ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

ছোট বেলার একটা ঘটনা মনে আসছে-
এক পরিবারের দুই ভাই। বড় ভাই বিয়ে করলো, বিয়েতে মহাধুমধাম হলো। ছোটভাই ও তার বন্ধুদল কোমর বেধে খাটলো, মজা করলো। বড় ভাই এর একটি ছেলে হলো। ছেলেটির যখন ৭ বছর খেলাচ্ছলে বাড়ীর উঠানে একটা আমগাছ লাগালো। ইতিমধ্যে ছোট ভাই বড় হয়েছে, বিয়ে করেছে, ভাবীর ছোট বোনকেই। ছোট ভাই এর ঘর তোলা হলো, তার ভাইস্তার লাগানো আম গাছের কাছেই। দুই পরিবারের মধ্যে খুব মিল। কেনোনা দুই পরিবারের কর্তা ভাই-ভাই, বাড়ীওয়ালী আপন দুই বোন। দুই পরিবারের মধ্যে মাত্র একটি ফুটফুটে বাচচা। ছেলেটির চাচা বললো, যেহেতু এই আম গাছটি তার ভাইস্তা লাগিয়েছে, এটা তার অধিকারের মধ্যেই থাকবে। তারা সবাই মিলেঝিলে এর ফল ভোগ করবে। তারপর অনেক বড় ঘটনা, দুই পরিবারে অরোও সন্তান এলো, আয়ের তুলনায় ব্যায় বাড়তে লাগলো, স্বচ্ছলতার স্মিত হাস্যের পরিবর্তে পারিবারিক টানাপোড়ন বাড়তে লাগলো। একদিন সেই আমগাছ থেকে আম পাড়াকে কেন্দ্র করে প্রথমে দুই ভাইএর বাচচাদের মাঝে মারামারি, তারপর সেটা গড়াল দুই কর্ত্রী, কর্তা ও তাদের বন্ধু-বান্ধব এর মাঝে। তারপর লাগলো মামামারি, লাঠালাঠি। ছোট একটা ঘটনা গড়ালো মানষিক মহামারিতে। গ্রামের সকল প্রধানরা বসে ঠিক করলেন দুই ভাইএর জমি-জায়গা ভাগ করে দিতে হবে, বাড়ীর জমি সমান দুই ভাগে ভাগ হবে, কিন্তু বিভাজন রেখাটি সরলরেখা না হয়ে একটু বাকা হবে যেন আম গাছটি বড় ভাইএর ভাগে পরে।গ্রহনযোগ্য সমাধান, দুই ভাই সহ গ্রামের সকল মানুষ সমাধান মেনে নিলেন।

যদিও আমার নিজের জীবনে দেখা একটা ছোট ঘটনা, কিন্তু এটা কি একটু বড় পরিসরে চিন্তা করলে, মানে দুই ভাই এর জায়গায় দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ-বার্মা চিন্তা করলে একটা বিশাল মিল পাচ্ছেন কি পাঠক? ফিরে যাচ্ছি দুই ভাই প্রসঙ্গে। বড় ভাই-ছোট ভাই বিচারের ফলে কি কেউ কি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলেন, না জয়-পরাজয় হয়েছিলো। আমি এই সমাধানের পরও কিছুকাল দেখেছি, গ্রামে কুথসা রটানো, ময়লা-ছোট মনের কিছু মানুষ দুই ভাইকে বিভিন্নভাবে বুঝানোর চেষ্টা করেছে, এর লাভ হয়েছে, ওর ঠকা হয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো, আবার এই দুই ভাইয়ে মারামারি লাগিয়ে দূর থেকে মজা দেখা। কিন্তু আমি তখন ঐ পরিবারের ছোট ভাই কে একবার বলতে শুনেছিলাম, “ দেখুন এখানে জয়-পরাজয়, লাভ-লোকসান এর ব্যাপার নেই। এখানে সবচেয়ে গুরুত্তপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে অনেক দিনের বিবাদজনিত সীমানা নির্ধারন হয়েছে, আমাদের জায়গায় আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বড় জয় হয়েছে দুই পরিবারের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন আর তুচ্ছ আম পাড়ার ঘটনাকে নিয়ে রক্তারক্তি কান্ড ঘটবে না!” বাহ কত দামী কথা, কত বড় উপলব্ধি!

