ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালের পদ প্রতিষ্ঠার জন্য বিধান করিতে পারিবেন। সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালকে কোন মন্ত্রণালয়, সরকারী কর্মচারী বা সংবিধিবদ্ধ সরকারী কর্তৃপক্ষের যে কোন কার্য সম্পর্কে তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতাসহ যেরূপ ক্ষমতা কিংবা যেরূপ দায়িত্ব প্রদান করিবেন, সেইরূপ ক্ষমতা বা দায়িত্ব পালন করিবেন।’

এ থেকে আমরা বুঝি, ন্যায়পালের মূল কাজ হলো, নাগরিক অধিকারকে প্রশাসনের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে রক্ষা করা। এ ছাড়া সব পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা দেশের আইন ও সংবিধান সঠিকভাবে মেনে চলছেন কি না এবং তাঁদের কাজে নাগরিক অধিকার বিনষ্ট হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে লক্ষ রাখা।

ন্যায়পাল এর পদ একটি সাংবিধানিক পদ; ৩৯ বছর পরও ন্যায়পালের পদ পূরণ করা হয়নি। বছর কয়েক আগে নরওয়ের আর্থিক সহায়তায় ন্যায়পালের পদে নিয়োগ এর একটি উদ্যোগ ছিলো। সম্প্রতি এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থ প্রাপ্তি সাপেক্ষে এই পদটি জানুয়ারীর মধ্যে পূরণের ঘোষণা দিয়েছিলেন আইন মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। প্রশ্ন হচ্ছে সংবিধানে এই পদ সৃষ্টি করার সময় এডিবি’র অর্থ প্রাপ্তি সাপেক্ষে কিংবা বিদেশী কোনো রাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তায় এর বাস্তবায়নের কথা তো উল্লেখ নেই। তা হলে অর্থ প্রাপ্তির আশায় আশ্বস্থ হয়ে এই পদের পূরণ কেন? ন্যায়পালের নিয়োগ হবে বাংলাদেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে ও নিজস্ব অর্থায়নে। এডিবি’র অর্থে নিয়োগ করা এই ন্যায়পাল ও তার দপ্তর স্থাপন করা কি তাদের কোনো স্বার্থ রক্ষা করবে?তাদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্যে আমাদের আয়োজন করে দেওয়া কী জাতী হিসেবে তা সন্মানের হবে?

এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থ প্রাপ্তি সাপেক্ষে ন্যায়পাল নিয়োগের সরকারী উদ্যোগ সম্পর্কে বার্তা সংস্থা বাসস এর এক প্রশ্নের উত্তরে সিডিএলজি’র পরিচালক আবু তালেব তখন বলেছিলেন, নিজের অর্থে, নিজের প্রয়োজনে শুধু জাতীয় ন্যায়পাল নিয়োগ নয়, বাংলাদেশকে নিজের অর্থে, স্থানীয় প্রয়োজনে স্থানীয় ন্যায়পালও (যেমন বিভাগীয় ন্যায়পাল, নগর ন্যায়পাল, জেলা ন্যায়পাল, উপজেলা ন্যায়পাল ও ইউনিয়ন ন্যায়পাল) নিয়োগ করতে হবে। তবে এডিবি’র অর্থ প্রাপ্তি সাপেক্ষে জাতীয় ন্যায়পালের পদ পূরণের উদ্যোগ খুবই লজ্জাজনক বিষয়; তাই, এডিবি’র অর্থে এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ পূরণ ও তার দপ্তর স্থাপন না করাই শ্রেয়।জাতি হিসেবে ঘুরে দাঁড়ানোর আকাংখা যখন বার বার উচ্চারিত হচ্ছে, ঠিক তখন এডিবির অর্থায়নে ন্যায়পাল নিয়োগ ও তার দপ্তর স্থাপন প্রক্রিয়া বাংলাদেশের ইমেজ কি বৃদ্ধি করবে? নিশ্চয় নয়।

