ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত এবং জামায়াতের রাজনীতি একটি চলমান ইস্যু। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে এটি আরও গতি পেয়েছে। পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা সমালোচনার অন্ত নেই। তবে একথা অনস্বীকার্য যে,তেমন জনসমর্থন না থাকলে ও আর্থ-সামাজিক অবস্থান ও ক্যাডার ভিত্তিক সংগঠনের কারণে জামায়াত অবশ্যই বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ফ্যাক্টর। যার কারণে দেখা যায়, বিএনপি যেমন জামায়াতকে নিয়ে বাহুবল প্রদর্শন করে,আওয়ামী লীগকে ও ক্ষেত্রবিশেষে জামায়াতের সাথে সমঝোতা করে যুগপৎ আন্দোলনে যেতে হয়।

ব্লগ বা কোথাও জামায়াত নিয়ে সমালোচনা করলেই জামায়াতিরা কৌশলে সেটাকে ইসলাম বিরোধীতায় রূপ দেয়ার চেষ্টা করে,যেন জামায়াত বিরোধীতা মানেই ইসলাম বিরোধিতা। অথচ অধিকাংশ ইসলামি দলই জামায়াতকে ইসলামী দল মানতে নারাজ,মওদুদীর বিভিন্ন ভ্রান্ত আক্বীদার কারণে মওদুদি ও জামায়াতকে ইসলামের মূলধারা বিচ্যুত বলেই মনে করেন তারা। জামায়াত নিজেদের কুকীর্তি ঢাকার জন্য ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিরোধীতা করতে গিয়ে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আ’লা মওদুদী বলেছিলেন-ইসলাম কো বাঁচানা হ্যায় তো পাকিস্তান কো বাঁচাও। মওদুদীর পাকিস্তান না বাঁচলেও মওদুদীর ইসলাম বা মওদুদীবাদ যেন বহাল তবিয়তে শাখা –প্রশাখা বিস্তার করে চলেছে,ধর্মীয় পরিমণ্ডলে তেমন না হলেও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তো বটেই।

একথা অস্বীকার করার জো নেই-জামায়াত-শিবির এক ঝাঁক নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর সমন্বয়, যাদের কাছে দলীয় স্বার্থের উপরে কিছু নেই,এমন কি সেটা ইসলাম বিরোধী হলে ও। মওদুদীর ভ্রান্ত আক্বীদা গুলোর প্রতি আনুগত্য তা-ই প্রমান করে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু দের লাইন ধরে হাততালি দিয়ে স্বাগত জানাতে আমি দেখেছি,অথচ ইসলামে হাততালি দেওয়া হারাম। গত জোট সরকারের আমলে পল্টন ময়দানে শিবিরের এক কর্মী সম্মেলনে আমি প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম,দেখলাম-গেটে একই রংগের পোষাক পরিহিত একদল তরুণ আগতদের স্বাগত জানাচ্ছে হাততালি ও নানাবিধ নৃত্যের মাধ্যমে,এক পর্যায়ে ঘোষক উপস্থিতিকে রাজশাহী থেকে আগত এক শিল্পীর সংগীত পরিবেশনে হাততালি দিয়ে স্বাগত জানাতে অনুরোধ জানালেন।
মুখে কোরানের বুলি আওড়ালেও আসলে মহাগ্রন্থ আল কোরান তাদের স্বার্থ সিদ্ধির এক হাতিয়ার মাত্র। ইসলামী শাসন ব্যবস্থার কথা বললেও চারদলীয় জোট সরকারের প্রভাবশালী অংশ হওয়া সত্বেও সে আমলে তারা ইসলামের স্বার্থে কি করেছে, তা জনগণের মধ্যে যেমন আলোচিত তেমনি আলোচিত তাদের অন্দরমহলে ও। তেমনি একটি পুস্তিকা আমার সংগ্রহে আছে যা প্রকাশিত হয় ২০০৩ সালে জামায়াতের কর্মীদের একটি ফোরাম থেকে। “সাঈদীর কাছে খোলা চিঠি-মুহতরাম সাঈদী সাহেব সবিনয়ে জানতে চাই” শিরোনামে পুস্তিকাটির শেষে লেখা আছে “রসুল(সঃ) এর বাস্তব জীবনের আদর্শে অনুপ্রাণিত ইসলামী আন্দোলনের একঝাক তরুণের সমন্বয়ে গঠিত- মুহতরাম সাঈদী সাহেব সবিনয়ে জানতে চাই নামক একটি স্বতন্ত্র ফোরাম থেকে প্রকাশিত ও প্রচারিত। পুস্তিকাটি ২০০৩ সালের ২২-২৬ ডিসেম্বর অনুষ্টিত চট্টগ্রাম প্যারেড ময়দানে তাফসীরুল কোরান মাহফিলে বিভিন্ন বুক স্টলে প্রথম ২ দিন বিক্রয় হয়,তৃতীয় দিন থেকে আর দেখা যায়নি।পুস্তিকাটিতে নিজেদের জামায়াত ও সাঈদীর শুভাকাঙ্কী দাবী করে জামায়াতের বিভিন্ন দ্বিমুখী নীতির বিরোধীতা করে এ ব্যাপারে সাঈদীর কাছে তাফসীর মাহফিলে এর জবাব দাবী করা হয়। জবাব যদিওবা মেলেনি তবু ও পুস্তিকাটির বিভিন্ন পয়েন্ট মনোযোগের দাবী রাখে যা জামায়াতের “ইসলামের তরে রাজনীতি না রাজনীতির তরে ইসলামের ব্যবহার” প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসে। আমি এ থেকে কয়েকটি পয়েন্ট তুলে ধরছি।যারা পুরো পুস্তিকাটি পড়তে চান ডাউনলোড করে নিতে পারেন-লিংক

