ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

মানুষ মারা গেলে তাকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য এবং তার রূহের মাগফিরাতের জন্য যে শেষবিদায়ানুষ্ঠান আয়োজন করা হয় এবং তাতে যে বিশেষ পদ্ধতিতে নামাজ পড়া হয়, তার নাম জানাযা। অত্যন্ত ভাবগম্ভীর ও অনাড়ম্বর পরিবেশে এই জানাযার নামাজ আদায় করা হয়ে থাকে। মৃতের রূহের মাগফিরাত কামনায় এই জানাযার নামাজ আদায় করা জীবিতদের জন্য শরয়ি দায়িত্ব। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিস শরিফে ইরশাদ করেন-

حَدَّثَنَا مُحَمَّدٌ حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ أَبِي سَلَمَةَ عَنْ الْأَوْزَاعِيِّ قَالَ أَخْبَرَنِي ابْنُ شِهَابٍ قَالَ أَخْبَرَنِي سَعِيدُ بْنُ الْمُسَيَّبِ أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ خَمْسٌ رَدُّ السَّلَامِ وَعِيَادَةُ الْمَرِيضِ وَاتِّبَاعُ الْجَنَائِزِ وَإِجَابَةُ الدَّعْوَةِ وَتَشْمِيتُ الْعَاطِسِ

 

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন, ‘একজন মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের পাঁচটি হক রয়েছে। সালামের উত্তর দেয়া, অসুস্থের খোঁজখবর নেয়া, জানাযায় অংশ গ্রহণ করা, দাওয়াত কবুল করা এবং হাঁচির জবাব দেয়া।’ (বুখারি শরিফ, ২/৩৭৮)
অপর এক হাদিসে আছে-

وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ ، رَضِيَ الله عَنْهُ ، أَنَّهُ سَمِعَ النَّبِيَّ صَلَّى الله عَلَيه وسَلَّم ، يَقُولُ : خَمْسٌ مَنْ عَمِلَهُنَّ فِي يَوْمٍ كَتَبَهُ الله مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ : مَنْ عَادَ مَرِيضًا ، وَصَامَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ ، وَرَاحَ إِلَى الْجُمُعَةِ ، وَشَهِدَ جِنَازَةً ، وَأَعْتَقَ رَقَبَةً.

 

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন, ‘পাঁচটি আমল এমন আছে যে ব্যক্তি কোনো দিন ওই আমলগুলো করে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতবাসীদের অর্ন্তভুক্ত করে দেবেন। রুগীর খোঁজখবর নেয়া, জানাযায় অংশগ্রহণ করা, জুমুআর দিন রোজা রাখা, জুমুআর নামাজের জন্য প্রত্যুষে রওয়ানা করা এবং একটি গোলাম আযাদ করা। (সহিহ ইবনে হিব্বান ৬/৭ হাদিস নং ২৭৭১)
আরেক হাদিসে আছে-

عَن أبي هُرَيْرَة رَضِيَ اللَّهُ عَنْه قال قال رسول الله {صلى الله عليه وسلم} من شهد الجنازة حتى يُصلى عليها فله قيراط ومن شهدها حتى تدفن فله قيراطان قيل وما القيراطان قال مثل الجبلين العظيمين

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের জানাযায় অংশ গ্রহণ করে জানাযার নামাজ আদায় করে তার জন্য রয়েছে এক ‘কিরাত’ সাওয়াব। আর যে ব্যক্তি জানাযায় শরিক হয়ে দাফন কার্য সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত উপস্থিত থাকে তার জন্য রয়েছে দুই ‘কিরাত’ সমপরিমাণ সাওয়াব। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! দুই কিরাত বলতে কী বুঝানো হয়েছে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, দুটি বৃহৎ পাহাড়ের সমপরিমাণ সাওয়াব। (বুখারি শরিফ ২/৪০৩)

শরিয়তের দৃষ্টিতে জানাযার নামাজ আদায় করা ফরজে কেফায়া। কোনো এলাকায় যদি কাউকে জানাযার নামাজ ছাড়া দাফন করে দেয়া হয় তাহলে ওই এলাকার সবাই গুনাহগার হবে। জানাযার নামাজ শুদ্ধ হওয়ার জন্য বেশ কিছু শর্ত রয়েছে।

