ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

আসল গানের কথা বোধহয় একটু ভিন্ন। যাহোক, প্রথম লাইনটিকেই যদি ধরি তাহলে সমকালীন একটি নিদারুন সত্য কথা উচ্চারিত হোলো সংসদে জনাব হাজি সেলিমের গানে। মা বাবাদের সাথে রাগ করে বলতে শুনেছি বাড়ী ছেড়ে চলে যাব। এখন শুনছি দেশ ছেড়ে চলে যাব। এটা কি বিশ্বায়নের ফল? এটা কি ভাল লক্ষন, নাকি খারাপ লক্ষন? এটা কি স্বাভাবিক, নাকি অস্বাভাবিক? এটা কি সুখে না দুখে? ভাবনাটা ইদানিং ফিরে ফিরেই আমার মাথায় চলে আসছে।

অভিবাসনের আকর্ষন এবং বিকর্ষনের তত্বগুলো সর্ব কালের জন্যই প্রযোজ্য। আগামিতেও থাকবে। এর মোটা দাগের কারনগুলো সবারই জানা যেমন; অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, বানিজ্যিক, যুদ্ধ, অপরাধ, শাস্তি ইত্যাদি। বর্তমানে যোগ হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারন। কিন্তু সাম্প্রতিক আমাদের দেশের অধিক হারে দেশ ছাড়ার এই প্রবনতা আমি কিভাবে ব্যখ্যা করব, ভালো বোলবো না খারাপ বোলবো, ভেবে পাচ্ছিনা।

দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, সুতরাং অর্থনৈতিক কারন তো বড় হবার কথা নয়। বৈষম্য বেড়েছে, সেটা কি কোনো প্রভাব ফেলছে? দেশে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাহীনতা কি একটি যুক্তি? গরিব যাচ্ছে জীবিকার সন্ধানে আর ধনী যাচ্ছে নিরাপত্তা, আরাম আয়েশের জীবনের জন্য। মেধাবীরা দেশ ছাড়ছে সুযোগের অভাবে। নতুন প্রজন্ম ইন্টারনেটের সুবাদে উন্নত বিশ্বের জীবন যাপনে আকৃষ্ট হচ্ছে। এক কথায় সমাজের সকল শ্রেনীর মানুষের মধ্যেই দেশ ছাড়ার প্রবনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আকর্ষন এবং বিকর্ষন দুটোই অ্ত্যন্ত প্রবল। উচ্চবিত্ত ত প্রায় সবা্রই বিদেশে ঘরবাড়ি আছে। মধ্যবিত্তরা তাদের ছেলে মেয়েদের এমন পড়ালেখা শিখাচ্ছে যাতে সহজেই তারা বিদেশে চলে যেতে পারে। নিম্নবিত্তরাও সর্বস্ব খুইয়ে পাড়ি জমাচ্ছে জীবনটাকে হাতে নিয়ে। বাকি থাকল কারা? দেশ প্রেমিকরা? সুযোগ পেলে তারাও দেশ ছাড়ে।

অনেকে বলেন, এর ফলে ১৬ কোটির দেশে, কিছু লোক ত কমবে। আসলেই কি তাই? কমছে ত সম্ভাবনাময় মেধা, প্রশিক্ষিত দক্ষ যুবক শ্রেনী, সম্ভাবনাময় আগামি নেতৃত্ব। তাহলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে কারা? দুর্নিতিবাজরাও পাড়ি দিচ্ছে দেশটাকে বা্রোটা বাজিয়ে আর দুর্নীতির উর্বর ক্ষেত্র বানিয়ে।

আবার অনেকে বলে থাকেন বিদেশ না গেলে আমরা কি করে প্রবাসীদের পাঠা্নো ডলার পাবো? যারা বিদেশ থেকে টাকা পাঠাচ্ছে তারা কিন্ত কম শিক্ষিত। তাদের পেছনে দেশের তেমন কোনো খরচ হয় নাই। উচ্চ শিক্ষিত যারা যাচ্ছে, তারা কিন্ত দেশে ডলার পাঠাচ্ছে না। সুতরাং তাদের পেছনে খরচ করা সরকারের তথা জনগনের টাকার পুরোটাই লস। কেউ বলবেন তারা ত ফিরে এসে দেশে ভাল চাকরি করছে, দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছে। কিন্তু তারা কতজন?

উন্নত বিশ্ব তাদেরই স্বার্থে অভিবাসনের হাত ছানি দেয় এবং উচ্চ শিক্ষায় সহায়তা করে বিনা পয়সায় মানব সম্পদ আহরনের জন্য। জার্মানি কি মানবিক কারনে আরব অভিবাসীদের ডাকছে? নাকি তাদের অর্থনীতিকে সবল করার জন্য শিক্ষিত, দক্ষ্য, সস্তা শ্রমিক আহরন করছে। ইদানিং ইওরোপের অন্যান্য দেশ ও অভিবাসীদের গ্রহন করছে। জার্মানী কেবল প্রথম বরফটা (Ice-breaking) গলিয়েছে।

ভালো ভাবে পর্যবেক্ষন করলে দেখা যাবে আমাদের দেশের মেধা বিদেশে চলে যাবার ফলে (Brain drain) আমাদের কি সুদুর প্রসারি ক্ষতি হয়েছে এবং হচ্ছে। বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পর্যায়ের লোকবলের এবং ব্যবস্থাপনার গুনগত মান যাচাই করলে তা ফুটে ওঠে। শিক্ষা বা মেধার কমতি হলে মুল্যবোধের অবক্ষয় নিশ্চিত। তার ফলাফল দুর্নীতি, অকার্যকারিতা এবং অব্যবস্থার প্রসার।

যাহোক, ফেস বুকের সুবাদে আমার এবং আমার স্ত্রীর আত্মীয়স্বজন ছাড়াও একসময়ের অতি কাছের এবং বর্তমানে স্থায়ীভাবে প্রবাসী লোকজনের ঘরবাড়ী, বাগান, খাবারদাবার ইত্যাদির আপুর্ব সব ছবি, গল্প প্রতিদিন যেভাবে দেখি, তাতে সত্যিকার অর্থেই লোভ হয়।

তাই ভেবে পাচ্ছিনা দেশ ছাড়াটাকে ভাল বোলবো না খারাপ বলবো? আশির দশকে বিলেত থেকে সল্পকালীন পড়াশুনা করে দেশে ফিরে আসার পর বন্ধুরা বলেছিলো “তুই একটা গাধা, থেকে যেতে পারলিনা”? তারপরেও সুযোগ থাকা সত্তেও বিদেশে থাকার কথা ভাবি নাই। বিশ্বাস করেছিলাম দেশ আমাকে এত দিয়েছে আমাকে তো তার প্রতিদান দিতে হবে। কিন্তু এখন আমার ছেলে, যাকে পড়া লেখা শিখিয়ে মানুষ করেছি সে প্রতিনি্যত দোষ দিচ্ছে কেন আমরা বিদেশ গিয়ে জীবনটাকে বানিয়ে নেই নাই। তাহলে বিদেশ যাবার চেষ্টায় তাকে এখন এত কষ্ট করতে হত না। সে ঠিক করে ফেলেছে বিদেশ সে যাবেই যেভাবেই হোক। আমিও আগে তাকে দেশের কথা ভাবতে বলতাম, এখন আর বলিনা। ভাবছি, সাংসদের এই গান তার প্রেরনা হয়ে থাকুক। “থাকবনা আর এ দেশে/ চলেযাব অন্য দেশে..”