ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

ফজরের নামাজ পড়ে আর বাসায় যাই না। সোজা আমার কর্মস্থলে। সকালবেলা হেঁটে যেতে বেশ ভালোই লাগে। রেললাইনের পাশ ঘেষে হকারদের পলিথিনবদ্ধ টং দোকানগুলো ঝিম মেরে থাকে। দোকানগুলোর নিচে দুই দোকানের মাঝে কিছু বেওয়ারিশ ভবঘুরে টোকাই, ভিক্ষুক ও দিনমজুর এখানে সেখানে বিশ্রী পোশাকে শুয়ে থাকে। প্রতিদিন আমি একই রাস্তায় যাই একই রাস্তায় আসি। এটি আমার নিত্যদিনের খুবই সাধারণ দৃশ্য। এতে নতুন কিছু নেই। পহেলা বৈশাখে প্রতিদিনকার ন্যায় কর্মস্থলে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ আমার দৃষ্টি আটকে গেল তিন-চারজন ছিন্নবসনে, নোংরা পোশাকে এক সঙ্গে বসে কী যেন করছে! আমার ওসব নিয়ে ভাবনা নেই। প্রতিদিনই তো এসব দেখে দেখে চোখ অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু হঠাৎ দৃষ্টি পড়ল একজনের হাতে একটি সিরিঞ্জ। আরেকজনের দেহে পুশ করে দিচ্ছে। মানে! মানে ‘ড্রাগ’ নিচ্ছে!! ‘ড্রাগ’ নেয়ার এমন সম্মিলিত নগ্নদৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়ালাম। শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল। এটি শুধু আমার এলাকার দৃশ্য নয়। আমার ধারণা বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায়ই এধরনের দৃশ্যের সঙ্গে মানুষ পরিচিত। আমাদের সমাজজীবনে মাদক যেন খুব সহজলভ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা উল্টালে কত কিছু আমরা পড়ি। দেশের কথা, দশের কথা, সরকারের রূপরেখা, নির্বাচনের কাঠামো, নারীনীতি, স্বাধীনতার ঘোষক-জনক, বাঙালী-বাংলাদেশী, বিসমিল্লাহ রাখা না রাখা, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকা না থাকা। অথচ কী অবাক কান্ড, রাষ্ট্রের হাজার হাজার মানুষ এমনকি শিক্ষিত যুবকরাও নেশায় বুঁদ পড়ে থাকে, ক্রমে অথর্ব হয়ে যাচ্ছে, ক’দিন পরই তার জানাযার নামাজ পড়তে হবে। অথচ তাদের নিয়ে কারও কোনো মাথা ব্যাথা নেই। না রাষ্ট্রের না সুশীলসমাজের, না বুদ্ধিজীবীদের আর না আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ মহলের। অবাক লাগে যখন দেখি আলেমগণ মসজিদের মিম্বর থেকে নামাজ-রোজার কথা বললেও এসব জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়গুলো তুলে ধরেন না। অথচ তারা সমাজের খুব গভীরের মানুষ। আলেমদের হাতে যে মিডিয়া আছে আর কারও কাছে সেই মিডিয়া নেই। সপ্তাহে একদিন হলেও তারা জনসাধারণের খুব কাছে যেতে পারেন।
অবাক করার বিষয় হলো, দেশের ডাক্তার সমাজ, যাদের কাছে গিয়ে আমরা সুস্থতা ফিরে পাই সইে ডাক্তার সমাজও মাদকাসক্তির ভয়াবহ থাবা থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে চলতে পারছেন না। ২৫ ডিসেম্বর ২০০৯ ইং তারিখে ঢাকার একটি মশহুর দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায় ৮-এর কলামে একটি রিপোর্ট ছাপানো হয়েছিল। যার শিরোনাম ছিল এরকম- ‘পেশা চিকিৎসা/নেশা মাদকের’রিপোর্টটির এক জায়গায় বলা হয়েছে-সম্প্রতি একটি গোয়ন্দো সংস্থা (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের) উপাচার্যকে দেওয়া এক প্রতিবেদনে চিকিৎসকদের মাদকাসক্ত হওয়ার বিয়ষটি উল্লেখ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বহিরাগত মাদকসেবীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু চিকিৎসক মাদক সেবন করছেন।