ফিরে আসছি সমূদ্রসীমা প্রসঙ্গে। পেশাগত সুবাদে আমার একটু-আধটু “UNCLOS অর্থাৎ United Nations Convention on the law of the Sea and international boundaries at sea” পড়ার সুযোগ হয়েছে। এই কনভেনশন যারা পরেছেন, যারা “Continental shelf” “Natural prolongation” “EEZ” “Base line” ইত্যাদির সংগা জানেন, তারা বলতে পারবেন ইটলসে বাংলাদেশ বা বার্মা কারো দাবী অযোক্তিক ছিলো না, আবার দুই দেশের দাবি এক সঙ্গে মেনেও নেয়া যাচ্ছিলো না প্রকৃতগত স্থানাভাবের কারনে।(দয়া করে কেও আমাকে মীরজাফর বা বার্মার দালাল মনে করবেন না। আমি এই আইন পড়েছি, তাই জানি কার দাবী কতটুকু যৌক্তিক। অপ্রিয় সত্য যৌক্তিক কথা বলতে আমি পিছপা হইনা)।বঙ্গোপোসাগর কিন্তু ভারত, বাংলাদেশ ও বার্মা যৌথভাবে শেয়ার করছি। সুতরাং নিজ নিজ দেশের স্বার্থে আমরা যখন দাবী করবো আমরা শুধু UNCLOS এর যে অংশটুকু আমাদের স্বার্থ রক্ষা করে সেটুকু বলেই আমাদের দাবী উথথাপিত করেছি। অপরপক্ষে বার্মাকেও অত বুদ্ধ জাতি ভাবার কারন নেই। তাদের দেশেও জ্ঞানী ব্যাক্তি আছেন। তারাও UNCLOS এর যে অংশটুকু তাদের স্বার্থ রক্ষা করে সেটুকু বলেই তাদের দাবী উথথাপিত করেছেন। ইটলসের মধ্যস্থতাকারী গন সব দিক বিবেচনা করে দুই দেশের জন্য ভালো হয়, UNCLOS কে মেনে সেই ভাবে সমাধান করেছেন। সেই বিবেচনায় কিছু অংশে বাংলাদেশের জয় (জয় না বলে আমি বলবো অধিকার প্রতিষ্ঠা) হয়েছে। কিছু অংশে বার্মার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু আমি বলবো জয় হয়েছে দুই দেশেরই, অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দুই দেশেরই, জয় হয়েছে আইনের প্রতিষ্ঠায়(ঠিক আমার গল্পটির মতো)! এটা দল/মঠ/গোষ্ঠি উর্দ্ধের বিষয়, এখানে আমাদের সবার এক হতে হবে, এখানে সমগ্র জাতির প্রশ্ন, এই অধিকার কে পুজি করে, এই সমূদ্রের অংশটুকুর সম্পদ দিয়ে জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে হবে। এখানে কোন ছোট মনের পরিচয় দেয়া যাবে না, ক্ষুদ্র দলীয় চিন্তার উর্দ্ধে যেতে হবে, যে সব ক্ষুদ্র মনের নেতা-নেত্রী ক্ষুদ্র দলীয় চিন্তার উর্দ্ধে যেতে পারবেন না তাদের পদাঘাত করে সরিয়ে দিতে হবে!

আজ সকালে অনলাইন পত্রিকার পাতা খুলে ধাক্কা খেলাম, অত্যন্ত লজ্জায় মাথা হেট হয়ে গেলো। আমাদের কথিত বড়মাপের ‍বুরবক নেতা বললেন, “সমুদ্র জয়ের পর সবাই কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম। কারণ এটি পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছিল। এ নিয়ে যে প্রচার শুরু হয়েছিল, তাতে কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাই কিছু না জেনেই ধন্যবাদ দিয়েছিলাম।–প্রথম আলো ৮ই এপ্রিল”। আমার খুব অবাক লাগে প্রধান বিরোধীদল যাদের প্রধান কাজ সরকার দলের কাজ পর্যবেক্ষন করা ও দেশ-জাতির প্রয়োজনে তার বিরুদ্ধে তাদের মত প্রকাশ করা। জাতিগত এত বড় একটা বিষয়ে বুরবকের মতো না জেনে, না বুঝে মন্তব্য দায়িত্বশীল দলের কাজ না বা তার অবকাশ ও নেই। পক্ষান্তরে সরকারী দলের নেতারা কিছু না জেনে, না বুঝে জয় জয় বলে মাতম তুলেছেন তারও কনো কারন আমি বুঝছি না। কি হতো যদি সরকারী দল বলতো রায়ের মতে, আমরা দক্ষিনের কিছু ব্লক হারিয়েছি, যেটা নিরপেক্ষ ভাবে দেখলে আমাদের ও বার্মার ও ২০০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে পরে। সুতরাং তারা বলতে পারতো আমারা দাবী উত্থাপন করেছিলাম, তার সপক্ষে যুক্তি উপস্থিত করেছিলাম, সকল বিষয় বিবেচনার পর আমারা আমাদের ন্যায্য অংশ বার্মা তাদের ন্যায্য অংশ পেয়েছে। সবচেয়ে বড় জয় হয়েছে আমাদের সমুদ্রে নিজেদের অংশের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে, আমরা এখন মারামারি/হানাহানির আশংকায় না গিয়ে, আমাদের সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীকে ঝুঁকিতে না ফেলেও তেল গ্যাস অনুসন্ধান করতে পারবো। আশা করি এটা বললেও দেশবাসী তাদের সত্য ভাষনের জন্য পুরস্কৃতই করতো। অন্তত দক্ষিনের তেল গ্যাস অনুসন্ধান ব্লকে দুই দেশের নৌ-বাহিনীর যে মুখোমুখি অবস্থান হয়েছিলো, তার শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য At least সরকারী দল প্রশংসার দাবী রাখে। পাশাপাশি খালেদা জিয়া সংসদে এই কাজের জন্য পুরো অভিনন্দন টা সরকারী দলকে দেয়ায় শুভ রাজনীতির ইঙ্গিত পাচ্ছিলাম(এটা বর্তমান রাজনৈতিক চর্চার বাইরে উনার সাহসী পদক্ষেপ। অথচ এই বরবুকই রায় হওয়ার পরপরই, কিছু না জেনে, না বুঝে, না পড়ে বলেছিলেন, “এটা সরকারের সাফল্য নয়, এটা পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সাফল্য”, মনে হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় সরকার চালান না, এটা নিজে নিজে চলে, কেমন স্ববিরোধী কথা, এরাই নাকি আমাদের দেশের বড় নেতা, দলীয় স্বার্থের জন্য দেশের স্বার্থকে উপেক্ষা করে যারা!)

