ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

“Enthusiasm” – এই ইংরেজী শব্দটির অর্থ “passionate interest in or eagerness to do something”, সম্ভবত এর বাংলা হবে “প্রবল উৎসাহ বা প্রবল প্রেরণা”। সম্ভবত বলছি এই জন্ন্য যে আমার কাছে এই মূহুর্তে কোন ইংরেজী-বাংলা অভিধান নেই। আর আমি থাকি এমন পাণ্ডব বির্বজিত স্থানে যে, কর্মস্থল থেকে বাড়ীতে না ফেরা পর্যন্ত অভিধান হাতে পাবার সম্ভাবনা নেই, আর এখানে ইন্টারনেটের যে শম্বুকগতি তাতে ইন্টারনেট অভিধানে এটার অর্থ খোঁজা আর কচ্ছপের পিঠে যুদ্ধযাত্রা করা সমান কথা।তাই আশা করছি আমার নিজের মনে যেটা অর্থ হবে বলে মনে হয়েছে সেটা যদি ভুলও হয় আশা করি পাঠক নিজগুনে ক্ষমা করে দিবেন।কিন্তু শব্দার্থটি “প্রবল উৎসাহ বা প্রবল প্রেরণা” এর খুব কাছাকাছিই হবে।

এত বড় ভূমিকা এই জন্ন্য দিলাম যে আজকাল আমাদের এই জাতির “প্রবল উৎসাহ বা প্রবল প্রেরণা” যা বিভিন্ন সময় আশে তা সঠিক পথে চালনা করা বড় বেশী দরকার, আমাদের সেটা রক্ষা করে, সেটিকে পাথেয় করে সামনে এগিয়ে যাবার রাস্তা বের করা শেখা দরকার। অনেক বড় ভাষণ দিয়ে ফেললাম এবার একটু ব্যাক্ষা করি।

স্বাধীনতার সময়ে(আজ থেকে ৪১ বছর আগে) যে উদ্যমে, যে বলিষ্ঠ শপথে সব বাংলাদেশী একত্র হয়েছিল, সেদিন তারা দেশ গড়ার যে শপথ নিয়েছিল তা কি আজ আর অবশিষ্ট আছে? বেশী দূরে যেতে হবে না সংসদ ভবন থেকে নিয়ে বাংলাদেশের যে কোন প্রতিষ্ঠানের বিভক্ত জনগোষ্ঠী দেখলেই বোঝা যাবে, বাঙ্গালী সমাজ আজ মেরুকৃত। একত্রিত নয় বিভক্ত।যে দেশগড়ার শপথ নিয়ে, ৩০ লক্ষ মূল্যবান জীবনের বিনীময়ে যে স্বাধীনতা, সেই দেশ কি আমরা গড়তে পেরেছি, না গড়ার বিন্দু মাত্র চেষ্টা করেছি।ক্ষমতাশীন দল বা বিরোধীদল কেউ কি কখনো একবারের জন্য জাতীয় সংসদ ভবনে গঠন মুলক ভাবে বলেছেন, বা জাতীয় স্বার্থে তারা একমত হতে পেরেছেন? অথচ আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন কিন্তু ছোট ভাষায় ১৯৭২ সালের প্রথম সংবিধান প্রস্তাবনার মধ্যেই আছে। উদ্ধৃত করছি-

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে আছে, “আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগনকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল – জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গনতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে”; তৃতীয় অনুচ্ছেদে আছে, “আমরা আরও অঙ্গীকার করিতেছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা – যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে”।

এই স্বপ্নকে নিয়েই কিন্তু তখনকার সকল মানুষ “যার যা কিছু আছে, যার কিছু নেই তার দুটি হাত আছে, একটি দেবার মতো প্রান আছে” এই নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। তখনকার এই জাতিগত “প্রবল উৎসাহ বা প্রবল প্রেরণা” মধ্যে শুধু ছিলো উপরের উদ্ধৃত লাইন গুলো। তখন কেও চিন্তা করেনি “স্বাধীনতার ঘোষক কে, কেই বা স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশ কে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন? এমন কি জাতীর পিতা, স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেতা শেখ মুজিবর রহমান এর জীবদ্দশায় কখনো এ নিয়ে তর্ক ওঠেনি। না উঠেছে স্বাধীনতার ঘোষনা প্রদানকারী, সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশাতেও।(এটা নিয়ে প্রচুর তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে কাদা ছোটাছুটি হচ্ছে। কিন্তু আমি একটা কথা বলতে চাই, সেনাবাহিনীর মতো একটা প্রখর নিয়মানুবর্তি বাহিনীতে থেকে মেজর জিয়া যে সাহস দেখিয়েছেন on behalf of great leader Shaikh Mujibor Rahman স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়ে, তার জন্যে অন্তত আমি তাকে সম্মান দেখাবই। আর কেউ না জানুক যারা প্রতিরক্ষা পেষায় আছেন অথবা প্রতিরক্ষা পেষার সমমূল্ল্যমান প্রশিক্ষন নিয়েছেন তারা জানেন, কমিশনড থাকা অবস্থায় এ ধরনের কাজ কতো ঝুঁকিপূর্ণ, কতটা সাহস ও দেশপ্রেম থাকলে এটা করা যায়!) এসব বেহুদা তর্ক-বিতর্ক শুধু আমাদের দেশ গঠনের সেই “প্রবল উৎসাহ বা প্রবল প্রেরণা” কে ম্রীয়মান করে দেয়।

