ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

কিছুদিন আগে এই ব্লগেই একটা পোস্ট পড়েছিলাম যার শি্রোনাম ছিল “এখন আমি কী করব”? দেশের বর্তমান দ্রব্যমুল্য, জীবন যাত্রার ব্যয় এবং সরকারী চাকুরেদের বেতন বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে একজন বেসরকারী চাকুরি জীবির অসহায়ত্বের বাস্তব কিছূ চিত্র তূলে ধরা হয়েছিল সেই পোস্টে। টক-শোতেও দেখলাম একই বিষয়ে কথা, কেউ পক্ষে বলছেন, আবার কেউ বলছেন সরকারী চাকুরেদের বেতন বৃদ্ধিতে বেসরকারী চাকুরেদের জীবনে তেমন কোনো প্রভাব ফেলবেনা। তারপর, সরকারী,বেসরকারী বিশ্ব বিদ্যালয় নিয়ে কতকিছুই না হয়ে গেল।

আসলে সবখানেই একটা বিভাজন সৃস্টির প্রক্রিয়া চলছে। ব্রিটিশরা এই ফর্মূলা কাজে লাগিয়েছে শাসন এবং শোষন কে পাকাপোক্ত করার জন্য। আমাদের দেশের শাসন ব্যবস্থাও একই ফর্মূলা প্রয়োগ করছে বলে মনে হয়। দেশের নিতীনির্ধকেরা এখনো ঔপনিবেসিক মানসিকতা থেকে মুক্ত হয় নাই। বঙ্গবনধু আমলাতন্ত্রকে মনে প্রানে ঘৃনা করতেন। তিনি বেঁচে থাকলে হয়ত অবস্থা অন্যরকম হতো। যাহোক, অপরদিকে মুক্ত-বাজার পদ্ধতি “বাই ডিফল্ট” সমাজে বিভাজন সৃস্টি করে। আসল কথা হলো বিভাজন কখনো সমাজে ভাল ফল বয়ে আনেনা। বৈষম্য যত বাড়ে বিভাজনটা ততই স্পষ্ট হতে থাকে। দেশকে এগিয়ে নিতে যখন দরকার একতা তখন এই বিভাজন কোনো ভাবেই কাম্য হতে পারেনা।

ফিরে আসি বেসরকারি চাকুরেদের কথায়। সরকারি চাকুরেরা ধরেই নেয় বেসরকারি চাকুরেরা তাদের চেয়ে অনেক বেশি বেতন পায় এবং ভাল আছে। নীতিনির্ধারক আমলাদের মাথাতে এটাই কা্জ করে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিল্প কারখানা এবং শত শত এন জি ওর অসংখ্য কর্মী যারা সংখ্যায় ২১ লাখের চেয়ে অনেক বেশী, তারা কত বেতন পায়? এদের উচ্চ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা ছাড়া বাকি সব কর্মচারিদের বেতন কিন্ত বেশী নয়। তাছাড়া বিদায়ের সময় বেশীরভাগকে খালি হাতে বের হতে হয়। অবসরে যাবার সময় হাতে বড়জোর কয়েক মাসের বেতন আর কিছু সঞ্চয়। অনিশ্চিত একটা ভবিষ্যতকে সামনে রেখে লক্ষ লক্ষ বেসরকারী চাকুরেরা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অনন্য ভুমিকা রেখে চলেছে।

এই বিরাট সংখ্যার বেসরকারি চাকুরেদের অবসরে যাওয়ার পর কোন সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা নাই। একজন এনজিও কর্মী বা গার্মেন্টস শ্রমিক তার চাকুরি শেষ করে যখন অবসরে যাবেন তখন তিনি হাতে কি পাবেন? অনেক দেশেই আছে, এমনকি আফ্রিকার অনুন্নত দেশেও সরকারী বা বেসরকারী সংস্থা যদি কাউকে ছাটাই করে বা অবসরে যায়, তার জন্য সংস্থাকে পেনসান/ভাতা বাবদ অনেক টাকা গুনতে হয়। আমাদের দেশের সরকার কি পারেনা? টাকা তো সরকারী কোষাগার থেকে যাবে না কিংবা উদ্দোক্তাদের পকেট থেকেও না। যাবে তো কর্মচারিদের বেতনের অংশ থেকেই। শুধু প্রয়জন বেসরকারী সংস্থা/প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনের মাধ্যমে বাধ্য করে বেতন কাঠামোতে সামাজিক নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করা্নো। কিনতু কথা হচ্ছে আমলারা এর উদ্দগ নিচ্ছে না, কারনটা আগেই বলেছি। অথচ সামাজিক সুরক্ষার সরকারী বাজেটের সবচে বড় খাত, ২৪%, (প্রায় এক চতুর্থাংশ) ৪ লাখ সরকারী চাকুরেদের পেনশানে ব্যয় হয়। এই টাকাতো জনগনের টাকা যেখানে বেসরকারী চাকুরেদেরও অংশ আছে।