বাংলাদেশের বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দক্ষ ন্যায়পাল নিয়োগের যে উদ্যোগ নিয়ছিলেন তাকে স্বাগত জানিয়েছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলছিলেন, ন্যায়পাল যে কোনো প্রশাসনিক অনিয়মের তদন্ত করতে পারবেন ; যা প্রশাসনকে গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এ ধরনের উদ্যেগের তীব্র বিরোধীতা করে বলেছেন, এর ফলে বড় ধরনের বিতর্কে জড়িয়ে পড়বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তারা আরো বলছিলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদে আলাপ আলোচনার মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।কিন্তু আজ জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সংসদে আলোচনা হয় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল তখন বলেছিলেন, ১৯৮০ সালে ন্যায়পাল নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকার তাদের স্বার্থহানি হবে ভেবে এই নিয়োগ দেয় নি। বর্তমান(২০০৭এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার) সরকারের পক্ষে যদিও ন্যায়পাল নিয়োগের মতো গুরুত্বপুর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়াটা একটু বেশি চ্যালেঞ্জিং তথাপি জনস্বার্থে এই সিদ্ধান্তটি গ্রহণযোগ্য হবে বলে আমি মনে করি।

অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা আ স ম হান্নান শাহ বলেছিলেন, এই সরকারের ন্যায়পাল নিয়োগের কোনো অধিকার নেই। তিনি বলেছিলেন, অন্য সব কাজ করতে গেলে তাদের মূল কাজ ব্যাহত হতে পারে । রাজনৈতিক সরকারগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে সাংবিধানিক দায়িত্ব সত্ত্বেও তারা ন্যায়পাল নিয়োগ, বিচার বিভাগের যথার্থ স্বাধীনতা দেয় নি। অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছিলেন, নাগরিক ফোরাম, সুশীল সমাজসহ বিভিন্ন ফোরাম থেকে ন্যায়পাল নিয়োগের দাবি অনেক দিনের। তিনি বলেছিলেন, প্রশাসনে অনেক ধরনের দুর্নীতির ঘটনা ঘটে। যেটার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন বা আদালতে যাওয়া যায় না। কিন্তু অনিয়মের জন্য মানুষকে ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এছাড়াও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অনেক অনিয়ম দুর্নীতি প্রতিরোধে ন্যায়পাল গুরুত্বপুর্ন ভূমিকা রাখতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ন্যায়পাল নিয়োগের বিষয়ে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সবাই একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন এটাই প্রত্যাশিত।

দেশে ন্যায়পাল ব্যবস্থা না থাকায় হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। কমিটির ৪৩তম বৈঠক পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেছিলেন। মূলত দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ সংশোধনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আনা এ সংক্রান্ত বিলের ব্যাপারে বলতে গিয়েই তিনি তখন এই বিষয়টি তোলেন।

তিনি বলেছিলেন, বাহাত্তরের সংবিধানের মূল বিষয়টি ছিল ‘ওম্বুডসম্যান’ (ন্যায়পাল) কেন্দ্রিক। তবে খুব হতাশা নিয়ে দেখছি- এতগুলো বছরেও আমরা ওই ‘ওম্বুডসম্যান সিস্টেম’ (ন্যায়পাল ব্যবস্থা) করিনি।
এ সময় এই বিল চূড়ান্তের আগে বিভিন্ন দেশের দুর্নীতি বিরোধী আইনগুলো বিশ্লেষণের কথা পুনঃব্যক্ত করেন আওয়ামী লীগের এই প্রবীণ সাংসদ। এর আগে সুরঞ্জিত সেন বলেছিলেন, যত বড় সরকার তত বেশী দুর্নীতি। আমাদের দেশে এগজিকিউটিভ পাওয়ার (নিরবাহী ক্ষমতা) যেখানে আছে সেখানেই এগুলো হয়। অত্যন্ত স্কিলড এন্ড এডুকেটেড (দক্ষ ও শিক্ষিত) লোকেরাই এসব দুর্নীতি করে থাকে। তাই দুদককে এক্টীভ করতে হলে তাকে স্বাধীন সত্ত্বা দিতে হবে। তাদের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা দিতে হবে। সুরঞ্জিত সেন আরো বলেন, দুদকের এই আইনটি নিয়ে ডোনার (দাতা) ও ডিপ্লোম্যাটদেরও (কুটনীতিক) ইন্টারেস্ট (আগ্রহ) আছে।