১। আওয়ামি লীগ সরকারের আমলে লিভার ব্রাদার্স বাংলাদেশ লিঃ সহ কতিপয় কোম্পানী ঢাকায় সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল।উক্ত সুন্দরী প্রতিযোগিতার প্রতিবাদে ও এর প্রতিরোধের জন্য আপনি তৌহিদী জনতাসহ ঢাকার রাজপথে নেমেছিলেন।————-তৌহিদি জনতার ঢল নিয়ে আপনি রাজপথে ঘোষণা দিয়েছিলেন,’আমি সাঈদী বেঁচে থাকতে এবং এই তৌহিদী জনতা বেঁচে থাকতে ঢাকার কোন প্রান্তে সুন্দরী প্রতিযোগিতা হতে পারবেনা।আপনি যে বিল্ডিঙয়ে সুন্দরী প্রতিযোগিতা হবে সে বিল্ডিং টুকরো টুকরো করে ফেলার ঘোষনা দিয়েছিলেন।———– হাজার হাজার জনগণ প্রশ্ন করেছেন- আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে ঢাকার যে সুন্দরী প্রতিযোগিতাটি বাতিল হয়েছিল,সে সুন্দরী প্রতিযোগিতাটি আপনার ইসলাম ও জাতীয়তাবাদী সরকারের আমলে ঢাকায় বারবার অনুষ্টিত হয়ে গেল।এমনকি বড় বড় জেলা শহরগুলোতে ও ঘটা করে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল————-।
আপনি এবং মাথায় কাফনের কাপড় বাঁধা আপনার তৌহিদি জনতা এখন কোথায়?—–সুন্দরী প্রতিযোগিতার ব্যাপারে নিরবতা কি ইসলামের স্বার্থে? ইসলামে (চার দলীয়)জোট সরকারের আমলে সুন্দরী প্রতিযোগিতা কি জায়েয দিয়েছে?

