ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

Book-Fair

বাথরুমে বসে নিবিষ্ট মনে বই পড়ছি, আম্মা একটু পরপর এসে তারাতাড়ি ফেরার জন্য তাড়া দিচ্ছেন। পড়ার টেবিলে পাঠ্যবই উল্টানো আছে। বর্তমান তরুণদের কাছে বিস্ময়কর মনে হতে পারে আমাদের সময়ের বই পড়ার এই অদ্ভুত ব্যবস্থা। কখনো খড়ের গাদায় বসে, ছাদের কোণে গাছের আড়ালে বা সবাই ঘুমিয়ে গেলে গভীর রাত্রিতে বই পড়া ছিল নিত্য অভ্যাস। আসলে বইপোকাদের জন্য পাঠের কোন বাঁধাধরা নিয়ম ছিলনা, আর বিনোদনের মাধ্যম তখন টুকটাক দেশী খেলা আর একমাত্র অবলম্বন ছিল বই।

বাবা-মা , লজিং মাস্টার তীক্ষ্ণ নজর রাখতেন ছেলে মেয়েদের উপর যাতে তারা আউট বই পড়ার সুযোগ না পায়। এর ফাঁকফোকর এড়িয়ে যারা দু’একটা বই পড়তো সমাজ তাদের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিত। সেটা যে নেগেটিভ হতো তা সহজেই অনুমেয়। এতোগুলো চোখের দৃষ্টি এড়িয়ে বইপড়াটা একটু কঠিন ছিল বৈকি! এখনকার মত বই সংগ্রহ করাটাও সহজ ছিলনা। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে শহরের লাইব্রেরীতে একটু বড় কাউকে গোপনে পাঠিয়ে হাতে বই পাওয়া যেতো। কারো কাছ থেকে ধারে এনে গোপনে পড়ে ফেরৎ দেয়াটাও কঠিন কাজ ছিল। আর লাইব্রেরীতে গিয়ে পড়ার কথা ভাবাও যেতোনা। শত বাঁধা আর সীমাবদ্ধতার পরও পাঠকের সংখ্যা ছিল ব্যাপক।

book

সময় পাল্টে এখন আর সবার মত শিক্ষার ধারা অনেক অধুনিক। ক্লাসের শিক্ষকরা প্রতিনিয়ত পাঠ্যপুস্তকের ফাঁকেফাঁকে নিজের সামগ্রিক জ্ঞান বোধ ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির লক্ষে নিজেরা বই সাজেস্ট করছেন। বইপাঠের প্রতিযোগিতা আয়োজন করে পুরস্কার প্রদান করছেন, বাবা-মা’রাও বিভিন্ন উপলক্ষে বই গিফট করছেন। জেলায় জেলায় বই মেলা হচ্ছে প্রতিবছর। একাধিক সংগঠন বই পাঠে আগ্রহ সৃষ্টির লক্ষে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বই পাঠ দিবস পালন করা হচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকের ছাড়া অন্যান্য গল্প কবিতা প্রবন্ধ উপন্যাস যে শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম তা সব সময় প্রিন্ট ও টিভি মিডিয়ায় প্রচার করা হচ্ছে। প্রযুক্তির কল্যাণে ই-রিডার  সহ অন্যান্য মাধ্যমে বই এখন হাতের দেরগোড়ায়।

এতো এতো আয়োজন করার পরও পাঠক খুঁজে পাওয়া রীতিমত দুষ্কর হয়ে পরেছে! ছেলে মেয়েদের পাঠ্য পুস্তকের বাইরে অন্যান্য বই হাতে নিতেও অনীহা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লাইব্রেরি হতে বই নিয়ে পড়ার শিক্ষার্থীর সংখ্যাও আশ্চর্য্যজনক ভাবে কমে যাচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে যেন লাইব্রেরিতে সারি সারি বই শুধু মাত্র শোভা বর্ধনের জন্যে। সকল শিক্ষার্থী  সাজসন্স ভিত্তিক পড়াশুনা করে পরীক্ষায় সর্বোচ্চ গ্রেড ধরে রাখায় ব্যস্ত। বাবা-মাও চান সন্তান পরীক্ষায় ভাল ফল করে উচ্চ বেতনের চাকুরী করুক। সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত হোক। এতেই মা বাবা খুশি। কিন্তু আদর্শ মানুষ হতে হলে তাকে সিলেবাসে নির্ধারিত পাঠ্য বইয়ের বাহিরে জীবন ও জগত সম্পর্কে জানতে হবে। যার একমাত্র পথ হচ্ছে বই পড়া।

