ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

প্রবীর বিধানের ‘জামায়াত নিষিদ্ধ হোক, ধ্বংস হোক’ পোস্টটি পড়লাম, মনোযোগ দিয়েই। সময় সুযোগ হলে প্রবীর’দার লেখাগুলো আমি মনোযোগ দিয়েই পড়ি, ভালো লাগে বলেই। তবে কয়েকটি পয়েন্টে একমত হতে পারলাম না বলেই এই প্রতিক্রিয়া।

আপনার মত, বাংলাদেশের অধিকাংশ জনতার মত আমিও জামায়াতকে চরমভাবে ঘৃণা করি, চাই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হোক। ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে জড়িত থাকার সুবাদে আমি জামাত-শিবিরের নগ্ন জঙ্গিবাদ খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছি। দেখেছি আমার সহপাঠী কে শিবিরের সন্ত্রাসী আক্রমনে রক্তাক্ত হতে, দেখেছি প্রতিপক্ষের মিছিলে বিনা কারণে, বিনা উস্কানীতে শিবির সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র আক্রমন,শিবির কর্মীদের দোকান লুটপাট করতেও দেখেছি, অস্ত্রের ঝনঝনানির পাশাপাশি দেখেছি তরুন-যুবাদের কাছে টানতে অর্থের কচকচানিও। যদিওবা উপরের সবগুলো দোষেই বাংলাদেশের প্রায় সব ছাত্র সংগঠনই দুষ্ট, তবুও শিবিরের টাই হাইলাইট করা হয় বেশী। একেকজনের কাছে এর কারণ ভিন্ন ভিন্ন।কেউ জামায়াতকে ঘৃণা করে জামাত-শিবির ইসলামের কথা বলে তাই, কেউ তাদের ঘৃণা করে তারা ইসলামের অপব্যাখ্যা-অপব্যবহার করে বলে,অধিকাংশ মানুষই তাদের ঘৃণা করে তারা স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিরোধী ছিল বলে। তা সত্ত্বেও তাদের শক্তি ও অবস্থান কিন্তু ফেলনা নয় কোনমতেই। তাদের মত সাংগঠনিক কাঠামো, অর্থনৈতিক প্রতিষ্টান অন্য কোন রাজনৈতিক দলের আছে মনে হয়না। কারণ তেমন জনভিত্তি না থাকলেও জনগণের উপর ছড়ি ঘোরায় যেসব নেতৃবৃন্দ তাদের কাছে কিন্তু জামায়াতের কদর আছে। যার কারণে দেখা যায়- আওয়ামীলীগকেও জামায়াতকে সাথে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনে যেতে হয়, বিএনপিকেও জামায়াতের শক্তিতে ভর করে আন্দোলন সাজাতে হয়। ফলশ্রুতিতে জামায়াতের অবস্থান দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়। তাই আমরা যতই বলি, জামায়াত ধ্বংস হবেনা যদি না জামায়াতকে নৈতিক ও আদর্শিকভাবে মোকাবেলা করা হয়। নিষিদ্ধ করা হলেও ভিন্ন নামে তাদের আত্নপ্রকাশ করতে বাধা কোথায়, যেমন ছাত্রসংঘ ছাত্রশিবির হয়েছে।