ক্ষমতা, কাজের ধরন, কাজের নিরাপত্তা, আউটপুট, সুযোগ সুবিধা, সামাজিক সুরক্ষা, ইত্যাদি বিবেচনা করলে সরকারি চাকুরেরা বেসরকারি চাকুরেদের চেয়ে অনেক ভাল আছেন। তুলনা করতে গেলে অনেক অপ্রিয় কথার অবতারনা হতে পারে তাই এড়িয়ে গেলাম। বেসরকারী সংস্থাগুলো (সেবা, বানিজ্যিক, এন, জি, ও, ইত্যাদি) যত কম বেতন দিয়ে পারে তারা তার চেষ্টাই করে। তাছাড়া বেসরকারী চাকুরেদের বেতন ছাড়া অন্য কোনো প্রকার সুযোগ সুবিধা নেই বললেই চলে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সাথে সাথে বেসরকারী বানিজ্যিক সংস্থাগুলোতে আগামীতে অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তাদের দিকটি বিবেচনা করে সরকারকে মালিকদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে যাতে তাদের বেতন কাঠামোতে সামাজিক নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

দেশের উন্নয়নের সাথে সাথে এনজিওদের প্রয়োজনীয়তার ধরন পালটাচ্ছে। তাই সময়ের সাথে সাথে তাদের ভূমিকার পরিবর্তন না করলে টিকে থাকা কঠিন হবে। ব্রাকের স্যার আবেদ অনেক দিন আগে এক কর্মী সম্মেলনে, কর্মীদের চাকুরির নিরাপত্তা বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, “তোমরা চাকুরির নিরাপত্তা চাও? আমিতো মনে করি আগামি ১০/১৫ বছর পর ব্রাকের মত সংস্থার প্রয়োজন এদেশে থাকবেনা”। ১৫ বছর নয় লেগেছে ৩০ বছর। দেশ এখন এক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ারে। চরম দারিদ্র আগের মত আর নেই। তাই এন জি ও উন্নয়ন কর্মীদের চাকুরি দিন দিন কমে আসবে, যদি তারা তাদের ভুমিকা না পালটায়। ব্রাক সাংগঠনিক ভাবে ব্যবসার লাইনে গিয়েছে, এবং আগের চেয়ে অনেক বেশী কর্মের সংস্থান করছে। দেশের আরো অগনিত এন জি ও কর্মিরা এখন যদি নিজেদের চেষ্টাতে ছোটো, মাঝারি শিল্প, খামার ই্ত্যাদি অর্থাৎ ব্যবসায় নামতে পারে, তাহলে এই সমস্যা থেকে তারা বের হয়ে আসতে পারবে। এন জি ও দের ক্ষুদ্র ঋন কার্যক্রম এখন ছোটো, মাঝারি শিল্প উদ্দোক্তাদের টার্গেট করতে পারে। বেসরকারী চাকুরেরা চাকুরির জন্য না ঘুরে চাকুরি সৃস্টির প্রয়াশ নিলে অনেক নতুন কর্মের সংস্থান হবে।

এভাবে গড়ে ওঠা শিল্প/ব্যবসার মালিকরা তাদের কর্মীদের ন্যয্য পাওনা দিবে কারন তারা ভুক্তভোগি। লুটপাট আর বাটপারির মাধ্যমে হালে ধনী মালিকদের মত তারা অমানবিক হবেনা। নতুন প্রজন্মকে বুঝতে হবে বিভাজন কখনো নিজের এবং দেশের উন্নয়ন আনে না। এখন দরকার সমাজের সর্ব ক্ষেত্রে ঐক্যের সুর, বিভাজনের নয়।