ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

ছোট একটা ঘটনা বলি মূল কথা বলার আগে। আমার সহধর্মিনীর দপ্তরে এক বাৎসরিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে রাষ্ট্রপতি এসেছিলেন। দপ্তরের একমাত্র নারী কর্মকর্তা হবার সুবাদে প্রধান ফটকে অতিথীকে বরন করার গুরুদায়িত্ব যথারীতি আমার সহধর্মিনীর উপর বর্তায়।ওদের দপ্তরের প্রধান ফটক থেকে ভবন এর দূরত্ব একটু বেশিই। প্রধান ফটক থেকে ভবন পর্যন্ত আমার সহধর্মিনী নাকি অতিথির সাথে হেটে কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না! শোনার পরে আমি ওকে বলেছিলাম, “গুল মারার জায়গা পাওনা! ছোট-খাট একজন মানুষ তারপর অনেক বয়স্ক সে কিভাবে তোমার মতো উঁচালম্বা, ভাল স্বাস্থ্যধারী, কমবয়সী মানুষের থেকে জোরে হাটে!” উত্তরে ও বলেছিল ওদের দপ্তরে নাকি অতিথি বিদায়ের পরে সহকর্মীদের আড্ডায় ও এই বিষয় বলার পরে ওর এক সহকর্মী বলেছিল,“আপা ঠিকই বলেছেন। রাষ্ট্রীয় বাসভবনের প্রধান পাচক নাকি বিশেষ বলবর্ধক, হৃতস্বাস্থ পুনরুদ্ধারকারী স্যুপ বানাতে পারে। অতিথি নাকি নিয়মিত সেই স্যুপ পানে হাটা-চলা, কাজে-কর্মে বিশেষ উন্নতি লাভ করেছেন। কাজেই উনার সাথে হন্টন প্রতিযোগীতায় আপনার নাভীশ্বাস উঠা বিচিত্র নয়!” আমি শুনে মনে করেছিলাম কি যেন হতেও পারে। কেননা এক শোকময় দূর্ঘটনায় তার স্ত্রীবিয়োগের পর হতে তার প্রতি খেয়াল রাখার কেউ না থাকায়, তার খাবার প্রস্তুত করা, খাবার দেখ-ভাল করার কেউ না থাকায় তার স্বাস্থ্যের যে অবনতি হয়েছিলো, ভালো খাবার ও সেবায় উনি তা পুনরুদ্ধার করতে পেরেছেন। সেটা ভেবে আমার ভালোই লাগছিল।
এর কিছুদিন পরের ঘটনায় আমি তো মোটামুটি শতভাগ নিশ্চিত হয়ে গেছি যে আমার সহধর্মিনীর সহকর্মীর বক্তব্য সঠিক। কেননা যখন খবরের কাগজে পড়লাম তিনি সংবিধানের বিশেষ ক্ষমতাবলে আদালত হতে খুনি প্রমানিত একজন ব্যক্তির বেশকিছু সাজা নিঃশর্ত ভাবে ক্ষমা ঘোষনা করেছেন। অবশ্য একজন সাংসদ (পরবর্তীতে মন্ত্রী ও দপ্তরবিহীন মন্ত্রী) বলেছিলেন, “রাষ্ট্রপতি তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেছেন!” আমি মনে করেছিলাম কি জানি বাবা হতেও পারে, স্যুপ খেয়ে উনার এত বল, কর্মচাঞ্চল্য, উদ্দম এসে গেছে যে – বিভিন্ন দপ্তর থেকে সুপারিশকৃত কয়েকটি কেসের নথি উনি অতি দ্রুত পড়ে পর্যালোচনা করে, আতি দ্রুত সাইন করে পাশ করে দিয়েছেন!

আমার সহব্লগার সবাই খুব চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন এবং মন্তব্য করেন। তাই কেউ একজন উপরের লেখাটুকু পরে এরকম একটা মন্তব্য করবেন, “আপনার চিন্তাধারা মনে হয় ঠিক নাই। উনি যদি কর্মচাঞ্চল্য অনুভব করবেন তাহলে ৩ বছর আগে স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী স্বেচ্ছায় দেয়া পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষর কেন করবেন না?” সেই সহব্লগারদের প্রতি আমার উত্তর, “আরে ভাই, সেই পদত্যাগ পত্র তো ছিলো উনার দ্বায়িত্ব গ্রহনের অল্প কিছুদিন পরে। স্যুপের গুনাগুন যতই ভালো হোক, অল্প কিছুদিন তো লাগবে তার আছর পরতে।অল্প কিছু দিন পরে উনি যখন শক্তি ফিরে পেতে শুরু করেছেন, তখন ঐ ফাইলের কথা ভুলে গেছেন, এখন বোঝা গেলো তো ব্যাপারটা”।

কিন্তু সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর পরে আমারই কেমন যেন খটকা লাগলো!

“প্রধানমন্ত্রীর এছাড়া কোনো উপায় ছিল না তখন বৃহস্পতিবার কৃষক লীগের সমাবেশে কেন রেলমন্ত্রীকে মন্ত্রিত্বে রাখা হল ব্যাখ্যা দিলেন। এবার দায়দায়িত্ব চাপালেন রাষ্ট্রপতির ঘাড়ে। বললেন, ‘কেউ পদত্যাগ করলেই তার পদত্যাগ হয়ে যায় না। সেটা গ্রহণ করা হলো কিনা সেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তদন্ত হচ্ছে, ফলাফল বের হলে রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা নেবেন। যতক্ষণ রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর না করেন, ততক্ষণ তিনি রেলমন্ত্রী থাকবেন। কিন্তু আমরা তা করিনি। তাকে রেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দফতরবিহীন মন্ত্রী করা হয়েছে। অন্য একজন মন্ত্রীও পদত্যাগ করেছে। আমরা তার পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাইনি। সে এখনও দফতরবিহীন মন্ত্রী রয়ে গেছে।’ এ বিষয়ে দৈনিক ইত্তেফাকে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ছাপা হয়েছে। তারা বলেছেন, উক্ত মন্ত্রীদ্বয় এখন আর মন্ত্রী হিসেবে বহাল নেই। সংবিধানের ৫৮(১)(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাদের পদ শূন্য হয়ে গেছে। ফলে দফতরবিহীন মন্ত্রী হিসেবেও তাদের মন্ত্রিসভায় রাখার আর সুযোগ নেই”।–আমার দেশ ২১ এপ্রিল “ঘুষ কেলেঙ্কারী থেকে রেহাই পাচ্ছেন না ……….”- এই শিরনামে খবরটি পড়ে আমার কেমন যেন সন্দেহ হলো স্যুপের কার্যকারীতার উপর।যিনি এতো কর্মতৎপর তিনি কেনো এই গুরুত্বপূর্ন ব্যাপারটিতে স্বাক্ষর করতে বিলম্ব করবেন? তাড়াতাড়ি ফোন দিলাম সহধর্মীনির সহকর্মিকে, “কি ভাই, আজকাল পাচকের স্যুপতো কাজ করছে না!” উনি যা উত্তর দিলেন শুনে আমার সব রহস্য দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে গেলো। “ভাই আপনি মনে হয় জানেন না, প্রধান পাচক মাস খানেক হলো অজ্ঞাত কারনে চাকরী ছেড়ে চলে গেছে। স্যুপ নাই তাই হয়তো আজকাল উনি একটু অসুস্থও বোধ করছেন!”

লেখকের বক্তব্যঃ গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক, জীবিত বা মৃত কোন কিছুর সঙ্গে মিল থাকলে তা সম্পূর্ন কাকতালীয়।