এর আগে গত গত ২৬ জুন এই কমিটির ৪০তম বৈঠকের পর এই বিলের ব্যাপারে সুরঞ্জিত বলেছিলেন, এটি চূড়ান্তের আগে ইন্দোনেশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় দেশগুলোর দুর্নীতি বিরোধী আইনের মডেল নিয়েও আলোচনা করা হবে। প্রয়োজনে এই বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনে কমিটির পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধি দল বিদেশে পাঠানো হবে। পরবর্তীতে সকল মতামত ও পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করে বিলটির প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হবে। ওই বৈঠকে এ বিলের ব্যাপারে কমিটি ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের অবস্থানের বিরোধিতা করেছিলেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী।

মূলত এই বিলে বিচারক বা বিচার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিসহ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করার আগে সরকারের অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক করার বিধান রাখার বিরোধিতা করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ও সংসদীয় কমিটির সদস্যরা। ওই বৈঠকে অংশগ্রহণকারী সরকারী হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরও তাদের পক্ষে অবস্থান নেন। তবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। মন্ত্রিপরিষদ এই বিলটির যে খসড়া প্রস্তুত করেছে তাতে কোন পরিবর্তন আনার পক্ষপাতি নন তিনি।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ‘গণতন্ত্র’ ও ‘ন্যায়পাল’ নগণ্য বিষয় নয়। আমাদের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে সাধারণ জনগণের নাগরিক অধিকারকে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হলে গণতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলো ও প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠা করা দরকার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে ন্যায়পালের বিধান ৭৭নং অনুচ্ছেদের সংযোজন করা হয়- যাতে করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। পাশাপাশি গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় ন্যায়পালের মাধ্যমে মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা যায়। প্রতিবারই সরকারগুলো ভোটের আগে জনগণের কাছে ওয়াদাবদ্ধ হয় ও প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বভার পেলে ন্যায়পালের বিধান কার্যকর করবে। কিন্তু ভোটে জিতে সরকার গঠন করার পর বেশ অল্প সময়ের মধ্যে সবকিছু ভুলে চুপ করে থাকে। ন্যায়পাল নিয়োগের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকলেও ১৯৭১ সালের পর কোনো সরকারই আজও তা পালন করেনি। গণতান্ত্রিক সমাজে ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় আইনের শাসন যেমন জরুরি, তেমনি প্রশাসনিক দুর্নীতি, অনিয়ম ও অনাচার ইত্যাদি রোধে ন্যায়পাল নিয়োগ জরুরি। সংবিধান প্রণেতারা সেটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তারা ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠানটিকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করারও বাধ্যবাধকতা রেখেছেন।কিন্তু আমরা আজও তার কোনো রূপ দেখলাম না।

বিগত প্রায় চার দশকেও ন্যায়পালের মতো সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়নি। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মহাজোট নির্বাচনী ইশতেহারে ন্যায়পাল নিয়োগের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু ক্ষমতার প্রায় ৩বছর অতিক্রান্ত হতে চলছে এ নিয়ে এগোয়নি মহাজোট সরকার। আর এ কারণেই প্রশাসনিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা হয়ে পড়েছে অনেকটাই সুদূরপরাহত।সরকারের জন্যেও বিব্রতকর।
পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রে ন্যায়পাল নিয়োগের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা হয়েছে। ন্যায়পাল ধারণাটি প্রথমবারের মতো সুইডেনে প্রকাশিত হয়, যার আভিধানিক অর্থ হলো মুখপাত্র বা প্রতিনিধি। সহজ ভাষায় বললে বলতে হয়, ন্যায়পাল হলো এমন একজন ব্যক্তি যিনি অন্যের জন্য কথা বলেন ও অন্যের স্বার্থকে প্রতিনিধিত্ব করে থাকেন। সুইডেনে ১৮০৯ সালে ন্যায়পাল নিয়োগ করা হয়। অন্যদিকে ফিনল্যান্ডে ১৯১৯ সালে সাংবিধানিক আইন পাসের মাধ্যমে। এ ছাড়াও ডেনমার্কে ১৯৫৪ সালে, নরওয়েতে ১৯৬০ সালে, নিউজিল্যান্ডে ১৯৬২ সালে, তাঞ্জানিয়ায় ১৯৬৬ সালে, ব্রিটেনে ১৯৬৭ সালে, ঘানায় ১৯৬৯ সালে, ইসরাইলে ১৯৭১ সালে, ফ্রান্সে ১৯৭৩ সালে, জিম্বাবুইতে ১৯৭৪ সালে, নাইজেরিয়ায় ১৯৭৫ সালে, অস্ট্রেলিয়ায় ১৯৭৭ সালে, নেদারল্যান্ডসে ১৯৮৭ সালে ও নেপালে ১৯৯০ সালে তাদের দেশের অভ্যন্তরে সরকারের কাজের স্বচ্ছতার জন্য ন্যায়পাল নিয়োগ করলেও আমাদের দেশে যেন তা সুদূরপরাহত।