প্রবীর বিধান লিখেছেন, ‘এখনো কমপক্ষে ২০টি সমমনা দল আছে জামায়াতের’। জানিনা তিনি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে কথাটি বলেছেন। তবে ইসলামী দলগুলো সম্পর্কে আমি যতটুকু জানি, বাংলাদেশে জামায়াতের সমমনা কোন উল্লেখযোগ্য ইসলামী দল নেই। হুজি,জমিয়তুল মুজাহিদীন কিংবা আহলে হাদীস দের সাথে জামায়াতের যোগাযোগ –সম্পর্ক -সহযোগিতা থাকতে পারে, তবে তারা সমমনা নয়। আমাদের দেশে মুসলমানরা প্রধানত দুই মতবাদে বিভক্তঃ সুন্নী ও ওয়াহাবী। ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামিক ফ্রন্ট, জাকের পার্টি, ছাত্রসেনা, তালামীয,তরীকত ফেডারেশন এগুলো সুন্নী ঘড়ানার দল আবার ইসলামী ঐক্যজোটের অঙ্গীভূত দলগুলো, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন এগুলো ওয়াহাবী ঘড়ানার। সুন্নী হোক বা ওয়াহাবী এরা কেউই জামায়াতের সমমনা তো নয়ই বরং আপনার-আমার চেয়েও কট্টর জামায়াতবিরোধী। এই দলগুলোর প্রায় সবাইই জামায়াতের প্রতিষ্টাতা আবুল আলা মওদুদীর ভ্রান্ত আক্বীদা বিশ্বাসের কারণে জামায়াতকে ইসলামী দল মানতে নারাজ। এই সব দলগুলোকে জামায়াতের সাথে একই কাতারে সমমনা বলে দাড় করিয়ে তো জামায়াতকেই শক্তিশালী করা হলো। অথচ জামায়াতকে, এদের ভ্রান্ত নীতিকে(যার মধ্যে স্বাধীনতার বিরোধিতাও একটি) ইসলামের কাঠগড়ায় দাড় করাতে এই দলগুলোর সহযোগিতাই সবচে বেশী প্রয়োজন, কোন সমাজতন্ত্রীর নয়। কোন সমাজতন্ত্রী কিংবা আওয়ামী লীগার জামাতের বিরোধিতা করলে জামাত কৌশলে সেটাকে ইসলাম বিরোধিতায় রূপ দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে নেয়। কিন্তু কোন আলেম যখন জামাতের নীতি-আদর্শের সমালোচনা করে তখন তারা সেটাকে ইসলাম বিরোধিতা বলতে পারেনা, বরং নিজেরাই ইসলামের মূলধারা বিচ্যুত সাব্যস্থ হয়ে পড়ে। তাই জামায়াতের বিরোধিতা করার সুযোগ নিয়ে কেউ যেন ইসলাম বিরোধিতায় লিপ্ত না হন,অন্তত যারা চান জামায়াত উৎখাত হোক। অবশ্য তা হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীন, কেননা বাংলাদেশের ক্ষমতা যাদের চক্রাকার সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে, সেই দু’দল কখনোই চাইবেনা জামাত সমূলে উৎখাত হোক- বিএনপি নিজেদের শক্তি খর্ব হবে বলে আর আওয়ামীলীগ রাজনৈতিক ফায়দা লুটার স্বার্থে। তাই ইসলামী রাজনীতিতে জামায়াতের একঘরে অবস্থানকে পুঁজি করেই জামায়াতকে উৎখাতের ছক সাজাতে হবে। জামায়াত নিজেদের ইসলামী দল বলে সরলপ্রাণ মুসলমানদের ধোঁকা দিচ্ছে, ঠিক ঐ সুতোটাই ছিড়ে দিয়ে প্রমাণ করতে পারলে জামায়াত যা করছে তা ইসলাম সম্মত নয়, ইসলামের স্বার্থে নয় তবেই জামায়াতকে সমূলে উৎখাত করা যাবে (দেখুনঃ ‘জামায়াতের রাজনীতি কী ইসলামের স্বার্থে ?’ http://blog.bdnews24.com/mume06/113520)। অন্য কোনভাবে নয়, ইসলামী রাজনীতির বিরোধিতা করে তো নয়ই। আপনাদের হিন্দু ধর্মে কোন রাজনৈতিক দর্শন না থাকতে পারে, কিন্তু ইসলামের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন আছে। সেটা ভাল লাগা না লাগাটা আপেক্ষিক ব্যাপার। তাই আমি প্রবীর বিধানের প্রস্তাবনাগুলো সম্পর্কে দ্বিমত পোষণ করছিঃ