খেলার মধ্যে রাজনীতি আনতে নেই, কিন্তু লেখার শেষ হিসাবে খেলা নিয়ে একটা উদাহরন দিতে চাই (যেটা আমি আমার “প্রেরণা বাঁচিয়ে রাখতে হবে” লেখায় উল্লেখ করেছিলাম)। গত এশিয়া কাপ ফাইনালে ২ রানের হার কেও সমগ্র জাতি/সমগ্র পৃথিবী জয় হিসাবে দেখলো। সবাই ভাবলো এই প্রেরণাকে নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট খেলায় অনেক এগিয়ে যাবে, আমাদের আর পিছু ফিরে তাকাতে হবে না। কিন্তু দুই দিন যেতে না যেতেই কয়েক বুরবক এই খেলারই পিছন ফিরে তাকালেন, সবাকে পিছনে তাকাতে বাধ্য করলেন। কি হতো যদি আমারা যদি আমারা চিন্তা করতাম খেলায় কি কি ভূল ছিলো, কোথায় কোথায় আমাদের আরোও উন্নতি করতে হবে, আমাদের ভবিষ্যত খেলার পরিকল্পনা কি হবে? এসব চিন্তা না করে আমরা ৫ রান নিয়ে চিন্তা করা শুরু করলাম! আমরা পিছু ফিরে তাকালাম!

সরকারী দলের কাছে আহব্বান থাকবে “জয় হয়েছে – জয় হয়েছে” মাতম না তুলে বলুন সীমানা নির্ধারিত হয়েছে, অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বিরোধীদলের কাছে আবেদন থাকবে ধন্যবাদ দেওয়া, ধন্যবাদ উঠিয়ে নেয়া এসব না করে বলুন, “সীমানা নির্ধারন করেছেন, সীমানার মধ্যে অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছেন, এটা ধন্যবাদ পাবার মতো কাজ করেছেন, আমরা চেষ্টা করেছিলাম পারিনি, সেই কাজটি আপনারা শেষ করেছেন”। দুই দল বসুন, আলাপ করুন কিভাবে আমাদের এই সমূদ্র সীমানায় তেল, গ্যাস অনুসন্ধান করা যায়? কিভাবে সি-পোর্ট করে আমদানী-রপ্তানী ঝঞ্ঝাট বিহীন ও কম খরচে করা যায়? কিভাবে উক্ত এলাকার মৎস সম্পদ সংগ্রহ করে, বিপনন করে, প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানী করা যায়? এগুলো করলে যেমন মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে, তেমন বেকার সমস্যার সমাধান হবে। আর পিছনে ফিরে তাকাবেন না, তার অবকাশ নেই। হোক সে সরকারী দল কি বিরোধী দল, আপনাদের দলীয় আদর্শ বা মতের ভেদ থাকতে পারে, কিন্তু জাতীয় ক্ষেত্রে মতানৈক্য আনুন, একে অপরকে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সাহায্য করুন। দয়া করে তিক্ততা আর বাড়াবেন না, দেশ গঠনে মন দিন, ১৬ কোটি মানুষের তাই প্রার্থনা আপনাদের কাছে।