ভারতে সম্প্রতি কংগ্রেস সরকার সংসদে তেমনি একটি লোকপাল বিল উত্থাপনের উদ্যোগ নেয়।কংগ্রেস এ বিলটি তৈরী করেছিল ব্রিটেনের Parliamentary Commissioner for the Administrationএর আদলে।কিন্তু গান্দীবাদী নেতা আন্না হাজারে বেকে বসলেন।তিনি বললেন এটি হতে হবে Citizen’s Ombudsman bill বা জনলোকপাল বিল।এ বিলের মাধ্যমে জনলোকপাল তার ইচ্ছেমতো কারো দুর্নীতি নিয়ে শুধু অনুসন্ধান নয় বিচারিক ক্ষমতাও পাবে।তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা তার থাকবে।ন্যূন্যতম ১০ বছর ও উর্ধে যাবজ্জীবন কারা দন্ড দিতে পারবে।বিনামূল্যে জনগণ জনলোকপালের কাছে অভিযোগ দিতে পারবে।বিচার হবে দ্রুত।২বছরের মাঝে শেষ করবে। আন্না হাজারের অনশন আন্দোলন সম্প্রতী ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।বিশ্বময় আলোচিত প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে।তার জনপ্রিয়তা ও জনসমর্থনের কাছে সরকার নতিস্বীকার করে।জনলকপাল বিল অবশেষে ভারতের সংসদ অনুমদন করে।

আমাদের মতো রাষ্ট্রের জন্য ন্যায়পাল জরুরি বিষয়। কেননা ন্যায়পাল আমাদের সরকারের প্রশাসনকে করতে পারে শক্তিশালী। আমাদের মতো দেশে ন্যায়পাল অফিসকে হতে হবে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। যেসব বিষয় ন্যায়পাল অফিসের জন্য জরুরি, যথা—
১. ন্যায়পাল অফিসকে হতে হবে সমপূর্ণ স্বাধীন,
২. ন্যায়পাল অফিসের তদন্ত করার চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকতে হবে,
৩. ন্যায়পালের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রস্তুতের ক্ষমতা থাকতে হবে,
৪. ন্যায়পালের জন্য বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ে এখতিয়ার থাকতে হবে,
৫. ব্যক্তি বিশেষের পদমর্যাদা রক্ষার লক্ষ্যে ন্যায়পাল গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে,
৬. স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে ন্যায়পাল ভূমিকা রাখতে পারে,
৭. দুর্নীতি হ্রাসে ন্যায়পাল অবদান রাখতে পারে।

ন্যায়পালের মতো ভালো একটি প্রতিষ্ঠান ওয়াদা দিয়েও গড়ে না তোলা প্রতারণার শামিল বলে গণ্য হতে পারে জনগণের কাছে।

