ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

মানবজীবনে পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। পাত্র-পাত্রীর মাঝে অসামঞ্জস্যতা বিয়ে পরবর্তী দাম্পত্য জীবনে নানা সংকট সৃষ্টি করে। অনেক সময় সে সংকট নিরসন করা সম্ভবপর হয় না। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বড় ধরণের ব্যবধান ও অসামঞ্জস্যতা অনেক ক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ইসলাম পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। যাতে বিবাহ করে মানুষ অতৃপ্তিতে না ভোগে এবং বিয়ের মতো একটি পবিত্র ও ধর্মীয় বন্ধন সারা জীবন অটুট থাকে। পাত্র-পাত্রীর মাঝে সামঞ্জস্যতা দাম্পত্য জীবনে এনে দেয় স্বস্তি ও প্রশান্তি। এই প্রশান্তিই নর-নারীকে সাহায্য করে যাবতীয় পাপাচার থেকে দূরে থেকে নিজেদের চারিত্রিক পবিত্রতা অক্ষুণ্ন রাখতে।

হাদিস শরিফে আছে, ‘হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন, আমি এক আনসারী মেয়েকে বিয়ে করতে চাচ্ছি। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মেয়েটিকে দেখে নাও। আনসারীদের চোখে আবার সমস্যা থাকে।’ (মুসলিম শরিফ)

পাত্র-পাত্রী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে নানা অপসংস্কৃতি প্রচলিত আছে। অপসংস্কৃতির বিষাক্ত ছোবল অপ্রতিরুব্ধ গতিতে আমাদের সমাজকে গ্রাস করে নিচ্ছে। অপসংস্কৃতির ব্যাপক বিস্তারের ফলে আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে অপসৃত হচ্ছে ধর্ম ও সমাজের শতাব্দীর পর শতাব্দী লালিত ইসলামের মূল চেতনা। এই সব অপসংস্কৃতির একটি হলো, উকিল বাবাকে নিজের বাবার মতো মনে করা। আমাদের দেশের অনেক এলাকায় দেখা যায় যে, বিয়ের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা সৃষ্টিকারী উকিল বাবাকে নিজের বাবার মতো মনে করা হয়। তিনি নিজে গিয়ে পাত্রী দেখে আসেন এবং তার কাছ থেকে বিয়ের অনুমতি এনে বিয়ের মজলিসে কনের পক্ষ হয়ে ওকালতি করেন। পরবর্তীতে তিনি কনের আপন বাবার মর্যাদায় ভূষিত হয়ে তার মাহরামদের অর্ন্তভূক্ত হয়ে যান। বিভিন্ন উপলক্ষে তিনি কনের পক্ষ থেকে মোটা অংকের হাদিয়া-তোহফা পেয়ে থাকেন। তার সাথে পর্দা রক্ষা করা হয় না।

উকিল বাবা সাধারণত কনের মাহরাম কোনো আত্মীয় স্বজন হন না। বরং তিনি গাইরে মাহরামই হয়ে থাকেন। তার সঙ্গে পর্দা করা ইসলামের দৃষ্টিতে ফরজ। শুধু সামাজিক প্রচলনের ওপর ভিত্তি করে একজন গাইরে মাহরাম ব্যক্তিকে উকিল বাবা ঠিক করে তার সাথে মাহরাম আত্মীয়-স্বজনদের ন্যায় দেখা সাক্ষাত করা ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। ইসলাম সকল গাইরে মাহরামের সাথে পর্দা করার নির্দেশ দিয়েছে। পর্দা নারীর সুন্দর্য। নারীর মান-সম্মান, ইজ্জত-আব্রু হেফাজত করার জন্যই পর্দা রক্ষা করে চলা অপরিহার্য কতর্ব্য।

কোরআনে কারিমে বলা হয়েছে, মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে ও তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। তারা ‘যা সাধারণত প্রকাশ থাকে’ তা ব্যতীত তাদের আভরণ প্রদর্শণ না করে। তাদের বক্ষদেশ ও গ্রীবা যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে। তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, আপন নারীগণ, তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌনকামনা রহিত পুরুষ এবং নারীদের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত কারো নিকট তাদের আভরণ প্রকাশ না করে। (সুরা নুর ২৪-৩০) আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, কাউকে উকিল বাবা ঠিক করার কারণে তার সাথে পর্দার বিধান রহিত হয়ে যায় না। কাজেই উকিল বাবার সঙ্গেও পরিপূর্ণ পর্দা করতে হবে।

অনেক সময় দেখা যায় যে, মেয়ের কাছ থেকে অনুমতি আনার সময় সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য উকিল বাবার সঙ্গে বর কনে উভয় পক্ষের দু’জন সাক্ষী যায়। এই সাক্ষী রাখাকে জরুরিও মনে করা হয়। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। শরিয়তের দৃষ্টিতে গাইরে মাহরাম কেউ মেয়ের কাছে অনুমতি আনার জন্য তার সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে পারবে না। বিয়ের আগে পাত্রীকে গাইরে মাহরামদের মধ্যে শুধু পাত্রই কিছু শর্তসাপেক্ষে দেখতে পারবে। নিম্মে শর্তগুলো উল্লেখ করা হলো।

১. পাত্রী দেখার সময় পাত্রের পক্ষের কোনো পুরুষ যেমন বাপ-ভাই, বন্ধু-বান্ধব প্রমূখ কেউ থাকতে পারবে না। তারা পাত্রী দেখা সম্পূর্ণ হারাম ও কবীরা গুনাহ।
২. পাত্র-পাত্রী একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে পারবে। একে অপরের সম্পর্কে জানতে পারবে, জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে। তবে একে অপরকে স্পর্শ করতে পারবে না। অনেক এলাকায় স্পর্শ করার যে প্রচলন আছে তা শরিয়ত অনমোদিত নয়।
৩. পাত্রীর শুধু কব্জি পযর্ন্ত হাত, টাখনু পযর্ন্ত পা এবং মুখমন্ডল দেখতে পারবে। এ ছাড়া শরীরের অন্য কোনো অঙ্গ আবরণ ছাড়া দেখতে পারবে না। অনেক এলাকায় মেয়ের মাথার কাপড় ফেলে চুল দেখানোর প্রচলন আছে। সেটিও নিতান্তই ভুল।
৪. পাত্রীর কোনো মাহরাম পুরুষের উপস্থিতি ছাড়া পাত্রী দেখা জায়েয নয়। সুতরাং নির্জনে পাত্র পাত্রী একত্রিত হতে পারবে না।
৫. পাত্র পাত্রী উভয়েই অপরকে প্রতারিত করার জন্য অস্বাভাবিক কোনো সাজসজ্জা করতে পারবে না। এতে প্রতারণার গুনাহ হবে। তবে শরীরের সুন্দর্য বৃদ্ধি করার জন্য স্বাভাবিক সাজসজ্জা করতে পারবে।

শিক্ষক : জামিয়া রহমানিয় সওতুল হেরা, টঙ্গী, গাজীপুর।