ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

একটি সম্পূর্ণ নতুন সমাজে মানুষ হিসেবে নিজেদের সুপ্ত প্রতিভা স্ফুরনের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে নিজেদের মানসিক,দৈহিক ও আত্মিক বিকাশে সফল হবেন – এমন দৃঢ় বিশ্বাসে অবতীর্ণ হয়ে ১৬২০ খৃষ্টাব্দে একদল নারী পূরুষ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কারনে জন্মভূমি ইংল্যান্ড থেকে বিতাড়িত হয়ে মে ফ্লাওয়ার জাহাজে করে আমেরিকার ম্যাসাচুয়েটসে এসে উপনীত হন এবং প্লীমাউথ উপনিবেশ গড়ে তোলেন । আত্ম – নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সাহায্যনির্ভর সম্পর্ক ও সকলের কল্যাণের জন্য সাধারন উদ্বেগই ছিলো প্লীমাউথ উপনিবেশ গড়ে তোলার প্রাথমিক মূলনীতি । নতুন সমাজ ও ভূমিতে একসঙ্গে বসবাস ও কাজ করতে করতে অভিযাত্রীদের মধ্যে এক দৃঢ় বন্ধন গড়ে উঠে । এর ফলে তারা দূঃসহ কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করে । এই অনুভূতিরই আরেক নাম হচ্ছে ‘সম্প্রদায়গত অথবা জাতিগত একাত্মতাবোধ’। প্লীমাউথ উপনিবেশ সফল করে তোলতে পারার পেছনে কাজ করেছে অভিযাত্রীগণের পারস্পরিক একাত্মতাবোধের যৌথ অঙ্গীকার । আমেরিকার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ আমেরিকার এই প্রথম সম্প্রদায়ের পারস্পরিক একাত্মতাবোধের সফল প্রয়াস প্লীমাউথ উপনিবেশসহ যে সমস্ত ঐতিহাসিক ঘটনা আমেরিকাবাসীদের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে তার প্রতিফলন আমেরিকার প্রত্যেকটি সম্প্রদায়ের লোকের দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যে পাওয়া যায় । নিজেদের মধ্যে পরস্পরের পারস্পরিক একাত্মতাবোধ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে অব্যাহতভাবে ধরে রাখতে পেরেছে বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী ও সফল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব কতৃপক্ষের আসনে নিজেকে উন্নীত করতে পেরেছে।

প্লীমাউথিয়ানদের মতো পারস্পরিক একাত্মতাবোধের সফল প্রয়াস একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাদের সামনে দেশ ও জাতি গঠনের অন্যতম একটি আলোকবর্তিকার মতো ছিলো । কিন্তু অব্যাহতভাবে আমরা তা ধরে রাখতে পারিনি । কারন আমাদের চেতনার মধ্যে একাত্তরের পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির নিরবচ্ছিন্ন ঘুন পোকাটিও ছিলো । ফলে প্রগতিশীলতায় আমরা ভাত খেয়েছি তো প্রতিক্রিয়াশীলতায় ফেলেছি প্রতিবেশীসূলভ কুলি । ভাইয়ের আশ্রয়ে থেকে শালাকে প্রশ্রয় দিতে গিয়ে আমরা হতে পারিনি কারো ভাই , হতে পারিনি কারো দুলাভাইও । ফলাফল হিসেবে মীরজাফরী’র সাজা ভোগ করেছি আমরা উভয় পক্ষ থেকেই । চল্লিশ বছরেও ঐক্যবদ্ধ আঙ্গিকে জনগণ হয়ে উঠতে পারিনি বাংলাদেশের । প্রত্যেকেই যে যার মতো বিচ্ছিন্নতাবোধে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন স্তরে অবস্থান করেছি ।

