ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

২০১১ সালের ১১ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আদেল আল জাবিরকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল ইরান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। পরিকল্পনা ছিল হোটেলটি উড়িয়ে দেয়ার, যেখানে তিনি বেশি বেশি আসা-যাওয়া করতেন। ওয়াশিংটনে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতকে হত্যার জন্য ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছে দুই ইরানির বিরুদ্ধে। যাদের একজন ইরানি বংশোদ্ভূত মার্কিনি নাগরিক মানসুর আর্বাবসিয়ার। অপরজন গোলাম শাকুরি। এ ঘৃণ্য কর্মের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকারও করেছেন তারা। তাদের বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে মামলাও হয়েছে। এফবিআই এ ষড়যন্ত্রকে ‘অপারেশন রেড কোয়ালিশন’ নামে অভিহিত করেছে। জড়িত থাকার অভিযোগে গোলাম শাকুরি ও মানসুর আর্বাবসিয়ার নামে দুইজনকে গ্রেফতারের পর নিউইয়র্ক ফেডারেল কোর্টের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতকে হত্যার চক্রান্ত এসেছিল তেহরান থেকেÑ আর্বাবসিয়া এ কথা অকপটে স্বীকার করেছেন।
কয়েকদিন আগে লেবাননে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আলী আওয়াদ আসিরি এবং ইরাকে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত সামির সোবহানকে হত্যার ষড়যন্ত্রও প্রকাশ হয়েছে। ইরাক সরকার শেষ পর্যন্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত সোবহানকে দেশ ত্যাগ করার অনুরোধ করতে বাধ্য হয়। আর এটি ইরাকের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ইরানের অন্যায় আচরণ বলেও অভিহিত করা হয়।
ইরাকি কর্মকর্তাদের মৌখিক হামলার জবাবে সামির সোবহান বলেছেন, সৌদি আরব একটি সুষম নীতি গ্রহণ করে রেখেছে। অন্যদের সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই। সৌদি আরব ইরাককে আরবি বানাতে চায় এবং ইরাককে আরব চরিত্র থেকে প্রত্যাহার করতে চায় না। সৌদি আরবের সঙ্গে লেবানন সরকারের মতানৈক্যের একটি কারণ ছিল। তা হলো, লেবানন থেকে আরবিকে তাড়িয়ে দেয়া। ইরাকেও কিছু রাজনীতিবিদ এটাই করছে। ইরাক সামির সোবহানের আরাবিয়াতের ওপর অতি উৎসাহ ও বাড়াবাড়িকে পছন্দ করেনি। অথচ মুক্তাদার আস সদরসহ সব রাজনীতিবিদ ইরাকের আরাবিয়াতের দিকে আগ্রহী হওয়ার প্রতি জোর দিয়েছেন। তারা পারস্য ও ফার্সি স্বার্থের পরিবর্তে আরবিয়াতকে চাইছে। সেক্ষেত্রেও সৌদি দূতাবাস সেই স্তরের প্রদীপ পেয়ে গিয়েছিল যেখানে প্রভাব সৃষ্টি করা যাবে। যেখানে তেহরান মোকাবিলা করতে পারবে না। রাষ্ট্রদূতদের এসব সফলতাই ইরানের জন্য এক অপ্রতিরোধ্য দেয়াল বানিয়ে দিয়েছে। আজ পর্যন্ত সামরিক কর্মকতাদের পরিবর্তে আদেল আল জাবির, সামির আল সোবহান, আওয়াদ আল আসিরি প্রমুখ রাষ্ট্রদূতদেরই কাজের লোক হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। কারণ এরা এমন লোক যারা তাদের দেশের স্বার্থে কাজ করেছে। তারা দূতাবাসের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী থেকে কাজ নেয়ার বৈধতা দেয়নি। কারণ যদি এমনটি করা হয় তবে তাতে যুদ্ধবিগ্রহ ও সন্ত্রাসবাদের বিস্তার ঘটবে।
ইরান প্রায় প্রতিদিনই এ কথা প্রমাণ করে চলেছে যে, সে একটি প্রাঙ্গণে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে এবং একটি রক্তাক্ত বিপ্লবের পাশে অবস্থান করছে। কেননা ইরান দূতাবাস ও কনসুলেট সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনকে স্বীকৃতিই দিতে রাজি নয়। ইরান কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে হত্যা করতে, রাষ্ট্রদূতদের বিরুদ্ধে হত্যার চক্রান্ত করতে, কারও জায়গায় অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করতে কোনো দ্বিধাবোধ করে না। ইরান কীভাবে একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরেকটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে হত্যার ষড়যন্ত্র করতে পারে?

বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক আমেরিকা হলেও বিপরীত মেরুতে অবস্থান সত্ত্বেও ইরান এক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। ইরান বিশ্বের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপকে বিভিন্ন সহযোগিতা, আর্থিক সাহায্য, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম প্রদান করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এদিকে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল জুবায়েরও ইরানের ব্যাপারে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে দাবি করেছেন, ইরান এখনও এ অঞ্চলের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ইরান যদি এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক চায় তাহলে তাদের সংবিধান অনুযায়ী বিপ্লব রফতানি করার চিন্তা থেকে সরে আসতে হবে। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও দাবি করেন, ইসলামী বিপ্লবের শুরু থেকেই ইরান সন্ত্রাসীদের প্রতি সমর্থন জুগিয়ে আসছে এবং ইরানই সবার বিরুদ্ধে শত্রুতা করে যাচ্ছে।

সৌদি আরব ও ইরানের সংঘাত দিন দিন আরও দানা বাঁধছে। এবার হয়তো তা আরও তীব্র আকার ধারণ করবে। সিরিয়া ও ইয়েমেনে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পেছনে সৌদি-ইরান দ্বন্দ্ব অন্যতম উপাদান। সৌদি-ইরান সংঘাত সামনে আরও নতুন নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করবে বলে আশঙ্কা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে নিত্যনতুন বাহানা নিয়ে তৈরি হচ্ছে যুদ্ধ আর সংঘাত।
সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব কয়েকটি রাষ্ট্র ইয়েমেনে সামরিক আক্রমণ শুরু করার পর থেকে নিজেদের বৈরিতা বিস্তৃত হচ্ছে নানা দিকে। ইয়েমেন, বাহরাইন, ইরাক, সিরিয়াসহ বহু স্থানে শিয়া-সুন্নি সংঘাত ক্রমেই বাড়ছে। ইরাক ও ইয়েমেনে এ সংঘাতের অস্তিত্বই ছিল না। ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়ায় কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অস্তিত্বই ছিল না আগে। তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ এ অঞ্চলকে চেনা-অচেনা সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। সর্বশেষ এ অঞ্চলে বিরাট শক্তি ও সম্পদ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে আইএস, যা ইসলামী রাষ্ট্র বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তারা ইরাক ও সিরিয়ায় একের পর এক অঞ্চল দখল করছে। তারা একের পর এক ভিন্নধর্ম ও মতাবলম্বী, সংখ্যালঘু জাতির মানুষদের ধরছে, গলা কাটা ও নির্যাতনের দৃশ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রচার করছে। হঠাৎ করে এ ধরনের একটি বিশাল বাহিনীর জন্ম এবং ক্রমান্বয়ে বিজয় বিশ্বমননে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। তাই এটা বিস্ময়কর নয় যে, ‘সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতা’র নামে যখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে, অস্ত্র জোগানও বাড়ছে, তখন নতুন নতুন দৃশ্যমান-অদৃশ্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে, গোয়েন্দা সংস্থার দাপট বাড়ছে, সন্ত্রাস বাড়ছে, তা দমনে নতুন নতুন দমনপীড়নের আইন, বিধিনিষেধ তৈরি হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, এ মডেলে প্রবেশের অর্থ জঙ্গি ও সন্ত্রাসীর বর্ধিত পুনরুৎপাদন এবং সন্ত্রাসের চিরস্থায়ীকরণ করা। যেন এক অদ্ভূত হৃদয়হীন ও বোধহীন বিশ্ব ব্যবস্থার মধ্যে আমরা বাস করছি। এখানে যারা সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী, তারাই বিশ্বজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’র নামে। তাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, ‘গণতান্ত্রিক’ ‘সভ্য’ রাষ্ট্র, এনজিও, ‘সুবোধ’ বুদ্ধিজীবী বিশেষজ্ঞরা।

তুর্কি আদ্দাখিল
আশশারকুল আওসাত (আরবি)
অবলম্বনে মুহাম্মাদ শোয়াইব