আমাদের দেশের আদালতগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুধু প্রতিকার ঘোষণা করে থাকে, কিন্তু প্রতিকার দিতে পারে না। কেননা আমরা জানি, প্রতিকার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর নির্ভর করে থাকে। এ অবস্থা আমাদের বলে দেয় ন্যায়পাল আমাদের জন্য কতটা জরুরি। আমাদের দেশের আদালতগুলোর দীর্ঘসূত্রতা নতুন কোনো বিষয় নয়। মামলার চূড়ান্ত ফলাফল পেতে আমাদের সময় লাগে বছরের পর বছর। ফলে আমরা দেখতে পারি, মানুষ নীরবে অধিকার লঙ্ঘনের বেদনা সহ্য করে যায়, তার পরও আদালতের বারান্দায় পা রাখাকে পছন্দ করে না।

ন্যায়পাল নিয়োগ আজ সময়ের দাবি। বর্তমান সরকারের মন্ত্রীরা প্রায়ই বলে থাকেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ন্যায়পাল নিয়োগ দেয়া হবে, যিনি দায়বদ্ধ থাকবেন জাতীয় সংসদের কাছে। কিন্তু তাদের কথা কবে বাস্তবে পরিণত হবে? ন্যায়পাল নিয়োগের ক্ষেত্রে যেমন দক্ষ ও যোগ্য লোক নিয়োগ দিতে হবে, তেমনি দিতে হবে যথার্থ সহযোগিতা। সচেতন জনগণ চায় সরকার ন্যায়পাল নিয়োগ দিয়ে শুধু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাই পূরণ করবে না; বরং ভোটের অঙ্গীকারও রক্ষা করবে।

মন্দের ভালো ! কর ন্যায়পাল পদ
ছয় বছরেই জীবনের পরিসমাপ্তি ! কর ন্যায়পাল পদ
আইন করে তৈরি হয়েছে কর ন্যায়পাল পদটি। ছয় বছর পর আবারো আইন করে কর ন্যায়পাল বিলুপ্ত করে দেয়া হলো।
বিগত ২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের শেষ দিকে সংসদে আইন করে কর ন্যায়পালের পদ সৃষ্টি করা হয়।
কর-ন্যায়পাল আইন, ২০০৫ ( ২০০৫ সনের ১৯ নং আইন ) [১২ জুলাই, ২০০৫]
কর সংক্রান্ত আইন প্রয়োগে নিয়োজিত পদাধিষ্ঠিত ব্যক্তি বা কর কর্মচারী কর্তৃক কৃত অপশাসন নিরূপণসহ উক্ত বিষয়ে তদন্ত পরিচালনা এবং তত্সম্পর্কে প্রতিকারমূলক বা সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে কর-ন্যায়পাল নিয়োগ এবং আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধানকল্পে প্রণীত আইন৷
যেহেতু কর সংক্রান্ত আইন প্রয়োগে নিয়োজিত পদাধিষ্ঠিত ব্যক্তি বা কর কর্মচারী কর্তৃক কৃত অপশাসন নিরূপণসহ উক্ত বিষয়ে তদন্ত পরিচালনা এবং তত্সম্পর্কে প্রতিকারমূলক বা সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে কর-ন্যায়পাল নিয়োগ এবং আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধান করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়;