“কে স্বাধীনতার ঘোষক, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ যদি স্বাধীনতার ঘোষণাই করে থাকবেন তবে আবার দীর্ঘ সময় পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে আলোচনা করলেন না কেন, বা বঙ্গবন্ধু কেন গ্রেফতার হতে গেল পাকিস্তানিদের হাতে, আবার খালেদা জিয়া ওই সময় ক্যান্টনমেন্টে কী করেছেন, বা কোথায় ছিলেন হাসিনা কী করেছেন?” এগুলো ছিলো পুরানো ইস্যু। বর্তমানে তো আরো বেশী “কার জন্মস্থান কোথায়? কে কোন দেশী নাগরিক? কবে কে কার “অশ্লীল শব্দ/লেখার অযোগ্য/অঙ্গ বিশেষ এ” বসেছে? সংসদে এবং সংসদের বাইরে দুই দলের সমান ভাবে খিস্তি-খেউর” – ২৮ মার্চের প্রথম আলোর প্রতিবেদনের মতো “জনতার কান লাল করে দেয়”। আমাদের প্রেরনাকে ছোট করে দেয়।

আমার লেখা দেখে মনে হতে পারে স্বাধীনতার সময়কার ইতিহাস, ঘটনাপ্রবাহ আলোচনা করা নিয়ে আমার আপত্তি আছে। বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই বরং প্রবল উৎসাহ আছে। এটা চলতেই হবে, সঠিক ইতিহাস আমাদের জানতেই হবে।নতুন প্রজন্ম এসব আলোচনা শুনে, দলিলপত্র-ভিডিও দেখে, ভালবাসায় বুকে ধারন করে বেড়ে উঠবে। একটা জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের তো বটেই, অন্য সব ক্ষেত্রের নৈর্ব্যক্তিক এবং বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিৎ। কিন্তু ৪১ বছর পরেও কি আমরা ৫ বছর পর পর বই বদলাবো? ৫ বছর পর পর ভেঙ্গে চুরে, কোটি কোটি টাকা খরচ করে নাম বদলের বাহার চালাতেই থাকবো?এই আলোচনা কি স্বাধীনতার চেতনা এবং তার বাস্তবায়নের আলোচনার চাইতে বড়? তার চাইতে বেশী অগ্রাধিকার দাবী করে? আর যখন দেখি আমাদের এই বেহুদা আলোচনাগুলো আমাদের সবাইকে মূল বিষয় থেকে বিচ্যুত করে দিয়েছে তখন এই আলোচনার আতিশয্য মাঝে মাঝে বিরক্তিও উদ্রেক করে।

