্বারা তার উপকার করা। হাদিস শরিফে কবর যিয়ারতের যে পদ্ধতি বলা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে নিজের জন্য কোনো কিছু চাওয়ার কথা নেই। বরং দোয়া-দরুদ পড়ে তাদের রূহে সাওয়াব পাঠানোর কথা আছে।
কবর যেয়ারতের বিষয়ে আমাদের দেশের মানুষ চরম প্রান্তিকতার শিকার। কবরের বিষয়ে শরিয়ত ইফরাত-তাফরীত (কোনো প্রকারের প্রান্তিকতা) অনুমোদন করে না। সুতরাং কবরের অসম্মানও যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি সম্মানের সীমা অতিক্রম করাও নিষিদ্ধ। হজরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযাসাল্লাম কবর পাকা করতে, এর উপর গম্বুজ নির্মাণ করতে আর কবরের উপর বসতে নিষেধ করেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদীস ৯৭০; মিশকাতুল মাসাবীহ পৃ ১৪৮)
এক হাদীসে আছে, ‘কবরের উপর বসবে না, কবরের দিকে ফিরে নামাযও পডবে না’। (সহিহ মুসলিম, হাদীস ৯৭২) আরেক হাদীসে আছে, ‘তোমাদের কেউ যেন কবরের উপর না বসে। সে জ্বলন্ত কযলার উপর বসুক, যার কারণে তার পরিধেয় কাপড় পুড়ে তার শরীরও পুড়ে যায়- এ-ও তার জন্য ভালো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদীস ৯৭১) এক হাদীসে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযাসাল্লাম কবর পাকা করতে, তার উপর কিছু লিখতে এবং তা পদদলিত করতে নিষেধ করেছেন। (জামে তিরমিযী, হাদীস ১০৫২)
এ সব হাদীস থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, কবরের অসম্মানও কাম্য নয়, সীমাতিরিক্ত সম্মানও কাম্য নয়। তবে কবরের উপর খেলাফে শরা কর্মকা- হলে তা সংশোধন করা জরুরি। হজরত আলী রা. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযাসাল্লাম আমাকে এ কাজে পাঠিয়েছিলেন যে, যে ছবি বা মূর্তিই দেখি তা যেন বিলুপ্ত করি আর যে কবরই উঁচু দেখি তা যেন সমান করি। (সহিহ মুসলিম, মিশকাত শরীফ পৃ ১৪৮) এই

 

হাদীসগুলো থেকে প্রমাণিত হয়, পাকা কবর বানানো বা কবরের উপর গম্বুজ নির্মাণ জায়েজ নয়। স্বয়ং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযাসাল্লাম ও তাঁর দুই সাহাবি (হজরত আবু বকর ও ওমর রা)-এর কবরও পাকা নয়, কাঁচা। (সুনানে আবু দাউদ, মিশকাতুল মাসাবীহ পৃ ১৪৯)

 

সুতরাং এসব হাদিসের আলোকে ওই সব কার্যকলাপ সম্পর্কে চিন্তা করা উচিত, যা আমাদের দেশের মানুষ ওলী-বুযুর্গদের কবরে ও তাদের মাজারে করে থাকে। যেমন কবরে গেলাফ চড়ানো, বাতি জ্বালানো, কবরে সিজদা করা, তাওয়াফ করা, কবরে চুমু খাওয়া, কপাল ঘষা, কবরের সামনে হাত বেধে এমনভাবে দাঁডানো যেভাবে নামাজী আল্লাহর সামনে হাত বেধে দাঁড়ায়, কবরের সামনে রুকুর মতো ঝোঁকা, কবরের উদ্দেশ্যে মান্নত মানা, নিয়ায চড়ানো ইত্যাদি। কবর বা মাজারের এসব কার্যকলাপ স্পষ্ট শিরক ও কবিরা গুনাহ।

 

লেখক : শিক্ষক, জামিয়া রহমানিয়া সওতুল হেরা, টঙ্গী, গাজীপুর