সেহেতু এতদ্বারা নিম্নরূপ আইন করা হইল:-
সূচী
ধারাসমূহ
১৷ সংক্ষিপ্ত শিরোনাম ও প্রবর্তন
২৷ সংজ্ঞা
৩৷ আইনের প্রাধান্য
৪৷ কর-ন্যায়পাল নিয়োগ
৫৷ কর-ন্যায়পালের কর্মের মেয়াদ
৬৷ কর-ন্যায়পালের কার্যালয়
৭৷ কর-ন্যায়পালের যোগ্যতা, অযোগ্যতা, ইত্যাদি
৮৷ কর-ন্যায়পালের পদত্যাগ ও অপসারণ
৯৷ অস্থায়ী কর-ন্যায়পাল
১০৷ কর-ন্যায়পালের অক্ষমতা
১১৷ কর-ন্যায়পালের পদমর্যাদা, পারিশ্রমিক, ইত্যাদি
১২৷ প্রধান নির্ বাহী
১৩৷ কর-ন্যায়পালের দায়িত্ব ও এখতিয়ার
১৪৷ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা
১৫৷ কর-ন্যায়পালের সাংগঠনিক কাঠামো, বাজেট, ইত্যাদি
১৬৷ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, ইত্যাদি
১৭৷ পরামর্শক, পরিদর্শন টিম, উপদেষ্টা কমিটি, ইত্যাদি নিয়োগ
১৮৷ অভিযোগ দায়ের, তদন্তের পদ্ধতি ও সাক্ষ্য গ্রহণ
১৯৷ সমন জারী
২০৷ কর-ন্যায়পালের সুপারিশ ও উহার বাস্তবায়ন
২১৷ সুপারিশ বাস্তবায়নে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে করণীয়
২২৷ তদন্ত কার্যে কর-ন্যায়পালের বিশেষ ক্ষমতা
২৩৷ কর-ন্যায়পালের নিকট রেফারেন্স প্রেরণ
২৪৷ প্রবেশ ও তল্লাশীর ক্ষমতা
২৫৷ কর-ন্যায়পালের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার
২৬৷ ক্ষমতা অর্পণ
২৭৷ অন্যান্য সংস্থার কর্মচারীকে ক্ষমতা প্রদান
২৮৷ ক্ষতিপূরণ বা অর্থ ফেরত প্রদানের নির্দেশ প্রদানের ক্ষমতা
২৯৷ কর-ন্যায়পাল কর্তৃক অন্যান্য ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের সহায়তা গ্রহণ
৩০৷ হলফনামা দাখিলের জন্য নির্দেশদানের ক্ষমতা
৩১৷ বাত্সরিক প্রতিবেদন, ইত্যাদি
৩২৷ ব্যতিক্রমী সেবা বা বিশেষ সহায়তার জন্য পুরস্কার প্রদান
৩৩৷ আদালত ইত্যাদির এখতিয়ার রহিত
৩৪৷ দায়মুক্তি
৩৫৷ বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি
৩৬৷ জনসেবক
৩৭৷ ব্যয় সংযুক্ত তহবিলের উপর দায়যুক্ত হইবে
৩৮৷ বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা
৩৯৷ মূল পাঠ এবং ইংরেজীতে পাঠ

ঐ সময় কর ন্যায় পাল বিল পাসের প্রস্তাব করে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী প্রয়াত সাইফুর রহমান বলেছিলেন, কর ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষ কর নিয়ে বিদ্যমান ভীতি থেকে রা পাবে। মানুষ আরো কর দিতে উৎসাহিত হবে। কর আদায়ে হয়রানি রোধে ও কর ন্যায় পাল ভূমিকা রাখতে পারবে বলে ঐ সময় পাস হওয়া আইনটিতে বলা হয়। মাত্র ছয় বছর পর সংসদে কর ন্যায়পাল (রহিত করণ) বিল, ২০১১ পাসের মধ্য দিয়ে কর ন্যায়পাল পদ ও তার যাবতীয় কাজ রহিত করে। বর্তমানে সরকার কর আদায়ে মানুষকে নানাভাবে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেয়ায় এ ধরনের ব্যয়সাধ্য প্রতিষ্ঠানের আর কোন প্রয়োজন নেই। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশসহ বিলটি সংসদে উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। এসময় সংসদে বিএনপির কোন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। কাকরাইলে কর ন্যায়পাল কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল। এই কায্যালয়ে ২০০৬ সালে ১০টি ২০০৭ সালে ১১৯টি ২০০৮ সালে ২৪১টি ও ২০০৯ সালে ৩৫৫টি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। এসব অভিযোগ সম্পর্কে কর ন্যায় পালের সবর্শেষ প্রতিবেদন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিবেচনায় নিবে বলে বিলে উল্লেখ করা হয়েছে। কর ন্যায়পাল পদ বিলুপ্তির বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আগে মানুষ আয়কর বিভাগের লোককে দেখে ভয় পেত। ভয়ে তারা কর দিত কর অফিসে বা করকর্মকর্তার সাথে কথা বলতে চাইতো না।