২. মওলানা সাহেব,মাত্র দুইজন সাংসদ নিয়ে আপনি যখন মদ-জুয়ার একটি বিল সংসদে পেশ করেছিলেন,তখনো আপনি জানতেন ঐ বিলটিকে আওয়ামীলীগ সরকার ডাস্টবিনে ফেলবে,তবু ও আপনি হুংকার দিয়ে সেদিন সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে জনতার কাতারে এসে বলেছিলেন,”এই সংসদ এই বিল প্রত্যাখ্যান করেছে।তবুও জনগণ দায়িত্ব দিয়েছিল বলে এবং আল্লাহ্‌কে জবাব দিতে হবে বিধায় পেশ করেই এসেছি।তাই এমন সংসদ চাই,যে সংসদে ঐ বিলকে আমরা মর্যাদার সঙ্গে পাশ করতে পারবো”।———কিন্তু আজকের আপনার ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ সরকারের মাত্র দু’জন নয়,দুইশত এর ও বেশি সংসদ সদস্য রয়েছে।দুই বছর চলে গেল।মওলানা সাহেব,ঐ বিলটি কি আছে,না?আজ ও ভয় হচ্ছে নাকি?না জানি বিলটি যদি প্রত্যাখ্যাত হয়।দেখুন না একবার ট্রাই করে,ঐ ধরনের কয়েকটি বিল সংসদে পেশ করুন।পাশ নাহলে রিজাইন দিয়ে জনতার কাতারে আসুন————-।ইসলামের নাম দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রোজ একটি করে বিল পেশ করেছেন(প্রত্যাখ্যাত হবে জেনেও)।কিন্তু আজকে ইসলামী জাতীয়তাবাদী সরকারের আমলে দুই বছর হয়ে গেল ইসলামের জন্য আপনার দল ও আপনার নিজের হাতে তেমন একটি বিল প্রদর্শনের জন্য হলে ও (জনগণকে জবাব দেয়ার জন্য) কেন সংসদে পেশ হলনা। বরং জাতি দেখল কি! মদকে লাইসেন্স দেয়া হল,বাজেটে মদের দাম কমানো হল।

৩. পবিত্র কোরআনে সুদকে স্পষ্টভাবে সম্পূর্ণ হারাম করা হয়েছে।সুদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোরভাবে কোরআন হাদীসে আদেশ দেয়া হয়েছে এবং নিষিদ্ধ করা হয়েছে।——সেই ১২% সুদ জড়িত দু’দুটি বাজেটকে কি করে হাত উঠিয়ে সমর্থন দিলেন?সুদের ঐ আয়াতগুলি কি সংশোধনযোগ্য?—-যুক্তি দিয়ে নয়,কোরান-হাদীসের দলিল দিয়ে জানাবেন।

৪. জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা নিজামী সাহেব সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।সরকারের কৃষি ব্যাংকটি ওই মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন। সম্প্রতি খবর নিয়ে জানতে পারলাম,বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক দেশের সমস্ত ব্যাংকগুলোর চাইতে বেশি সুদের কারবার করে থাকে।আমাদের জানার খুব কৌতূহল-নিজামী সাহেব ওই ব্যাংক এর কোন কাগজপত্রে কি স্বাক্ষর করেননি? যদি করে থাকেন,কোরানের সুদের ঐ সমস্ত আয়াতকে কি পদদলিত করা হলনা? যুক্তি নয়,কোরান-হাদীসের দলিল দিয়ে জানাবেন।

