ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

ঢাকায় বসে যাঁরা নেতা-নেত্রী হয়েছেন, তাঁরা ছাড়া মাঠপর্যায়ের সদস্যদের আগে তেমন কোনো মূল্যায়ন ছিল না। গত সংসদ নির্বাচনে তৃণমূল পর্যায়ে প্রার্থী মনোনয়নের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ মাঠপর্যায়ে নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন করেছে। এতে দলের গণতান্ত্রিক ভিত্তি শক্তিশালী হয়েছে।যাঁরা প্রভাবশালী এবং অঢেল অর্থের মালিক, তাঁরা এলাকায় না এসেও অর্থের জোরে সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন লাভ করেছেন। পৃথিবীর কোনো দেশেই অর্থের বিনিময়ে মনোনয়ন বা নেতা নির্বাচন করা হয় না। একমাত্র বাংলাদেশেই এটা সম্ভব হয়। আওয়ামী লীগের প্রত্যেক সদস্যকে সদস্যপদ নবায়ন করতে হবে। কোনো কর্মী বা নেতা সদস্যপদ নবায়ন না করলে স্থানীয় যেকোনো পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি ও নেতা নির্বাচনে তাঁর ভোটাধিকার থাকবে না। সদস্যপদ নবায়ন বাধ্যতামূলক।

বুধবার দিন (২২/১১/১১)কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলা মিলনায়তনে আওয়ামী লীগের সদস্য সংগ্রহ কর্মসূচিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপরের কথাগুলি বলেন আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।

কথাগুলি নতুন না হলেও আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদকের মুখ থেকে শোনার কারনে কথাগুলি আমার কাছে নতুন মনে হচ্ছে । বাংলাদেশের বেশীরভাগ রাজনীতিকদের কথা শুনতেই আমার ভাল্লাগেনা । কিন্তু সৈয়দ আশরাফের এই কথাগুলি আমার ভালো লেগেছে । বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাহ্যিক কোনো গুনগত পরিবর্তন সম্ভব না হওয়ার অন্যতম প্রধান যে কয়টি উপাদান প্রভাবক বিষের কাজ করছে , অর্থের বিনিময়ে মনোনয়ন বা নেতা নির্বাচন তার মধ্যে অন্যতম একটি। ’৭৫ পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে মনোনয়ন বা নেতা নির্বাচনের কাজটি শুরু হয়। এরপর থেকে যারাই ক্ষমতায় এসেছে সকলেই এই অপকর্মটির নিরবচ্ছিন্ন চর্চা করে রাজনীতির স্বাভাবিক বিকাশের পথটিকে চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়েছে। ফলে গ্রামে গঞ্জে শহরে বন্দরে সর্বত্র তৈরী হয়ে আসার চেয়ে ’রেডী-মেড’ নেতা বনে যাওয়ার ঝোঁক তৈরী হয়ে গেলো সবার মধ্যে।

কয়েকজন মানুষ মিলে একটি ঘর, কয়েকটি ঘর মিলে একটি বাড়ি,কয়েকটি বাড়ি মিলে একটি পাড়া,কয়েকটি পাড়া মিলে একটি গ্রাম,কয়েকটি গ্রাম মিলে একটি ইউনিয়ন,কয়েকটি ইউনিয়ন মিলে একটি থানা, তারপর জেলা,বিভাগ,দেশ-এ সবের ভেতর দিয়ে কষ্টসাধ্য নিরবচ্ছিন্ন পথ চলতে চলতে বিকশিত হওয়ার কথা ছিলো যে স্তরভিত্তিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের তা আর হয়ে উঠা হলোনা কারোই। লাভ কী ? মাথার উপর উড়ে এসে জুড়েই বসে যাবে যদি অর্থলগ্নীকারী বসন্তের কোকিল ! তারচে বসন্তের কোকিলদের তুষ্ট করে টেন্ডার তদবির ও দূর্নীতির মাধ্যমে কামানেওয়ালা বনে যেতে পারলেই বরং অনায়াস নেতৃত্ব যেচে চলে আসে হাতের মুঠোয় ! হলোও তাই। কেন্দ্রীয়ভাবে অবমূল্যায়িত পরীক্ষিত, কর্মঠ ও পরিচ্ছন্ন নেতাকর্মীরা হয় স্বেচ্ছায়, না হয় অভিমানে, ক্ষেত্রবিশেষে বাধ্য হয়ে ক্রমে ক্রমে নিস্ক্রিয় হয়ে গেলে রাজনীতির সামনের সারিতে এসে প্রতিষ্ঠিত হওয়া শুরু করলো ষন্ডাগুন্ডা, কালো টাকার মালিক ও অসৎ ব্যাবসায়ীদের মতো জনসম্পৃক্ততাহীন ’রেডী-মেড’ নেতৃবৃন্দ।

অর্থের বিনিময়ে মনোনয়ন বা নেতা নির্বাচনের মাধ্যমে যে অপকর্মটি কেন্দ্রীয়ভাবে করা হলো , তাদের নব্য দোসররা সেই একই অপকর্মটি করতে শুরু করলো তৃণমূল পর্যায়ে এসে। রাজনীতির নামে সর্বত্র আদতে যা হতে লাগলো, জনগণের কোনো সম্পৃক্ততাই রইলোনা এসবের সাথে । জনগণ হয়ে উঠলো বরং নব্য উপনিবেশবাদের জমিদার নিয়ন্ত্রিত সামন্ততান্ত্রিক প্রজা। রাজনীতি বলে যেমন কিছু নেই , গণতন্ত্র বলেও কিছু নেই। সংসদ এমপি মন্ত্রী যা আছে সবটাই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত রাজণ্যবর্গের পছন্দমতো জমিদার সিলেকশন। চাপিয়ে দেয়া সুপরিকল্পিত সিলেকশনকে নির্বাচিত করার মধ্যে দিয়েই কেবল আমরা তথাকথিত গণতন্ত্র চর্চার আস্বাদ নিচ্ছি। রাজণ্যবর্গের এইসব তথাকথিত সিলেকশনকে প্রত্যাখান করতে পারার সুযোগ আসলে আমরা তা প্রত্যাখান করি বটে (নাসিক নির্বাচন সাম্প্রতিক উদাহরন) , তদুপরি রাজনীতিতে গুনগত পরিবর্তন সম্ভব হচ্ছেনা । তারপরও কেনো ? সে কথা আরেকদিন বলবো। তবে সৈয়দ আশরাফকে ধন্যবাদ জনগণের মনের কথাটি নিজের মধ্যে ধারন করে অকপটে তা বলার জন্য।

মধ্যবাড্ডা , ঢাকা