দেশের একটি মশহুর মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তারদের দু’এক জন নন, প্রায় পঞ্চাশজনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ও প্রকাশিত এই গুরুতর অভিযোগের সংবাদে সাধারণ নাগরিকদের মাঝে হতাশা নেমে আসা খুবই স্বাভাবিক।
সমাজে ভদ্র-সভ্য ও শিক্ষিত মানুষ বলে পরিচিত, যারা মানব সেবায় নিয়োজিত তারাই যদি এমন অসদাচরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে তাহলে দেশের অন্যান্যদের অবস্থা যে কত করূণ তা কছিুটা হলেও অনুমান করা যায়।
এতদিন চিকিৎসক সমাজের বিরাট একটি অংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ চলে এসেছে তাদের সেবার মান, আন্তরিকতা, দক্ষতা, ব্যবসা প্রবণতা ও রাজনৈতিক হানাহানি নিয়ে। এখন অভিযোগ উঠলো মাদক সেবনের এবং কারো কারো বিরুদ্ধে কর্মস্থলে কর্মরত অবস্থায়ও। এরচেয়ে শংকা ও হতাশার খবর আর কী হতে পারে। চিকিৎসা পেশার মতো একটি স্পর্শকাতর পেশায় নিয়োজিত মেধাবী পেশাজীবীদের মাঝে যদি এভাবে মাদকের মহামারি চলতে থাকে তাহলে অসুস্থ মানুষের মনে স্বস্থি কীভাবে আসবে?আর তারাইবা চিকিৎসারা জন্য কার শরণাপন্ন হবে?
নেশা ও মাদক মানব-সভ্যতার চরম শত্রু। এটা জীবন ও সম্ভাবনাকে নষ্ট করে, শান্তির পরিবারে অশান্তির আগুন প্রজ্জ্বলিত করে এবং সমাজে অনাচার ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে। নেশা ও মাদক সভ্যতার চাকা পিছনের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। তাই কল্যাণের ধর্ম ইসলামে নেশা ও মাদক সম্পূর্ণ হারাম।
কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ * إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ
হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, পূজার বেদী ও (ভাগ্য) নির্ণায়ক) শর ঘৃণ্য বস্ত্ত, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর। যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।
শয়তান তো এ-ই চায় যে, মদ ও জুয়ার দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করবে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে বিরত রাখবে। সুতরাং তোমরা কি নিবৃত্ত হচ্ছ?-সূরা মাইদা ৫: ৯০-৯১
এ আয়াতে মাদক সম্পর্কে চূড়ান্ত বিধান দেওয়া হয়েছে এবং একে ঘৃণ্য ও বর্জনীয় ঘোষণা করা হয়েছে। শুধু তাই নয় একে উল্লেখ করা হয়েছে পূজার বেদীর সাথে। আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, যখন শরাব হারাম করা হল তখন আল্লাহর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবীগণ একে অপরের কাছে গিয়ে বললেন,‘শরাব হারাম হয়েছে এবং একে শিরকের মতো (মারাত্মক গুনাহ) সাব্যস্ত করা হয়েছে।’
حرمت الخمر وجعلت عدلا للشرك،
قال المنذري : رواه الطبراني، ورجاله رجال الصحيح.