(১) মৃত ব্যক্তিকে অবশ্যই মুসলমান হতে হবে। কোনো অমুসলিম, কাফের, নাস্তিক-মুরতাদের জানাযার নামাজ পড়া জায়েয নয়।
(২) মৃত ব্যক্তিকে জীবিতাবস্থায় জন্মগ্রহণ করতে হবে। কাজেই মৃত নবজাতক বা মৃত ভ্রুণের জানাযার নামাজ পড়ার প্রয়োজন নেই।
(৩) মৃত ব্যক্তির শরীর ও কাপড় প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরণের নাপাকি থেকে পবিত্র হতে হবে। চাই সে পবিত্রতা গোসলের দ্বারা হোক বা তায়াম্মুমের দ্বারা হোক। সুতরাং কোনো মৃত ব্যক্তির স্বাভাবিকভাবে গোসল ও অপারগতাবশত তায়াম্মুম করানো ছাড়া জানাযার নামাজ পড়ালে তা শুদ্ধ হবে না। পবিত্র করানোর পর পুনরায় নামাজ পড়াতে হবে।
(৪) মৃতের সতর আবৃত থাকতে হবে। অন্যথায় জানাযার নামাজ সহিহ হবে না। সুতরাং পুরুষ ও মহিলার জীবিতাবস্থায় যে পরিমাণ তার সতর হিসেবে গণ্য, সে পরিমাণ সতর ঢেকে রাখতে হবে। অন্যথায় তার জানাযার নামাজ শুদ্ধ হবে না।
(৫) মৃতের লাশ ইমাম ও মুক্তাদিগণের সামনে থাকতে হবে। পাশে বা পিছনে থাকলে বা একেবারে অনুপস্থিত থাকলে জানাযা শুদ্ধ হবে না।
(৬) মৃতের লাশ মাটিতে বা খাটিয়ার ওপর রাখতে হবে। কোনো ওজর ছাড়া মৃতের লাশ জানবাহনের ওপর বা মানুষের কাঁেধর ওপর রেখে জানাযার নামাজ আদায় করলে তা শুদ্ধ হবে না।
(৭) মৃতের লাশ অবশ্যই জানাযা স্থলে উপস্থিত থাকতে হবে। অনুপস্থিত লাশের ওপর জানাযা অর্থাৎ গায়েবানা জানাযা পড়া জায়েয নয়।

সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, আমাদের সমাজে যারা রাজনৈতিক হত্যাকান্ডে বা সহিংসতায় মারা যান, কর্মসূচি দিয়ে তাদের গায়েবানা জানাযা পড়া হয়। যেহেতু একজায়গায় একত্রিত হয়ে সবাই মিলে তার জানাযার নামাজ পড়া সম্ভব নয় সে কারণেই মৃত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার গায়েবানা জানাযা পড়া হয়ে থাকে। তাছাড়া অনেক সময় দেখা যায় বড় কোনো আলেম বা পীড়-মাশায়েখ মারা গেলে তার প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্মান থাকার কারণে তার জানাযার নামাজ পড়তে আগ্রহ বোধ করে। এসব ক্ষেত্রে মানুষ সাধারণত গায়েবানা জানাযার আশ্রয় নিয়ে থাকে। কিন্তু গায়েবানা জানাযা জায়েয কিনা এ বিষয়টিকে কেউ ক্ষতিয়ে দেখার চেষ্টা করেন না। যেহেতু জানাযার নামাজ একটি ইবাদত ও ধর্মীয় বিষয় তাই ধর্মীয় শর্তাবলী ও বিধি-বিধান মেনেই তা পালন করা উচিত। দুঃখের বিষয় হলো, সম্প্রতি জানাযার বিধি-বিধানকে চরম উপেক্ষা করে এই মহান ইবাদতটিকে পলিটিক্যাল ফ্যাশনে রূপ দেয়া হয়েছে, যা কিছুতেই কাম্য নয়।

হানাফি, মালেকি মাযহাবের সব ফকিহ ও হাম্বলি মাযহাবের ফকিহদের একাংশের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, লাশ অনুপস্থিত রেখে গায়েবানা জানাযা জায়েয নয়। কেননা সাহাবায়ে কেরামের পূর্ণ যুগের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, সে যুগে গায়েবানা জানাযা পড়ার কোনো প্রচলন ছিল না। অথচ সে যুগেও বড় বড় সাহাবি দূর-দূরান্তে ইন্তেকাল করেছিলেন; কিন্তু তাদের গায়েবানা জানাযা পড়া হয়নি। যেমন বীরে-মাউনার ঘটনায় সত্তরজন কারী আলেম সাহাবির শাহাদাতের খবর পেয়েও নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গায়েবানা জানাযা পড়েননি। এমনকি স্বয়ং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকালের পরও কোথাও কোনো সাহবি এমনকি মক্কা শরিফ যা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মস্থান সেখানেও কোনো গায়েবানা জানাযা পড়া হয়নি। আর নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো কাজ ব্যাপকভাবে বর্জন করা তা বর্জনীয় হওয়ার প্রমাণ।

হাম্বলি মাযহাবের অন্যতম ভাষ্যকার হাফিজ ইবনুল কায়্যিম (রহঃ) বলেন-
ولم يكن من هديه وسنته الصلاة على كل ميت غائب فقد مات خلق كثير من المسلمين وهم غيب فلم يصل عليهم
‘গায়েবানা জানাযা পড়া রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত পরিপন্থী। কেননা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় দূর-দূরান্তে বহু সাহাবায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেছেন; কিন্তু তিনি তাদের গায়েবানা জানাযা পড়েননি। (আউনুল মা’বুদ ২০/১৬০, লামেউদ্দারারী ৪/৪৩৩)

হানাফি মাযহাবের শ্রেষ্ঠতম ভাষ্যকার আল্লামা ইবনুল হুমাম (রহঃ) বলেন,
وَشَرْطُ صِحَّتِهَا إسْلَامُ الْمَيِّتِ وَطَهَارَتُهُ وَوَضْعُهُ أَمَامِ الْمُصَلِّي ، فَلِهَذَا الْقَيْدِ لَا تَجُوزُ عَلَى غَائِبٍ وَلَا حَاضِرٍ مَحْمُولٍ عَلَى دَابَّةٍ أَوْ غَيْرِهَا ، وَلَا مَوْضُوعٍ مُتَقَدِّمٍ عَلَيْهِ الْمُصَلِّي ، وَهُوَ كَالْإِمَامِ مِنْ وَجْهٍ .