৫. শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ১লা বৈশাখ উদযাপনের ব্যাপারে আপনার বক্তব্য যথেষ্ট শুনেছি।বৈশাখের মালিককে বাদ দিয়ে সরাসরি বৈশাখকে আহবান করা,রমনা বটমূলে যুবতী মেয়েদের দিয়ে বিভিন্ন নৃত্য-গীতের মাধ্যমে বৈশাখ বরণকে আপনি অনৈসলামিক কাজ বলে অত্যন্ত কঠিন ভাষায় সমালোচনা করেছিলেন।————–গত বাংলা ১৪১০ নববর্ষে আপনার ভাষায় দেশে একটি ইসলামী ও জাতীয়তাবাদী সরকার ক্ষমতায় আছে। বিভিন্ন জরিপে ও পর্যালোচনায় দেখা গেছে ১৪১০ নববর্ষটি সমস্ত বর্ষবরণের চাইতে উলঙ্গপনা ও বেহায়াপনার মধ্যদিয়ে পালিত হয়েছে। কিন্তু জোট সরকারের আমলে হওয়ায় এই ১লা বৈশাখটির পক্ষে ছিলেন আপনি ও আপনার দল।এমনকি জামায়াতে ইসলামীর মূখপত্র হিসেবে খ্যাত দৈনিক সংগ্রামের প্রথম পৃষ্ঠায় ১লা বৈশাখ ১৪১০ সালের বর্ষবরণ সম্পর্কে চার কলাম জুড়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। ঐ প্রতিবেদনে রসুল (স)এর উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে,১লা বৈশাখ বাংগালী মুসলমানদের জন্য এক মহোৎসব,কেননা এটি নবী (সঃ) এর হিজরি সালের অনুকরণে তৈরী।——– কিন্তু এতদিন নবী (সঃ) এর হিজরি সালের অনুকরণে তৈরী বাংলা নববর্ষটি এবং বাঙ্গালী মুসলমানদের সেই মহোৎসব কোথায় গিয়েছিল? জোট সরকারে স্থান নিয়েছেন বলে ইসলামের নাম দিয়ে এক এক সময়ে এক এক রকম করে,এমন দ্বিমুখী বক্তব্য কি শরিয়তসম্মত?

৬. সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিভিশন এর আর্কাইভ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাঁকজমকপূর্ণ যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে,তা বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক দেখেছে।———–জামায়াতে ইসলামীর আমীর মওলানা নিজামী দর্শকদের প্রথম সারিতে বসে যুবতী মেয়েদের ড্যান্স উৎফুল্ল মনে উপভোগ করেছেন।উক্ত ড্যান্স দেখে উনি যে সত্যি সত্যি আনন্দ পেয়েছিলেন তার প্রকাশ ও তিনি ঘটিয়েছিলেন।মেয়েদের ড্যান্স দর্শনের মাঝে মাঝে তার ডান পাশে বসা যোগাযোগ মন্ত্রী নাজমুল হুদার দিকে তাকিয়ে উনি মুছকি হাসি দিচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে আমিরে জামায়াত নিজামী সাহেব তার মাথার উপর থেকে ইসলামী সংস্কৃতির প্রতীক, রসুল (সঃ) এর সুন্নত মাথার টুপিটি খুলে ফেললেন এবং পকেটে ঢুকিয়ে নিলেন। দশ হাজারেরও বেশী প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন, ইসলামে সুন্দরী যুবতীদের ড্যান্স,নৃত্য এবং নারীদেহের অর্ধ উলঙ্গ অঙ্গ প্রত্যঙ্গ উপভোগ করা কবে যায়েজ ঘোষণা করা হল?

৭. শিখা অনির্বানের বিরুদ্ধে আপনিই সর্বোচ্চ প্রতিবাদকারী। আওয়ামী লীগ সরকার শিখা অনির্বান প্রতিষ্ঠা করেছিল তাদের নৈতিকতার কারণে এবং সেটা তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও ছিল। তবুও আপনি আওয়ামী লীগ সরকারকে ছাড়লেন না।——আওয়ামী লীগের পতনের সঙ্গে সঙ্গে শিখা অনির্বান ও মরে গেল। সেই মৃত শিখা অনির্বানকে আপনার ইসলামী ও জাতীয়তাবাদী সরকারের উদ্যোগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কর্তৃক পুনঃ নির্মাণ ও আধুনিক সংস্কার করে তা পুনরায় প্রজ্বলিত করা হয়েছে। ঠিক এই মুহূর্তে আপনার বিপ্লবী কণ্ঠে কোন প্রতিবাদ বেরুলনা কেন?

