ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

তথ্য-প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন বলতে সাধারণ দৃষ্টিতে প্রথমেই ধরে নেওয়া হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (বিশেষ করে ফেসবুক) মানুষের অংশগ্রহণ। দেশের বেশিরভাগ মানুষ এখন ফেসবুকে সম্পৃক্ত। অনেকে আবার একসাথে কয়েকটা একাউন্টও খুলে বসেছেন! কিন্তু এই ফেসবুক আমাদের কতটুকু ক্ষতি করছে তা কি একটু ভাবি? একসময় সকল আন্দোলনের মাঠ ছিল রাজপথ, বর্তমানে তা দখল করেছে ফেসবুক। মানুষের দায়িত্ববোধও অনেকাংশে কমিয়েছে এই যোগাযোগ মাধ্যম।

তবে এটাও সত্য যে বর্তমানে আন্দোলন আরও সংগঠিত হচ্ছে এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণেই। যেমন, কোটা প্রথা সংস্কারের দাবিতে চাকরিপ্রার্থী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের দিক-নির্দেশনার খবর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে। মানুষ মুহূর্তে সর্বশেষ অবস্থা জানতে পারছেন।

তারপরও মোটাদাগে বলতে হয়, অনেকেই ফেসবুকে নামেমাত্র একটি পোস্ট দিয়ে তার দায়িত্ব শেষ করছে। প্রশ্ন আসে, দায়িত্ব কি শুধু তাহলে এতটুকুই? এর ফলে মাঠে-ময়দানের সমর্থন হারিয়ে যাচ্ছে, মিথ্যা ভরসা বৃদ্ধি পাচ্ছে, মানুষ ধোকার স্বীকার হচ্ছে। কারণ ফেসবুকের সমর্থন দেখে সাধারণরা আশা করেন মানুষ রাজপথে নামবেন, অথচ রাজপথে গিয়ে সাধারণরা হতাশ হন। যেমন বলা যায়, চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনে ফেসবুকের মাঠ খুব গরম, অথচ রাজপথ সে অনুপাতে গরম নেই। আমি রাজধানী ঢাকার কথা বলব না, চট্টগ্রামে লক্ষাধিক অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী রয়েছেন যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবর। কিন্তু রাজপথে তাদের প্রতিনিধিত্ব করার মানুষ হাতেগোনা মাত্র কয়েক’শ!

 

সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা সংস্কারের দাবিতে চট্টগ্রামের রাজপথে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আজ আমি লজ্জিত। শিক্ষার্থীদের দেখলাম, গতকাল শাহবাগে পুলিশের গুলিতে চোখে আঘাতপ্রাপ্ত ঢাবির বাংলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আবু বকর সিদ্দিকের রক্তাক্ত ছবি ফেসবুকে দিচ্ছেন। অনেক এই রক্তাক্ত ছবিকে কাভার বা প্রোফাইল ছবি হিসেবে ব্যবহারও করছেন। কিন্তু আন্দোলনের ডাকে রাজপথে সাড়া দিয়েছেন মাত্র কয়েক’শ শিক্ষার্থী।

একজন সংবাদকর্মী হিসেবে এই সংবাদটি কাভার করতে গিয়েছিলাম চট্টগ্রাম নগরীর ষোলশহরে। দেখলাম, খুব অল্প সংখ্যক শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমেছেন। রাস্তা অবরোধ করতে তাদের যে কত কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছে তা দেখে মর্মাহত হলাম। পুলিশ যখন শিক্ষার্থীদের তুলে দিতে চেয়েছিল তখন একদল শিক্ষার্থী আন্দোলন থেকে ছিটকে পড়ে ষোলশহর স্টেশনের ভেতর চলে গেলেন। ভয়ে না, শুধু আন্দোলনের স্রোত আনার জন্য। তারা স্টেশনের ভেতর থেকে আবার মিছিল নিয়ে এসে আগের জায়গায় জড়ো হয়। কারণ, পুলিশকে তো বোঝাতে হবে আন্দোলনের সাথে আরও অনেক শিক্ষার্থী যুক্ত হচ্ছে! ষোলশহর থেকে দুই নম্বর গেট অতটুকু পথ তারা অনেক সময় নিয়ে পার হয়েছেন- শুধু পুলিশকে বোঝানোর জন্য যে এ আন্দোলনে অনেক শিক্ষার্থীর সমর্থন আছে। তারাও রাজপথে এসেছেন।

এই সংবাদ সংগ্রহ করে যখন ফিরছি, তখন খবর পেলাম ঢাবি শিক্ষার্থী আবু বকর সিদ্দিকের চোখ পুলিশের ছোড়া বুলেটের আঘাতে রক্তাক্ত। পরিচিত যারা আন্দোলনে রাজপথে নামেননি তারাও এই ছবি দিয়ে দুঃখ, ক্ষোভ, নিন্দা প্রকাশ করতে লাগলেন। হয়তো এই শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামলে আন্দোলন আরও বেগবান হত।

আমরা দিন দিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অসামাজিক প্রাণিতে পরিণত হচ্ছি। শুধু এ আন্দোলন নয়, সামাজিক যে কোন ইস্যুতে আমরা ফেসবুকে পোস্ট দিয়েই দায়িত্ব শেষ করি। আমরা আমাদের নাগরিক অধিকার ছেড়ে দিচ্ছি। আমরা স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছি। এই অসামাজিক জীবন থেকে বের হতে হবে আমাদের। তবেই আমরা নাগরিক অধিকার রক্ষা করতে পারব।