‘জানাযা সহিহ হওয়ার জন্য শর্ত হলো, মৃতকে মুসলমান হতে হবে। পবিত্র হতে হবে এবং লাশ মুসল্লিদের সামনে রাখতে হবে। কাজেই অনুপস্থিত লাশের ওপর গায়েবানা জানাযা জায়েয নয়। (ফাতহুল কাদীর ৩/৩৬৬) এতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, লাশ ছাড়া জানাযা তথা গায়েবানা জানাযা পড়া জায়েয নয়।

ফাতহুল কদীরেরই অন্য জায়গায় তিনি বলেন,
ثُمَّ دَلِيلُ الْخُصُوصِيَّةِ أَنَّهُ لَمْ يُصَلِّ عَلَى غَائِبٍ إلَّا عَلَى هَؤُلَاءِ وَمَنْ سِوَى النَّجَاشِيِّ صَرَّحَ فِيهِ بِأَنَّهُ رُفِعَ لَهُ وَكَانَ بِمَرْأًى مِنْهُ مَعَ أَنَّهُ قَدْ تُوُفِّيَ خَلْقٌ مِنْهُمْ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ غَيْبًا فِي الْأَسْفَارِ كَأَرْضِ الْحَبَشَةِ وَالْغَزَوَاتِ وَمِنْ أَعَزِّ النَّاسِ عَلَيْهِ كَانَ الْقُرَّاءُ ، وَلَمْ يُؤْثَرْ قَطُّ عَنْهُ بِأَنَّهُ صَلَّى عَلَيْهِمْ وَكَانَ عَلَى الصَّلَاةِ عَلَى كُلِّ مَنْ تُوُفِّيَ مِنْ أَصْحَابِهِ حَرِيصًا حَتَّى قَالَ { لَا يَمُوتَنَّ أَحَدٌ مِنْكُمْ إلَّا آذَنْتُمُونِي بِهِ ، فَإِنَّ صَلَاتِي عَلَيْهِ رَحْمَةٌ لَهُ } عَلَى مَا سَنَذْكُرُ .
‘বহু সাহাবায়ে কেরাম এমন রয়েছেন, যারা বিভিন্ন সফরে মদিনার বাইরে ইন্তেকাল করেছেন। যেমন সিরিয়া বা বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে। এক বীরে মাউনার মর্মান্তিক হত্যাকান্ডেই শহীদ হয়েছেন সত্তরজন সাহাবি। যারা ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র; কিন্তু তিনি তাদের কারো গায়েবানা জানাযা পড়েছেন বলে একটি বর্ণনাও পাওয়া যায় না। অথচ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের জানাযায় শরীক হতে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। যে কারণে তিনি বলে রাখতেন, তোমাদের মধ্যে কারো ইন্তেকাল হলে আমাকে সংবাদ দিবে। যাতে আমি তার জানাযা পড়তে পারি। কারণ আমি যার জানাযায় শরীক হবো তা তার জন্য রহমতের কারণ হবে। (ফাতহুল কাদীর ৩/৩৬৮)

আল্লামা কাসানি (রহঃ) বলেন,
وعلى هذا قال أصحابنا : لا يصلى على ميت غائب
‘এজন্যই আমাদের ওলামারা বলেছেন, অনুপস্থিত লাশের ওপর জানাযা তথা গায়েবানা জানাযা পড়া যাবে না। (বাদায়েউস সানায়ে ৩/২৮৮)

বিখ্যাত ফাতওয়া গ্রন্থ ফাতওয়ায়ে শামীতে বলা হয়েছে,
حضوره (ووضعه) وكونه هو أو أكثر (أمام المصلي) وكونه للقبلة فلا تصح على غائب
জানাযা সহিহ হওয়ার জন্য শর্ত হলো, মৃতের লাশ মুসল্লিদের সম্মুখে উপস্থিত থাকা। কাজেই গায়েব বা অনুপস্থিত লাশের ওপর জানাযা জায়েয নয়। (ফাতওয়ায়ে শামী ২/২২৬)

মোটকথা, হানাফি ও মালেকি মাজহাবের ইমামগণের সর্বসম্মত অভিমত হলো, গায়েবানা জানাযা জায়েয নয়। জানাযা পড়তে হলে অবশ্যই লাশ সমল্লিদের সামনে উপস্থিত থাকতে হবে।

কেউ কেউ গায়েবানা জানাযা জায়েয বলতে চান। তারা দলিল হিসেবে ইথিওপিয়ার মুসলিম বাদশাহ হজরত নাজ্জাসী (রাঃ) এর ঘটনা এবং মুয়াবিয়া বিন মুয়াবিয়া আল মুযানি (রাঃ) এর ঘটনা পেশ করেন।