৮. সম্প্রতি সৌদি পত্রিকা ‘ওকাজ’ এর সাথে সাক্ষাতকারে আমিরে জামায়াত মওলানা নিজামী সাহেব একপর্যায়ে বললেন,”বর্তমান সময়ে অনেক সমস্যার প্রেক্ষিতে জামায়াতের দৃষ্টিভঙ্গী ও ভূমিকার ব্যাপারে ঢাকায় অবস্থিত আমেরিকান দূতাবাসের অনুভূতি অত্যন্ত চমৎকার” । ইহার অর্থ আমেরিকা জামায়াতের উপর সন্তুষ্ট। এই কথা থেকে কি বুঝা যায় না আপনারা সঠিক ইসলামের আদর্শকে বলি দিয়ে আমেরিকার গোলামী করতে শিখেছেন? নাহলে মুসলমানদের চিরশত্রু আমেরিকা কি করে জামায়াতে ইসলামীর উপর সন্তুষ্ট থাকবে? বিশ্বে একজন মুসলিম ব্যক্তি এমনকি অমুসলিমও একথা বিশ্বাস করবেনা যে আমেরিকার গোলামী না করলে একটি ইসলামী দলের উপর তারা সন্তুষ্ট থাকবে। হ্যাঁ,যদি আল্লাহ-রসুলের ইসলাম না হয়ে বুশ,ব্লেয়ার ও শ্যারনদের গোলামী করার ইসলাম হয়,তাহলে অন্য কথা। এ ব্যাপারে স্পষ্টভাবে কিছু বলবেন কি?

৯. এক বৈঠকে মুফতি আমিনীর প্রতিনিধি বললেন, “আমরা জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে বলিনা,আমরা মওদুদীর বিরুদ্ধে বলছি”।এই কথাটি দেশের ইসলামী অনেক রাজনৈতিক দলকে অনেক দিন থেকে বলতে শুনেছি।——–দেখা যাচ্ছে অন্যান্য সকল ইসলামী রাজনৈতিক দলের মাঝে সব বিষয়ে মিল রয়েছে।শুধুমাত্র মওদুদীর এই জায়গায় এসে যতসব ঝামেলা এবং বিভেদ। ইসলামী ঐক্যের স্বার্থে,ইসলামী সকল শক্তিকে এক করার স্বার্থে ,একজন মাত্র ব্যক্তি “মওদুদী” ,একে কি এই বিষয় থেকে বাদ দেয়া যায়না? —– মওদুদীতো আল্লাহর নবী নয় যে,তার বলা কথা সমূহে ভুল ধরতে পারা যাবেনা বা বাতিল করা যাবেনা। জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আবুল আ’লা মওদুদী রচিত “মাসআলায়ে জবর ও কদর” তথা তাকদীরের হাকীকত বইটিতে উনি তার মূল বক্তব্য-ভূমিকাতে তকদির সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন- “একথা সত্য যে,তাত্ত্বিকভাবে এ বিষয়ে ঈমান ও যুক্তির উভয় পাল্লায় ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু তাই বলে এটা যেমন আছে তেমন থাকতে দেওয়া ও সঙ্গত নয়। যদি ও আমার মতে অদৃষ্টে বিশ্বাস ঈমানের অঙ্গীভূত নয় বরং এটা নিছক একটা ধর্মীয় বিধির চেয়ে বেশি কিছু নয়”।(আধুনিক প্রকাশনী,বাংলাবাজার ঢাকা কর্তৃক প্রকাশিত ‘তাকদীরের হাকিকত’,পৃষ্টা-১২,লাইন-৯)