অথচ তথাকথিত গণতন্ত্র আছে । ভোটও দিচ্ছি । শাসক নির্বাচিত করছি । বাহ্যিক কোনো ঔপনিবেশিক অবস্থাও বিরাজিত নেই । তথাপি স্বদেশী ধনিকশ্রেণী (Elite) কর্তৃক জনসাধারনের শোষণ অপ্রতিহত গতিতেই চলছে । ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গ (Power Elite) এবং জনসাধারনের মধ্যে কর্তৃত্ব-নির্ভরশীলতা ( Dominance-Dependance) ও রক্ষক-পোষ্যের (Patron-Client) সম্পর্ক । জনগণের কি প্রয়োজন এবং সেসব কিভাবে মেটানো সম্ভব , সে সম্পর্কে সব ধরনের সিদ্ধান্ত নেয় ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গ । অর্থাৎ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ , প্রশাসক , জমিজমা ও অগাধ ধনসম্পদের মালিক পেশাজীবি ও ব্যবসায়িক সংগঠনগুলি । এসব সিদ্ধান্ত ও এগুলির বাস্তবায়ন যাদের জীবনকে সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত করে সেইসব সাধারন জনগণ কেনোক্রমেই ঐ প্রক্রিয়ার সাথে সার্থকভাবে সংশ্লিষ্ট হতে পারে না ( ভোট পাওয়া হয়ে গেলে ক্ষমতাসীনরা হয়ে যায় জনবিচ্ছিন্ন আর বিরোধীরা হয়ে যায় সরকারবিচ্ছিন্ন , সংসদে যায় না)। বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি ও রাজনীতিতে সমাজের উঁচুশ্রেণী ও জনগণের ভেতর কর্তৃত্ব-নির্ভরশীলতার সম্পর্ক বিরাজমান থাকায় স্বাভাবিকভাবেই উন্নয়ন পরিকল্পনাসমূহ ‘উপর থেকে নীচে’ এ চিরায়ত কাঠামোতেই সংগঠিত হয়ে থাকে । বাংলাদেশের উন্নয়ন তহবিলের অন্যতম প্রধান উৎসটি এখনো পর্যন্ত বৈদেশিক সাহায্য নির্ভর বিধায় বৈদেশিক সাহায্যের পরিমান বৃদ্ধি পেলেও তা শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট শাসকশ্রেণীর পকেটভারী তথা ক্ষমতা সংরক্ষণকেই সহায়তা করছে । এবং শাসকশ্রেণীর ক্ষমতা সংরক্ষণের পোলাও’র তেজপাতা হিসেবে বছরের পর বছর ধরে বৈদেশিক ঋণ-সেবার (Debt servicing) দূঃসহ ও অন্যায্য বোঝা বয়ে যেতে হচ্ছে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ও নিরপরাধ(!) জনগোষ্ঠীকে ।
এতো কিছুর পর পোলাও’র তেজপাতার মীরজাফরী’র সাজা ভোগ যথেষ্টই হয়ে গেছে বলে মনে করা উচিৎ বাংলাদেশের জনগণের । এবার ঘুরে দাঁড়ানোর পালা ।

আসুন ,পারস্পরিক একাত্মতাবোধের সফল প্রয়াস একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অভিঘাতে একেক অট্টালিকার চড়াই পাখির পরাধীন জীবনযাপন ছেড়ে নিজের কুঁড়েঘরে বাবুই পাখির স্বাধীন ও মুক্ত জীবনযাপনে ফিরে এসে আম জনতার চরিত্র ধারন করি আবার । রাজনীতি শিখিয়ে ছাড়ি রাজনীতিকদের । আমরা কারো আরোপিত গণতন্ত্রের খড়কুটো না । ইচ্ছে হলো কেউ চালায় দিলো , ইচ্ছে হলোনা পুড়িয়ে ফেললো শীতের রাতে ।

গণতন্ত্রে বিকোতেই যদি হবে , মদ বেঁচে দুধ না খেয়ে, দুধ বেঁচে মদ খাওয়ার নৈতিকতা নিয়েই বিকাবো ।