নাজ্জাসীর জানাযার ঘটনা :
নাজ্জাসীর জানাযার ঘটনাটি সহিহ ইবনে হ্বি¦ানে এভাবে বর্ণিত হয়েছে।
عمران بن حصين أن النبي صلى الله عليه وسلم قال إن أخاكم النجاشي توفى فقوموا صلو عليه فقام رسول الله صلى الله عليه وسلم وصفوا خلفه فكبر أربعا وهم لا يظنون إلا أن جنازته بين يديه

ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাই নাজ্জাশী ইন্তিকাল করেছেন। চলো তার জানাযার নামাজ পড়ি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে বাইরে এলেন। সাহাবায়ে কেরাম তার পেছনে কাতারবন্দি হলেন। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার তাকবীরের সহিত নামাজ পড়ালেন। সাহাবায়ে কেরামের ধারণা নাজ্জাশীর জানাযা নবী করিম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে রাখা ছিলো। (সহিহ ইবনে হ্বি¦ান ১/৩৫৫)

সহিহ বুখারিতে ঘটনার বিবরণ এভাবে রয়েছে,
حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ زُرَيْعٍ حَدَّثَنَا مَعْمَرٌ عَنْ الزُّهْرِيِّ عَنْ سَعِيدٍ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ نَعَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى أَصْحَابِهِ النَّجَاشِيَّ ثُمَّ تَقَدَّمَ فَصَفُّوا خَلْفَهُ فَكَبَّرَ أَرْبَعًا

হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সাহাবায়ে কেরামের কাছে উপস্থিত হয়ে নাজ্জাসীর মৃত্যু সংবাদ শুনালেন এবং জানাযার নামাজ পড়ার জন্য সামনে অগ্রসর হলেন। সাহাবায়ে কেরাম তার পেছনে কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়ালেন। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার তাকবীর দিলেন। (বুখারি শরিফ ১/১৭৬)

বুখারি শরিফের অন্য বর্ণনায় হজরত জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে,
حَدَّثَنَا أَبُو الرَّبِيعِ حَدَّثَنَا ابْنُ عُيَيْنَةَ عَنْ ابْنِ جُرَيْجٍ عَنْ عَطَاءٍ عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ مَاتَ النَّجَاشِيُّ مَاتَ الْيَوْمَ رَجُلٌ صَالِحٌ فَقُومُوا فَصَلُّوا عَلَى أَخِيكُمْ أَصْحَمَةَ

একদিন নবী করিম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হাবশার অধিবাসী একজন নেককার লোক মারা গেছেন। তোমরা তার জানাযা পড়ার জন্য প্রস্তুত হও। জাবের (রাঃ) বলেন, আমরা জানাযার নমাজ পড়ার জন্য কাতারবদ্ধ হলাম। অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযার নামাজ পড়ালেন। তখন আমরা কাতারে দাঁড়ানো ছিলাম। (বুখারি শরিফ ১/১৭৬)

ইবনে মাজাহ শরিফে ঘটনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে,
حدثنا محمد بن المثنى . حدثنا عبد الرحمن بن مهدي عن المثنى بن سعيد عن قتادة عن أبي الطفيل عن حذيفة بن أسيد أن النبي صلى الله عليه و سلم خرج بهم فقال ( صلوا على أخ لكم مات بغير أرضكم ) قالوا من هو ؟ قال ( النجاشي ) . صحيح
হুযায়ফা বিন উসায়েদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে বের হলেন। তিনি বললেন, তোমরা অমুসলিম দেশে বসবাসকারী তোমাদের এক ভাইয়ের জানাযা পড়। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি কে? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিনি নাজ্জাসী। (ইবনে মাজাহ ১১১)

উপর্যুক্ত হাদিসসমূহ সহ সিহাহ সিত্তায় বর্ণিত অন্যান্য হাদিস দ্বারা বুঝা যায় হাবশার অধিপতি নাজ্জাসী স্বদেশে ইন্তিকাল করেছেন আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বস্থানে সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে জানাযার নামাজ পড়েছেন। সুতরাং প্রমাণিত হলো, গায়েবানা জানাযা জায়েয আছে।

মুয়াবিয়া বিন মুয়াবিয়া আল মুযানি (রাঃ) এর গায়েবানা জানাযার ঘটনা :

মুয়াবিয়া বিন মুয়াবিয়া আল মুযানি (রাঃ) এর গায়েবানা জানাযার ঘটনা এভাবে বর্ণিত হয়েছে, ইমাম তাবারানী (রহঃ) তার লিখিত গ্রন্থ আল মুজামুল কাবীর গ্রন্থে হজরত আনাস বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন-

