ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব দেশগুলোর মধ্যকার চলমান সংকট শান্তিপূর্ণভাবে নিরসনের জন্য বিভিন্ন মধ্যস্থতা ও উদ্যোগের পাহাড় জমে যাচ্ছে। কাতারের সমস্যা তার নিকটতম প্রতিবেশী পারস্য ও রোমানদের (ইরানি ও তুর্কিদের প্রচীন স্থানীয় নাম) সঙ্গে।

আপাতদৃষ্টিতে কাতারকে সবচেয়ে বেশি সমর্থন করছে তুরস্ক। তুরস্ক এমন একটি বিল অনুমোদন করেছে, যার ফলে আরও বেশি সৈন্য কাতারে পাঠানো যাবে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট মধ্যস্থতা করতেও প্রস্তাব দিয়েছেন। আরব বিশ্বে হৈচৈ শুরু হয়েছে তার মধ্যস্থার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে।

সেবাদাস মিডিয়ায় কর্মরত দালাল শ্রেণীর বিশ্লেষকরা বলছেন, “তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান শুরু থেকেই পরিস্কারভাবে ‘কাতারি উপন্যাসের’ প্রতি ঝুঁকে পড়েছেন। এটি হয়তবা তার মধ্যস্থতার বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে দেবে। কেননা তিনি খোলামেলাই বলেছেন, ‘নিশ্চয় কাতার মাজলুম। তাকে দায়ী করা ঠিক হবে না।” (আল আরাবিয়া নেট)।

তবে তুরস্ক কেন কাতারের পক্ষ নিল সেই প্রশ্নের উত্তরটাই বড় বিষয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পেট্রোডলারের দেশগুলোতে আধিপত্য বিস্তারের ধারাবাহিকতায় ইসরাইল ও মিসরকে কড়া নিয়ন্ত্রণ, লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনকে ধ্বংস করে গন্তব্যের শেষের দিকে এসে পৌঁছেছে। এই আধিপত্য বিস্তারের ব্যাপারে তাদের একমাত্র প্রতিবন্ধক প্যান-ইসলামিক শক্তি অর্থাৎ মুসলিম ব্রাদারহুড এবং এই ধরনের অন্যান্য সংগঠন। এই প্রতিবন্ধক শক্তিকে নির্মূল করার জন্য প্রচার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানোর পরও কাঙ্খিত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। বিরামহীন প্রচারণার ফলে ইসলামোফোবিয়া পশ্চিমা বিশ্বের শিরা-উপশিরায় ব্লাড ক্যান্সারের মতো প্রবাহ হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে ভয়াবহ হামলার মধ্য দিয়ে এ ক্যান্সারের যাত্রা শুরু। শুরুতে ব্রেইন ক্যান্সার। তারপর দেহ। এখন শিরা-উপশিরায়। এখনও তা চলছে। শুরুটা ছিল আধিপত্যবাদী মোড়ল রাষ্ট্রগুলোর যাত্রার সূচনা। এ যাত্রায় তারা গন্তব্য পানে অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছুটে চলছে।

নাইন-ইলেভেনের পর বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের বিচরণ সঙ্কীর্ণ করে দেওয়া হয়েছে। এখন পশ্চিমা দেশগুলোতে কোনো ব্যক্তির মুসলমান অথবা ইসলামি ঐতিহ্যের ধারক হওয়া অপরাধ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। পশ্চিমা ও বিশ্ব মিডিয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য দিয়ে প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে। উগ্রপন্থী ও সন্ত্রাসী জাতি হিসেবে মুসলমানদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে ইসলামের। পশ্চিমা সংস্কৃতির জন্য ইসলামকে সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সোস্যাল মিডিয়াতে ইসলাম ও মুসলমানদের সবচেয়ে সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। পাশ্চাত্যে ক্রম বর্ধমান ইসলামভীতি সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা লাভ করা যায়, যখন আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরব সফর করে বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে মুসলমানদেরকেই কেবল সন্ত্রাসের নির্মূলের উপদেশ দিচ্ছেন। আমেরিকান ইসলামিক সামিট না করে আমেরিকান ইসরাইল সামিট করে তাদেরকে সন্ত্রাস ছাড়ার উপদেশ তো ট্রাম্প দিচ্ছেন না। সত্য হলো, নাইন-ইলেভেন, প্যারিস হামলা ও অন্য সব দৃশ্যপটও একেকটি নাটক। এর নেপথ্য উদ্দেশ্য, মধ্যপ্রাচ্যের তেল দখল, ইসরায়েলকে শক্তিশালী এবং বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করা।

মার্কিন খপ্পরে পড়া উপসাগরীয় দেশগুলো একবার একটু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখতে পাবে, যাদেরকে সন্ত্রাসের জন্য দায়ী করা হচ্ছে, ঐতিহাসিক উগ্রবাদ ও সহিংসতার ইতিহাস কি তারা রচনা করেছিল? না এই ঘৃণ্য ইতিহাস রচিত হয়েছে খোদ উপদেশ দাতাদের দ্বারাই? কাতারকে যখন অবরুব্ধ করা হলো ইসরাইলের যুদ্ধমন্ত্রী এভিগডোর লিবারম্যান বলল, ‘সন্ত্রাসীদের প্রতি দোহার সমর্থনের কারণে কাতারের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ায় এখন ইসরাইল ও অন্য আরব দেশ মিলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জোট গঠন করতে পারবে।’ লিবারম্যান আরো দাবি করেন, ‘আরব দেশগুলো এটা বুঝতে পেরেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রকৃত হুমকি ইসরাইল ও ইহুদিরা নয় বরং সন্ত্রাসবাদই প্রধান বিপদ।’

