ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

প্রথমে গুম (Disappearance) অতঃপর হত্যা ( Secret killings)। চোখের পলকে মানুষের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনাটির একটি নিরুদ্বিগ্ন বাজারে পরিণত করে ফেলা হলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে । সাদা পোশাকধারী একদল সংঘবদ্ধ লোক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাম করে (!) জলজ্যান্ত মানুষজনকে ধরে নিয়ে গিয়ে গুম করে ফেলছে । কারো লাশ মিলছে , কেউ কেউ নিখোঁজই থাকছেন ।

তবে লাশ মিলে যাওয়াটা নিছক একটা দূর্ঘটনা । সকলের অজ্ঞাতে লাশ পঞ্চভূতে বিলীন করে দিয়ে (গুপ্তহত্যার মাধ্যমে) হতভাগ্য ব্যক্তিটির সম্পর্কে তাঁর স্বজনদের কোনো সিদ্ধান্তে আসতে না পারার ’নিখোঁজ অবস্থা জিইয়ে রাখা’র কৌশলটি হচ্ছে আধুনিক গুম প্রবৃত্তির স্বাভাবিক প্রবণতা । এতে সাপও মরে লাঠিও ভাঙ্গে না । আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নামটুকু বেচা (!) ছাড়া গুমকারী অথবা খুনী যেহেতু অজ্ঞাত , নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজনেরা বড়জোর কাউকে সন্দেহ করতে পারবে , কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আনতে পারবে না । আবার এক ঢিলে দু’পাখিও মরে । মানবাধিকার লঙ্ঘন জাতীয় উপসর্গের বদহজমজনিত ফৌজদারী শংকা ছাড়াই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্ঘুম সুইজিন (Cuisine) নির্বিঘ্নে উপভোগ করতে পারে সুনির্দিষ্ট মিশন নিয়ে কাজটি করে অথবা করায় যারা ।

পরিকল্পনা , বাস্তবায়ন এবং ফলাফল লাভে more convenient বিধায় ঘাতকদের কাছে ক্রমেই জন(!)প্রিয় হয়ে উঠবে গুম , গুপ্তহত্যা । এবং ক্রমান্বয়ে হয়ে উঠছেও তা । বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড ( extra judiciary killings ) সংঘটিত করার এই ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ জাতীয় অস্রটির কাছে অচিরেই বাজার হারাতে বাধ্য হবে ক্রসফায়ারও । নীচের ফাইলদুটিতে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার এর

পরিসংখ্যান দু’টি দেখুনঃ
Crossfire.pdf
Disappearence.pdf

২০০৪ থেকে ২০১১ এর দিকে যেতে ক্রসফায়ারের সংখ্যা কমে এলেও ২০০৭ থেকে ২০১১ এর দিকে আসতে গুমের (Disappereance) সংখ্যা বেড়ে গেছে । কারন একটাই , ফলাফল লাভের (!) চেয়ে ক্রসফায়ার প্রক্রিয়ায় হাউ কাউ বেশী । চিহ্নিত হয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে হামলা , মামলা , তদন্তের ভয় ছাড়াও দেশী বিদেশী সমালোচনাসহ মানবাধিকার কর্মীদের চিল্লাচিল্লির মতো রয়েছে হরেক রকমের হ্যাঁপা । বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডে প্রবৃত্ত হওয়ার কালেই বোঝা গিয়েছিলো কালের বিবর্তনের ধারায় প্রক্রিয়াটি অব্যাহত রাখতে হলে নিজের মুখ রক্ষার তাগিদেই অসভ্য ক্রসফায়ার ছেড়ে ক্রমে ক্রমে তাকে একটি সভ্য চেহারা ধারন করতে হবে । গুম হচ্ছে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের সেই আপাতঃ সভ্য (!) চেহারা-যার নিরবচ্ছিন্ন চর্চা রাতের ঘুম কেড়ে নিতে শুরু করেছে তাঁর অন্তর্গত জনগণের । কারন অন্ধকার ঘরে সর্বত্রই সাপ সাপ পরিস্থিতি । কার স্বার্থের আগুনে কাকে যে কখন জলাঞ্জলি দিয়ে ফেলা হবে সে খবর কেউ জানে না ।

এখানে ওখানে কুকুর শেয়ালের মতো যেনতেনভাবে মেরে ফেলে রাখা কোনো একটি লাশের খোঁজ মিললেই হাজার মানুষের স্রোত ছুটে যাচ্ছে নিজেদের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মানুষটিকে খুঁজে পাবার আশায় । সর্বশেষ মুন্সীগঞ্জ থেকে উদ্ধার হওয়া দুটি লাশের একটি গত ২৮ নভেম্বর রাজধানীর হাতিরপুল থেকে নিখোঁজ হওয়া তিন যুবকের একজন ইসমাইল হোসেনের বলে শনাক্ত করেছেন তাঁর স্বজনেরা । এমনি করে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে উদ্ধার হচ্ছেই লাশ । রাষ্ট্র এবং তাঁর আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলি বলছে চলমান গুম এবং গুপ্তহত্যার ঘটনাগুলোয় তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই । তবে কি রাষ্ট্রের বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে এবং সুযোগ নিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের মিশনে মাঠে নেমে পড়েছে সংশ্লিষ্ট অসংশ্লিষ্ট অন্য আরো অনেকেই ? পরিস্থিতি যদি এমনই হয়ে থাকে তাহলে একটি ঘটনারও মূলোৎপাটন সম্ভব হবে না । এবং সেটা হবে আরো বেশী উদ্বেগজনক এবং নৈরাজ্যকর ।

বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড থেকে বেরিয়ে এসে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রত্যাবর্তন না করলে অচিরেই একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিনত হতে বাধ্য হবে বাংলাদেশ । সে পদধ্বনিই শোনা যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে । ভাগ্যাকাশে কোনো না কোনো একটা দূর্গতি অথবা যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান থাকাই কি তবে বাঙ্গালি জীবনের নিয়তি ! আল্লাহ্ মালুম ।