আমরা জানি,তাকদীরে বিশ্বাস করা ঈমানের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। ——আমরা কলেমায় বলে আসছি যে,আল্লাহর উপর বিশ্বাস,আসমানী কিতাব সমূহের উপর বিশ্বাস,আল্লাহর নবী-রাসুল গণের উপর বিশ্বাস,ফেরেস্তা ও কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাস,তকদীরের উপর বিশ্বাস,মৃত্যুর পর পুনঃজন্মের উপর বিশ্বাস। এই গুলো আল্লাহ যেমন বলেছেন তেমন থাকবে। ঐ গ্রন্থে আল্লামা মওদুদী সাহেব বলে ফেললেন, “যদি ও আমার মতে অদৃষ্টে বিশ্বাস ঈমানের অঙ্গীভূত নয় বরং এটা নিছক একটা ধর্মীয় বিধির চেয়ে বেশি কিছু নয়”। এরপর ও আল্লামা মওদুদীর ঈমান যথাযথ আছে বলে আমরা বিশ্বাস করতে পারব কি করে? উনি আরো বললেন, “তাই বলে এটা যেমন আছে তেমন থাকতে দেওয়া ও সঙ্গত নয়”। তার মানে আল্লাহর নির্ধারিত করে দেয়া তাকদীরের বিরুদ্ধে উনি যুদ্ধ করবেন—————–আল্লামা মওদুদী যে তাকদীর বিশ্বাস করলেন না এবং এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ইঙ্গিত দিলেন,বিষয়টি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য ও বক্তব্য কি?

১০. ছাত্রশিবির বায়তুল মালের নাম দিয়ে চাঁদা কালেকশন করে বলে অনেকের অভিযোগ। বিভিন্ন অনুষ্টানাদির জন্য প্রতিমাসে কয়েকবার করে বিভিন্নভাবে এই কালেকশন করা হয়। অনেকেই বলছেন সপ্তাহ সপ্তাহ কালেকশন,মাসে মাসে কালেকশন, বিশেষ বিশেষ কালেকশন সহ বিভিন্ন ধরণের কালেকশন করে থাকে। রসুলের যুগে যাদের ইচ্ছে হত তারা বায়তুল মাল এনে প্রদান করত। জোরাজুরির কিছু ছিলনা,যার ইচ্ছে হবে সে দেবে। যদিওবা ছাত্রশিবিরের দাবী,তারা সে পন্থা অনুসরণ করে চলেছে। এই বায়তুল মাল কালেকশনটি চাঁদাবাজির চাইতে বেশি হয়ে গেছে বলেও অনেকে বলছে।ইসলামের দৃষ্টি দিয়ে এটা আর দেখার সুযোগ নাই। ——- এই বায়তুল মাল কালেকশন কতদিন হবে?

১১. শিক্ষানীতি সম্পর্কে সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে শেখ মুজিবের ছবি টাঙ্গানো সূত্রের উদৃত্তি দিয়ে আপনি বলেছিলেন, যে ঘরে কুকুর কিংবা কোন প্রাণীর ছবি থাকে সে ঘরে রহমতের ফেরেস্তা আসেনা। এটা রাসুলের হাদিস ও বটে। শেখ মুজিবের ছবি টাঙ্গানো সম্পর্কে বড় বড় প্রতিবাদ করেছিলেন। শেখ মুজিব ছিল একজন পুরুষ। এখন দেখা যাচ্ছে আপনার অফিসে আপনার মাথার উপরে,নিজামী সাহেব ও মুজাহিদ সাহেব সহ জামায়াত নেতৃবৃন্দের মাথার উপরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছবি টাঙ্গিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একজন মহিলা। এ বিষয়েতো কিছু বললেন না। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কি দু’ধরণের হয়ে গেলনা?

১২. আপনি গত বছর কক্সবাজারের তফসীর মাহফিলে বলেছিলেন- এই সরকার ইসলামপন্থী সরকার। আমাদের প্রশ্ন , ইসলামে কী একাধিক পন্থা আছে,যে পন্থা বা ইসলামী পদ্ধতিতে নারী নেতৃত্বকে, মদকে, সুদকে,ব্যাভিচারকে,জুয়া-লটারীকে হালাল করা হয়ে থাকে?

