ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

“ জামায়াতের ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের জন্য যদি ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবী উঠে, সর্বহারাদের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের জন্য কেন বাম রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবী উঠবে না”- শিরোনামটি এভাবে দিতে চেয়েছিলাম, লম্বা হয়ে যাচ্ছে বলে বদলে দিলাম।

১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিরোধিতা করে। পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় এরা সর্বশক্তি নিয়োগ করে। পাক হানাদারদের সহায়তায় রাজাকার,আলবদর,আল শামস, শান্তি কমিটি গঠন করে ইতিহাসের ন্যক্কারজনক গণহত্যায় মেতে উঠে। স্বাধীনতার পরেও দীর্ঘ সময় ধরে দেশে-বিদেশে স্বাধীন বাংলাদেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখে। ১৯৭৫ এর কালো অধ্যায়ের পর পরবর্তী ক্ষমতাসীনদের সুবিধা নিয়ে জামায়াত বাংলাদেশের রাজনীতিতে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। তা সত্ত্বেও জামায়াত কখনো বাংলাদেশের ধর্মভীরু বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হয়ে উঠতে পারেনি তাদের ভ্রান্ত আক্বীদা- বিশ্বাস ,৭১ এ বিতর্কিত ভূমিকা এবং ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের কারণে। বলাই বাহুল্য , ১৯৭১ এ জামায়াতের ভূমিকাকে ইসলামের রঙ ছড়ানো নিতান্তই আহম্মকি বা উদ্দেশ্যমূলক। জামায়াত ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করেনা, ভ্রান্ত মওদুদীবাদ প্রতিষ্ঠাই তাদের ধ্যানজ্ঞান। তাই জামায়াতকে টার্গেট করে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধের আবদার হাস্যকর তো বটেই।

১৯৭১ সালে চীনপন্থী কমিউনিস্টরাও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে। কমরেড আব্দুল হকের পূর্ব পাকিস্তানের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি মহান মুক্তিযুদ্ধকে ‘দুই কুকুরের লড়াই’ বলে অভিহিত করে। এরা যে স্বাধীন বাংলাদেশ মেনে নেয়নি তার প্রমাণ এই দলটি ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত নিজেদের নামের সাথে পূর্ব পাকিস্তান লেখা অব্যাহত রাখে। সংশ্লিষ্ট এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের একসাথে পাক হানাদার ও বামপন্থীদের সাথেও যুদ্ধ করতে হয়েছে। স্বাধীনতার পরেও এসব দলগুলো আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। চারু মজুমদারের শ্রেণী শত্রু খতমের বিপ্লবী মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ এই গোপন বামদের মৃগয়াক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের যশোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, খুলনা, রাজবাড়ি এবং রাজশাহীর বিস্তীর্ণ অঞ্চল। একটি পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাম উগ্রপন্থীরা ১৩টি পুলিশ ফাঁড়ি ও ১৮টি বাজার আক্রমণ করে, ১৪০টি অস্ত্র ও ৬৬৮০টি গোলাবারুদ লুঠ করে। হত্যা করে ২৬ জন রাজনৈতিক নেতা কর্মীকে। আরেক রিপোর্টে দেখা যায়, ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারা সিরাজগঞ্জের নিমগাছি পুলিশ ফাঁড়ি, ৮৭ সালের জানুয়ারিতে শেরপুরের চন্দ্রকোণা পুলিশ ক্যাম্প ও মার্চে নাটোরের গুরুদাসপুর থানা, ৮৮ সালের এপ্রিলে ব্রাহ্মনবাড়িয়ার সরাইল পুলিশ ফাঁড়ি ও মে মাসে মাগুরার শ্রীপুর থানা লুঠ করে। কোন কোন থানা দু’বার পর্যন্ত লুঠ করা হয়। স্বাধীনতার পর হতে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত সময়ে শুধু ঝিনাইদহ জেলাতেই সর্বহারাদের হাতে ও এদের অন্তর্দ্বন্দ্বে ৩ হাজার মানুষ খুন হয়। এই সর্বহারাদের রুখতে গত চারদলীয় সরকার জন্ম দিয়েছিল আরেক চরমপন্থি বাংলা ভাইয়ের।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর কে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাসদ ভিন্ন ভিন্ন নামে পালন করে। যদি ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তাহের-ইনু গং জিয়াকে মুক্ত করে না আনতেন তাহলে হয়তো আজ বাংলাদেশের ইতিহাসের অনেকাংশই অন্যভাবে লেখা হত। তাই বাম চরমপন্থীদের রাজনৈতিক গুরুদের মুখে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধের আবদার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ফেনা দেখে আমাদের হাসি পায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংগালীর স্বাধিকার আন্দোলনের মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের রক্ষাও ছিল নাকি?

কট্টর জামায়াত বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও আমি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি, জামায়াত রাজনীতির সুযোগ পাওয়ার পর থেকে হানাহানি, সন্ত্রাস, রগ কাটার প্র্যাকটিস যেমন করেছে তেমনি করেছে অনেক গঠনমূলক কাজও। এরা গড়ে তুলেছে মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক, বীমা, হাসপাতাল সহ অসংখ্য কর্মসংস্থান। আর বামপন্থী দলগুলো দেশকে কি দিয়েছে? হানাহানি, ভেদাভেদি আর ধর্ম বিরোধিতা।

অনেকের মত আমিও মনে করি স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিরোধী জামায়াতীদের এদেশে রাজনীতি করার নৈতিক অধিকার নেই, একই কারণে অধিকার নেই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে কুকুর লড়াই বলা বামদেরও।

জাতি যখন অধীর আগ্রহে ৭১ এর কুলাঙ্গারদের বিচারের রায়ের অপেক্ষায় আছে, তখন বামপন্থীদের ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবীতে হরতাল কি প্রমাণ করে?

আমি আমার পূর্ববর্তী কয়েকটি পোস্টেও আলোকপাত করেছি, জামায়াত মানেই ইসলাম নয়। তাই জামায়াতের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায় ইসলামের উপর চাপিয়ে দিয়ে যারা নিজেদের ধর্মবিরোধী স্বার্থ হাসিল করতে চান তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। কারণ এদেশের বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠী ধর্মভীরু, ধর্ম বিদ্বেষী নয়। এরা জামায়াতকে ইসলাম মনে করেনা বলেই হয় আওয়ামী লীগ নয় বিএনপি ক্ষমতায় যায়, জামায়াতের আসন সংখ্যা থাকে নগণ্য।

তথ্যসূত্রঃ
১. http://www.jessore.info/index.php?option=content&value=520
২. http://www.somewhereinblog.net/blog/nipupowerfulblog/28744562