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، قَالَ : نَزَلَ جِبْرِيلُ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى الله عَلَيه وسَلَّم قَالَ : يَا مُحَمَّدُ ، مَاتَ مُعَاوِيَةُ بْنُ مَعَاوِيَةَ اللَّيْثِيُّ ، أَفَتُحِبُّ أَنْ تُصَلِّيَ عَلَيْهِ ؟ قَالَ : نَعَمْ فَضَرَبَ بِجَنَاحِهِ الأَرْضَ فَلَمْ تَبْقَ شَجَرَةٌ ، وَلاَ أَكْمَةٌ إِلاَّ تَضَعْضَعَتْ فَرَفَعَ سَرِيرَهُ ، فَنَظَرَ إِلَيْهِ وَصَلَّى عَلَيْهِ ، وَخَلْفَهُ صَفَّانِ مِنَ الْمَلاَئِكَةِ فِي كُلِّ صَفٍّ سَبْعُونَ أَلْفَ مَلَكٍ ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى الله عَلَيه وسَلَّم : يَا جِبْرِيلُ لِمَ نَالَ هَذِهِ الْمَنْزِلَةَ مِنَ اللهِ ؟ قَالَ : بِحُبِّهِ قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ، وَقِرَاءَتِهِ إِيَّاهَا ذَهَابًا ، وَإِيَابًا ، وَقَائِمًا ، وَقَاعِدًا ، عَلَى كُلِّ حَالٍ.

হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, একদা জিবরাইল (আঃ) রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে উপস্থিত হয়ে বললেন, হে আল্লাহ তায়ালার রাসুল! মুআবিয় ইবনে মুআবিয়া আল মুযানি ইন্তেকাল করেছেন। আপনি তার নামাজে জানাযা পড়তে আগ্রহী? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই। তখন জিবরাইল (আঃ) তার উভয় ডানা দ্বারা জমিনে আঘাত করলেন। ফলে জমিনের সকল গাছ-পালা টিলা-টুম্বর সমান হয়ে গেল। অতঃপর মুআবিয়ার লাশ উঠানো হলো। যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখতে পেলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযার নামাজ পড়ালেন। পেছনে দু’কাতার ফেরেশতা দাঁড়ালেন। প্রতি কাতারে সত্তর হাজার করে ফেরেশতা ছিল। নামাজ শেষে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরাইল (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন। কোন আমলের বরকতে মুআবিয়া এই মর্যাদা লাভ করল। উত্তরে হযরত জিবরাইল (আঃ) বললেন, মুআবিয়া সুরা ইখলাসকে খুবই মুহাব্বত করতেন। এবং চলতে ফিরতে উঠতে বসতে সর্বাবস্থায় তিনি সুরা ইখলাস তেলাওয়াত করতেন। (এলাউস সুনান ৮/২৩৪)

তাবারানী, কাবীর ১৯/৪২৮) এই ঘটনা দ্বারাও বুঝা যায়, গায়েবানা জানাযা পড়া বৈধ।

নাজ্জাসীর হাদিসের উত্তর :
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজ্জাসী (রাঃ) এর গায়েবানা জানাযা পড়েছেন বলে যে দাবি করা হয়েছে তা এই হাদিস দ্বারা বুঝা যায় না; বরং হাদিস দ্বারা যেটা বুঝা যায় সেটা হলো, নাজ্জাসীর লাশ মুজিজা স্বরূপ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনে নিয়ে আসা হয়েছিল। সাহাবায়ে কেরামও এই মনে করে জানাযার নামাজ পড়েছেন যে, লাশ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে আছে। যেমন সহিহ সনদে মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে,
حدثنا عبد الله حدثني أبي ثنا عبد الصمد ثنا حرب ثنا يحيى أن أبا قلابة حدثه أن أبا المهلب حدثه أن عمران بن حصين حدثه أن رسول الله صلى الله عليه و سلم قال ان أخاكم النجاشي توفي فصلوا عليه قال فصف رسول الله صلى الله عليه و سلم وصففنا خلفه فصلى عليه وما نحسب الجنازة إلا موضوعة بين يديه إسناده صحيح على شرط مسلم رجاله ثقات رجال الشيخين غير أبي المهلب الجرمي فمن رجال مسلم

হজরত ইমরান ইবনে হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের ভাই নাজ্জাসী ইন্তেকাল করেছেন। সুতরাং তোমরা তার জানাযা পড়। বর্ণনাকরী বলেন, এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাতার সোজা করে দাঁড়ালেন। আমরাও তার পিছনে কাতারবন্ধী হয়ে দাঁড়ালাম। আমাদের ধারণা হচ্ছিল লাশটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে রাখা হয়েছিল। (মুসনাদে আহমাদ ৪/৪৪৬)
বিষয়টি সহিহ ইবনে হিব্বানেও বর্ণিত হয়েছে,
عن عمران بن حصين قال أنبأنا رسول الله صلى الله عليه وسلم أن أخاكم النجاشي توفي فقوموا فصلوا عليه فقام رسول الله صلى الله عليه وسلم وصفوا خلفه وكبر أربعا وهم لا يظنون إلا أن جنازته بين يديه