আত তারগীব ওয়াত তারহীব ৩/১৮০ হাদীস (৩৫৭৬)
হাদীস শরীফের ঘোষণায় নেশা ও মাদক সম্পূর্ণরূপে হারাম সে যে নামের হোক, আর যেভাবেই তা গ্রহণ করা হোক। ইরশাদ হয়েছে-
كل مسكر حرام
‘সকল নেশাসৃষ্টিকারী দ্রব্য হারাম’
এটি একটি ‘মুতাওয়াতির’ হাদীস। মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় মুতাওয়াতির ঐ সকল হাদীসকে বলে, যা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত, যা এত সংখ্যক রাবীর সূত্রে বর্ণিত যে, এতে কোনো প্রকারের সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশ থাকে না। বিখ্যাত হাদীস বিশারদ আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহ. (৮৫২ হি.) বলেন, এ মর্মের হাদীস একত্রিশজন সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে। (দ্র. ফতহুল বারী ৩/৭৩)
* হযরত সা‘দ ইবনে আবী ওয়াককাস রা. থেকে বর্ণিত, ‘যে বস্ত্ত অধিক পরিমাণে গ্রহণ নেশা সৃষ্টি করে তা সামান্য পরিমাণে গ্রহণও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষিদ্ধ করেছেন’।-সুনানে নাসায়ী, হাদীস : ৫৬০৮, ৫৬০৯, সহীহ ইবনে হিববান হাদীস : ৫৩৭০।
* দায়লাম হিময়ারী রা. বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আরজ করলাম, ‘আল্লাহর রাসূল! আমরা এক ঠান্ডা দেশের অধিবাসী, আমাদেরকে কঠিন পরিশ্রমের কাজ করতে হয়, আমরা গম দ্বারা এক ধরনের পানীয় প্রস্ত্তত করে থাকি, যার দ্বারা আমরা কাজের শক্তি পাই ও শীতের মোকাবিলা করি।’ তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সেটা কি নেশা সৃষ্টি করে?’ আমি বললাম, জী হাঁ। তিনি বললেন, ‘তাহলে তা বর্জন কর।’আমি বললাম, ‘লোকেরা তা বর্জন করতে প্রস্ত্তত হবে না।’ তিনি বললেন, ‘ত্যাগ না করলে তাদের সাথে লড়াই কর।’ সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৩৬৮৩

এ মর্মের হাদীস হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. ও উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকা রা. থেকেও বর্ণিত হয়েছে। (দ্র. সুনানে আবু দাউদ, ৩৬৮১; তিরমিযী, ১৮৬৫; ইবনে মাজা, ৩৩৯৩; মুস্তাদরাকে হাকিম ৩/৪১৩ আবু দাউদ ৩৬৮৭)
মাদকদ্রব্যের বেচাকেনা এবং এর সাথে যেকোনো পর্যায়ের সংশ্লিষ্টতা নিষিদ্ধ আর তা আল্লাহর লা’নত ও অভিশাপের কারণ।
* আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রা. থেকে এক দীর্ঘ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘খাম্র’ (শরাব) সম্পর্কে বলেছেন, ‘যিনি তা পান করা হারাম করেছেন তা বিক্রি করাও হারাম করেছেন।’ (সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৪১২৮)
* জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. বলেন, তিনি ফতহে মক্কার বছর যখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় অবস্থান করছিলেন, তাঁকে বলতে শুনেছেন যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল খাম্র (শরাব) বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছেন …। (সহীহ বুখারী, হাদীস : ২২৩৬, ৪২৯৬; সহীহ মুসলিম ৪১৩২)
* উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকা রা. বলেন, সূরা বাকারার শেষের দিকের (রিবা সংক্রান্ত) আয়াতসমূহ যখন নাযিল হল তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন এবং লোকদের সামনে তা তিলাওয়াত করলেন। এরপর শরাবের ব্যবসাও নিষিদ্ধ করলেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস : ৪৫৯,২০৮৪,২২২৬,৪৫৪০-৪১,৪২; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৪১৩০, ৪১৩১)
* এক হাদীসে আছে,
لعن الله الخمر وشاربها وساقيها وبائعها ومبتاعها وعاصرها ومعتصرها وحاملها والمحمولة إليهه.
وفي رواية للترمذي : وآكل ثمنها

মাদকের উপর অভিশাপ; মাদক পানকারীর উপর অভিশাপ, পরিবেশনকারীর উপর অভিশাপ; বিক্রয়কারীর উপর অভিশাপ, ক্রয়কারীর উপর অভিশাপ; যে মাদক নিংড়ায় তার উপর অভিশাপ, যার আদেশে নিংড়ানো হয় তার উপর অভিশাপ; বহনকারীর উপর অভিশাপ, যার কাছে বহন করে নেওয়া হয় তার উপর অভিশাপ; আর যে মাদক বিক্রয়লব্ধ অর্থ ভোগ করে তার উপর অভিশাপ।-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৩৬৭৬; জামে তিরমিযী, হাদীস : ১২৯৫
এককথায়, মাদক এমনই খবীছ বস্ত্ত যে, উৎপাদন, বিপণন, পরিবেশন ও গ্রহণের যেকোনো পর্যায়ে এর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অভিশাপের কারণ। আর এ তো বলাই বাহুল্য যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অভিশাপ যার উপর তার জীবন কখনো শান্তির হতে পারে না।