গত দু’বছর মানুষকে বোঝানো গেছে, প্রত্যেককেই কর দেয়া উচিত। গত দু’বছরে ২ লাখ করদাতা বেড়েছে। তাই করন্যায়পাল বাতিল করা দরকার। প্রয়োজনের তাগিদেই কর ন্যায়পাল পদ তৈরি হয়েছিল আবার প্রয়োজন নেই মনে করেই বিলুপ্ত করা হলো।এখন প্রশ্ন হচ্ছে প্রয়োজন অপ্রয়োজনের হিসেব-নিকেশটি কতটুকু যুক্তিযুক্ত? প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক-সম্পর্কিত আইনের সঙ্গে ন্যায়পাল আইনটি সাংঘর্ষিক হওয়ায় মন্ত্রিসভা সেটি রহিতকরণের প্রস্তাব অনুমোদন করে। আইনটি বাতিল হওয়ায় কর ন্যায়পাল কার্যালয়ে কর্মরত সব কর্মকর্তা ও কর্মচারী তাঁদের আগের অবস্থানে ফিরে যায়।

বাংলাদেশে ন্যায়পাল নিয়োগ জরুরি
রাজপথে আইন শৃংখলাবাহিনীর বেপরোয়া আচরণ,মানবাধিকার লংঘন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি আর সরকারের বিভিন্ন স্তরে জবাবদিহিতা না থাকায় দিন দিনই বিব্রতকর অবস্থায় পড়ছে সরকার৷ এই পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক ন্যায়পাল নিয়োগ জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা৷

তাঁরা বলছেন, একজন ন্যায়পাল থাকলে সরকারকে মুখোমুখি হতে হবে না অনেক বিব্রতকর পরিস্থিতির৷
নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু, রাজপথে আইন শৃংখলাবাহিনীর বেপরোয়া আচরণ, সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির প্রতিকার না পাওয়ার মত বিষয়গুলো দিন দিনই সাধারণ মানুষকে করে তুলছে উদ্বিগ্ন৷ অনেক ক্ষেত্রেই জবাবদিহিতার বাইরে চলে যাচ্ছে এসব ঘটনা৷ এসবের প্রতিকার পেতে একজন সাংবিধানিক ন্যায়পাল অবশ্য দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা৷ এ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেছেন, সংবিধানে সুনির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা থাকলেও স্বাধীনতার পর থেকে কোন সরকারই আমলে নেয়নি ন্যায়পাল নিয়োগের কথা৷সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. এম জহির বলেছেন- ন্যায়পাল সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে৷ সরকারি প্রতিষ্ঠানকে আনবে জবাবদিহিতার মধ্যে৷

মানবাধিকার লংঘন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে সরকারের প্রতি আস্থা হারায় সাধারণ মানুষ- এমন দাবি করে বিশেষজ্ঞরা বললেন, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি এই আস্থাহীনতাই জন্ম দেয় সামাজিক অনাচার ও রাজনৈতিক সহিংসতার৷ বর্তমান সরকার তার ইশতেহারে ন্যায়পাল নিয়োগের কথা বলেছে৷ তাই তাদের উচিত অচিরেই ন্যায়পাল নিয়োগ দেয়া৷

তথ্য সূত্রঃ
১।বুধবার, ২০ জুলাই ২০১১
ঢাকা, সংবাদ প্রতিদিন ডটকম:
২।নিউজ বাংলাঃন্যায়পাল নিয়োগঃ এই লজ্জা রাখব কোথায়?
হাকিকুল ইসলাম খোকন/বাপস
বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০০৯
৩।দৈনিন জনকন্ঠঃকর ন্যায়পাল (রহিতকরণ), বিল পাসবৃহস্পতিবার, ১৬ জুন ২০১১, ২ আষাঢ় ১৪১৮
৪।দৈনিক বাংলাবাজার ঃছয় বছরেই জীবনের পরিসমাপ্তি ! কর ন্যায়পাল পদঃ ঢাকা, শুক্রবার ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১১
৫।গণতন্ত্র ও ন্যায়পাল – অ্যা ড ভো কে ট জা হা ঙ্গী র আ ল ম স র কা রঃ

SAVE BANGLADESH BLOGঃThursday, July 22, 2010