বিল গেটস বলেছেন, “আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন আমার অনেক স্বপ্ন ছিল। আমার নানা ধরনের স্বপ্নের পেছনে একটা বড় কারণ ছিল বই পড়া। বৈচিত্র্যময় বই পড়ার কারণেই আমি অনেক অনেক স্বপ্ন দেখতাম।” বই মনের সংর্কীণতা কে দূর করে।

books

একটি বই একজন লেখকের চিন্তাধারার ফসল। বইয়ের মধ্যে লিপিবদ্ধ থাকে সভ্যতার ইতিহাস। বই পড়ার অভ্যাস মানুষকে আলোর পথে টেনে নিয়ে যায়। পাঠ অভ্যাস চিন্তা জগতকে প্রসারিত করে। জ্ঞানের মহা সমুদ্রের সন্ধান পেতে হলে বই পড়ার বিকল্প নেই। বই একজন নিঃসঙ্গ ব্যক্তির জীবনে সবচে ভালো সঙ্গী। বইয়ের দ্বারা মানুষ এক জায়গা বসে অনেক জায়গা ঘুরতে পারে। জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে বইয়ের কোন বিকল্প নেই। জীবনে বইয়ের চেয়ে ভালো সঙ্গী আর হয় না। কিন্তু প্রযুক্তির আগমনে বই পড়ার অভ্যাসটা দিন দিন কমে যাচ্ছে।

তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তির মাধ্যমে যতটা না বই পাঠের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে তাঁর ডের বেশী আগ্রহী ইন্টানেটের বহুমাত্রিক ব্যবহারের দিকে। ফেসবুকে স্ট্যাটাস আপলোড, সেলফি, লাইক, কমেন্ট, মুভি-মিউজিকের পেছনে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিচ্ছে। শুধুমাত্র সাময়িক আনন্দদায়ক এই সকল মাধ্যম কিছুক্ষণের জন্য আনন্দদায়ক হলেও তরুণদের মূল্যবান সময়ের বড় একটা অংশ নষ্ট করে দিচ্ছে। প্রজন্মের কাছে নেশার মত আটকে থাকছে বিভিন্ন গেমস। যার ফলে তারুণ্যের স্বাভাবিক বিকাশ প্রক্রিয়া মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ফলে এরা সহজেই হতাশাগ্রস্থ হয়ে মাদকদ্রব্য সহ অন্যান্য নেশার দিকে ধাবিত হচ্ছে। সন্ত্রাসী কার্যকলাপে তরুণ সমাজের ব্যাপক অংশগ্রহণ হচ্ছে যা খুবই চিন্তার কারণ। সামাজিক অবক্ষয়, শ্রদ্ধা-সম্মান বোধ, স্নেহ-ভালবাসা হারিয়ে অনেক তরুণ তাদের জীবন ধারণের জন্য বেছে নিচ্ছে সহিংস ও বিকৃত নানান পথ।

Open book

বর্তমানে  যুক্তিবাদী ও কাল সচেতন লেখক প্রমথ চৌধুরী তার ‘বই পড়া’ প্রবন্ধে নানান যুক্তি প্রমাণের মাধ্যমে বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা ও অপরিহার্যতা তুলে ধরেছেন। একজন শিক্ষার্থীকে মননশীল ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে অবশ্যই তাকে পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বই, নিয়মিত পত্রিকা পড়তে হবে। জানার পরিধি বাড়াতে হবে। বর্তমান বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে অনলাইন প্রযুক্তির সঠিক ব্যাবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে জ্ঞানের ভান্ডারকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করতে হবে।

প্রযুক্তিকে সঠিক পথে কাজ লাগানোটাই বর্তমান প্রজন্মের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। অনলাইনে পাঠ অভ্যাস করা যেতে পারে। দেশি বিদেশী লক্ষ লক্ষ বই, জার্নাল এর ই-সংস্করণ সহজেই পাওয়া যায়। এরজন্য প্রয়োজন শুধুমাত্র সদিচ্ছার। এখন তরুণ প্রজন্মের উচিত প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে পাঠ অভ্যাসটাকে ধরে রাখা। যার বই পড়ার অভ্যাস যত বেশি তার জানার পরিধিও তত বেশি। তাই বই পড়ার অভ্যাসটা চালু রাখা প্রয়োজন। প্রতিটি মা বাবারই উচিত তার সন্তানদেরকে বয়স অনুযায়ী বই পড়ার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা। এতে তাদের জ্ঞানের জগত প্রসারিত হবে। জীবনে বড় হওয়ার প্রতি আগ্রহ বাড়বে।

পূর্ব প্রকাশিত