প্রথমতঃ আইন করে ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে গুড়-মুড়ি দিয়ে মোয়া বানিয়ে জামায়াতের হাতে তুলে দেওয়া হবে। নিষিদ্ধ করে যে জামায়াতের কর্মকান্ড থামানো যাবেনা সেটা রাজনীতি সচেতন মাত্রই জানে। জামায়াত জনগণকে বুঝাতে সক্ষম হবে দেশে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানের দেশে ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ মানে ইসলামী রাজনীতির উপর নিষেধাজ্ঞা। বহুধাবিভক্ত ইসলামী দলগুলো একীভূত হবে। এর সাথে যোগ হবে জনগণের বিরাট অংশ, ধর্মীয় প্রেরণায়। দুর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত সরকারের দমন পীড়নে জনগণের সহানুভূতিও তাদের দিকে ধীরে ধীরে হেলে যাবে। এরপর কি হবে মিশরের দিকে থাকান। ইখওয়ান কে থামাতে কি করেনি হোসনি মোবারক সরকার। এমনকি লম্বা দাড়ি রাখলেও তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে রিমান্ডে। আর আজকে ইখওয়ান ব্রাদারহুড নাম নিয়ে মিশরের ক্ষমতায় আর হোসনি মোবারক কোমায়।

দ্বিতীয়তঃ জামায়াতের রাজনীতিতে পুনঃজন্ম জিয়াউর রহমানের আমলে আর সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংযোজিত হয়েছে এরশাদের আমলে। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দিলে জামায়াতের কিছু আসবে যাবেনা, বরং জনগণের মাঝে প্রপাগান্ডা ছড়ানোর আরেকটি উপলক্ষ পাবে।

তৃতীয়তঃ জামায়াতের নেতাদের বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের সমালোচনায় ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশে একাধিক ভাষায় পুস্তক রচিত হয়েছে। বলাইবাহুল্য তা করেছেন আলেম সমাজই, সরকারী উদ্যোগে এর প্রচারণার ব্যাবস্থা নেয়া যেতে পারে। দেলাওয়ার সাঈদীর ভ্রান্তিকর তাফসীর সম্পর্কে জানতে পড়তে পারেন চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত মাওলানা আব্দুল মান্নান লিখিত “দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ভ্রান্ত তাফসীরের স্বরূপ উন্মোচন”। বইটি আমি স্কানিং সম্পন্ন করেছি, কিছুদিনের মধ্যেই আপলোড করব।

চতুর্থতঃ চট্টগ্রামের বাইতুশ শরফ ও সাতকানিয়ার চুনতি দরবার ব্যাতিত জামায়াতের সাথে অন্য কোন পীরের সংযোগ আছে বলে আমার জানা নেই। জামায়াত বরং পীর-মাশায়েখ বিরোধী অবস্থানই দেখিয়ে এসেছে বারবার। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী চট্টগ্রামে তাফসীর মাহফিলে ইসলামে পীরগিরি জায়েয নেই বলে ঘোষনা দিয়েছেন। অবশ্য তার তাফসীর মাহফিলে সভাপতির আসনে বাইতুশ শরফের পীর থাকেন। কয়েকটি ব্যাতিক্রম ছাড়া পীরদের খানকায়, মসজিদে আধ্যাত্নিকতার, ধর্মীয় রীতিনীতির আলোচনা হয়, সন্ত্রাস বা জামায়াতী করণের নয়।

এসবগুলো প্রস্তাবনাই জামায়াতের শিকড় ছড়াতে সাহায্য করবে, নির্মূলে নয়। আমি বরং ব্লগার পথহারা সৈকতের ‘নিষিদ্ধ জামাত ও আমার প্রতিক্রিয়া’ পোস্টের এ প্রস্তাবনার সাথে একমতঃ
“আসুন আমরা যারা জামাতের নির্মূল চাচ্ছি তারা আদর্শগতভাবে তাদের নির্মূল করি। তাদের আসল চরিত্র জনতার সামনে তুলে ধরি তাদের ভন্ড প্রমাণ করি। তাহলেই জনগন এমনিতেই তাদের ছুড়ে ফেলে দেবে, তার আগে আমাদেরকেও নিজেদেরকে দেশপ্রেমিক প্রমাণ করতে হবে”।