এমনিভাবে সহিহ ইবনে হিব্বানেও সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, সাহাবায়ে কেরাম প্রবলভাবে ধারণা করেন যে, লাশটি নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে রাখা হয়েছে। (সহিহ ইবনে হিব্বান ১০/৩৪৭) বিষয়টি নাসর্বু রায়া গ্রন্থেও বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। এখানে তা হুবহু উল্লেখ করা হলো।
النوع الحادي والاربعين من القسم الخامس من حديث عمران بن حصين أن النبي صلى الله عليه وسلم قال إن أخاكم النجاشي توفى فقوموا صلو عليه فقام رسول الله صلى الله عليه وسلم وصفوا خلفه فكبر أربعا وهم لا يظنون إلا أن جنازته بين يديه الثاني أنه من باب الضرورة لانه مات بأرض لم يقم فيها عليه فريضة الصلاة فتعين فرض الصلاة عليه لعدم من يصلى عليه ثم ويدل على ذلك ان النبي صلى الله عليه وسلم لم يصل على غائب غيره وقد مات من الصحابة خلق كثير وهم غائبون عنه وسمع بهم فلم يصل عليهم إلا غائبا واحدا ورد أنه طوت له الارض حتى حضره وهو معاوية بن معاوية المزني

আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ) বুখারি শরিফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ ফাতহুল বারীতে ইয়াহইয়া ইবনে কাসিরের বর্ণনা উল্লেখ করার পর লিখেন, ‘আমরা নাজ্জাসীর জানাযা পড়েছি এই অবস্থায় যে, তার মৃতদেহ আমাদের সামনে উপস্থিত ছিল।’ (ফাতহুল বারী ৩/১৮৮)
ولابن حبان من حديث عمران بن حصين فقام وصفوا خلفه وهم لا يظنون الا أن جنازته بين يديه أخرجه من طريق الأوزاعي عن يحيى بن أبي كثير عن أبي قلابة عن أبي المهلب عنه ولأبي عوانة من
طريق أبان وغيره عن يحيى فصلينا خلفه ونحن لا نرى الا أن الجنازة قدامنا ومن الاعتذارات أيضا أن ذلك خاص بالنجاشي لأنه لم يثبت أنه صلى الله عليه وسلم صلى على ميت غائب غيره قال المهلب وكأنه لم يثبت عنده قصة معاوية المؤذن

উপরোক্ত বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, নাজ্জাসীর নামাজে জানাযা গায়েবানা ছিল না; বরং নাজ্জাসীর লাশ মদিনায় রাসুলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে পেশ করা হয়েছিল। তা ছিল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিযা। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিযা তার নির্দেশ ছাড়া উম্মতের জন্য আমল করা বা শরিয়তের বিধান হিসেবে নির্ধারণ করা যায় না।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় এমন বহু মুজেযা সংঘটিত হয়েছে। তিনি যখন মিরাজ সম্পন্ন করে ফিরে আসেন, মক্কার কাফের সম্প্রদায় তা অস্বীকার করে বসে এবং তাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ফেলে। তারা প্রশ্ন করে, আপনি যদি সত্যিই বাইতুল মাকদিস হয়ে উর্ধ্বাকাশ ভ্রমণ করে থাকেন তাহলে বলুন তো, বাইতুল মাকদিসের দরজা ও জানালা কয়টি? স্বাভাবিভাবে এসব অযৌক্তিক প্রশ্নের উত্তর দেয়ার দরকার নেই, তথাপি ঘটনার সত্যতা প্রমাণের জন্য আল্লাহ তায়ালা নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে বাইতুল মাকদিসের দৃশ্য হাজির করে দেন। তিনি তা দেখে দেখে জবাব দেন। উক্ত ঘটনায় দেখা যায়, দূরের কোনো জিনিস রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে হাজির করার ঘটনা একাধিক এবং এগুলো তার মুজিযা। এসব মুজিযা দ্বারা শরিয়তের কোনো বিধান প্রমাণ করা যায় না। যতক্ষণ তিনি সেটাকে উম্মতের আমলের জন্য শরিয়তের বিধান হিসেবে প্রমাণিত না করেন।

দ্বিতীয় উত্তর :
তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নেয়া হয় যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজ্জাসীর গায়েবানা জানাযা পড়েছিলেন তারপরও তার দ্বারা ব্যাপকভাবে গায়েবানা জানাযা বৈধ হওয়া প্রমাণিত হয় না। কেননা এটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি ঘটনা। যা তার জন্যই খাস ছিল। যেমন চারের অধিক বিবাহ করা তার জন্য খাস। অনুরূপ ঘুমালে অজু না ভাঙ্গা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে খাস। এসব বিশেষ বিধান দ্বারা উম্মতের জন্য ব্যাপকভাবে কোনো বিধান প্রমাণ করা যায় না। উল্লেখিত ঘটনা যে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত তার বড় প্রমাণ হলো, কুরুনে সালাসা তথা শ্রেষ্ঠতম তিন যুগে অর্থাৎ সাহাবা, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীনের যুগে কখনো গায়েবানা জানাযা হয়নি। কাজে নাজ্জাসীর ঘটনাকে যেভাবে বিশ্লেষণ করা হোক না কেন, এর দ্বারা গায়েবানা জানাযা জায়েয প্রমাণিত হয় না।