প্রধান দুই দলের কাছে অনুরোধ জনগনের মনের ভাষা পরতে শিখুন।অঢেল অর্থব্যায়ে সমাবেশের চেয়ে ঐ অর্থ দিয়ে কল-কারখানা করুন,সেই কল-কারখানাতে বেকার ছেলে-মেয়েদের কর্মসংস্থান হবে, রাস্তা-ঘাট মেরামত করুন, রাস্তার পাশে গাছ লাগান, অর্থাভাবে যে সমূস্ত খামারী(প্রথম আলো ২৮ মার্চ – বার্ড ফ্লুর পরে অনেক খামারী অর্থাভাবে আর মুরগীর খামার করেন নি) পূনরায় শুরু করতে পারছেন না তাদের দিন।(এই সব খামারে আপনারা বড় করে দলীয় সাইনবোর্ড লাগান, আপনাদের প্রচারও হবে!)এসব বিভিন্ন জনকল্যান মূলক কাজে নিজেদের নিয়োজিত করুন। এগুলো আপনাদের ঐ মেকী সমাবেশের থেকে বেশী জনপ্রিয়তা দেবে। আপনাদের ভোট চাইতে হবে না, জনগনই আপনাদের ভোট দিবে, ভোটের আগে আপনাদের ক্যানভাইসিং করতে হবে না, জনগনই আপনাদের হয়ে তা করে দিবে। উদাহরনঃ ডাঃ আইভী, গত নারায়নগঞ্জ পৌর নির্বাচন। আপনারা এসব করলে স্বাধীনতার সময় দেশ গঠনের যে “Enthusiasm/প্রবল উৎসাহ বা প্রবল প্রেরণা” নিয়ে জাতি শুরু করেছিলো তাতে আরো উৎসাহ দেওয়া হবে।
আশার কথা দীর্ঘ সময় পরে হলেও বিরোধীদল সংসদে এসেছে। তার থেকে বড় ভাল খবর যে, “মিয়ানমারের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সমুদ্রসীমা জয় করে আনতে পারায় বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংসদে তাঁর দীর্ঘ ভাষণে সরকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এ রকম সচরাচর ঘটে না। কেউ কারও ভালো দেখতে পারে না। এবার কিন্তু একটু অন্য রকম হলো। বিএনপির চেয়ারপারসন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রীকেও অভিনন্দন জানালেন।প্রথম আলো ২৮শে মার্চ”। ধর্মীয় কারনে হোক, আর জনগন চায় না বলেও হোক হরতাল প্রত্যাহারে আমি মনে করি রাজনৈতিক ভাবে BNP অনেক লাভবান হলো। তারা জনগনের মনের কথাকে সম্মান জানালো। এখন আশা সরকারী দলও অন্তত পরমত কে সম্মান জানাবে, জনগনের মনের কথাকে সম্মান জানাবে। তাতেই আমাদের দেশ গড়ার প্রেরণা!

পাশাপাশি গত ২২ তারিখের বাংলাদেশ-পাকিস্তান ফাইনাল খেলা, যে অবিস্মরনীয় মুহূর্ত, যেখানে অন্তত অল্প সময়ের জন্ন্য পুরো দেশ আবার সেই ১৯৭১ এর “Enthusiasm/প্রবল উৎসাহ বা প্রবল প্রেরণা” ভেষে গিয়েছিলো, যে খেলায় ২ রানে হারের পরও মনে হচ্ছিলো “এ যেনো আমাদের জয়! আমাদের প্রবল প্রেরণায় কিছু করার জয়, সামনে এগিয়ে যাবার জয়!”। এটা শুধু আমাদের দেশবাসির মনে হয়নি, সারা পৃথিবীর মানুষের মনে হয়েছে, সেই প্রেরণায় কি একটু হলেও কালি পরলো না, একটু হলেও সেই অর্জন ম্লান হলো না এই ৫ রানে ছেবলামিটা করে? এই ক্রিকেটিয় প্রেরণাটা কে একটু হলেও আমারা গ্লানিতে ঢেকে দিলাম না! ধরুন প্রচন্ড পরিশ্রম করে পড়াশুনা করার পর একটা ছাত্র ভালো ফল পেলো না, তার পিতা-মাতা তাকে কি বলবে, “ ঠিক আছে বাবা না হয় এবার তুই পরীক্ষায় ভালো করতে পারিস নি, চেষ্টা চালিয়ে যা সামনের বার দেখিস ঠিকই পাবি” না কি “আসলে তোর হলের ইনভিজিলেটর টা অমুক পরীক্ষার সময় যদি তোর খাতাটা বেল বাজার সাথে সাথে না নিয়ে একটু পরে নিতো!” এটা বলবে? এই আবেদন টা করাতে আমাদের ক্রিকেটাররা, সারা দেশবাসী, পৃথিবীর সবাই কি আমরা একটু পিছনে ফিরে তাকালাম না! ক্রিকেটাররা যাদের এখন দরকার ছিলো এটা পূর্ণভাবে বিশ্বাস করা যে “Yes we can do it!” সেই বিশ্বাসটার মধ্যে ঘুণপোকা ঢুকে কি গেলো না? এটা সবার কাছে প্রশ্ন থাকলো! যদি পাকিস্তানের কুকর্মটা সাবাকে জানানো মূল উদ্দেশ্য থাকতো তাহলে এই জয়-পরাজয়, ৫ রান ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন না করে শুধু আভিযোগ টা করে রাখলে মনে হয় আমরা আরো বেশী মর্যাদা পেতাম। এখন পেলাম তো মুলা কিন্তু পৃথিবীর সবার কাছে ছোটলোকের একটা ফ্রি তকমা পেলাম, যা আমাদের এই প্রেরনাকে অসম্ভব ছোট করে দিলো, অনেক পিছিয়ে দিলো।অথচ আমাদের উচিত ছিলো এই প্রেরণাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া পেছনে নয়!