ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

 

একটা খেজুর পাতার চাটাইয়ের উপর শুইয়ে রাখা হয়েছে আবুর বউয়ের মৃতদেহ। পাড়া প্রতিবেশী, আত্নীয় স্বজনে গম গম করছে বাড়ীর উঠোন। লাশ ঘিরে বিভিন্ন ঘটনা আউড়াতে আউড়াতে বিলাপ করে কাঁদছে পাঁচ ছয়টা ছেলের বউ, ১০/১২ জন নাতি নাতনি আর আবুর বউয়ের মেয়ে তিনটা। কারো চোখে এক ফোঁটা পানির অস্তিত্ব নেই। কারো কান্না যে এতা মেকী হতে পারে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রথম দেখলাম আমি। লেস বালি নাকি বলে-এক কানে তিনটা করে পরস্পর সোনার দুল। আবুর বউয়ের কানে ছয়টা সোনার লেস বালি নেতিয়ে পড়ে আছে বালিশের উপর। লাশ গোসল দেয়ার সময় খুলে ফেলা হবে লেসবালিগুলি।

বিলাপ করতে করতে ছোটো মেয়েটিকে কোলে নিয়ে আবুর বড় ছেলের বউ বলছে, আমার শ্বাশুড়িতো মইরা গেছেগা, এখন ফুনি ইলায় বেলে কইয়া গেছে আমার নন্দেরে সোনার লেসবালিগুলি দিয়া দিতাম।

পাশেই আবুর বউয়ের ছোটো মেয়ে খুকী কাঁদতে কাঁদতে বলছে, আমার মায় কইয়া যাইবো কি ? জিনিসতো আমিঐ বানাইয়া দিছি, জিনিসতো আমারঐ ।

আরো কয়েকজন উত্তর প্রতিউত্তরের ঢংয়ে লেসবালিগুলির প্রসঙ্গ নিয়েই পরস্পর কথা বলতে বলতে বিলাপ করছে।
একেকজন একেক যুক্তিতে দখল করতে চাইছে লেসবালিগুলি।

অথচ ছেলে, ছেলের বউ, মেয়েরা- কেউই খবর নেয়নি আবু আর আবুর বউয়ের। সংসার জুড়ে জমিজমা বেঁচে ছেলেদের বিদেশ পাঠিয়ে,মেয়েদের বিয়ে দিয়ে নিজেরা নিঃস্ব হয়ে গেলেও ছেলে মেয়েরা ঠিকই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু কেউ ফিরে তাকায় নি মা বাপের দিকে। স্বামী স্ত্রীতে বাড়ীর হাইছে(পাগাড়ে) ছোট্ট একটি ঘরে নিতান্ত অসহায় এবং একাকী দিনাতিপাত করতে করতে অসুস্থ স্বামীর পাশে সন্ধ্যারাতেই মরে পড়ে ছিলো আবুর বউ। সকালে গিয়ে সবাই জানতে পারে মৃত্যূর কথা।

মাটিতে বসলে পিঁপড়ায় কামড়াবে, পানিতে ভিজলে জ্বরে মরবে-নিজে খেয়ে না খেয়ে পরম যত্নে ও মমতায় যে সন্তানদের পৃথিবীর বুকে আবাদ করে দেয়ার নিরন্তর সংগ্রামে রত ছিলো তাজুর মা(আবুর বউ), নিঃশ্বাস ত্যাগের প্রাক্কালে নির্ঘাত এক ফোঁটা পানির অনাবাদে তার বুকটা ফেটে গেছিলো কিনা কে জানে ?

এইমাত্র মাটি দিয়ে এসে তাজুর মাকে ব্লগটা লিখলাম।

ঈদের বাড়ীযাপন শেষে একটু পরেই ঢাকা ফিরবো।

বউকে আগেও বলেছি। আজকে আবার নতুন করে বললাম, যে গাছের কলা তুমি খাচ্ছ, সে গাছ লাগিয়েছে যারা, আমি আজীবন গোলাম তাদের। দুই দিনের ফকিন্নী তুমি। ভাতেরে অন্ন বলা আমাকে কখনোই শেখাতে চেয়োনা বন্ধু।