ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

শাহবাগ আন্দোলন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সবচেয়ে আলোচিত একটি বিষয়। যে আন্দোলন দেশবাসীকে স্মরন করিয়ে দিচ্ছে ৫২ র ভাষা আন্দোলনের কথা, ৬৬ র ছয় দফার কথা, ৬৯ র গন আন্দোলনের কথা,৭১ র মুক্তিযুদ্ধের কথা এবং ৯২ র রাজাকার বিরোধী গণ আদালতসহ দেশের গুরুত্বপূর্ন সকল আন্দোলনের কথা। আন্দোলনে ব্যবহৃত শ্লোগানগুলো দেশবাসীকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের দিনগুলোতে। আমরা যারা আজকের তরুন প্রজন্ম যারা হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন করি তারা পেয়েছি মুক্তিযুদ্ধের স্বাদ। সম্পুর্ন অরাজনৈতিক ব্যানারে শুরু হওয়া এই আন্দোলন গুনে, মানে এবং বৈশিষ্টগত ভিন্নতায় অনেক আন্দোলনকেই ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। তাইতো টনক সড়েছে দেশের তথাকথিত বুদ্ধীজীবিদের, রাজনৈতিক দলগুলোর এবং স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির। যেসব তথাকথিত বুদ্ধীজীবী এতদিন রাজাকারদের পক্ষে কথা বলেছেন তারাও এখন সুর পাল্টাতে শুরু করেছেন। ইতোমধ্যেই এ আন্দোলনকে নিয়ে শুরু হয়েছে নানান ধরনের রাজনৈতিক হিসাব নিকাষ।

একটি বিষয় সবার কাছে পরিষ্কার হওয়া দরকার যে শাহবাগ আন্দোলন কোন রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের আন্দোলন নয়। বরং এটি আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি গনমানুষের অনাস্থারই বহি:প্রকাশ। এই ইস্যুতে সরকারী দল জনগনের আস্থা ধরে রাখতে পারেনি পক্ষান্তরে দেশের প্রধান বিরোধী দল শুরু থেকেই যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের কথা বলে অনেক আগেই জনরোষের শিকার হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দেশের অন্যতম বৃহত্তম দল ” বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ”।অন্যভাবে বলতে গেলে এটি বাঙালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে গড়া রাজনৈতিক দল। যে নেতার ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল বাংলার আপামর জনতা। তারই কন্যা আজ বাংলাদেশের রাষ্টীয় ক্ষমতায় তাইতো স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধাপরাধের বিচার বিষয়টিতে জনগনের প্রত্যাষা এ সরকারের প্রতি অনেক বেশী। যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করে এই সরকার সাধারন মানুষের প্রশংসা পেয়েছিল কিন্তু শুরু থেকেই দেশী বিদেশী চাপও অব্যাহত ছিল। সকল চাপকে উপেক্ষা করে সরকার এগিয়ে যাচ্ছিল এবং ১ম রায়ে সাধারন মানুষ সন্তুষ্টু হলেও ২য় রায় দেশবাসীকে হতবাক করে দেয়। শুরু হয় নানান গুন্জন। সাধারন মানুষের মনের ভিতর সন্দেহ দানা বাধে তাহলে কি সরকার মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী জামাতের সঙ্গে আতাত করে এই রায় দিল ? তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই সরকার এ ধরেনর রায় আয়োজনের বিনিময়ে জামায়াতের কাছ থেকে বিশেষ কোন সুবিধা চেয়েছিল শাহবাগ আন্দোলন কি সেই চাওয়া ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়নি ? আবার যদি ধরে নেই দেশী বিদেশী চাপে পিছু হটার কেৌশল অবলম্বন করতে চেয়েছিল সরকার সেই চাপ কিংবা ভয় সককার কি এখন অনুভব করছেন ? দেশে বিদেশে আন্দোলেনর স্ফুলিঙ্গ যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে কি এখন বলার সুযোগ আছে যে এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রনোদিত বিচার ? এসব কিছুকেই উপেক্ষা করেও সরকার যদি জামায়াতের সঙ্গে গোপন সমঝোতায় লিপ্ত হয় কিংবা রাজনৈতিকভাবে জোটবদ্ধ হয় তাহলে কি জনগন তাদেরকে ক্ষমা করবে ?

বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল ” বিএনপি”, দলটির জন্ম মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরে হলেও দলটির প্রতিষ্ঠাতা একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। এখনও অনেক মুক্তিযোদ্ধার ঠিকানা এই দলটি। সুতরাং এটা বলা যুক্তিযুক্ত হবে বলে মনে করিনা যে এটি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি। তবে একথা সত্য যে, শুধুমাত্র ক্ষমতার লোভেই এই দলটি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে জামায়াতকে ক্ষমতার অংশীদার করেছে এবং বিভিন্ন সময় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারীদেরকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। রাজাকারদের গাড়ীতে দিয়েছে লালসবুজের পতাকা। বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করলে তারা প্রথম থেকেই স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার কথা বললেও বিচার প্রক্রিয়ায় কোথায় অস্বচ্ছতা রয়েছে কিংবা কিভাবে বিচার করলে স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় থাকবে তাও বলেনি কখনও। তাদের দলের কেউ কেউ শাহবাগ আন্দোলনকে নাটক বলে অভিহিত করেছেন আবারও কেউ কেউ আন্দোলনকারীদেরকে স্যালুট দিচ্ছেন। এই ইস্যুতে বক্তব্য দিতে গিয়ে দলের নেতারা “তবে”,”যদি”,”কিন্তু”, “এবং’ জাতীয় শব্দগুলোর যথেচ্ছ ব্যাবহার করছেন। কি ফল হবে একবারও কি ভেবে দেখেননি তারা ? ভাবছেন আবারও জামায়াত শিবিরকে নিয়ে ভোট চাইতে মাঠে নামবেন ? শাহবাগ আন্দোলন কি আপনাদের কোন বার্তা দেয়নি ?

মুক্তিযুদ্ধের ৪১ বছর পরেও বাংগালীর হৃদয়ের ক্ষতের দাগ শুকায়নি। এখনও মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয় বাংলার আকাশ বাতাস। এখনও “জয় বাংলা” শ্লোগানে কেপে ওঠে রাজপথ। সুতরাং “মুক্তিযুদ্ধ” দেশের রাজণীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ন নিয়ামক। বলা হয়ে থাকে ২০০৮ সালের নির্বাচনে তরুন ভোটারদের একটি বড় অংশ যুদ্ধাপরাধের বিচারের ইস্যুতে আওয়ামীলীগকে ভোট দিয়েছিল। এই ইস্যুতে তরুনরা আবারও ভেোট দিবে, এই ভোট কাদের বাক্সে যাবে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ২০১৪ সালের নির্বাচন পযর্ন্ত কিন্তু যারা মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের সাথে বেঈমানী করবে তাদের দাত ভাঙ্গা জবাব দেয়ার প্রস্তুত আছে জনগন। সুতরাং সাবধান।