মুয়াবিয়া বিন মুয়াবিয়া আল মুযানি (রাঃ) এর ঘটনার জবাব :
মুয়াবিয়া বিন মুয়াবিয়া আল মুযানি (রাঃ) এর হাদিসের ব্যাপারে প্রথম কথা হলো অনেক মুহাদ্দিসের নিকট হাদিসটি দুর্বল। তদুপরি এই হাদিস দ্বারা গায়েবানা জানাযা প্রমাণিত হয় না। কেননা হাদিসের বর্ণনা দ্বারাই স্পষ্ট যে, সব পর্দা ও প্রতিবন্ধকাত উঠিয়ে দিয়ে তার লাশ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এনে দেয়া হয়েছিল।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، قَالَ : نَزَلَ جِبْرِيلُ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى الله عَلَيه وسَلَّم قَالَ : يَا مُحَمَّدُ ، مَاتَ مُعَاوِيَةُ بْنُ مَعَاوِيَةَ اللَّيْثِيُّ ، أَفَتُحِبُّ أَنْ تُصَلِّيَ عَلَيْهِ ؟ قَالَ : نَعَمْ فَضَرَبَ بِجَنَاحِهِ الأَرْضَ فَلَمْ تَبْقَ شَجَرَةٌ ، وَلاَ أَكْمَةٌ إِلاَّ تَضَعْضَعَتْ فَرَفَعَ سَرِيرَهُ ، فَنَظَرَ إِلَيْهِ وَصَلَّى عَلَيْهِ ، وَخَلْفَهُ صَفَّانِ مِنَ الْمَلاَئِكَةِ فِي كُلِّ صَفٍّ سَبْعُونَ أَلْفَ مَلَكٍ ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى الله عَلَيه وسَلَّم : يَا جِبْرِيلُ لِمَ نَالَ هَذِهِ الْمَنْزِلَةَ مِنَ اللهِ ؟ قَالَ : بِحُبِّهِ قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ، وَقِرَاءَتِهِ إِيَّاهَا ذَهَابًا ، وَإِيَابًا ، وَقَائِمًا ، وَقَاعِدًا ، عَلَى كُلِّ حَالٍ.

হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, একদা জিবরাইল (আঃ) রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে উপস্থিত হয়ে বললেন, হে আল্লাহ তায়ালার রাসুল! মুআবিয় ইবনে মুআবিয়া আল মুযানি ইন্তেকাল করেছেন। আপনি তার নামাজে জানাযা পড়তে আগ্রহী? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই। তখন জিবরাইল (আঃ) তার উভয় ডানা দ্বারা জমিনে আঘাত করলেন। ফলে জমিনের সকল গাছ-পালা টিলা-টুম্বর সমান হয়ে গেল। অতঃপর মুআবিয়ার লাশ উঠানো হলো। যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখতে পেলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযার নামাজ পড়ালেন। পেছনে দু’কাতার ফেরেশতা দাঁড়ালেন। প্রতি কাতারে সত্তর হাজার করে ফেরেশতা ছিল। নামাজ শেষে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরাইল (আঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন। কোন আমলের বরকতে মুআবিয়া এই মর্যাদা লাভ করল। উত্তরে হযরত জিবরাইল (আঃ) বললেন, মুআবিয়া সুরা ইখলাসকে খুবই মুহাব্বত করতেন। এবং চলতে ফিরতে উঠতে বসতে সর্বাবস্থায় তিনি সুরা ইখলাস তেলাওয়াত করতেন। (এলাউস সুনান ৮/২৩৪)

উক্ত হাদিসের বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায়, হজরত মুয়াবিয়া আল মুযানির জানাযা গায়েবানা জানাযা ছিল না। তার মৃতদেহ উপস্থিত করেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযা পড়েছেন। এই বর্ণনা দ্বারা এই বিষয়টিও পরিস্কার হয়ে যায় যে, গায়েবানা জানাযা জায়েয নয়। কেননা যদি গায়েবানা জানাযা জায়েযই হত তাহলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে কেন এত অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তার লাশ হাজির করা হলো। বরং স্বাভাবিকভাবেই তিনি গায়েবানা জানাযা পড়ে নিতেন।

জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহঃ) বুখারি শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘ফায়যুল বারীতে’ লিখেন,
أما الصلاة على الغائب فلم يثبت فيها إلا واقعة النجاشي و أما واقعة معاوية الليثي فاختلفوا فيها والظاهرأنه منكر فاذا لم يثبت تلك الصلاة في عهد النبي صلى الله عليه وسلم مع أن كثيرا من المسلمين في دار عزابة في عهده صلى الله عليه وسلم فانسب أن نختم بعهده صلى الله عليه وسلم سيما اذا لم تجري عليها توارث الأمة أيضا بخلاف الصلاة على القبر فإن بعضهم عملوا بها فيما بعد