১৩. মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর সাথে সন্ত্রাসী শব্দ জুড়ে দেয়ায় মুরতাদ আজগর আলীর বিরুদ্ধে নিন্দে জানাতে গিয়ে সংসদে আপনি বলেছিলেন, ‘মাননীয় স্পীকার দেশবাসীর দাবী হচ্ছে, এ মহান সংসদে ব্লাসফেমী ধরণের আইন পাশ করে এসব ধর্ম বিদ্বেষী নাস্তিক মুরতাদ জ্ঞানপাপীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হোক’।
প্রশ্ন হচ্ছে, আজ দু’বছর হয়ে গেল এই ব্লাসফেমী ধরণের কোন আইন প্রণয়নের জন্য কোন ধরণের ভূমিকা রেখেছেন কী?

১৪. আওয়ামীলীগ সরকারকে দোষ দিয়েছিলেন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়ায়, নজরুল ইসলাম কলেজ থেকে ইসলাম শব্দটি বাদ দেয়াসহ এ ধরণের আরো অনেক ইসলামী শব্দ বিভিন্ন স্থাপনা থেকে বাদ দেয়ায়। কিন্তু এই দু’বছরে একক সংখ্যাগরিষ্টতা থাকার পর ও এই নামগুলো ফিরিয়ে আনতে কোন চেষ্টা করলেন না কেন?

১৫. ‘ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম’ এই বাক্যটিকে জামায়াত রাজনৈতিক ময়দানে শ্লোগান হিসাবে ব্যবহার করে আসছিল। এক পর্যায়ে এসে শ্লোগানটিকে কিছুটা শিথিল করা হল এবং অল্প সংস্কার করে এমন কিছু ব্যাখ্যা আরোপ করা হল,যাতে করে মাঝে মধ্যে বাধ্য হয়ে নারী নেতৃত্বের কিছু অংশ মেনে নেয়া যায়। কিন্তু বর্তমানে “নারী নেতৃত্ব হারাম” এই মূল্যবান বাণীটিকে জ্যান্ত কবর দেয়া হয়েছে। কোন শ্লোগান,মিটিং-মিছিল,সভা-সেমিনারে ভুল করেও এই আলোকপাত করা হয়না। কার স্বার্থে এই হারামকে হালাল করা হল?

আরো অনেক পয়েন্ট আছে,কলেবর বৃদ্ধি হয়ে যাচ্ছে বলে এড়িয়ে গেলাম। পুস্তিকাটি যেহেতু গত বি এন পি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে প্রকাশিত,বিষয়াবলী ও সমসাময়িক। তবে কথা গুলো আমার নয়-আশা করি কেউ আমাকে এসব বিষয়াবলী নিয়ে বিতর্কে জড়াবেন না। তবে হ্যাঁ,বিষয়গুলো নিয়ে অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে। মতভিন্নতা থাকলেও পয়েন্ট গুলো জামায়াতের নীতি-আদর্শের সাথে সংশ্লিষ্ট। প্রশ্নবোধক চিহ্নগুলোই প্রমাণ করে জামায়াতের রাজনীতি আসলে ইসলামের তরে নয়,মওদুদী মতবাদ প্রতিষ্টার জন্য। তাই জামায়াতের বিরুধিতা মানে ইসলামের বিরুধিতা নয়,জামায়াতের রাজনীতি ও মওদুদীবাদের বিরুধিতা। স্বয়ং আব্বাস আলী খানের মুখ থেকেই বেরিয়েছে এ সত্যটি।নগর জামায়াতের কর্মী সম্মেলনে তিনি বলেন “জামায়াতে ইসলামী অন্য ধরণের একটি দল,এটাকে পুরোপুরি ধর্মীয় দল বলা যায়না,আবার রাজনৈতিক দল ও বলা যায়না। এটা একটা আদর্শবাহী দল”(দৈনিক পূর্বকোণ,চট্টগ্রাম,১৫ নভেম্বর ১৯৯৬)।

কী সেই আদর্শ যেটা কোন ইসলামী দল দাবীদারের জন্য ইসলামের চেয়ে ও বড় হতে পারে? ভ্রান্ত মওদুদীবাদ ???