যে ইসরাইল আজ ‘সন্ত্রাসী’দের মদদ দেওয়ার অভিযোগে কাতার অবরোধকে বড় গলায় সমর্থন করছে সে ইসরাইলই ১৯৮২ সালে লেবাননে হামলা চালিয়ে ১৭ হাজার ৫০০ নিরপরাধ বেসামরিক লোককে শহীদ করেছে। বর্তমানে যে আইএস সিরিয়ায় বোমাবর্ষণ করছে, প্রতিদিন হাজার হাজার নিষ্পাপ শিশু, বুড়ো, যুবক ও মহিলাকে বোমা মেরে মেরে ফেলা হচ্ছে সে আইএসের সৃষ্টিও হয়েছে ইসরাইল থেকেই। ১৯৪৮ সালের ১৫ মে মুসলিম ফিলিস্তিনে মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া রূপে আত্মপ্রকাশকারী ইহুদি রাষ্ট্রটির লাগামহীন সন্ত্রাসের গতি রোধ করা খোদ আমেরিকার পক্ষেও অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে।

কাতার অবরোধের সঙ্গে সঙ্গে যে আমেরিকা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পথচলার সূচনা হয়েছে বলে কৃতিত্ব দাবি করেছে তাদের ইতিহাস কিন্তু রক্তের ইতিহাস। ইরাক ও আফগানিস্তানের সম্পদ পাওয়ার জন্য জোর দখল করে এ অঞ্চলের মানুষ ও মানবতাকে পিষে দিয়ে পীড়াদায়ক জুলুমের নিষ্ঠুর কাহিনি রচনা করেছে এই আমেরিকা। এক উসামা বিন লাদেন-এর খোঁজে ১২ লাখ নিরপরাধ মানুষকে নির্দয়ভাবে হত্যা করেছে আমেরিকা। ১০ লাখের বেশি ইরাকি মুসলমানকে মেরে ফেলার পর নির্লজ্জভাবে স্বীকার করেছে, ইরাকে হামলা বড় ধরনের ‘ভুল’ ছিল। লিবিয়ায় হামলা করে সেখানকার প্রতিষ্ঠিত সরকারকে উৎখাত করে গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে। ড্রোন হামলার নামে পাকিস্তানে হাজার হাজার নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এসব কথিত শান্তির ঠিকাদাররা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে মুহূর্তেই লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষকে দুনিয়ার ওপারে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তারাই যখন সন্ত্রাসের অভিযোগে কাতারকে অবরোধ করার জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে উস্কে দেয় তখন এরদোগানের ন্যায় নেতারা কাতারের পক্ষ অবলম্বন করাতে দোষের কিইবা আছে।

দালাল বিশ্লেষকদের ভাবনা হচ্ছে, ‘তাহলে কি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মিশর, জর্দান ও মৌরতানিয়া এবং অন্যান্য দেশের কাতারের বিরুদ্ধে তাদের কি কোনো দলিল নেই?’

আসলে সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়া, ইরানকে সমর্থন করা এগুলো হচ্ছে মানুষকে বোকা বানানোর প্রচেষ্টা মাত্র। কাতারের বিরুদ্ধে যা করা হচ্ছে তা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল এবং আমেরিকার তৈরি নীলনকশারই অংশ মাত্র। আমেরিকা ও ইসরাইলে চরম দালাল সৌদি জোটের মূল ক্ষোভের কারণ হচ্ছে গাজায় ইসরাইলি দখলদার বাহিনীর একমাত্র প্রতিরোধ শক্তি হামাসের প্রতি কাতারের সমর্থন।

পশ্চিমা বিশ্ব জানে যে, কাতারের একমাত্র সাহসী এবং প্রতিবাদী মিডিয়া আল-জাজিরার মাধ্যমে ইসরাইলি দখলদার বাহিনীর অপকর্মের মুখোশ খুলে যাচ্ছে। খুলে যাচ্ছে মিসরের স্বৈরাচারী মুবারক সহ অন্যান্য আরব শাসকদের মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে করা নির্মম নিপীড়ন। সুতরা আল-জাজিরা তাদের ক্ষমতার মসনদে টিকে থাকার পথে ব্রাদারহুড ও হামাসের চেয়ে কোনো অংশে কম প্রতিবন্ধক নয়। তাইতো আল-জাজিরাকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য এতো আয়োজন। আর আল-জাজিরার কণ্ঠরোধ করতে পারলে বিশ্বজনমতকে অন্ধকারে রেখে এই লক্ষ্য অর্জন করা হবে অনেক সহজ।

যাইহোক, তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু দোহায় সফরের পর রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আনাদোলুকে বলেন, অবশ্যই সংলাপ ও শান্তির মাধ্যমে সংকট নিরসন করতে হবে। তুরস্ক সংকট নিরসনে অংশ নিবে। তুর্কি প্রচেষ্টার জন্য আমরা সফলতা কামনা করি।