অনুপস্থিত মৃতদেহের ওপর জানাযা পড়া নাজ্জাসীর ঘটনা ছাড়া আর কোনো ঘটনা দ্বারা প্রমাণিত হয় না। ইবনে মুয়াবিয়ার যে কথা উল্লেখ করা হয়ে থাকে সে সম্পর্কে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। সহিহ বর্ণনা হলো, ইবনে মুয়াবিয়ার এই ঘটনা ভিত্তিহীন। অতএব গায়েবানা জানাযার আর কোনো ঘটনা যেহেতু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে ঘটেনি, অথচ বহু সাহাবি দূর-দূরান্তে ইন্তেকাল করেছেন। কাজেই নাজ্জাসীর এই ঘটনাটিকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিযা গণ্য করা উচিত। বিশেষ করে যখন যুগ পরম্পরায় গায়েবানা জানাযার প্রচলন ছিল না, তাই তা একথার সুস্পষ্ট প্রমাণ বহণ করে যে, এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী বিচ্ছিন্ন ঘটনা। যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল।’ (ফায়যুল বারী ৪/৪৬৭)

হাম্বলি মাজহাবের ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এ ক্ষেত্রে একটি চমৎকার মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, যদি নাজ্জাসীর ঘটনা দ্বারা গায়েবানা জানাযার পক্ষে দলিল পেশ করা হয় তাহলে গায়েবানা জানাযা ওই সব মুসলামানেরর ওপর পড়া যাবে যাদের ওপর কোনো মুসলমান না থাকার কারণে সরাসরি জানাযা পড়ানো সম্ভব হয় না। নাজ্জাসীর ওপর এই জন্য জানাযা পড়া হয়েছিল, যেহেতু ইথিওপিয়ায় তখন কোনো মুসলমান না থাকার কারণে সরাসরি তার ওপর জানাযা পড়া সম্ভব হয়নি। একারণেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় সাহাবিদের নিয়ে তার জানাযার নামাজ সম্পন্ন করেছিলেন।

যদি গায়েবানা জানাযা পড়া যদি জায়েযই হত তাহলে এইভাবে সব বাধা ও প্রতিবন্ধকতা উঠিয়ে দেয়ার কী প্রয়োজন ছিল।

আর বুখারি শরিফের হাদিসটির উত্তর হলো, যেহেতু ওই মহিলা মসজিদে নববীর ঝাড়ু দিতেন, তাই তার বিশেষ প্রতিদান হিসেবে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটি করেছেন। তাছাড়া দ্বিতীয় জানাযা কেবলমাত্র ওই ক্ষেত্রে পড়া যেখানে প্রথম জানাযা অলীর অনুমতি ছাড়া পড়া হয়। সেমতে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব মুমিনের সবচেয়ে বড় অভিভাবক। তাই তিনি ওই সাহাবি অথবা সাহাবিয়ার জানাযা পুনরায় পড়েছিলেন।

হজরত হামজা (রাঃ) বদরী সাহাবি ছিলেন। একাধিক জানাযাসহ ভিন্ন পদ্ধতিতে তথা চারের অধিক তাকবীরের সাথে জানাযা পড়া বদরী সাহাবিদের বিশেষ বৈশিষ্ট ছিল।
أخبرنا أبو جناب الكلبي قال: سمعت عمير بن سعيد يقول: صلى علي على سهل بن حنيف فكبر عليه خمسا فقالوا: ما هذا التكبير؟ فقال: هذا سهل بن حنيف من أهل بدر، ولأهل بدر فضل على غيرهم فأردت أن أعلمكم فضلهم. واحد

যেমন হজরত উমায়ের বিন সাঈদ (রাঃ) বর্ণনা করেন, ( হজরত সাহল ইবনে হুযায়ফ রাঃ ইন্তেকাল করলে) হজরত আলী (রাঃ) তার জানাযার নামাজ পড়ান এবং এতে পাঁচ তাকবীর বলেন। ফলে লোকেরা বলেন, এই অতিরিক্ত তাকবীর কিসের। তিনি বললেন, ইনি সাহল ইবনে হুযায়ফ (রাঃ)। তিনি বদরী সাহাবি। আর বদরী সাহাবিদের অন্যান্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। (আততাবাকাতুল কুবরা ৩/৪৭৩)

মোটকথা গায়েবানা জানাযার পক্ষে যেসব দলিল পেশ করা হয়ে থাকে, সেগুলোর কোনোটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাস, কোনোটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুজিযা, আবার কোনোটি এমন ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেখানে কোনো কারণবশত মুসলামানগণ জানাযার নামাজ পড়তে পারেননি। কোনোটা দ্বারা গায়েবানা জানাযা প্রমাণ করা যায় না। সুতরাং শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এমন কাজের প্রচলন ঘটানো যা শরিয়ত দ্বারা প্রমাণিত নয় তা সম্পূর্ণ বিদআত। যা অত্যন্ত ঘৃণিত। মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করতে হলে, তার রূহের মাগফিরাত কামনা করতে হলে শরিয়ত অনুমোদিত পন্থায় যাবতীয় শর্ত-শরায়েত মেনেই জানাযা পড়তে হবে। আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সবাইকে বুঝার তাওফিক দান করুন। আমীন।

শিক্ষক, জামিয়া রহমানিয়া সওতুল হেরা, টঙ্গী, গাজীপুর।